আমি আদনান। ফাতিমা আমার স্ত্রী। প্রথম যখন আমাদের বিয়ে হয়েছিলো, তখন মনে হয়েছিলো আমাদের পরিবার এভাবে আমাদের বিয়ে দিয়ে ঠিক করেনি। কারণ আমরা কেউ কারো মতো ছিলাম না। একজন যদি উত্তর মেরুর মানুষ হই, তো অন্যজন দক্ষিণ মেরুর। একজন সংশয়বাদী আর অন্যজন বিশ্বাসী। এভাবে তো ফাতিমার আমার সাথে থাকাই ঠিক ছিলো না। তবুও কী মনে করে ছিলো, সেটা ফাতিমাই ভালো বলতে পারবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের পরিবার কাজটি ঠিক করেনি। যদিও আমার সংশয়ের কথা আমার পরিবার জানতো না। কিন্তু আমি যে সালাত আদায় করতাম না, সেটা তো তারা দেখতোই। তবুও কী মনে করে তারা এই সিদ্ধান্ত নিলো কে জানে?

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে কত কিছুই আল্লাহ তা’আলা পরিবর্তন করে দিলেন। এখন মনে হয় আল্লাহ তা’আলা ফাতিমাকে আমার জন্য হেদায়েতের মাধ্যম হিসেবেই কবুল করেছেন। হয়তো আমার বাবা-মার দু’য়ার কারণেই আল্লাহ তা’আলা ওকে আমার জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আগে অন্তরে একপ্রকার অশান্তি অনুভব হতো। কিন্তু এখন একপ্রকার প্রশান্তি অনুভব করি। এই অনুভুতি আসলে কেমন, সেটা বলে বুঝানো যাবে না। আমার জীবনের এই কালো অধ্যায়গুলো সাদা করে দেওয়ার জন্য ফাতিমার অবদান আমি ভুলতে পারি না। এজন্য আমি সবসময় ওর ইচ্ছাকে অগ্রধিকার দেই। এতদিনের পরিচয়ে আমি লক্ষ করলাম যে, ফাতিমা খুব সত্যান্বেষী একটি মেয়ে। পড়াশোনার প্রতি ওর প্রচণ্ডরকম ঝোঁক। আমি তো অফিসে থাকি। ওয়ার্কার, বায়ার, ইনভেস্টর – কতজনকে যে সামলানো লাগে! মার কাছে শুনলাম অধিকাংশ সময় ফাতিমা পড়াশোনা করেই কাটায়। আমার প্রায়ই ওকে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে নিয়ে যাওয়া লাগে। এই তো গতকাল মাত্র গ্রামের বাড়ি থেকে এলাম। এরই মধ্যে আজ বলে বসলো, “তুমি তো আজ ফ্রি আছো। চলো তো একটু লাইব্রেরিতে যাই।”

IIRT Arabic Intensive

যেহেতু কোনো কাজ নেই, তাই আমিও রাজি হয়ে গেলাম। দুইজন বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। নাবিলাকেও যাওয়ার জন্য বললাম। কিন্তু ও যেতে ইচ্ছুক না। অবশ্য ও যে ফাঁকিবাজ, লাইব্রেরিতে ওর যাওয়ার কথাও না। শেষমেষ মাকে বলে আমরা দুইজনই গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেলাম। যাত্রাপথে মহাখালি এসে ফাতিমার ফোন বেজে উঠলো। বাইরে গাড়ির শব্দে শুনতে সমস্যা হবে ভেবে ফাতিমা ফোন রিসিভ করে লাউড স্পিকারে দিয়ে বললো, “হ্যালো সামিরা, কেমন আছিস?”

ফোনে উত্তর এলো, “হ্যাঁ, ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?”

-“আমিও আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। কোথায় তুই? হঠাৎ ফোন দেওয়ার কারণ কী?”

-“আমি জাতীয় সংসদের সামনে। তোর বাসায় যেতে চাচ্ছিলাম। তুই কি বাইরে? এত শব্দ কেন?”

-“হ্যাঁ, আমি তো একটু ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে যাচ্ছি। তুই এখন যেখানে আছিস, সেখান থেকে তো লাইব্রেরি দূরে নয়। কোনো দরকার থাকলে লাইব্রেরিতে চলে আয়। আমি দোতলায় দক্ষিণ দিকে বসবো, ইনশা-আল্লাহ।”

-“আচ্ছা, ২০ মিনিট পরে রওনা দিচ্ছি।”

কথোপকথন শেষে আমি ফাতিমাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, এই সামিরা কে?”

“সামিরা আমার ক্লাসমেট ছিলো ছোটবেলায়। মিরপুরে থাকে।” ফাতিমার উত্তর।

কিছুক্ষণ পরে আমরা লাইব্রেরিতে চলে আসি। কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকে আমি সোজা দক্ষিণ দিকের একটি নিরিবিলি টেবিলে গিয়ে বসে পড়লাম। ফাতিমা কী একটা হিস্ট্রির বই নিয়ে এলো। পাশ থেকে দেখে বুঝতে পারলাম বইটির নাম A History of Disease in Ancient Times এবং বইটি লিখেছেন Phillip Norrie নামের এক ভদ্রলোক। আমি ফাতিমাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “এই বই পড়ে তুমি কী করবে?”

ফাতিমা উত্তর দিলো, “বই পড়লে জ্ঞান বাড়ে। স্পিনোজা বলেছিলেন, ‘ভালো খাদ্যবস্তু পেট ভরে, কিন্ত ভালো বই মানুষের আত্মাকে পরিতৃপ্ত করে।’ আর জন মেকলে বলেছিলেন, ‘প্রচুর বই নিয়ে গরীব হয়ে চিলোকোঠায় বসবাস করবো, তবু এমন রাজা হতে চাই না যে বই পড়তে ভালোবাসে না।’ তাই তোমারও উচিত প্রচুর বই পড়া। বুঝলা? যা-ই হোক, এই বইটিতে প্রাচীন সব রোগের বিস্তারিত উপাত্ত দেওয়া আছে। এগুলো আমার বিভিন্ন কাজে লাগতে পারে।”

আমি ফাতিমাকে বললাম, “আচ্ছা, তাহলে তুমি বসে বসে বই পড়ো। আমি একটু লাইব্রেরিতে ঘুরে আসি।”

এই বলে আমি উঠে পড়লাম। এখানে কী কী বই আছে সেটা দেখার জন্য দোতলার দরজার দিক দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। একটা কলাম ঘুরে উল্টো দিকে আসতে আসতে আবার দরজার দিকে গিয়ে দেখলাম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কিছু বই রাখা আছে। ভাবলাম এখান থেকে একটি বই আমি পড়তে পারি। হঠাৎ একটি মেয়ে সামনে এসে বললো, “এক্সকিউজ মি! আপনি শেখ আদনান না? ফাতিমার হাসব্যান্ড?”

আমি কিছুটা বিব্রতবোধ করলাম। এরপরে উত্তর দিলাম, “হুম। আপনি কে? আমাকে চিনলেনই বা কী করে? আমি তো আপনাকে চিনি না!”

মেয়েটি উত্তর দিলো, “আমি ফাতিমার ফ্রেন্ড সামিরা। আপনাকে ফেসবুকে দেখেছি। ফাতিমার সাথে একটি ছবি আছে আপনার। এখন সামনাসামনি দেখে মনে হলো আপনিই সেই লোক। তাই শিওর হয়ে নিলাম। ফাতিমা আমাকে এখানে আসতে বলেছে। ওর সাথে আমার একটু দরকার আছে। ও কোন টেবিলে বসেছে?”

“আচ্ছা আমার সাথে আসুন।” এই বলে আমি সামিরাকে নিয়ে লাইব্রেরির দক্ষিণ দিকে যেতে লাগলোম। দক্ষিণ দিকে পৌঁছে বললাম, “ফাতিমা, তোমার ফ্রেন্ড চলে এসেছে।”

ফাতিমা বললো, “এত তাড়াতাড়ি কীভাবে আসলি? রাস্তায় জ্যাম ছিলো না মনে হয়, তাই না?”

“হুম।” সামিরার উত্তর।

“কিন্তু তুমি ওকে চিনলে কী করে?” আমাকে লক্ষ্য করে ফাতিমার প্রশ্ন।

আমি বললাম, “আমি চিনিনি। তোমার ফ্রেন্ডই আমাকে চিনেছে। ফেসবুকে নাকি আমার আর তোমার ছবি দেখেছে।”

একথা শুনে ফাতিমা বললো, “ও আচ্ছা। সামিরা, এদিকে আয়। পাশে এসে বস। আদনান, তুমি সামনের চেয়ারে বসতে পারো অথবা আমার এই পাশে আসতে পারো।”

আমি উত্তর দিলাম, “আচ্ছা, সামনেই বসছি।”

ওদিকে সামিরা ফাতিমার পাশে বসতে না বসতেই বলে বসলো, “তোর অভ্যাস আর গেলো না! সারাদিন খালি পড়াশোনা আর পড়াশোনা। এই অভ্যাস তোর কবে যাবে? আমার মনে হয় যাবে না! তো কী পড়ছিস দেখি?”

ফাতিমা বললো, “এই তো পূর্ববর্তী সময়ের কিছু রোগ যেমন, Plague, Small Pox ইত্যাদির ইতিহাস পড়ছি। এখানে যা দেখলাম, ওই সময়ে এই রোগগুলোর কোনো ট্রিটমেন্ট ছিলো না। তাই এই রোগ হলে মৃত্যু অবধারিত।[১] কী কী কারণে এই রোগ হতো, তারা কীভাবে এগুলোর মোকাবেলা করতো ইত্যাদি বিষয়গুলো পড়ে দেখছি। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, সেদিন একটি ওয়েবসাইটে দেখলাম, শুধুমাত্র ১৪ শতকেই পৃথিবীতে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন মানুষ Plague রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে।[২] এটা কিন্তু একটা ম্যাসিভ অ্যামাউন্ট অব পিপল! এমনকি ট্রিটমেন্ট বের হবার পরেও ২০০৪ থেকে ২০০৯ সালে বিশ্বে মোট ১২৫০৩ জন প্লেগে আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৮৪৩ জনই মারা গিয়েছে এবং এর মধ্যে আফ্রিকারই ৯৭.৬ পার্সেন্ট।[৩]  এমনকি এই বছরের সেপ্টেম্বর আর অক্টোবরেই মাদাগাস্কারে প্লেগের মহামারী দেখা দিয়েছে।”[৩.১]

সামিরা বললো, “হুম, সত্যিই দুঃখজনক! আচ্ছা ফাতিমা, একটা প্রশ্নের উত্তর দে। কেউ যদি এই প্রচুর সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়, তাহলে কি আমরা তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারি কিংবা তাকে কি আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বলতে পারি? অথবা তাকে কি আমরা ব্যক্তি হিসেবে অমানবিক বলতে পারি?”

আমি সাথে সাথে উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ, অবশ্যই সে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী! সে অবশ্যই দোষী এবং অমানবিক ব্যক্তি! তাকে হিটলারের উপাধি দেওয়া উচিত!”

আমার উত্তর শুনে সামিরা বললো, “এক্স্যাক্টলি এটাই একটা সাধারণ সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের চিন্তা। কিন্তু মোহাম্মদ তো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ ছিলো না। এজন্যে সে এই বিশাল পরিমাণ মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিলো। তাই প্লেগে এই বিপুল পরিমাণ মানুষের মৃত্যুর জন্য এক হিসেবে মোহাম্মদও দায়ী ছিলো। এ কারণে সে একজন অমানবিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি। এবং যেহেতু সে ইসলাম ধর্মের নবী, সেহেতু ইসলামও একটি বর্বর ধর্ম!”

সামিরার এই কথা শুনে আমার চোখ দু’টি ডাবের মতো হওয়ার উপক্রম। চিন্তা করলাম যে, হায়! হায়! সম্পূর্ণ কথা না শুনে কী স্টেটমেন্ট দিলাম? ফাতিমার দিকে তাকাতেই মনে হলো সে-ও কিছুটা বিরক্তি বোধ করেছে সামিরার কথা শুনে। ফাতিমা তখন সামিরার দিকে ঘুরে বসে জিজ্ঞাসা করলো, “সামিরা, তুই কি এগুলো বলতেই আমার সাথে দেখা করতে এসেছিস?”

মাঝ থেকে আমি বললাম, “ফাতিমা, এটা লাইব্রেরি। এখানে এত জোরে কথা বলা যাবে না। তোমরা যদি এসব বিষয়ে কথা বলতেই চাও, তাহলে চলো বাইরে কোনো রেস্টুরেন্টে যাই।”

ফাতিমা বললো, “আচ্ছা চলো, কোনো রেস্টুরেন্টেই যাই। সামিরার অভিযোগগুলো আমার শোনা দরকার। তুমি গাড়ি বের করতে লাগো। আমি আর সামিরা বইটি জমা দিয়ে আসছি।”

তারপর আমি নিচে এসে গাড়ি বের করতে করতে ওরা নেমে এলো। আমি ওদের গাড়িতে নিয়ে সোজা Chef’s Cuisine-এ চলে আসলাম। ফাস্ট ফুডের জন্য এই রেস্টুরেন্টটি ভালোই। গাড়ি থেকে ওদের নামতে বলে বললাম, “তোমরা ভিতরে গিয়ে কী খাবে, সেটা অর্ডার দাও। আমি গাড়ি পার্ক করে আসছি।”

গাড়ি পার্ক করে এসে ওদের সাথে বসলাম। তারপর কী অর্ডার করেছে জিজ্ঞাসা করলাম।

ফাতিমা বললো, “কোল্ড কফি। আর কিছু না।”

আমি বললাম, “শুধু কফি খাবে? আরো কিছু নাও।”

ফাতিমা বললো,“সামিরাই বলেছে বেশি কিছু খাবে না। আর আমার এখন খাওয়ার মুড নেই! আচ্ছা, কী যেন বলছিলাম?”

আমি উত্তর দিলাম, “তুমি বলছিলে যে, সামিরা কি এই কাজেই তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে কি না।”

ফাতিমা সামিরার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো, “ও হ্যাঁ। আচ্ছা, এখন বল। সামিরা, তুই কি এগুলো বলতেই আমার সাথে দেখা করতে এসেছিস? তুই রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে কোনো কারণ ছাড়া অমানবিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বলতে পারিস না। কী জন্যে তোর এমনটা মনে হলো, সেটা প্রমাণসহ বল। প্রমাণ ব্যতীত এভাবে তুই রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দোষারোপ করতে পারিস না!”

সামিরা বললো, “না, আমি ঠিক এ কারণে তোর সাথে দেখা করতে আসিনাই। কথায় কথায় উঠেছিলো, তাই বলেছিলাম। আর আমি দোষারোপ কোথায় করলাম? যা সত্যি, তা-ই তো বলেছি। তোদের সহি বোখারি আর মুসলিমে আছে, মোহাম্মদের সময় যখন কোনো স্থানে প্লেগ রোগ মহামারী আকারে প্রকাশ পেতো, তখন সে তাদের হুকুম দিয়েছে যে, ঐ এলাকা থেকে কেউ যেন বাইরে না যায়। আবার ওই এলাকার ভিতরে কেউ যেন না ঢোকে।”[৪]

ফাতিমা বললো, “হুম, তাতে কী সমস্যা?”

সামিরা বললো, “সমস্যা তো আছে। আমি জানি তুই এখন বলবি যে, কোনো এলাকায় যখন Plague মহামারী আকারে প্রকাশ পায়, তখন ওই এলাকায় ঢুকলে তো তাদেরও প্লেগ হবে। অথবা তুই বলতে পারিস যে, যে ব্যক্তি Plague রোগে আক্রান্ত হয় সে যদি এলাকার বাইরে যায়, তাহলে সে তো ওই এলাকাতেও প্লেগ ছড়াবে। তাই তো? আমি কি ঠিক বললাম?”

তখন ফাতিমা বললো,“হুম। এটা তো তিনি ঠিকই বলেছেন।”

তখন সামিরা বললো, “হুম, এতটুকু তো ঠিকই ছিলো। কিন্তু মনে কর, কোনো এলাকায় ১০০০ মানুষ বসবাস করে। সেখানে ২০০ লোক প্লেগে আক্রান্ত হয়েছে। এটাকে মহামারী হিসেবে ধরা যায়। কিন্তু তুই দ্যাখ, ওই এলাকার ৮০০ লোকই কিন্তু সুস্থ আছে। তুই এটা জানিস যে, প্লেগ একটি Pandemic Disease। অর্থাৎ, এটি যখন মহামারী আকারে ছড়ায় তখন একটি বিস্তৃত এলাকাসহ আক্রান্ত হয়। এমনকি সম্পূর্ণ দেশও আক্রান্ত হতে পারে। এরকম হয়েছিলো চায়না এবং ইন্ডিয়াতে ১৮৫৫ সালে এবং ১২ মিলিয়ন লোক এতে মারা যায়। একে তৃতীয় প্লেগ প্যানডেমিক বলে।[৫] যা-ই হোক, তাহলে এখন এই ৮০০ লোককে যদি মোহাম্মদের আদেশ অনুযায়ী এলাকা ত্যাগ করতে না দেওয়া হয়, তাহলে একসময় ওই ৮০০ জন লোকও প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবে। এভাবেই অল্প সংখ্যক রোগী প্লেগে আক্রান্ত হলেও মোহাম্মদের আদেশ মানার কারণে অনেক স্থানে সে সংখ্যা কয়েকগুণে গিয়ে দাঁড়ায়। তাহলে এই অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যুর কারণে কি আমি মোহাম্মদকে দোষী বলতে পারি না? এখানে আমার দোষ কোথায়?”

আমি চিন্তা করলাম, “তাই তো! এমন বাধ্যবাধকতা কেন দেওয়া হলো?” আমার মাথায় কোনো উত্তরই আসছিলো না। আর আমি এ বিষয়ে তেমন জানিও না। নিচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে জিহ্বায় বারবার কামড় দিতে লাগলাম।

ফাতিমা কিছুক্ষণ পরে একটু কাশি দিয়ে বললো, “আচ্ছা, এই ব্যাপার। ভালোই জেনেছিস দেখছি। তাহলে তোর মতে এই ক্ষেত্রে মানবতার মানদণ্ড হলো, অল্পসংখ্যক লোক যারা প্লেগে আক্রান্ত হয়েছে তারা তো মারা যাবেই! কিন্তু যে কয়জন আপাতত সুস্থ আছে তাদের বাঁচানো। মানে হলো, অধিক মানুষের বেনিফিটের দিকে লক্ষ রেখে কম সংখ্যক মানুষকে ইগনোর করা। এক্ষেত্রে এটাই তো তোর দৃষ্টিতে মানবতা। তাই তো?”

সামিরা মাথা নেড়ে বললো, “হুম।”

ফাতিমা বললো, “এটাই তোদের প্রবলেম। তোরা হাদীস পড়বি। কিন্তু সেটা বোঝার জন্য পড়বি না। তোরা পড়বি ভুল ধরার জন্য। আর যখন কোনো হাদীস পেয়ে যাবি, যেটি নিজের স্বল্প বৈজ্ঞানিক জ্ঞান দিয়ে জাস্টিফাই করতে পারবি না, তখন অজ্ঞতাবশত ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রজ্ঞার অধিকারী ব্যক্তিটিকে দোষারোপ করে বেড়াবি! এগুলোই তোদের কাজ।”

ফাতিমার এই কথা শুনে আমি আগ্রহ সহকারে ফাতিমার দিকে তাকাতেই ও বললো, “সামিরা, তোকে আগে প্লেগ সম্পর্কে কিছু বেসিক জ্ঞান দেই। Yersenia pestis নামক একটি ব্যাক্টেরিয়ার কারণে প্লেগ হয়।[৬] এই জীবাণুটি রোডেন্ট বর্গীয় প্রাণী, যেমন-ইঁদুরে বসবাস করে, সংখ্যাবৃদ্ধি করে। এজন্য এই ইঁদুরকে এই রোগের রিজার্ভার বলা হয়। ইঁদুর থেকে এই ব্যক্টেরিয়া কিছু মাছি জাতীয় প্রাণী যাকে ‘Fleas’ বলি, যেমন-Xenopsilla cheopis-এর মাধ্যমে মানুষের দেহে আসে।[৭] এজন্য ‘Fleas’-কে বলা হয় এই রোগের ভেক্টর। এখন প্লেগের ব্যাক্টেরিয়া যখন মানুষকে আক্রমণ করে, তখন একজন মানুষও প্লেগের জীবাণুর জন্য আশ্রয়দাতা হিসেবে বিবেচিত হয়। তখন তার থেকে আবার অন্য একজন আক্রান্ত হতে পারে। তাই মানুষকে Plague-এর ক্যারিয়ারও বলা হয়।”[৮]

“এক্সকিউজ মি স্যার, আপনাদের কফি।” ওয়েটার বললো। আমি বললাম,“ভাই, একটু পরে একটা লাচ্চি দিয়ে যেও তো।” ছেলেটি একটি হাসি দিয়ে চলে গেলো। ফাতিমা কফির কাপে চুমুক দিয়ে বললো, “তাহলে রিজার্ভার, ভেক্টর আর ক্যারিয়ার কাকে বলে বুঝেছিস?”

সামিরা বললো, “হুম, বুঝলাম।”

তখন ফাতিমা-বললো, “আল্লাহ্‌র শুকরিয়া যে একবারেই বুঝেছিস! যা-ই হোক, এখন প্লেগের Source of infection এবং Mode of transmission কীভাবে হয় সেটা জানিস?”সামিরা উত্তর দিলো, “হুম। তোর কথামতো তো সংক্রমিত ইঁদুর, fleas, আর প্লেগে আক্রান্ত ব্যক্তিই Source of infection । আর Mode of transmission জানি না।”

ফাতিমা বললো, “হুম, ঠিক বলেছিস। সাধারণত প্লেগ পাঁচভাবে ট্রান্সমিট হতে পারে। তার মধ্যে একটি হলো, মানুষ থেকে মানুষে। আমাদের আজ এই একটা টাইপই দরকার। বাকিগুলো না হলেও চলবে। তাহলে যেহেতু মানুষ Source of infection, সেহেতু সংক্রমিত মানুষ থেকে সরাসরি তার থুথু, কফ, হাঁচি দিলে বের হওয়া তরল বা সাধারণ কথোপকথনের মাধ্যমেও প্লেগ ছড়াতে পারে।[৯] তাহলে বুঝতেই পারছিস যে, একটি এলাকায় এই রোগ দেখা দিলে তা মহামারী হতে আর বেশি সময় লাগবে না। বুঝেছিস?”

সামিরা বিরক্তির সুরে বলে উঠলো, “ফাতিমা, তুই মনে হয় আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এদিক সেদিক করে এড়িয়ে যাবার ট্রাই করছিস! এটা অবশ্য তোদের একটা স্ট্র্যাটেজি। কিন্তু আমি আজ তোকে ছাড়ছি না। এগুলো জেনে আমার কোনো লাভ নেই। তুই সরাসরি আমার প্রশ্নের উত্তর দে!”

ফাতিমা হেসে দিয়ে বললো, “শোন সামিরা, আমি যদি তোর প্রশ্নের উত্তর না-ই দিতে পারতাম, তাহলে এখানে বসে বসে শুধু শুধু তোর সাথে কথা বলে সময় নষ্ট করতাম না! আমি যেগুলো তোকে বলছি, সেগুলো ভালো করে শোন, নাহলে পরে যা বলবো তার কিছুই বুঝবি না। ঠিকাছে?”

পরিস্থিতি আমার কাছে একটু গরম মনে হচ্ছে! তাই সাথে সাথে আমি ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে বললাম, “ফাতিমা, তোমার মনে হয় গলা শুকিয়ে গিয়েছে। এই নাও, পানি খাও।”
ফাতিমা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “খাচ্ছি কোল্ড কফি। গলা শুকাবে কেন? হা হা।”

ওরা দুই জনেই হেসে দিলো। ওরা আমাকে বোকা ভাবুক আর যা ভাবে, ভাবুক। আমি এটাই চেয়েছিলাম যে ওরা দুইজন যেন শান্তভাবে কথা বলে। এখানে আমি অন্তত সফল। নিচের দিকে তাকিয়ে এটাই ভাবছিলাম আর মুচকি হাসছিলাম।

“এই যে, কী চিন্তা করছো? কফি খাও। তাহলে গলা শুকাবে না। সামিরা, আমরা যেন কোথায় ছিলাম?” ফাতিমার প্রশ্ন।সামিরার উত্তর আমিই দিলাম। বললাম যে, “আমরা Modes of transmission-এ ছিলাম।”

ফাতিমা কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বলা শুরু করলো, “আচ্ছা, Plague সাধারণত তিন ধরনের হয়। একটি বুবনিক প্লেগ। অপরটি নিউমোনিক প্লেগ এবং আরেকটি হলো সেপ্টিসেমিক প্লেগ।[১০] এর মধ্যে বুবনিক প্লেগই বেশি হয়। এবং এক্ষেত্রে মানুষ Source of infection নয়। কিন্তু ট্রিটমেন্ট না করলে পরবর্তীতে নিউমোনিক ও সেপ্টিসেমিক প্লেগ হয়। এখন, যেহেতু সেই সময়ে এই রোগের চিকিৎসা ছিলো না, সেহেতু সেই সময়ে বুবনিক প্লেগ হলেও তা পরে নিউমোনিক প্লেগে রূপ নিতো। সেই ক্ষেত্রে মানুষ প্লেগের Source of Infection । তাহলে এখানে আমাদের মূল ফোকাস থাকবে নিউমোনিক প্লেগের উপর। ওকে? উম…আচ্ছা, এখন তুই বল যে, তুই কি ‘Incubation period’ এবং ‘Exposure’ সম্পর্কে কিছু জানিস?”

সামিরা উত্তর দিলো, “না, আমি এই ব্যাপারে কিছু জানি না।”

ফাতিমা বললো, “ঠিকাছে, তাহলে আমিই বলছি। Incubation Period হলো, মনে কর একটি রোগ সংঘটনে সক্ষম একটি জীবাণু আজ তোর শরীরে ঢুকেছে। কিন্তু ওই জীবাণুর কারণে যে রোগ হবে, সেই রোগের প্রথম লক্ষণ প্রকাশ পেলো সাত দিন পরে। তাহলে এই মধ্যবর্তী সাতদিন সময়কে Incubation Period বলা হয়।[১১] প্লেগের বিভিন্ন ভ্যারিয়েশান মিলে এর Incubation Period হলো ১-৭ দিন।[১২] এটা ভালো করে মনে রাখিস। আর মেডিকেল টার্মিনোলজি অনুযায়ী সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে ‘Exposure’ বলতে বোঝায় যে, একটি এলাকায় সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়লে ওই এলাকার এনভাইরনমেন্টে থাকা। অর্থাৎ, মনে কর মিরপুরে সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। এখন তুই ওই এলাকায় থাকিস। তখন বলা হবে ওই রোগের পরিবেশে তুই ‘Exposed’ হয়েছিস।[১৩] তোকে কি আমি বুঝাতে পারলাম?”

সামিরা বললো, “হুম, বুঝেছি। তারপর?

ফাতিমা বললো, “এবার তাহলে তোকে তোর প্রশ্নের উত্তর দেই। মনে কর, ঢাকার সাভার এলাকাজুড়ে প্লেগ রোগ মহামারী আকারে প্রকাশ পেয়েছে এবং তার কোনো চিকিৎসাও নেই। একের পর এক উপজেলা আক্রান্ত হয়েই চলেছে। এখন ধর, সাভারে ৫ হাজার মানুষ বসবাস করে। এর মধ্যে ২ হাজার মানুষ অলরেডি আক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। বাকি ৩ হাজার জন আপাতদৃষ্টিতে এখনো সুস্থ। কিন্তু এই ৩ হাজার মানুষ কিন্তু সাভারে ওই আক্রান্ত এলাকার পরিবেশে Exposed হয়েছে। তার মানে এদের মধ্যেও ওই এলাকায় Exposed হওয়ার কারণে জীবাণু ঢুকতে পারে। কিন্তু কার শরীরে জীবাণু ঢুকেছে এবং কার শরীরে ঢোকেনি এটা ওই incubation period-এর আগে অর্থাৎ ২-৭ দিনের আগে বোঝা যাবে না। এখন তোর যুক্তি অনুযায়ী এই ৩ হাজার লোক সাভার থেকে বের হয়ে এর আশেপাশের ২০ টি গ্রামে পালিয়ে গেলো। কিন্তু পালিয়ে যাবার ৪-৫ দিন পরে দেখা গেলো ওই ৩ হাজার লোকের মধ্যে ১ হাজার লোকের প্লেগ দেখা দিলো এবং এরা ওই ২০ টি গ্রামেই অসমভাবে অবস্থান করছে। আলটিমেটলি তখন রেজাল্ট কী হবে? ওই ২০টি গ্রামের পরিবেশও কিন্তু তখন প্লেগের জীবাণু দিয়ে আক্রান্ত হলো। পরবর্তীতে ওই ২০ টি গ্রামের আরো ১০ হাজার মানুষ প্লেগে আক্রান্ত হবে। তোর বুদ্ধি অনুযায়ী যদি এভাবে প্রত্যেক এলাকা থেকে লোকেরা পালিয়ে অন্য এলাকায় আশ্রয় নিতে থাকে, তাহলে প্রত্যেকেই প্লেগের জীবাণুযুক্ত পরিবেশে Exposed হওয়ায় Incubation period অতিক্রমের মধ্যেই প্লেগে আক্রান্ত হয়ে যাবে। এতে করে একসময় পুরো বাংলাদেশ প্লেগে আক্রান্ত হয়ে পড়বে। তারপর, এটি যেহেতু প্যানডেমিক রোগ, সেহেতু একটি উপমহাদেশও প্লেগে আক্রান্ত হতে পারে। নিশ্চয়ই তখন ফলাফলটি ভালো হবে না। এবার বল, রাসূলুল্লাহ ﷺ কি কাউকে প্লেগে আক্রান্ত এলাকা থেকে বের হতে নিষেধ করে ভুল করেছিলেন?”

সামিরা অন্য দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে আছে। কয়েক মিনিট যাবার পরে ফাতিমা বললো, “কী? এখন তো মুখ থেকে আর কথা বের হবে না। কাউকে দোষারোপ করার আগে ভালোভাবে জিনিসটি জানতে হয়। তারপরে সিদ্ধান্তে আসতে হয়। হুট করে এভাবে না জেনে অপবাদ দিলে হয়তো তোদের মহলে বাহবা পাবি! কিন্তু আমার কাছে না। আর আদনান, তোমার কিন্তু সম্পূর্ণ কথা শুনে তারপর উত্তর দেওয়া উচিত ছিলো। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ব্যাপারে তোমার এই কথা বলা ভুল হয়েছে।”

ফাতিমাকে আবার একটু এক্সাইটেড মনে হচ্ছে। এবার আমি কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বললাম, “ওকে, আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমি তো প্রথমে জানতামই না যে সামিরা রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে দোষারোপ করবে! জানলে তো বলতাম না।”

ফাতিমা বললো, “আচ্ছা যা-ই হোক, আর না করার চেষ্টা করবে। সামিরা, তুই প্লেগে আক্রান্ত এলাকার আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মানুষকে যে অন্য এলাকায় পালিয়ে যাবার পক্ষে যুক্তি দিলি, সেটা কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবেও ভুল। ‘International Health Regulation’ কমিটির নির্দেশ অনুযায়ী- ‘Internationally Quarantinable disease’ হলো তিনটি। তারমধ্যে একটি হলো Plague।[১৪] Quarantine বলতে বুঝায়, কোনো ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ‘Incubation Period’ পর্যন্ত কোথাও আলাদা করে রাখা। প্লেগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ‘Incubation Period’ হলো ৭ দিন।[১৫] অর্থাৎ, যদি কোনো ব্যক্তির ভিতরে প্লেগের জীবাণু থাকে, তাহলে ৭ দিনের মধ্যে প্রকাশ পাবেই। তাই তাকে এই ৭ দিন কোথাও আলাদা করে রাখা হয়। এই পদ্ধতি প্রত্যেক দেশের এয়ারপোর্টে বিদ্যমান। এখন কেউ যদি প্লেগে আক্রান্ত কোনো এলাকা থেকে আমাদের দেশে আসে, তাহলে তাকে এয়ারপোর্টে বা অন্য কোথাও ৬ দিন আলাদা করে রাখা হবে। তার গতিবিধির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। যদি ওই সময়ের মধ্যে তার প্লেগের কোনো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে তাকে তার দেশে ফেরত পাঠানো হবে। অথবা সুস্থ করে তারপরে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। আর যদি ওই সময়ে প্লেগের কোনো উপসর্গ না পাওয়া যায়, তাহলে তাকে এয়ারপোর্ট থেকে রিলিজ দেওয়া হয়। এটাই ‘World Health Organization’ এর নির্দেশ।[১৬] তাহলে যে পদ্ধতি প্রত্যেক দেশের এয়ারপোর্টগুলোতে আছে, সেই পদ্ধতির জন্য কোনোদিন তো তোকে সেসব দেশের প্রশাসনকে দায়ী করতে দেখলাম না। তাহলে একই পদ্ধতি ১৪০০ বছর আগে রাসূলুল্লাহ ﷺ বাস্তবায়ন করলে তুই কেন তাঁকে দোষারোপ করলি? এখানেই তোদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ডবাজি প্রকাশ পায়। হা হা।”

সামিরা এখনো কোনো কথা বলছে না। স্থিরভাবে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। কফির কাপও সামনে পড়ে আছে। দুই-এক চুমুক দিয়েছে মনে হয়। সম্ভবত ও লজ্জা পেয়েছে। একটু পরে ফাতিমা আবার বলা শুরু করলো, “আমি জানি, এর কোনো উত্তর তোর কাছে নেই। ঠিকাছে, তাহলে এতক্ষণের আলোচনায় এটাই প্রমাণিত হয় যে, মহামারীর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর আদেশ সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক। রাসূলুল্লাহ ﷺ চিন্তা করেছিলেন বৃহত্তর মানুষের উপকারের কথা। তিনি এটা বুঝেছিলেন যে, কয়েকজন মানুষের বিনিময়ে যদি হাজারো মানুষ বেঁচে যায়, তাহলে সেটাই লাভ। তুইও এটা বলেছিলি যে, অল্প কয়েকজনের বিনিময়ে যদি অধিক সংখ্যক মানুষকে রক্ষা করা যায়, তাহলে সেটাই ভালো এবং সেটাই উত্তম মানবিকতা। তাহলে এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এরও মানবিকতাই প্রকাশ পেয়েছে এবং এতে তাঁর কোনো দোষ নেই। বরং এর জন্য তাঁর প্রশংসা করা উচিত। সুতরাং, তিনি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই দিয়েছিলেন। আর যে মানুষগুলো ওই এলাকায় থেকে মারা গিয়েছে, সেই মানুষগুলোকেও তাদের সবরের জন্য আল্লাহ পরকালে পুরষ্কৃত করবেন। তাদেরকে আল্লাহ তা’আলা শহীদদের মর্যাদা দান করবেন।[১৭] এর থেকে বড় পাওয়া আর কী থাকতে পারে? সুতরাং, ইসলাম বর্বর ধর্ম নয়, বরং একটি সুন্দর জীবন ব্যবস্থা। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, শরিয়াহ সংক্রান্ত বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি কথাই আল্লাহ্‌র আদেশেই বের হয়েছে।[১৮] আজ থেকে প্রায় ১৪০০ বছর আগে এক নিরক্ষর মানুষ এমন একটি বৈজ্ঞানিক ও মানবিক সিদ্ধান্ত নিজ থেকে দিবে, সেটা ভাবাই যায় না। তাই বলা যায়, তিনি এই নির্দেশ ওহীপ্রাপ্ত হয়েই আমাদের দিয়েছিলেন। অতএব, তাঁর হুকুমই আল্লাহ্‌র হুকুম। সুতরাং, এতে প্রমাণিত হলো যে, তিনি আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন সত্য রাসূল। এখন কি তুই তোর ভুল বুঝতে পেরেছিস?”

এতক্ষণ পরে সামিরা মুখ খুললো। একবারে বাকি কফিটুকু শেষ করে বললো, “আচ্ছা আমি তোকে যে কথা বলতে এসেছিলাম সেটা হলো, আমার জার্মানির ভিসা হয়ে গিয়েছে। সামনের মাসে চলে যাবো। আর হয়তো কয়েক বছর পরে দেখা হতে পারে। তাই শেষবারের মতো বিদায় জানাতে এসেছিলাম। ভালো থাকিস।”

এই বলে সামিরা চেয়ার থেকে উঠতে গেলে ফাতিমা বললো, “সামিরা, আমার প্রশ্ন কিন্তু এটা ছিলো না! তুই নিজেই কিন্তু কথা ঘুরালি। আর……”

ফাতিমাকে থামিয়ে দিয়ে আমি বললাম, “থাক ফাতিমা, এমনিতেই ও লজ্জিত হয়েছে। আজ আর ডাকার দরকার নেই। ওকে ছেড়ে দাও।”

ফাতিমা বললো, “হুম! তাও ঠিক। আসলে অজ্ঞতাই সব সমস্যার মূল। জ্ঞান হলো আলোর মতো। আমার রব বলেন,

وَقُلْ جَاء الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا

আমি বললাম, “এই, ওয়েট…ওয়েট। এই আয়াতের অর্থ আমি জানি। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

‘বলুন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। কেননা মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই ছিলো।’[১৯]

নামাযের সময় হয়ে যাওয়ায় লাচ্ছি আর খেতে পারলাম না আমরা। বিল পে করে বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় আসার পথে ফাতিমা জানালা খুলে দিলো। জানালা দিয়ে আযানের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিলো। আশেপাশের সকল মসজিদ থেকে একই সাথে আযানের ধ্বনি ভেসে আসায় মনোরম এক তরঙ্গের উদ্ভব হচ্ছে। এজন্যই-মনে হয় ঢাকাকে মসজিদের শহর বলা হয়।


[বিঃদ্রঃ সামিরার সাথে আদনানের এভাবে ফ্রি-মিক্সিং শরী’য়াহ সম্মত নয়। গল্পের চিত্রায়নে এগুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে যেহেতু স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আদনান এবং ফাতিমা রয়েছে, সেহেতু ছেলে বা মেয়ে যে-ই বিপরীতে থাকুক, একজনের পর্দার জন্য সেটা সমস্যা। এজন্য এগুলোকে নিছক গল্পে হিসেবে পড়ার অনুরোধ।

আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তখনের সিদ্ধান্ত মেডিকেল সাইন্স এখন প্র্যাক্টিস করে। কোথাও প্লেগের মহামারী দেখা দিলে সেখানে ট্রিটমেন্ট দিতে যাওয়া নিষেধ একমাত্র কেমোপ্রফাইল্যাক্সিস নেওয়া ছাড়া। আবার কাউকে সেখান থেকে বের হতেও দেওয়া যাবে না। কিন্তু আক্রান্ত লোকদেরকে আইসোলেশন করে রাখার সুবিধা রয়েছে। যাতে তারা অন্য সবার আক্রান্ত হবার কারণ না হয়। সমস্ত জ্ঞান তো আল্লাহ তা’আলার কাছেই। লেখাটিতে যা কিছু ভুল, তা আমার ও শয়তানের পক্ষ হতে এবং যা কিছু কল্যাণ, সবই আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে।]

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থাবলি

[১] Park’s Textbook Of Preventive And Social Medicine (23rd edition); Chapter: Zoonoses; Page no: 296

[২] https://en.wikipedia.org/wiki/Black_Death

[৩] WHO (2010); Weekly Epidemiological Record; No. 06, 5th Feb, 2010

[৩.১] http://www.who.int/csr/don/02-october-2017-plague-madagascar/en/

http://www.who.int/csr/don/29-september-2017-plague-madagascar/en/

[৪] সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৬৬৬ ; ই. ফা.- ৫৫৮০, ৫৫৮১, ই. সে.-৫৬০৭, ৫৬০৮

সহিহ বুখারী (আধুনিক প্রকাশনী); হাদীস নং- ৬৪৮৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-৬৫০২

[৫] https://en.wikipedia.org/wiki/Third_plague_pandemic

[৬] https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/8993858

[৭] Park’s Textbook Of Preventive And Social Medicine (23rd edition); Chapter: Zoonoses; Page no: 293

[৮] Park’s Textbook Of Preventive And Social Medicine (23rd edition); Chapter: Zoonoses; Page no: 293

[৯] Park’s Textbook Of Preventive And Social Medicine (23rd edition); Chapter: Zoonoses; Page no: 295

[১০] https://www.healthline.com/health/plague

[১১] https://en.wikipedia.org/wiki/Incubation_period

[১২] http://plague.emedtv.com/plague/plague-incubation-period.html

[১৩] http://dictionary.cambridge.org/dictionary/english/exposure

[১৪] Code of Federal Regulations: 1999-1985; Page-49, Section: 61.123 E-Link: https://goo.gl/M39QC6

[১৫] Park’s Textbook Of Preventive And Social Medicine (23rd edition); Chapter: Zoonoses; Page no: 295

[১৬] Code of Federal Regulations: 1999-1985; Page-49, Section: 61.122

[১৭] https://islamqa.info/en/151904

[১৮] সূরা আন-নাজম (৫৩); আয়াত-৩

[১৯] সুরা বনী-ইসরাঈল (১৭); আয়াত নং-৮১

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive