মুসলিমদের ওপর সহিংস আক্রমণ চালানোর ঘটনা কয়েকদিন পরপরই মিডিয়াতে দেখা যায়। এই অবস্থায় মুসলিমদের বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবী। ইসলাম বিদ্বেষীরা মুসলিম পুরুষদের থেকে মুসলিম নারীদেরকেই বেশি আক্রমণ করে; কারণ মেয়েরা দুর্বল এবং তাদের সহজেই চেনা যায়। এ ধরনের রক্ত হিম করা ঘটনা শুনলে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলিম ভাইবোনদের প্রতি আমরা গভীর সহানুভূতি ও শোক প্রকাশ করে থাকি। কিন্তু আসলে, প্রত্যেক মুসলিম নারীর উচিৎ এই ধরনের জাতিগত আক্রমণকে নিজ নিজ জাগরণের ডাক হিসেবে বিবেচনা করা। বোনেরা, নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মরক্ষামূলক পরামর্শ ব্যবহার করুন।

১। মানসিক প্রস্তুতি

আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, যে কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনা আমাদের যে কারও সাথে ঘটতে পারে। সেজন্য আমাদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, “কখনো যদি আমি এক বা একাধিক হামলাকারীর সম্মুখীন হয়ে যাই, তখন কী করতে হবে সেটা কি আমি জানি?”

IIRT Arabic Intensive

নিজেকে এখন থেকে প্রস্তুত করতে থাকলে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনায় আতঙ্কিত বা ভীত হয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া থেকে আপনি নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন। যদি আপনি অতি মাত্রায় বিশ্বাসী হয়ে পড়েন যে, আপনার প্রতিদিনের চলাচলের রাস্তাটি একদম ‘নিরাপদ’, তাহলে আপনি হয়তো অসচেতন হয়ে পড়বেন আর হামলার শিকার হওয়ার জন্য সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবেন। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় পেছন থেকে মায়ের বলা “সাবধানে যেও” এখন আর শুধু বলার জন্য বলা না। সচেতন থাকা এখন সময়ের দাবী। যখন আপনি কোনো কোলাহলপুর্ণ জায়গায় থাকবেন তখন বেখেয়াল হয়ে যাবেন না। আপনার আশেপাশে অন্যান্য লোকজন থাকলেও না। হাঁটার সময়, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময়, বাসের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় অথবা ট্রেনে  বসে থাকার সময় মেসেজ চেক করা, ফোন, হেডফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। আপনি হয়তো সবার অলক্ষে হিজাবের নীচে হেডফোন ব্যবহার করবেন। তারপরেও তারা আপনার অসতর্কতার সুযোগে আপনাকে লোকালয় থেকে বিছিন্ন করে ফেলতে পারবে।

আপনার আশেপাশের পরিস্থিতি ও লোকজনের প্রতি খেয়াল রাখুন। অতর্কিত হামলা থেকে বাঁচতে দিনের বেলাতেও বিল্ডিং এর চিপা আর অন্ধকার জায়গাগুলো এড়িয়ে চলুন, বড় রাস্তা দিয়ে হাটা-চলা করুন। আপনার আশেপাশের মানুষজন ও রাস্তাটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করুন। আত্মবিশ্বাস ও সতর্কতার সাথে দ্রুতগতিতে হাঁটুন। চেষ্টা করুন, কোনো বন্ধুর সাথে বা দলবদ্ধভাবে চলাচল করতে। অসতর্কভাবে, বেখেয়ালে বা অপ্রস্তুতভাবে হাটবেন না। সতর্ক থাকলে আপনি নিজেকে সম্ভাব্য বাজে পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে পারবেন। সেই সাথে নিজেকে সহজ লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারবেন।

২। পোশাকের ব্যাপারে সতর্কতা 

ভেবে দেখুন, হঠাৎ যদি রাস্তায় কোনো হামলাকারীর আক্রমণের শিকার হোন তখন আপনার কি করা উচিৎ? হামলার পূর্ব পরিকল্পনা না থাকলেও যদি একজন ব্যক্তি কোনো মুসলিম নারীকে সহজ শিকার হিসেবে পায় তাহলে সে হামলা করতে পারে।

সকালে কাপড় পরার সময় একটু থামুন এবং চিন্তা করুন, হঠাৎ প্রয়োজন হলে এই কাপড়ে আপনি সুবিধা মতো দৌড় দিতে পারবেন কিনা?

জুতো বাছাই করাও এক্ষেত্রে বিশেষ প্রয়োজনীয়। আপনি যদি চিপা আর অস্বস্তিকর জুতো পরেন, তাহলে শক্তিশালী হামলাকারীদের থেকে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা কমে যাবে। উঁচু জুতা এড়ানোর চেষ্টা করুন। এতে দৌড়ানোর সময় গোড়ালির সাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। অনেক মহিলারা ঢিলা ফ্ল্যাট ধরনের জুতো পরেন এতে প্রতি পদক্ষেপে সেটা পা থেকে খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এগুলো আপনাকে দৌঁড়াতে বাঁধা দিবে, এমনকি পালানোর সময় আপনি হোঁচট খেয়ে পড়তে পারেন। আপনার পায়ের সাথে ফিট হবে এমন জুতোগুলো ব্যবহার করুন যাতে কোনো জরুরি অবস্থায় আপনি সেখান থেকে দ্রুত সরে পড়তে পারেন।

৩। নির্ভার ও  সচল থাকা

লোকজনের সামনে বাঁধাহীন ও সচল থাকুন।

আপনি যদি অসচেতনভাবে আপনার ব্যাগে মাথা নিচু করে কিছু খুঁজতে থাকেন – এই অসাবধানতার মুহূর্তটিই আপনাকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

আপনার হাত যদি ভারী ভারী বাজারের ব্যাগ দিয়ে বোঝাই থাকে তাহলে আপনার চলাচল বা প্রতিক্রিয়া ধীর গতিতে হবে। আপনি তখন হামলার শিকার হওয়ার জন্য একজন উপযুক্ত ব্যক্তিতে পরিণত হবেন। খুব ভারী ব্যাগ বহন করবেন না। এগুলোর কারণে হামলাকারী সহজেই আপনাকে ধরতে পারে বা হ্যাচকা টান দিয়ে ফেলে দিতে পারে। বিশাল মোটাসোটা ব্যাগের কারণে আপনার চলাচলের গতি কমে যাবে আর তখনই আপনি কোনো অপরাধীর হামলার শিকার হতে পারেন। যদি আপনার বেশি পরিমাণে জিনিস কেনার বা অনেক জিনিস বহন করার প্রয়োজন পরে তাহলে সাথে কোনো বন্ধুকে নিন বা গাড়িতে করে যান।

৪।পালানোর চেষ্টা করা 

আপনি যদি কোনো বিপদজনক পরিস্থিতিতে পড়েন, তাহলে কখনই প্রতিপক্ষের বিপরীতে জেতার চেষ্টা করবেন না। আপনার উদ্দেশ্য থাকবে নিজেকে বাঁচানো এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায় হলো হামলাকারীর কবল থেকে পালানো। আপনি যদি বিপদের আভাস টের পান, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব ঐ এলাকা থেকে পালানোর চেষ্টা করুন। কোনো নিরাপদ, জনবহুল জায়গায় পৌছানোর চেষ্টা করুন। চলন্ত গাড়ি থেকে দূরে থাকুন, ধাক্কা খেতে পারেন। হামলা থেকে দূরে যাওয়ার এবং দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করুন। কোনো রকমের সংকোচ বোধ করবেন না –বিপদ টের পেলে চিৎকার করে সাহায্যের জন্য অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করুন। অথবা কোনো জনবহুল দোকান, রেস্তোরায় লুকিয়ে পড়ুন।

মনে রাখুন, পুলিশকে বা অন্য কাউকে জানানোর আগে ঐ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। আপনার প্রথম কাজ হবে অবিলম্বে কোনো নিরাপদ স্থানে যাওয়া। আর তার পর চিন্তা করুন কিভাবে আপনি বাসায় যাবেন বা আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে ইত্যাদি। আগে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে নিন, আপনি হামলাকারীদের থেকে সুরক্ষিত আছেন কিনা। তারপর সাহায্যের জন্য আপনি আপনার ফোনের দিকে মনোযোগ দিন।

৫। আত্মরক্ষার কৌশল জানা

আপনি যদি আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়েন তাহলে একটা সহজ কাজ করে আত্মরক্ষা করতে পারেন। সেটা হলো, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হামলাকারীকে একটা ঘুষি মারুন যাতে করে আপনি পালানোর একটা সুযোগ পেয়ে যান। অনেকে মনে করেন, এরকম পরিস্থিতিতে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা উচিৎ বা তার রাস্তা আটকিয়ে দেয়া উচিৎ। হামলার সময় আসলেই আপনার কি করা উচিৎ সেটা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কী পরামর্শ দেন ? টি মলারকিন, Target Focus Training এর উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা। ব্যক্তিগত সুরক্ষা প্রশিক্ষণের জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। How to Survive the Most Critical 5 Seconds of Your Life বইয়ের লেখক। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, যে কোনো হামলার মুহূর্তে আপনার হাতে সর্বোচ্চ ৫সেকেন্ড থাকে কিছু একটা করে আপনার জীবন বাঁচানোর জন্য। এবং এক্ষেত্রে সবচাইতে ভালো হয় যদি আপনি দ্রুত বেগে তাকে সামান্য আঘাত করে পালিয়ে আসতে পারেন।

অনেক আত্মরক্ষার ক্লাসে হামলাকারী কি করে সেই অনুযায়ী ঘায়েল করতে শেখানো হয়। কিন্তু এই আত্মরক্ষামূলক উপায়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে -সে আমার সাথে কি করতে যাচ্ছে ? এবং আপনি আসল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলবেন (মার খাওয়ার ভয়ে অনেকে কাঠ হয়ে যায়)। আর এভাবে আপনি হামলাকারী থেকে এক ধাপ পিছিয়ে পড়বেন।

আপনি যদি বিপদে পড়েন তাহলে আপনার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুকে ঘুষি মারতে হবে।

যদি আপনি এমনভাবে কোনঠাসা হয়ে পড়েন যে পালানোর কোনোই উপায় নেই তাহলে একটা সহজ, কার্যকর উপায়ে ঘুষি দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান এবং যতো দ্রুত পারেন দৌড় দিন। আপনার কাছে আর কোনো অভিনব কৌশলের জন্য এক মুহূর্ত সময় থাকবে না। হামলাকারীর চোখ, নাক, গলাকে তাক করুন। এমন কিছুকে লক্ষ্যবস্তু বানান যেটা শুধু কিছু সময়ের জন্য ব্যাথার কারণ হবে না বরং হামলাকারীর ওই জায়গা জখম হয়ে যাবে। এই এক মুহূর্তের মধ্যে আপনি দৌড়ে পালানোর একটা সুযোগ পেয়ে যাবেন। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিন এবং কনুই বা হাঁটু দিয়ে তাকে আঘাত করুন যাতে করে আপনি জীবন বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে পারেন। নিজেকে রক্ষা করার জন্য আপনার কনুই আপনার শরীরের সবচেয়ে শক্ত অংশ। আপনি যতোই ছোট হোন না কেনো আপনার শরীরের ভারকে ব্যবহার করুন। সমস্ত শক্তি একত্রিত করে তাকে ঘায়েল করুন। আক্রমণকারীর অক্ষম হওয়ার মুহূর্তটিকে কাজে লাগিয়ে বেরিয়ে আসুন।

আরো একটি পরামর্শ: কর্মক্ষম ও সুস্থ থাকলে আপনি নিজেকে বাঁচাতে পারবেন ।

National Council on Strength and Fitnessএর মতে, “একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘণ্টায় ১৫ মাইল গতিতে দৌড়াতে পারে।”

জরুরি অবস্থায়, হামলাকারীর হাত থেকে পালিয়ে আসার মতোন দৈহিক সক্ষমতা কি আপনার আছে ? বিপদজনক পরিবেশ থেকে নিরাপদে পালিয়ে আসার মতো সহনশীলতা কি আপনার আছে ?

প্রিয় বোন, নিজেকে নিরাপদ রাখতে এড়িয়ে চলা অবশ্যই সবচাইতে উত্তম পন্থা। সবসময় দল বেঁধে চলাচল করুন এবং বিপদজনক এলাকা এড়িয়ে চলুন। সকাল সন্ধ্যায় আল্লাহ্‌কে স্মরণ করুন। যাই হোক, নিজেকে যে কোনো বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করার জন্য শরীরকে কর্মক্ষম রাখার বিকল্প নেই।

বিভিন্ন অ্যারবিক কার্যকলাপ করে আপনি আপনার হৃদযন্ত্রকে সচল রাখতে পারেন। যাতে করে কোনো বিপদ থেকে দৌড়ে বের হয়ে আসার ক্ষমতা আপনার থাকে। দিনের অল্প কিছু সময় কার্যকর ও পরিকল্পনা মোতাবেক অনুশীলন করার মাধ্যমে আপনার সহনশীলতা ও মনোবল বৃদ্ধি পাবে। আপনি যতো বয়স্কই হোন না কেনো এভাবে আপনি নিজেকে ভালোভাবে রক্ষা করতে পারবেন এবং যে কোনো পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন ইনশা’আল্লাহ।

নিশ্চয়ই যে কোনো পরিস্থিতিতে আল্লাহ বাণীতেই রয়েছে স্বস্তি-

যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। [সূরাহ আল-বাক্বারাহ (২) : ২৫৭]


উৎস: ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটি ব্লগ (মূল আর্টিকেল লিংক)

অনুবাদক: শারিকা হাসান

অনুবাদ কপিরাইট © মুসলিম মিডিয়া

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive