কোটা সংস্কার আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশে আরেকটা বড়সড় মুভমেন্ট হয়ে গেলো নিরাপদ সড়কের দাবিতে৷ এ নিয়ে বেশিরভাগ কথাই অলরেডি বলা হয়ে গেছে। এই লেখায় আমি মূলত প্রাসঙ্গিক কিছু ফেইসবুক স্টেইটাস উদ্ধৃত করেছি, যেগুলোতে কয়েকটি পার্সপেক্টিভ থেকে নিরাপদ সড়ক ইশ্যু সংশ্লিষ্ট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে৷ তারপর উপসংহারে অল্প করে নিজের কিছু কথা যোগ করেছি। খুব বেশি ইউটোপিয়ান শোনালেও আশা করি কথাগুলো বাস্তবজীবন থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন মনে হবে না।

চলছে গাড়ি সিসিমপুরে

ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার পরীক্ষাটা কী পরিমাণ শিশুতোষ, এ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন অগ্রজ সাকিব ভাই। তাঁর লেখাটি হুবহু তুলে ধরছি:

IIRT Arabic Intensive

“আমি যখন প্রথম ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষা দিতে যাই, তখন আমার বিআরটিএ বা বাংলাদেশের ট্রান্সপোর্ট লাইসেন্সিং জগৎ নিয়ে কোন ধারণা ছিলো না। তখন সবে মোটরবাইক কিনেছি। এক ভাই ফর্ম ফিল-আপ করিয়ে দিলেন। হালকা মোটরযান এর। আমি রিটেন দিলাম, ভাইভা দিলাম। সব পাস।

প্র্যাক্টিকাল এক্সামে গিয়ে মোটরবাইকের পরীক্ষা দিয়েই বাসায় চলে আসি। আমার ধারণা ছিলো না যে আমাকে গাড়িও চালাতে হবে। আমি ভেবেছিলাম যেহেতু আমার লাইসেন্স দরকার বাইকের, তাই গাড়িতে ফেল গেলেও কী? আর আমি তো গাড়িই চালাতে পারি না।

তবে সেটা ভুল ছিলো বলে সে যাত্রায় লাইসেন্স মিলে নি। এরপর আবার পরীক্ষা দিয়েছি প্রায় বছরখানেক পর। এবার আর ভুল করি নি। যেহেতু আমি গাড়ি চালাতে জানি না, তাই আগেরদিন ঘন্টাখানেক ইউটিউবে অটো গাড়ির বেসিক মুভমেন্ট নিয়ে অনেক ভিডিও দেখেছি। স্টার্ট দেয়া থেকে সামনে নেয়া আর পেছনে নেয়া পুরোটাই আমি ইউটিউবে দেখে বুঝে নিয়েছিলাম। এবং পরদিন যথারীতি পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে সে ইউটিউব নলেজ অনুযায়ী গাড়ি একবার সামনে নিয়েছি, আর ব্যাকগিয়ার দিয়ে পেছনে নিয়েছি।

বিআরটিএ এর লাইসেন্সিং পরীক্ষায় গাড়ির ড্রাইভিং টেস্ট এতটুকুই। তাই আমার লাইসেন্স হয়ে গেলো। এ পৃথিবীতে খুব কম মানুষই হয়তো আছে, যারা কখনো ড্রাইভিং সিটে না বসেই কেবল ভিডিও দেখে গাড়ি চালিয়ে লাইসেন্স পেয়ে গেছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো আমি এখনো গাড়ি চালাতে জানি না। অদ্ভুত ত্রুটিযুক্ত এক সিস্টেমের কারণে আমি একজন লাইসেন্সধারী অপেশাদার ড্রাইভার। আমি কার, মাইক্রো, জিপ থেকে শুরু করে মিনি পিক-আপ পর্যন্ত চালাতে সরকারিভাবে অনুমোদন পেয়েছি।

সিস্টেম অনুযায়ী আমি পরীক্ষায় আইনগতভাবে সমস্ত নিয়ম মেনে ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছি। কিন্তু গলদ ঐ পরীক্ষাতেই। এই পরীক্ষা কিছুতেই কারো ড্রাইভিং ক্যাপাসিটি নির্ণয় করতে পারে না। পিএইচডি ক্যান্ডিডেট নিতে কেউ যদি “২+২ = কত?” – এই প্রশ্ন দিয়ে কারো ক্যাপাসিটি টেস্ট নেয়, তখন ব্যাপারটা যেমন হাস্যকর হবে, বিষয়টা ঠিক তেমনই।

এ-তো গেল হালকা মোটোরযানের অবস্থা। বাস বা ট্রাকের ড্রাইভিং টেস্ট যারা দেখেছেন, তারা কেবল হেসেছেন। ঐ খোলা মাঠে সামনে-পিছে নেয়া। আর কিছুই না।

যদিও আমি লাইসেন্সধারী, তবু কোনদিন যথেষ্ট পরিপক্ক না হয়ে আমি গাড়ি চালাবো না। কিন্তু হাজার হাজার পেশাদার ড্রাইভার বর্তমানে রাজপথ হাঁকিয়ে হাজার হাজার গাড়ি চালাচ্ছে, যাদের ক্যাপাসিটি সত্যিকার অর্থে নির্ণয় করা হয় নি। কিন্তু সিস্টেমে পড়ে লাইসেন্স দিয়ে দেয়া হয়েছে। পয়সা খেয়ে লাইসেন্স দেয়ার হিসেবটা না হয় বাদই দিলাম?” (উদ্ধৃতি শেষ)

সবার আমি ছাত্র

আগের অংশটি যা দিয়ে শেষ হলো, এই অংশটা সেখান থেকেই শুরু। টাকা-পয়সা দিয়ে লাইসেন্স আদায় করতে রাজি না হওয়ায় সতীর্থ সাইফ কীভাবে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত ছাত্রজীবনেই কাটিয়ে দিচ্ছে, সেই ব্যাপারে এক পুলিশ ভাইয়ার সাথে তার বাস্তব কথোপকথন সে তুলে ধরেছে এভাবে:

“: ভাই, থামব?

: আচ্ছা, থামেন৷

: কাগজ-পত্র দেখাই?

: দেখান৷

: (কাগজ দেখা চলছে)

: দেখলেন তো? সব আছে, খালি এপ্লাই করার প্রায় ৪ মাস পরেও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাইনি৷ লার্নার আছে খালি৷

: (কাগজপত্র ফিরিয়ে দিতে দিতে) হুম, কিন্তু লার্নার দিয়ে গাড়ি চালানো যায় না৷ লাইসেন্স করে ফেলেন তাড়াতাড়ি।

: জানি৷ কিন্তু আমার হাতে তো না, বিআরটিএ দেয় না, কী করি? তো এখন একটা মামলা দিয়ে দেন। ২০০ টাকার দিয়েন।

: (একটু অবাক হয়ে) তাই? আচ্ছা। ইনস্যুরেন্স কোনটা যেন?

: (সব কাগজপত্র থেকে ইন্স্যুরেন্স বের করে দিয়ে) এইযে৷

: (ইন্স্যুরেন্স নম্বর টুকে) এটার উপর তো আগেও মামলা খেয়েছেন। ২০০ না, ৪০০ টাকার মামলা হবে।

: (একটু বেজার হয়ে) ও

: এক কাজ করেন, ট্যাক্স টোকেন দেন। এটা রাখেন। (ইন্স্যুরেন্স ফিরিয়ে দিয়ে)

: (ট্যাক্স টোকেন বের করে দিয়ে) এই নেন।

: (নম্বর টুকে) এটায় আগে মামলা খাননি। ২০০ টাকার মামলা হবে। (মুচকি হেসে) নাম বলেন… পিতার নাম… ফোন নম্বর… ঠিকানা… জাহাংগীরনগর?… হলে থাকেন?… সুন্দর যায়গা… ভালো থাকবেন… লাইসেন্স করে ফেলেন, একটু দৌড়াদৌড়ি করলে পেয়ে যাবেন আশা করি।

গতকালকে ইচ্ছা করে মামলা নিলাম। তাড়াতাড়ি লাইসেন্স করতে দালালদের যে টাকা দেওয়া লাগে, সেই টাকার মামলা খাবো কয়েক মাস। তাও দালালদের টাকা দিব না৷

[বিঃদ্রঃ গণহারে লাইসেন্স চেক না করে লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করলে বরং আরো দক্ষ ড্রাইভার পাওয়া যাবে। কারণ, লাইসেন্স থাকা মানেই কেও ভালো ড্রাইভার তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না, এর মানে এটাও হতে পারে যে সে ৭-১০ হাজার টাকা খরচ করার সামর্থ রাখে এবং তার দুর্নীতি করতে সমস্যা নেই।]” (উদ্ধৃতি শেষ)

ওয়াকিং লাইসেন্স

ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে অনেক কথা হয়ে গেলো। কিন্তু পথচারী হয়ে পথে বিচরণ করাটাও যে শিখে নিতে হয়, এ ব্যাপারটা অনেকেরই অজানা। আমি নিজেও এই অজ্ঞতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নই। আল্লাহ্‌ আমার ও অন্য সবার অজ্ঞতা দূর করে দিন। এই প্রসঙ্গে জরুরি কিছু কথা তুলে এনেছে বন্ধু জুবায়ের:

“সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় একটি অত্যন্ত দুঃখজনক দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। ফেসবুক ও গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা অনেকেই ভিডিওটি দেখেছি–একটা থেমে থাকা বাস চালু হয়ে তার সামনে দিয়ে যাওয়া মহিলাকে ধাক্কা দেওয়ায় মহিলার কোলের শিশুটি পড়ে যায়। এক বছরের শিশুটি একদিন পর মারা যায়। ভিডিওটি যখন প্রথম দেখি তখন অসম্ভব খারাপ লেগেছিল, কারণ আমার আদরের ভাগ্নেটি ঐ বাচ্চাটির বয়সী। সাদা চোখে দেখলে মনে হবে এই দুর্ঘটনার জন্য পুরোপুরিই বাসচালক দায়ী, এভাবে সামনে দিয়ে যাওয়া একটা মানুষের ওপর বাস উঠিয়ে দিতে কীভাবে মানুষ পারে!

ভিডিওটি দেখে খারাপ লাগলেও আমার মনে একটু খচখচ ছিল–আসলেই কি ঘটনাটার পুরো দায় ড্রাইভারের? পরবর্তীতে M. Mahbubur Rahman ভাই ব্যাপারটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আবার চিন্তাভাবনা করলাম। ভিডিওটি বারবার দেখলাম এবং তার সাথে নিজের ড্রাইভিং নলেজ যুক্ত করে কনভিনসড হলাম যে, ঘটনার দায় মূলত ঐ ভদ্রমহিলার। সদ্য শিশুহারানো শোকে পাথর এক নারীর ব্যাপারে এমন মন্তব্য নিষ্ঠুরতা মনে হতে পারে, কিন্তু এই নিষ্ঠুরতাই সত্যের সৌন্দর্য। জাজমেন্টের ব্যাপারে আবেগকে একপাশে ফেলে রাখতে হয়, এটাই নিয়ম। ভদ্রমহিলা কীভাবে দায়ী সে আলোচনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যেন এ ধরণের দুর্ঘটনা আর না ঘটে। তবে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমি আরো কিছু কথা বলে নিতে চাই।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে আমরা ড্রাইভারদের অযোগ্যতা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্স চুরি ইত্যাদি নানা সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলাম। আমি নিজেও এসব নিয়ে লেখালেখি করেছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সব দুর্ঘটনাই কিন্তু কেবল ড্রাইভারদের দোষে ঘটে না। ঢাকা শহরে রাস্তাঘাটে মানুষজন যেভাবে চলাফেরা করে, তাতে আরো দুর্ঘটনা কেন ঘটে না সেটাই মাঝেমধ্যে ভাবি। একেকজন নবাবের মতো রাস্তার মাঝ দিয়ে চলে, রাস্তা পার হতে ওভারব্রিজের তোয়াক্কা না করা তো খুবই সাধারণ ঘটনা, সেই পার হওয়ারও যে কতো বিচিত্র পদ্ধতি! গাড়ি থেমে গেলে দাঁড়িয়ে পড়ে, আবার চলতে শুরু করলে দৌড় দেয়। চৌরাস্তা আর মোড়গুলোতে তো আরো মজার দৃশ্য। মোড়ে নিয়ম হচ্ছে যেকোন একদিকের রাস্তায় সরে গিয়ে ডিভাইডার বরাবর পার হওয়া, প্রয়োজনে ভেঙ্গে ভেঙ্গে। সেখানে মানুষ মোড়ের ঠিক মাঝে গিয়ে কোণাকুণি হাঁটা শুরু করে। ভাবটা এমন যেদিক থেকেই গাড়ি আসুক আমাকে দেখে তো থামবেই, আমি তো শাহেনশাহ।

এক ড্রাইভারের কথা শুনেছিলাম যে বলেছিল, রাস্তায় চলার সময় মানুষগুলোকে গরু-ছাগল ভেবে চালাতে হয়, কারণ মানুষ তো নিয়ম মানে, আর গরু-ছাগল মানে না, ঢাকার পথচারীরা গরু-ছাগলের মতোই চলাফেরা করে। সুতরাং এদের মানুষ ভেবে “নিয়ম মানবে” আশা করে গাড়ি চালালেই অ্যাক্সিডেন্ট হবে, তাই ধরেই নিতে হবে এরা গরু-ছাগল, নিয়ম কিছু মানবে না, রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটবে, আমাকেই সাবধানে গাড়ি চালাতে হবে। কথাগুলো পথচারী হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক মনে হলেও বাস্তবতা এরকমই। একই কথা রিকশা-ভ্যানওয়ালাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে কোনও জ্ঞান তো তাদের নেই-ই, গাড়ির সিগনাল পর্যন্ত বোঝে না অনেকেই। যারা গাড়ি চালান তাঁরা ভাবুন তো, ইউটার্ন নিতে গিয়ে দেখেন ক্যাঁৎ করে রিকশা বা ভ্যান ভেতরে ঢুকে পড়েছে–এমন অভিজ্ঞতা কতবার হয়েছে!

এবার আসি কুষ্টিয়ার সেই দুর্ঘটনার ব্যাপারে। এখানে আমাদের জানতে হবে ব্লাইন্ডস্পট সম্পর্কে। যারা ইঞ্জিনচালিত যেকোন ধরণের যানবাহন চালিয়েছেন তাঁরা মোটামুটি শব্দটার সাথে পরিচিত। ব্লাইন্ডস্পট হচ্ছে চালকের চারপাশের এমন কিছু এরিয়া যার মধ্যে কোনও অবজেক্ট চলে আসলে চালক সেটাকে দেখতে পায় না।

ফোর হুইলারের ক্ষেত্রে ( গাড়ি, মাইক্রো, বাস, ট্রাক ইত্যাদি) একটা কমন ব্লাইন্ডস্পট হচ্ছে ড্রাইভারের পাশের একটা কৌণিক দূরত্ব, যা ড্রাইভারের চোখ কিংবা লুকিং গ্লাস কোনটাই কাভার করে না। মানুষের চোখদুটো সামনের দিকে বলে (unlike গরু বা হাতি) মানুষের দৃষ্টিসীমা ১৮০ ডিগ্রি কৌণিক দূরত্ব পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। এর পেছনের জিনিস মানুষ মাথা না ঘুরিয়ে দেখতে পায় না। আবার লুকিং গ্লাস দিয়ে মোটামুটি ২৪০ ডিগ্রির পর থেকে দেখা যায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ১৮০ থেকে ২৪০ পর্যন্ত, মোটামুটিভাবে এই ৬০ ডিগ্রি ক্ষেত্রের জিনিস একজন ড্রাইভার গাড়ি চালানোর সময় দেখতে পায় না।

এজন্য গাড়ির লেন পরিবর্তনের সময় চালককে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে হয় ব্লাইন্ড স্পটে অন্য কোন গাড়ি আছে কি না। একইভাবে গাড়ি চালানোর সময় চেষ্টা করতে হয় অন্য গাড়ির ব্লাইন্ড স্পটে না থাকার জন্য, একটু সামনে বা পেছনে থাকার জন্য।

ঢাকা শহরের বাসগুলোতে বাম দিকের লুকিং গ্লাস সাধারণত থাকে না। ফলে বামদিকে ড্রাইভারের ব্লাইন্ড স্পটের এরিয়া আরো বেড়ে যায়। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে দরকার হয় হেল্পার/কনডাকটরের সাহায্য। এই যে তারা ক্ষণে ক্ষণে “ডাইনে চাপেন”, “বরাবর যান”, “বাঁয়ে প্লাস্টিক/প্রাইভেট/রিকশা” কথাগুলো বলে সেটা মূলত এ কারণেই। ঐ জায়গার বস্তুগুলোকে ড্রাইভারের পজিশন থেকে দেখা যায় না।

যদি ভারি যানবাহন হয়, যেমন বড় বাস বা ট্রাক, সেক্ষেত্রে আরেকটি ব্লাইন্ড স্পট যুক্ত হয় সামনের দিকে। বড় বাস বা ট্রাকের ক্ষেত্রে শুধু পাশেই নয়, সামনেও একটা নির্দিষ্ট উচ্চতার জিনিস ড্রাইভারের পজিশন থেকে দেখা যায় না।

দুর্ঘটনার ঐ ভিডিওটা লক্ষ করলে বোঝা যায়, ভদ্রমহিলা ড্রাইভারের পাশের ব্লাইন্ডস্পট দিয়ে এসেছেন এবং সেটা অতিক্রম করে সামনের ব্লাইন্ডস্পটে গিয়ে পড়েছেন। এরপর তিনি ঐ ব্লাইন্ডস্পট অতিক্রমের কোনও চেষ্টা না করে বাসের কিনারা বরাবর হেঁটে গেছেন। আমাদের দেশের মহিলাদের গড় উচ্চতা অপেক্ষাকৃত কম বলে ব্লাইন্ডস্পটে থাকাটা আরো সহজ হয়ে যায়। ঘটনাতে অনেকে বাসচালকের অনেক দোষ দিতে পারে, তার অমুক তমুক করা উচিত ছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সত্যটা হলো ঐ মহিলার কায়দায় যদি আবারো কেউ পার হতে যায় তবে একই ঘটনা আবার ঘটবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এধরণের স্থানে পার হতে গেলে বাসের ড্রাইভারের সাইড বরাবর কিছুদূর এগিয়ে যাই, তারপর বামে সরে আসি, এতে ব্লাইন্ডস্পটে পড়ার আশঙ্কা থাকে না। প্রয়োজনে হাত দেখাই। কিন্তু মানুষজন বেশিরভাগকেই যে কায়দায় পার হতে দেখি, বিশেষ করে মহিলারা, তাতে চরম বিরক্তি বোধ করি। এ দৃশ্যের মনে হয় না কোনও শেষ আছে।

আমি অবশ্যই বাসচালকদের পক্ষ নিয়ে এই লেখাটি লিখি নি। আমিও আপনাদের মতোই একজন পথচারী; মালিক বা চালকপক্ষের কেউ নয়। কিন্তু মুসলিম হিসেবে ইনসাফ করা জরুরি, সেই বোধটা মানুষের মধ্যে জাগ্রত করতেই কথাগুলো বলা। সাথে ব্লাইন্ডস্পট সম্পর্কে সতর্কীকরণ তো আছেই।

বেশিরভাগ বাঙালি কিছু শুনতে চায় না, বুঝতে চায় না। তারা প্রতিটি ব্যাপারে অতিরিক্ত সরলিকরণে অভ্যস্ত। রাস্তাঘাটে চলাফেরাও যে একটা শেখার বিষয়, জানার বিষয় এই বুঝটা তাদের কে দেবে! আল্লাহ্‌ এই জাতিকে হেদায়াত দিন।” (উদ্ধৃতি শেষ)

নিরাপত্তা কোন পথে?

নিরাপদ সড়ক একটাই। সেটা হলো সিরাত্বাল মুস্তাক্বীম। সরল-সোজা পথ, যে পথে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহপ্রাপ্তরা চলেছেন। তাদের পথ নয়, যাদের উপর আল্লাহ্‌র গযব এবং যারা পথভ্রষ্ট।

প্রথম দেখায় হয়তো কথাটাকে বেখাপ্পা লাগবে। সব ব্যাপারে জোর করে ইসলামকে টেনে এনে প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা মনে হবে। কিন্তু আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি। মানুষকে মানুষের অধিকার না দেওয়ার মূলে রয়েছে আল্লাহ্‌কে আল্লাহ্‌র অধিকার না দেওয়া। পথচারীর উপর চালকের যুলুম আর চালকের উপর পথচারীর যুলুমের মূল কারণ হলো আল্লাহ্‌কে ভয় না করে নিজের নফসের উপর করা যুলুম। অবৈধ পন্থায় মানুষের হাতে ড্রাইভিং লাইসেন্সের নামে কিলিং লাইসেন্স যখন আমরা ধরিয়ে দিচ্ছি, ভাবছি কেউ আমাদের দেখছে না, তখনও আল্লাহ্‌ আমাদের দেখছেন।

আল্লাহ্‌র নাযিলকৃত কোনো বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, এমন আইন মানতে কোনো সমস্যা নেই (যেমন- প্রায় সকল ট্রাফিক আইন)। বরং মানাটাই ইনসাফের দাবি। এর সাথে হারাম রক্তপাতের বিষয় জড়িত। রুলস না মানলে আমরা নিরাপরাধ প্রাণ ঝরে যাওয়ার কারণ হয়ে যেতে পারি।

আর আল্লাহ্‌র দেওয়া বিধানই ন্যায়বিচারের একমাত্র পথ। মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাবই এমন যে, তাকে শাস্তির ভয় না দেখালে শুধু আত্মিক ক্ষমতা দিয়ে সে সবসময় ভালো হয়ে চলতে পারে না। আল্লাহ্‌র দেওয়া বিধানে রয়েছে অনিচ্ছাকৃতইচ্ছাকৃত খুনের যথাযথ শাস্তি। এমনকি মুসলিম শাসকের জিম্মায় থাকা কোনো কাফির নাগরিককে অন্যায়ভাবে খুন করলেও সে ব্যাপারে শাস্তির বিধান রয়েছে। আল্লাহ্‌ আমাদের এমন নেতৃত্ব দান করুন, যারা আল্লাহ্‌র জমিনে আল্লাহ্‌র আইন প্রয়োগের আবশ্যকতা বোঝে।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive