তোমার নাম কী?
-কুরআন।
বাড়ি কই?
– লাওহে মাহফুজ।
তুমি কবে এসেছ?
– রামাদ্বান মাসে ক্বদরের রজনীতে।
তোমাকে কে পাঠিয়েছেন?
– আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন।

কথোপকথনটি খুব সাধারণ মনে হলেও যখন জানব যে একই প্রশ্ন অন্য কোনো ধর্ম গ্রন্থকে করা হলে গ্রন্থ এগুলোর উত্তর দিতে পারবে না তখন ব্যাপারটি আর এত সাধারণ থাকে না। কোনোটা এর প্রেরণকারী কে তা বলতে পারবে না, আসার কারণ বলতে পারবে না, কবে এসেছে তার কোনো প্রমাণ দিতে পারবে না। কোনোটা ঠিকানা কোথায় জানে না, নিজের নামই জানে না। আর বেশিরভাগ তো এগুলোর কিছুই বলতে পারে না। অর্থাৎ এগুলো মৃত, প্রাণহীন। এগুলোর ব্যাপারে একমাত্র লোকেরা যা বলে তা মেনে নিতে হয়, এগুলোর নিজস্ব কোনো পরিচয় নেই। আমার নিজের পরিচয় যদি আমি নিজেই দিতে না পারি, শোনা কথার উপর আমার পরিচয় গড়ে ওঠে তাহলে তার অর্থ কী দাঁড়ায়? সেখানে নাম-পরিচয়হীন কোনো গ্রন্থকে ঐশী কিভাবে দাবি করা যায়?

IIRT Arabic Intensive

আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো যদি এগুলোকে জিজ্ঞেস করা হয় যে তুমি কি বিকৃত? কোনো উত্তরই তা দিতে পারবে না। এদিকে কুরআনই একমাত্র কিতাব যা নিজের নাম নিজেই বলতে সক্ষম। এর নামকরণ এর অনুসারীরা করেনি। কুরআনকে একই প্রশ্নের জবাবে পাওয়া যাবে যে এটা তো রুহুল আমীনের (জিবরাঈল আলাহিস সালাম) মাধ্যমে প্রেরিত আল্লাহর অবিকল বাণী। আজও একই রকম সংরক্ষিত আছে ঠিক যেমন করে এটি এসেছিল। অপরদিকে অন্য সব ধর্ম গ্রন্থের কথা বাদই দিলাম, আমরা কুরআনের ঠিক আগের গ্রন্থ ইঞ্জিলের কথাই যদি ধরি তাহলে খ্রিষ্টানরা ঈসা(আ) থেকে মুহাম্মাদ(সা) এর মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যেই তাদের কিতাবকে বিকৃত করে ফেলল, হারিয়ে ফেলল তাদের রাসূলের কথা। একটি পূর্ণাঙ্গ ইঞ্জিলও ছিল না, জোড়াতালি দিয়ে একটি অসম্পূর্ণ ইঞ্জিল বানাল যার নাম দিল বাইবেল তাও আবার অনুবাদকৃত ভাষায়।

ক্যাথলিক এনসাইক্লোপিডিয়াতে আছে-

প্রাচীন যুগের কোনো পুস্তক লেখকের হাত থেকে ছাড়া পাবার পর ঠিক সেভাবেই আমাদের হাতে আসেনি, সবগুলোই কোনো না কোনোভাবে বদলে গেছে।

যেখানে বাইবেল মাত্র পাঁচ থেকে ছয়শত বছর টিকতে না পেরে বিকৃত হয়ে গেল সেখানে চৌদ্দশত বছর পার হয়ে গেল অথচ এই কুরআনের একটটি আয়াত তো দূরে থাক একটা হরফ পর্যন্ত পাল্টালো না? কীভাবে? এতটুকুও কি ভাবনা জাগে না?

শুধু তা-ই নয় কুরআনই একমাত্র কিতাব যা সংরক্ষণের জন্য লাইব্রেরী, ইন্টারনেট দরকার নেই। ইন্টারনেট যদি ধ্বংসও হয়ে যায় আর কেউ যদি পৃথিবীর তাবৎ কিতাবকে সাগরে ভাসিয়ে দেয় একটি মাত্র কিতাব তবুও অবিকল বেঁচে থাকবে কোটি কোটি হাফেযের অন্তরে। কেন? আর কোনো কিতাব নয় কেন? কারণ আল্লাহ নিজেই বলেছেন-

আমিই এ কিতাব অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর হেফাযতকারী। [সূরাহ আল-হিজর (১৫) : ৯]

হিন্দি ভাষায় কেউ কুরআন মুখস্থ করলে তাকে কী আর কুরআনে হাফেয বলা চলে? তেমনি মূল ভাষায় অধ্যয়ন না করার ফলে তোরাহ, বাইবেলের আসলে কোনো হাফেযই পাওয়া সম্ভব না। এরপরও যা আছে তাতেও কেন কোনো পূর্ণাঙ্গ হাফেয পাওয়া যায় না? কেন মানব অন্তরের সাথে কেবল কুরআনের আয়াতেরই এমন সখ্যতা? কারণ মানুষের জন্যেই এর আসা।

আমি একে আরবী ভাষায় কুরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার।

[ সূরাহ ইউসুফ (১২): ২]

চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে যে, কুরআনকে যে ভাষায় নাযিল করা হয়েছে তিলাওয়াত ও গবেষণা এখনো সেই ভাষাতেই করা হয়। আরো বড় বিষয় হচ্ছে ভাষাটি কোনো মৃত ভাষা তো নয়ই বরং ব্যবহারের দিক দিয়ে পৃথিবীর পঞ্চম ভাষা যার সংখ্যা কেবল বাড়ছেই। Duolingo Forum এবং Fluentu এর মতে আরবি এবং ফরাসি হচ্ছে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল এবং ভবিষ্যতের ভাষা হিসেবে শীর্ষে। আর ফরাসি ভাষায় কোনো ওহী আসেনি কাজেই বাকি থাকে এক আরবি।

এখানে চমকপ্রদ বিষয় দুইটি তখন বুঝা যাবে যখন জানব কুরআন বাদে এই গুণ আর কোনো ধর্মের কিতাবের জন্য প্রযোজ্য নয়। যেমন, ইঞ্জিলকে সনাতন হিব্রু ভাষায় প্রেরণ করা হলেও পথভ্রষ্ট খ্রিষ্টানরা এখন যেটাকে নিউ টেস্টামেন্ট বলে সেটা গ্রীক ভাষায় রচিত। আবার ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে তারা ল্যাটিন, ইংরেজিও ব্যবহার করে থাকে। অথচ মূল যেই ভাষা সেই হিব্রুর ব্যবহার উধাও।

একে তো অসম্পূর্ণ, ত্রুটিযুক্ত তার উপর যদি ব্যবহারের জন্য অনুবাদকে মানদন্ড ধরা হয় তাহলে একজন বিবেকবান মানুষ কীভাবে তা আল্লাহর বাণী বলে মনে করতে পারে? অসম্পূর্ণ গীতাঞ্জলিকে কি নোবেলপ্রাপ্ত বলা চলে? আবার এই অসম্পূর্ণ অংশকেও যদি চীনা ভাষায় পাওয়া যায় তাহলে কি এর কপালে নোবেল জুটতো? নাকি একটি পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি গীতাঞ্জলিকেই একমাত্র নোবেলপ্রাপ্ত বলা চলে, অতঃপর তার উপর গবেষণা করা যায়।

আবার তোরাহর ভাষা সনাতন হিব্রু। কিন্তু একে গ্রীক, ল্যাটিনেও ব্যবহার করা হয়। শুধুমাত্র গুরুগম্ভীর ধর্মীয় আনিষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রেই হিব্রুকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। পাঠকরা জেনে থাকবেন যে হিব্রু হলো একটি মৃত ভাষা। টোরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্বের সাবেক অধ্যাপক রোনাল্ড ওয়ারডহ তার An Introduction to Sociolinguistics (p. 36)   গ্রন্থে বলেন যে, তথাকথিক “হিব্রু ভাষার পুনর্জন্ম” নামক দাবি কখনোই ভাষা হিসাবে হিব্রুর মৃতপ্রাণকে অস্বীকার করতে পারেনা। হিব্রু সব সময়ই কেবল ধর্মীয় উপাসনায়গুলোতে বলার ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এরই একটি প্রকারভেদ হলো আধুনিক হিব্রু আর এ জন্যই তা আধুনিক যা বিলুপ্ত হিব্রুর ফসিল মাত্র। প্রায়োগিক জীবনে এর ব্যবহার যথেষ্ট আলোচনাসাপেক্ষ।

কিতাবের মূল পান্ডুলিপি পাওয়া যায় না, ভাষা মৃত। এমনকি অনুবাদ করে সুবিধামত ভাষায় রচনা করেও কিতাবগুলোর পূর্ণাঙ্গ হাফেয পাওয়া যায় না। অথচ উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত সারা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ যাদের মুখের ভাষা পর্যন্ত আরবি না তারা কোনো বাধা ছাড়াই কুরআন হিফয করে ফেলছে! যারা মাতৃভাষা ব্যতীত আর কোন দ্বিতীয় ভাষাও জানেনা তারাও কেবল পড়ে ও শুনে সাতাত্তর হাজার চারশত ঊনপঞ্চাশটা ভিনদেশি শব্দ অবিকল একই ভাবে মুখস্থ বলতে পারছে! একটা হরফের ক্রম পর্যন্ত এদিক-সেদিক হয়না! এটা কি একটুকুও অন্তরকে নাড়া দেয় না? কীভাবে সম্ভব! এর কারণ হলো সত্য বাণী, আল্লাহর নির্ধারিত কিতাব ব্যতীত আর কোনো ভাষা, কোনো গ্রন্থের সাথে আল্লাহর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। হাজার চেষ্টা করেও তা আয়ত্ত করা যাবে না। বিকৃতি, বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করা যাবেনা।

আমি কুর’আনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোনো চিন্তাশীল আছে কি

[সূরাহ আল-ক্বামার: ১৭]

এক তোরাহ (প্রচলিত ওল্ড টেস্টামেন্ট) এরই রয়েছে সাত রকম সংস্করণ- Dead Sea Scrolls, Septuagint, Masoretic Text, Samaritan Torah। অনেকে এটা শুনেই বলে বসতে পারেন যে কুরআনেরও তো সাতটা আহরুফ আছে। এর উত্তর হলো কুরআনের আহরুফ বিভিন্ন ডায়ালেক্টের মতো। একই কথা, ভিন্ন ডায়ালেক্টে। কিন্তু টেস্টামেন্টের সংস্করণের একটির সাথে আরেকটির মাঝে বহু স্থানে তথ্যের অমিল এবং সাংঘর্ষিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। এখনকার খ্রিষ্টানরা যেই নিউ টেস্টামেন্ট মেনে চলে সেটাকে প্রথম জামানার পাদ্রিরা কখনোই ঈশ্বরের বাণী বলে স্বীকার করতেন না। কারণ তারা জানতেন যে তা ছিল দলিল-প্রমাণহীন শুধুমাত্র বিভিন্ন সাধকদের বলে যাওয়া কথা।

একই কারণে আলোচনায় বহু-ঈশ্বরবাদীদের প্রসঙ্গে কথা বলিনি। একে তো সামাজিক ভাষাতত্ত্ববিদ রজার বেলের জীবিত ভাষার ধর্ম অনুযায়ী যথাযথ সম্মানের সাথেই বলা যায় যে তাদের ভাষা ইতিমধ্যেই মৃত (যেমন- সংস্কৃত)। আর ঐতিহাসিক দলিলের ভিত্তিতে বলা যায় যে বহু-ঈশ্বরবাদী পৌরাণিক গ্রন্থগুলোতেও এদের আগমনের পরিষ্কার সময়কাল এমনকি গ্রন্থের নাম-পরিচয়ও মেলেনা। অসংখ্য মৌখিক শ্লোক, প্রচলিত কাহিনী এবং অগণিত ঋষিদের প্রচার করা বাণী ও পরিবর্তিতে অন্যদের দ্বারা পুনঃলিখিতরূপ এগুলো। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যার অবস্থা তোরাহ-বাইবেলের চেয়েও খারাপ।

বহু-ঈশ্বরবাদীদের প্রধান একটি গ্রন্থ হলো বেদ যেটাকে আবার চার ভাগে মানুষই বিভক্ত করেছে। সেই বেদ নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন যে বেদ ভগবান প্রেরিত না। বেদ মানুষই লিখেছে। বেদকে এই জন্য শ্রুতি সাহিত্য বলা হয়।(Apte, 1965) আবার গীতা নিয়ে রচিত ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষনের গবেষণা অনুযায়ী গীতার রচয়িতা কে, কোথা থেকে উৎসারিত তার কোনো সূত্রই মেলে না।

তাই এগুলোকে ইতিহাসবিদরা সংস্কৃতি হিসেবে পড়েই বেশি স্বাছন্দ্য বোধ করে থাকেন।  অনেক বহু-ঈশ্বরবাদী ধর্মগুলোর মর্মকথায়ও একেশ্বেরবাদের ছোঁয়া খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ সেগুলো বিভিন্ন সময়ে আগত নবীদের উপর নাযিল হওয়া সহীফা যা তাদের মৃত্যুর পর লোকদের দ্বারা বিকৃত হতে হতে এই পর্যায়ে এসেছে। অথচ তাওহীদ, শির্ক, রিসালাত সম্পর্কিত ঘোষণা থাকার পরেও অনুসারীরা তা বিকৃত করা থেকে ক্ষান্ত হতে পারেনি। যেমন শুধু একটি উদাহরণ, ঋগ্বেদের দশ নাম্বার মণ্ডলের একশত চৌদ্দ নাম্বার সুক্তের পাঁচ নাম্বার শ্লোকে আছে, “একং ব্রহ্ম দ্বিতীয়ং নাস্তি, নেহ না নাস্তি কিঞ্চন” অর্থাৎ পরমেশ্বর এক, দ্বিতীয় কেউ নাই, নাই নাই কিঞ্চিৎ পরিমাণও নাই। আবার, যজুর্বেদে(৪০/৯) আছে, “অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যেহসংভূতিমুপাসতে। ততো ভুয় ইব তে তমো য উ সম্ভুত্যাঃরতাঃ” অর্থাৎ অন্ধকারে (নরকে) প্রবেশ করবে তারা, যারা প্রকৃতির পূজা করে। (যেমন আগুন, পানি, বাতাস) আর যারা মূর্তিপূজা করে, তারা আরো বেশি অন্ধকারে প্রবেশ করবে। অথচ এখান থেকে হিন্দু ধর্ম আজ কোথায় এসে ঠেকেছে!

যাক ওল্ড আর নিউ টেস্টামেন্টের প্রসঙ্গে ফিরে যাই। একমাত্র তৃতীয় শতাব্দীর মধ্য ভাগে এসে নিউ টেস্টামেন্ট নামক উদ্ভাবনের প্রচলন দেখা যেতে থাকে। কীভাবে তাহলে এটি একটি ধর্মগ্রন্থের স্বরূপ হতে পারে? আইরিনিয়াস নামের একজন পাদ্রী ২০০ খ্রিস্টাব্দে এসে সর্বপ্রথম চার গসপেলকে একসাথে নিয়ে আসেন। একে তো অনূদিত ও পুনঃরচিত, তার উপর এই নিউ টেস্টামেন্ট যে আবার সারা বিশ্বের সকল খ্রিষ্টান দ্বারা সমানভাবে সমাদৃত তাও নয়। এরও আবার ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ আছে। ইথিওপিয়ায় এক রকম নিউ টেস্টামেন্ট তো দক্ষিণ ভারতে আরেক রকম। প্রোটেস্ট্যান্টদের কাছে যেটা গ্রহণযোগ্য ক্যাথোলিকদের কাছে সেই টেস্টামেন্ট আবার অগ্রহণযোগ্য। যে জিনিসের মূল পাণ্ডুলিপিই নেই আর তারও উপর যদি এত এত বিভাজন এবং সমস্যা থেকে থাকে তাহলে একে আর যাই হোক আল্লাহর কিতাব আর বলা চলেনা।

অথচ ১৪০০ বছর ধরে এক কুরআন তার অস্তিত্বে শুধু যে অবিচল দাঁড়িয়েই আছে তা-ই নয় বরং যেভাবে এসেছিলো ঠিক সেভাবেই সমগ্র মানব জাতির সাথে এককভাবে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই মিশে আছে।

তাহলে তোরাহ, বাইবেল এবং অন্যান্য বহু-ঈশ্বরবাদীদের পু্রাণের দুর্বলতার কারণ হিসেবে সংক্ষেপে এগুলোকে দায়ী করা চলে,
১) মূল পান্ডুলিপির অনুপস্থিতি এবং অসম্পূর্ণতা
২) ভাষার মৃত্যু, পরিবর্তন ও পুনঃলিখন
৩) অতঃপর অর্থচ্যুতি এবং অপব্যাখ্যা
৪) শ্লোক পরিবর্তন
৫) নতুন শ্লোক সংযোজন
৬) পুরাতন শ্লোক বিয়োজন বা উপেক্ষা
৭) দালিলিক নির্ভরযোগ্যতার অভাব
৮) একের অধিক সংস্করণের উপস্থিতি ও সাংঘর্ষিকতা

অতএব তাদের জন্যে আফসোস! যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লেখে এবং বলে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।
[সূরাহ বাক্বারা (২): ৭৯]

এদিকে কুরআন কোনো নির্দিষ্ট জাতির জন্য প্রেরিত কিতাব নয়। তাই এটি সময়ের সাথে মিটবারও নয়। যতদিন পৃথিবী আছে ততদিন অবিকৃত কুরআন আছে। অন্য কিতাবাদির মতো এটিকে কাদের জন্য এসেছ বলে প্রশ্ন করলে তা কেবলমাত্র মূসা নবী(আ), ঈসা নবী(আ) এর জাতির জন্য এসেছি বলে উত্তর দেয় না; বরং এটিতো সমগ্র মানবজাতির জন্য।

নাযিল করা হয়েছে কুর’আন যা মানুষের জন্য হিদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।  [সূরাহ বাক্বারা (২): ১৮৫]

কুরআন নাযিলের পর যারা একে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে মেরেছিল তারা আজ মাটির নিচে চলে গেছে। তেমনি ১০ বছর চ্যালেঞ্জ, ১০০ বছর চ্যালেঞ্জ, ১০০০ বছর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়তে ছুঁড়তে আজ ১৪০০ বছর হয়ে গেল তাও তারা মাটির নিচেই পড়ে আছে আর কুরআন মাথা উঁচু করে নির্বিকার দাঁড়িয়ে। এটি কার অস্তিত্ব প্রমাণ করে? কার প্রশংসা বর্ণনা করে? কার সাক্ষ্য-ওয়াদা বহন করে? কথায় বলে বুদ্ধিমানের জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট।

কুরআনে দুনিয়া শব্দটিকে যেমন ১১৫বার উল্লেখ করা হয়েছে ঠিক তেমনি আখিরাতকেও ১১৫বার। বিশ্বাসের কথা এসেছে ১৭বার, অবিশ্বাসও ১৭বার। ১৪৫বার যদি জীবনের কথা বলা হয়ে থাকে তাহলে মৃত্যুর কথাও ১৪৫বার। এভাবে ভালো কাজ যতবার খারাপ কাজ ততবার, ফেরেশতা যতবার শয়তান ততবার, নাম ধরে ইবলিস যতবার তার থেকে আল্লাহর কাছে রক্ষাও ততবার। ২৩টি বছর ধরে ওহী নাযিলের মধ্যে মাসের কথা বলা হয়েছে ১২বার আর দিনের কথা মাত্র৩৬৫ বারই। সম্ভব? আছে আর কোন কিতাব যা সত্য বলে? যা জীবিত? নাম-পরিচয়-আগমনপ্রমাণ-উদ্দেশ্য সব কিছুর উত্তর দেয়?

চেয়েছিলাম এই আলোচনায় কুরআনের মুজিযার কথা আনবো না। কিন্তু কালামে পাকের সৌন্দর্যই এরকম যে না এনে পারলাম না। এরকম আরো অসংখ্য নিদর্শন আছে। সাহাবা আযমাইন যখন দ্বীন প্রচার করতেন তখন কুরআনের কোনখানে কোন শব্দ কয়বার তা জানতেন না। গুণে গুণে এতবার এত শব্দ আসছে দেখে ঈমান আনেননি। তখন তো সমগ্র কুরআনই অবতারণই হয়নি; বরং কুরআনের ভাষাগত অলৌকিকতার কারণেই আরবরা বুঝে যেতেন যে মাতৃভাষায় উচ্চারণ করা এই শব্দমালা কোনো মানবসৃষ্ট নয়। জগতের দুর্দশায় ক্লিষ্ট মন মুহূর্তেই বুঝে যেত এ তো ঐশী বাণী, মহাসত্য। তবে সেই স্পষ্ট অলৌকিকতা সরাসরি বুঝতে হলে আরবি ভাষা জ্ঞান থাকতে হবে। আর কোনো জিনিসের বিকৃতি রোধ করতে তা মূল উৎস হতে অধ্যয়নের গুরুত্ব তো আগেই দেখিয়েছি।

সত্যকে জানতে হলে একটি উন্মুক্ত হৃদয় থাকা চাই যার জানালা দিয়ে আজও আলো উঁকি দিতে চায়। যে কিতাবের অস্তিত্বই এত ওজনদার তার ভাষার প্রভাব না জানি কত গভীর! সে গল্প নাহয় আরেকদিনের জন্য তোলা থাক।

তবে যত কিছুই বলা হোক না কেন, অন্ধ আর বধির হতে চাইলে কোনো কিছুই বিবেকে আটকাবেনা।  কেউ কেউ তো এতোটাই অন্ধ হয় যে তারা চোখ দিয়ে কেবলই দেখতে, আর কান দিয়ে কেবলই শুনতে পায় শুধুমাত্র যা তারা শুনতে চায়, দেখতে চায়। এ কিতাব তাই সত্যের প্রেমিকদের জন্য। প্রেমপত্র খোলা রইল।

এটি সেই কিতাব যাতে কোনোই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী আল্লাহ্‌কে ভয়কারীদের জন্য। [ সূরাহ বাক্বারা (২): ২]

অতএব, যার ইচ্ছা বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক। [ সূরাহ কাহফ(১৮): ২৯]

1400 years and still counting …

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থাবলি

i) Alfred Durand, The New Testament article in The Catholic Encyclopedia; Vol 14
ii) The Corruption of the Torah
http://www.manyprophetsonemessage.com/2014/05/14/the-corruption-of-the-torah/
iii) In what language was the Bible first written
https://www.biblica.com/resources/bible-faqs/in-what-language-was-the-bible-first-written/
iv) A discussion about the version of the Bible available to Muhammad(PBUH)
http://www.scielo.org.za/scielo.php?script=sci_arttext&pid=S2305-08532017000200010
v) Is the Bible corrupted? Debate between Adhan Rashid and James White
https://www.youtube.com/watch?v=dlGZdiSnuxU
vi) Is Quran manmade?
https://www.youtube.com/watch?v=DjeovAKWwjs&t=13s
vii) Islamic view of the Christian Bible
https://en.wikipedia.org/wiki/Islamic_view_of_the_Christian_Bible#Torah_(Tawrat)
viii) Corruption of the Tawrat and Injeel
https://islamqa.info/en/answers/2001/corruption-of-the-tawraat-torah-and-injeel-gospel
ix) Number of words in the Quran
https://islamweb.net/en/fatwa/88181/
x) Which languages are growing most
https://forum.duolingo.com/comment/6173089/Which-languages-are-growing-the-most-Which-are-shrinking
xi) Keeping up with the world: The 5 fastest growing languages
https://www.fluentu.com/blog/fastest-growing-languages/
xii) An Introduction to Sociolinguistics by Ronald Wardaugh
xiii) Apte, The Practical Sanskrit Dictionary(1965, p. 887)
xiv) Mufti Jubaer Ahmad, Hindu Vaider Dawat Deoar Poth O Poddhoti, pp. 84, 88

 

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive