একটা শান্তির গল্প বলি। কয়েকদিন আগে আমার মা স্বপ্নে তাঁর ছোট মামাকে দেখেছিলেন। দেখেছিলেন যে, তিনি হাস্যোজ্জ্বল, শান্তির ছাপ তাঁর সুন্দর অবয়বে স্পষ্ট। বললেন, “নিশ্চয় মামা কবরে অনেক শান্তিতে আছেন, কী সুন্দর দেখাচ্ছিলো তাঁকে।”

আমি মনে মনে ভাবলাম, “মাশাআল্লাহ্‌, কেন থাকবেন না? যিনি এইরকম একটা সন্তান পৃথিবীতে রেখে গেছেন, তাঁর কি সম্পদের কোনো কমতি থাকতে পারে?”

IIRT Arabic Intensive

ঐ সন্তানটি হলেন তিনিই, যার বাড়িতে গত ডিসেম্বরের বরিশাল সফরে থেকেছিলাম। আমার আল-আমিন মামার বাড়ি। না, আমারই বাড়ি। কেন না? এরকম একটা বাড়ি, কে না নিজের বলে দাবি করতে চাইবে? আমি বাড়ির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা, আসবাব বা পুঁজিবাদী স্বপ্নের মাপে এর দামের কথা বলছি না। বলছি এর ভিতরকার আস্থা, প্রশান্তি আর ভালোবাসার কথা।

আমার মামাটা হয়তো এখনকার মেয়ের বাবাদের নাম্বার ওয়ান পছন্দ ক্যারিয়ার সচেতন এটিএম মেশিন না, পেশায় তিনি একজন স্কুল শিক্ষক। তাঁর ঘরে ভারি ভারি সার্টিফিকেট আর টাকার গরম কম, পারিবারিক বন্ধন বেশি। তিনটা সন্তান নিয়েছেন, যাতে বছরে একবার হাজ্জ করার সামর্থ্য না থাকলেও বিদেশ ভ্রমণ, ব্যাঙ্কভর্তি সুদী ফূর্তির টাকা, নিজে খাই নিজে বাঁচি বস্তুবাদী চিন্তাধারার মতো দরিদ্রতার শিকার না হতে হয়। বরং তাঁর মৃত্যুর পর সেই হীরার টুকরাগুলা যাতে তাঁর চিরসবুজ উদ্যানে যাবার টিকিট হয়ে যায়, সেই ব্যবস্থা করেছেন। যত বেশি হীরা, তত বেশি দু’আ, ততো বেশি সাওয়াব। দু’আর এবোর্শনে উনি যাননাই।

ফজরের ওয়াক্তে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা মিসকল দেয়, “স্যার ঘুম থেকে উঠছি, এখন পড়বো।” জীবনে তাঁর কাছে পড়ার জন্য সাহায্য চাইছে আর খালি হাতে ফিরে গেছে, এমন মৃত আর এমন গরীব তিনি এখনও হননাই। দেখেন না সমাজে অনেক গরীব আর চলমান মৃত মানুষ আছে? যাদের আছেই কেবল টাকা, ক্যারিয়ার, ক্ষমতা। স্কুলে ভর্তি হবার মতো সামর্থ্য নাই, ছাত্রের বাবাকে অর্ধেক বেতন দিতে বলে বাকি অর্ধেক গেছে নিজের পকেট থেকে বছরের পর বছর। তাও তোরা মানুষ হ বাবারা, জীবিত মানুষ হ!

মামা আমার কোনো রাজনীতি করেন না, যুবাদের মদ ভাং এর টাকা দেন না, মাসজিদ কমিটির সভাপতিও না। তবু বর্ষায় নিজের ঘর উন্নয়ন করেননাই, বরং আল্লাহর ঘরে তাঁর নাম কিছু কষ্টার্জিত টাকার উসিলায় শরীক হয়ে আছে। বরিশালে যেই কয়দিন ছিলাম আর যেইসব জায়গাতেই যাওয়া হয়েছে, আমার কাছে মামার বাসার চাইতে শান্তির জায়গা আর দ্বিতীয়টা লাগেনাই। অন্তর আটকে গেছে ওখানে। বিশ বছর আগে ওখানে গিয়েছিলাম, অথচ এবার যেয়ে মনে হয়েছে বিশ বছর আমি এখানে ছাড়া কোথাও থাকিনাই।

আর আমার মামাতো ভাইগুলা। তার ভিতর একজন রিদওয়ান, যার খেলনা হেলিকপ্টার তৈরির হাত খুব একটা খারাপ না। এটা বানানো হয়েছে তার জেএসসি পরীক্ষার পর। এতটুক একটা গ্রামের ছেলে, কত বড় তার প্রতিভা আর স্পৃহা।

মাগরিবের পরে ওয়াক্বিয়াহ পড়ে দুই ভাইকে একদম চোখে চোখে আগলায়ে রাখে। মেঝোটা পড়ে মাদরাসায় আর ছোটটা কী দুষ্ট, সে কী ভালোবাসা এদের। ভাই ছিলো ওরা তিন, আমি গিয়ে হয়ে গেলো চার। আমার মমতাময়ী মামী একদম আপন করে নিয়েছিলেন। মাটির চুলায় কড়া শীতে সকাল বেলা উঠে সবার জন্য চা আর গোসলের জন্য গরম পানি বানায়ে দিতেন। মাটির চুলা, শীত, নয়জন লোক এই কথাগুলায় একটু জোর দিলেই বুঝা যায় কেন কথাটা বললাম। একটা বেলা যে একটু তাঁকে নিয়ে কাউকে গীবত করার সুযোগ দিবেন, সেই রাস্তা নাই। বাসায় বৃদ্ধা শ্বাশুড়ি, তাঁর সব খেয়াল তাঁর।

– কী করতেছো এখন?

– আলহামদুলিল্লাহ। ঘর সামলাই।

প্রশ্নের এই উত্তরটা এখনকার অনেক মানুষের পছন্দ না। এরপর আমার মামীর কথা ভাবি। ভাইরে, ঘর সামলানো সবাই এফোর্ড করতে পারে না 🙂

বোকা মামা আমার। নাহলে ফুফাতো ভাই বোনের পরিবারসহ নয়জনকে নিজের বাসায় চাকরি বাকরি মাথায় তুলে রেখে অর্ধেক সপ্তাহ কেউ খাওয়ায়? আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে টাকার মতো জিনিস নষ্ট করার কোনো অর্থ হয়?

কি জানি! আমার এই মামাটাকে মনে হয় আপনাদের পছন্দ হবে না। গালভর্তি দাড়ি, মাথায় টুপি, গ্রামে থাকে। বড় সার্টিফিকেট নাই, সামান্য ইংরেজি শিক্ষক। কিন্তু ফেরার সময় কেন জানি মনে হচ্ছিলো আমার পরিবার থেকে সরে যাচ্ছি। হয়তো কোনো কাজে ঢাকায় আসতে হচ্ছে, আবার তো ফিরেই আসবো! এই সান্ত্বনাতে। মামাকে না দেখিয়ে তাঁর সাথে একটা সেলফি তুলেছিলাম। এই যে না জানিয়ে সেলফি তোলা, এইটার যে অর্থ, ভালোবাসা; এইটা কি কোনো বিরাট ক্ষমতার নেতা, শিল্পপতি, গায়ক, নায়ক পারছে আমাকে দিয়ে করাইতে? কেন পারলো না? আর কেনই বা এই মানুষটা পারলো? কীভাবে হলো এই মনোরাজ্য জয়?

দুনিয়ার কোনো সনদপত্র, ক্ষমতা, অর্থ এটা দিতে পারবে না। এত বড় অর্জনের সামর্থ্য এগুলার নাই। এইটার জন্য প্রয়োজন ‘মনুষ্যত্ব’, একটা আলোকিত ‘রুহ’। এই আলো দুনিয়াবাসীরা কেন জানি পয়সা, ক্যারিয়ার আর খ্যাতি দিয়ে কিনতে পারে না। এইটা আসে ঐ বিশাল আসমানের মালিকের কাছ থেকে।

বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থা এটা কোনদিনও শিখাতে পারবে না। এই শিক্ষা অর্জন সবার জীবনে হয় না। আর যার হয়, তার কোনোকিছুর অভাব হয় না। ঐ গ্রামে দেওয়ালে দেওয়ালে, রিক্সায়, অটোতে, নৌকায় লেখা দেখেছি ‘আপনার সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠান’। আর ঐ ঘরে আমি শান্তি দেখেছি, সালাত-কুরআন-সুন্নাতকে জীবিত দেখেছি। আর আমার মা দেখেছে এই ঘরেরই আগের বাসিন্দাকে, আল-আমিন মামার বাবাকে। এমন বাবা কয়জন হতে পারবো আজকে আমরা? কয়জন হতে পারবো এমন সন্তান?

সন্তান নিয়ে তাদের কীভাবে দ্বীনের কাজে, মানুষের কাজে লাগানো যায়, সেই চিন্তা করতো এই উম্মাতে মুহাম্মাদিন। আর আজকে তারা এবোর্শোন বিয়ের আগে করবে না পরে, তা-ই নিয়ে চিন্তিত। এদের লক্ষ্য হচ্ছে বিনোদন, খ্যাতি আর পয়সা। গরু ছাগলের জীবন। জন্ম-আহার-উপভোগ-প্রজনন-মৃত্যু। স্বার্থের মায়া, প্রবৃত্তির তাড়না উপেক্ষা করে মানুষের জন্য, মাযলুম দিশেহারা উম্মাতের জন্য, নিজের ভাইদের জন্য জীবন পার করার সাহস এদের নাই, এদের সার্টিফিকেট সেই সাহস দেয় না।

এই সন্তান আমাদের নিতে পারে জান্নাতে, এই সন্তান নিতে পারে জাহান্নামে। কত সন্তানদের দেখি সালাত পড়ে না, সিয়াম রাখে না, পর্দা তো করেই না আরও নিজেকে কতভাবে প্রকাশ করা যায় সেই চিন্তায় সদা ব্যস্ত। সময়মতো বিয়েকে গুরুত্ব দেয় না, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্কুলের, কলেজের, ভার্সিটির, পাড়ার বিপরীত লিঙ্গের মনোরঞ্জনের বস্তু না হলে হয় না, যিনা-ব্যভিচারের তোয়াক্কা করে না, নাচ-গান-চারুকলা নিয়ে হৈ-হুল্লোড়, জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নাই, একাধিক মানদণ্ডে ভরপুর একটা জীবন। এতে যে তাদের অন্তরে স্থায়ী শান্তি আসতেছে, তাও না। অথচ কোনো ব্যাপারে চূড়ান্ত উদাসীন হলে সেইটা হচ্ছে ইসলাম! অনেকে জেনেশুনেও জাহান্নাম চায়, আল্লাহ্‌ মাফ করুক। কিন্তু আপনার মাতা-পিতাও যে তার সাথে আগুনে চলে যাচ্ছে? যার মা-বাপ কবরে চলে গেছে, সে-ই কবরের জ্বালানি সরবরাহ করতেছে সেটা ভুলে যাচ্ছে। যেন এই পৃথিবীই শেষ! যে পৃথিবী ধ্বংসই হয়ে যাবে, তার জন্য এতকিছু! সুবহানআল্লাহ!

মানুষের দেহের তিনটি অংশ। প্রথম অংশ আল্লাহ্‌ তা’আলার, তা হলো রূহ। দ্বিতীয় অংশ নিজের, তা হলো আমল। তৃতীয় অংশ পোকার, আর সেটি হলো শরীর।

সেই পোকার খাদ্যকে তারা পূজা করেছিলো, অথচ অন্ততকাল তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। কত মা-বাবা চলে যাবে জান্নাতে সেই দিনে, শুধু তার নেক সন্তানের হাত ধরে। আর কত বাবা-মা না জানি ঝলসে যাবে তাদের জাহিল আর জালিম সন্তানদের কারণে। যাদের তারা নিজ হাতে একদিন খাইয়ে দিতো, যখন তারা খেতে পারতো না। কথা বলতে শিখাতো, যখন বলতেও পারতো না। ঘুম পাড়াতো, ঈদের সময় কামাইয়ের সবটা দিয়ে কিনে দিতো সবচেয়ে সুন্দর জামাটা আর নিজে কিনতো একটা সাধারণ জুতা। ঈদের দিন যখন আমরা আনন্দ করতাম, তখন হয়তো মা তাঁর সেই বিশ বছর আগের কলেজের বান্ধবীর দাওয়াতে যেতে পারেননাই, বাবাটা আগের ঈদের পাঞ্জাবি পরে একা একাই ঈদগাহ থেকে ফিরে আসেন। তারপর একদিন তাঁরা চলে যান। তাকিয়ে থাকেন আমাদের দিকে, তাকিয়ে আছেন আমার দিকে, তাকিয়ে আছেন আপনার দিকে, আল-আমিন মামার দিকে। ঐ তো আমিও দেখতে পাচ্ছি নানু ভাইটাকে, কতই না সুন্দর দেখাচ্ছে তাঁকে!!

                           رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

হে পালনকর্তা, তাঁদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমন তাঁরা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছিলেন। [সূরাহ বানী ইসরাঈল (১৭): ২৪]


লেখক: মুরসালিন নিলয়

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive