আচ্ছা, আমরা কি কখনও ইব্রাহীম (আঃ) এর জীবনটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রিসার্চ করে দেখেছি? কেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোরআনে এতবার ইব্রাহীম (আঃ) এর ঘটনাবলী উল্লেখ করেছেন, আর হাদীসেও ইব্রাহীম (আঃ) এর কথা এতবার এসেছে? আমরা যে মিল্লাতে ইব্রাহীম (আঃ) এর অনুসারী, এই কথার সিগনিফিকেন্স কী?

আসলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে ইব্রাহীম (আঃ) এর মিল্লাতের উপর দেখতে চান, এবং এটা চান যেন আমরা ইব্রাহীম (আঃ) এর সত্যিকারের বংশধর (আইডোলজিকাল) হয়ে যাই। ইব্রাহীম (আঃ) যেভাবে রেসপন্ড করেছিলেন, তাঁর বংশধররা যেন সেভাবেই রেসপন্ড করে, সেটাই কি তিনি চান না?

IIRT Arabic Intensive

একটু পিছন ফিরে তাকাই, ইব্রাহীম (আঃ) এমন কী করেছেন তাঁর জীবনে। তাঁর জীবনটা আসলে খুব ঘটনাবহুল, খুউউউব। তাঁর জীবনের সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট ইনসিডেন্টটা হয়তো এটা যে তিনি তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-কে আল্লাহর জন্য কুরবানী করতে গিয়েছিলেন।

একটু গভীর ভাবে দেখি, ঘটনার মধ্যে কী মাহাত্ম্য লুক্কায়িত আছে। আসলে ইব্রাহীম (আঃ) যৌবনে নমরূদের বিরুদ্ধে একাই লড়েছিলেন, পরে তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করা হলেও তাঁকে আল্লাহ বাঁচিয়ে দেন। এরপর তিনি মক্কায় আসেন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে। বৃদ্ধ বয়সে তাঁর আবেদনে তাঁকে আল্লাহ ইসমাঈল (আঃ)-কে দান করেন। এবং সবচেয়ে এমেইজিং ব্যাপার হলো, শুধু আল্লাহর আদেশে শিশুপুত্র ইসমাঈল (আঃ) এবং তাঁর মা হাজেরা (আঃ)-কে ধুধু মরূপ্রান্তরে রেখে তিনি অন্য অঞ্চলে চলে যান।

পারবেন এমন কাজ করতে? পানি নেই, খাওয়া দাওয়া নেই? দুধের শিশু আর তার মাকে মরুভূমিতে রেখে দূরে অন্য কোনো অঞ্চলে চলে যেতে? আপনার কি মনে হবে না যে, আপনার স্ত্রী-পুত্রের জন্য তো মৃত্যু ছাড়া কিছু নেই?

কিন্তু ইব্রাহীম (আঃ) শুধু আল্লাহর উপর নির্ভর করে স্ত্রী-পুত্রকে পরিত্যাগ করে অন্য জায়গায় চলে গেলেন। এইটাই হলো তাওয়াক্কুল, রাইট? সামনে নিশ্চিত অন্ধকার জেনেও আল্লাহর আদেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে পরিত্যাগ করতে পারা। এটাই লীপ অব ফেইথ। আল্লাহ এইটাই চান।

যাই হোক, পরে ইসমাঈল (আঃ) একটু বড় হলে ইব্রাহীম (আঃ) ফিরে আসেন। তখন আল্লাহ তাঁকে আবার পরীক্ষায় ফেলেন। আল্লাহ ইব্রাহীম (আঃ)-কে জানিয়ে দেন যে তিনি যেন তাঁর পুত্রকে কুরবানী করে দেন। ওই মুহূর্তেে ইব্রাহীম (আঃ)-এর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ছিলো তাঁর পুত্র। পুত্রকে কুরবানী? এ আবার কেমন কথা?

চিন্তা করে দেখুন তো , যখন আল্লাহ ইব্রাহীম (আঃ)-এর কাছে তাঁর পুত্রকে চাইলেন, তখন ইব্রাহীম (আঃ)-এর সম্ভাব্য রেসপন্স কী কী হতে পারতো?

ইব্রাহীম (আঃ) কি বলতে পারতেন না, “হে আল্লাহ আমি সারাজীবন ইসলামের জন্য এত কিছু কুরবান করে এসেছি … আজ তুমি কেন আমার কলিজাকে চাও?”

“আমি নমরূদের মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছি। তা কি যথেষ্ঠ না?”

“আমি সারাজীবন মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে দিতে নির্যাতিত হইনাই? তা কি যথেষ্ঠ না?”

“আমি আমার প্রিয়তমা স্ত্রী এবং সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুপুত্রকে শুধু তোমার জন্য মরূভূমিতে ফেলে গিয়েছিলাম। এটাও কি যথেষ্ঠ না?
কেন তুমি আমার এই বৃদ্ধ বয়সে আমার পুত্রকে চাও?” (আসতাগফিরুল্লাহ)

ইব্রাহীম (আঃ) কি এভাবে আল্লাহকে খোঁটা দিতে পারতেন না? কিন্তু ইব্রাহীম (আঃ) এসবের কিছুই করেন নি … যখনই তিনি হুকুমটি বুঝতে পেরেছেন, তখনই পুত্রকে গোপনে বলে রাজি করিয়েছেন এবং তারপর মাকে না জানিয়েই পুত্রকে নিয়ে কুরবানী দিতে চলে গেছেন।

ইব্রাহীম (আঃ)-এর মানসিক শক্তিটা চিন্তা করতে পারেন? পুত্রের গলায় ছুরি চালানোর আগে ওনার কেমন লাগছিল চিন্তা করতে পারেন? ওনার কি কলিজাটা ছিঁড়ে যায়নি? উনার কি মনে হয়নি, আজ আমি সব হারালাম? উনি তো জানতেন না যে, আল্লাহ শেষমেশ দুম্বা কুরবানী করাবেন এবং ইসমাঈল (আঃ) রক্ষা পেয়ে যাবেন।

যাক, পরীক্ষায় ইব্রাহীম (আঃ) উত্তীর্ণ হলেন। উনার ইসমাঈল (আঃ)-কেও উনি হারালেন না । রচিত হলো ইতিহাস…..

এখানে মূল পয়েন্ট হলো এটা যে, আল্লাহ আসলে ইসমাঈল (আঃ)-এর রক্ত চাননি, আল্লাহ ইব্রাহীমের অন্তরকে পরীক্ষা করতে চেয়েছেন। আল্লাহ দেখেছেন যে, ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহকে আসলে কতটুকু মানেন। টু দ্য ম্যাক্সিমাম নাকি এট ওয়ান পয়েন্ট ইব্রাহীম (আঃ) would break down and mess up.

ইব্রাহীম (আঃ)-কে এই আদেশ দেবার পর কি গাঁইগুঁই করেন, নাকি শুনেই তা মানতে রাজি হয়ে যান? বেয়াদবী করেন নাকি বিনয়ী হন?

দেখেন ইব্রাহীম (আঃ) বিনা তর্কে কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ মেনে নিয়েছেন, তাওয়াক্কুল করেছেন এবং আল্লাহর নির্দেশের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন।

ইব্রাহীম (আঃ) এর বংশধরদের (মানে আমরা) কাছ থেকেও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ঠিক তা-ই চান। এবং সব সময় ইব্রাহীমের মতনই আমাদেরকে আল্লাহ পরীক্ষা করবেন, এটা সুনিশ্চিত। আমরা কি মনে করেছি যে আমরা ঈমান এনেছি বললেই আমাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে, আর কোনো পরীক্ষা হবে না?

আপনি দেখবেন , যখনই আপনি ইসলামকে সিরিয়াসলি পালন করতে যাবেন, তখনই আপনার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলোর উপর একটার পর একটা আঘাত আসতে থাকবে। আপনাকে সবসময় আপনার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাই স্যাক্রিফাইস করতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, ঠিক ইব্রাহীমের মতন।

ইব্রাহীম (আঃ) যেভাবে আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই আপনাকেও যেন আগুনেই নিক্ষিপ্ত হতে হবে। কিন্তু আপনি যখন লীপ অব ফেইথটা নিবেন, আল্লাহর উপর আস্থা রেখে, ঠিক ইব্রাহীম (আঃ)-এর মতনই আপনি দেখবেন, আগুনের ভিতরেই সুশীতল ঠাণ্ডা আল্লাহ আপনার জন্য তৈরি করে রেখেছেন।

ইব্রাহীম (আঃ) যেভাবে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে তাঁর স্ত্রী-পুত্রকে ফেলে এসেছিলেন, সেভাবে আপনাকেও বাহ্যিকভাবে আপনার সবকিছু (ক্যারিয়ার, জীবন, প্রিয়বস্তু) নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে ফেলতে হবে। কিন্তু ফেলার পর দেখবেন, আল্লাহ ঠিকই হেফাজত করেছেন। মাঝখান দিয়ে আপনি পরীক্ষায় পাস করলেন আরকি …

আল্লাহ আপনাকে সবশেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরীক্ষা করবেন, আল্লাহ আপনাকে এমন বিপদে ফেলবেন যে, ‘হয় হারামে লিপ্ত হও, না হলে এই দুনিয়া শেষ’….

তখন ইব্রাহীমের মতো রিস্ক নিয়ে লীপ অব ফেইথটা আপনাকে নিতে হবে। দুনিয়াকেই শেষ করে দিতে হবে, কিন্তু হারামে আপনি লিপ্ত হবেন না।

কিন্তু তারপরেই দেখবেন , কোত্থেকে যেন আল্লাহর সাহায্য এসে হাজির। আপনি কল্পনাও করতে পারেন নি …

আল্লাহর সাহায্য সবসময় ওই ছুরি চালানোর পরে আসবে, লীপ অব ফেইথটা নিবার পরে আসবে, আগে না, না হলে তো প্রমাণ হলো না যে আপনি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি কেয়ার করেন, তাই না? আপনি পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে পাস করার পরই আল্লাহ আপনাকে অফুরন্ত উপায়ে সাহায্য করবেন।

মিল্লাতে ইব্রাহীম মানেই আসলে সেই মিল্লাত, যেই মিল্লাতে থাকা মানুষগুলো আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রেখে লীপ অব ফেইথটা নিয়ে নেয়।

এ ঘটনা প্রতিটা ইসলামিস্টের জীবনে ঘটেছে, প্রতিটা … সত্যি । আশেপাশের ইসলাম মেনে চলা লোকজনকে জিজ্ঞেস করে দেখেন।

আল্লাহর জন্য স্যাক্রিফাইস করার পর আপনার মনে হবে সব শেষ, কিন্তু আসলে সবই আল্লাহ আপনাকে ফিরত দিবেন, ঠিক যেমন ইসমাঈলকে ইব্রাহীম (আঃ) ফিরত পেয়েছেন।

আসুন, লীপ অব ফেইথ নিবার ডিসিশনটা আজকেই নিয়ে নিই …

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive