পাড়ায় বেশ শোরগোল হচ্ছে। ‘তন্তসঙ্গের ছেলেপেলে নাকি?’ ভাবলেন সিদ্ধার্থদা।

তার অনুমান সঠিক। কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেল তন্তসঙ্গের ছেলেগুলো তারস্বরে চেঁচাচ্ছে—জয়তু ভটকিল বড়াল, জয়তু বিজ্ঞান! একটু পড়েই কারণ জানা গেল—ভটকিল বড়াল নাকি গাড়ি বানিয়ে ফেলেছে! ব্রান্ডের নাম দিয়েছে ‘ভডি’! গাড়ি চলছেও ভালো।

সিদ্ধার্থদা মোটেও কনভিন্স হতে পারলেন না। এর আগে এক নামকরা কম্পিউটার প্রোগ্রামারের বানানো প্রোগ্রাম-কোড কপি করে, তার উপর একটু ঘষামাজা করে—’নতুন প্রোগ্রাম বানিয়েছি’ বলে দাবি করতে লাগলেন ভটকিল মশাই। তন্তসঙ্গের ছোকরাগুলো তাকে মাথায় নিয়ে ধিন-তা-ধিন-তা করে নাচতে লাগল। পরে মূল প্রোগ্রামার মামলা ঠুকে দেয়ায় বেচারা সেঁধিয়ে যায় কিছুদিন। এবার কি করেছে কে জানে!

সিদ্ধার্থদার অস্বস্তি ক’দিন বাদেই বাস্তবতায় পরিণত হল। জানা গেল, ভটকিল মশাই এক গাড়ির ইঞ্জিন খুলে এনে, ঘষেমেজে চকচকা করেছেন, তারপর তার ছোট ফিয়াট গাড়ির ইঞ্জিনটা সরিয়ে, ঘষামাজা-করা-ইঞ্জিনটা লাগিয়ে দিয়েছেন। গাড়ির লোগো খুলে ফেলে সেখানে চাইনিজ তালার মত ট্রাই-সার্কেল লোগো বসিয়েছেন। উপরে নাম সেঁটে দিয়েছেন ভডি! ব্যস পাড়ায় শুরু হয়ে গেল হাসাহাসি। এনিয়ে ভটকিল মশাইকে জিজ্ঞেস করাতে উনি উত্তর দিলেন—কে বলেছে আমি নতুন গাড়ি বানিয়েছি? আমি বলেছি? এইসব ঐ ছোকরাদের প্যাঁচাল। আমার ইচ্ছে হলো গাড়িটার একটু ভোল পাল্টাই। তাই একটু ডিজাইন করেছি আরকি!

২০১০ সালে নাস্তিক জিনবিদ ক্রেগ ভেন্টরের টিম বেশ আলোচনায় উঠে আসেন। তারা নাকি প্রথম কৃত্রিম প্রাণ তৈরি করতে পেরেছেন! মুক্তমনারা তো মহাখুশি! কিন্তু ভেন্টরের টিম আসলে কী করেছিলেন? গল্পের ভটকিল মশাই গাড়ির ক্ষেত্রে যা করেছিলেন, তাই! গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়: এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ইস্ট থেকে ক্রোমোজোমের বিভিন্ন মাল মশলা সংগ্রহ করা হয়। তারপর Mycoplasma mycoides নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার জিনোমের অনুকরণ করে কম্পিউটার সফটওয়্যারের সাহায্যে আরেকটি জিনোম ডিজাইন করা হয়। ইস্ট ক্রোমোজম থেকে নেয়া কাঁচামাল দিয়ে সফটওয়্যারের সাহায্যে তৈরি করা হয় অনুকৃত কৃত্রিম ক্রোমোজোম এবং তাতে কিছু ঘষামাজা করা হয়, সংযুক্ত করা হয় কিছু জলছাপ। কপি করে বানানো ক্রোমোজমটি এবার Mycoplasma capricolum নামের একটি সরল ব্যাক্টেরিয়ার কোষে ঢুকিয়ে দেয়া হয়, যার মধ্যেকার ক্রোমোজোম আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। পরে এই জোড়াতালি দেয়া ব্যাকটেরিয়াটি বংশবিস্তার শুরু করে।

এটাকেই মুক্তমনা সম্প্রদায় কৃত্রিম প্রাণ বলে গলা ফাটিয়ে প্রচার করতে থাকে। ক-কে কলিকাতা বানিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে:

কম্পিউটারে কৃত্রিমভাবে তৈরি ক্রোমোজোমের মাধ্যমে একটি পোষক ব্যাকটেরিয়ার কোষে ‘প্রাণ’ সঞ্চারে সফল হয়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে নতুন সিন্থেটিক জীবন যুগের সূচনা হলো – যখন প্রাণ ‘সৃষ্টি’র ব্যাখ্যার জন্য কোন অলৌকিক কিংবা অপার্থিব অনুকল্পের দরকার পড়ছে না, বিজ্ঞানীরা হাতে কলমেই তৈরি করে তা দেখিয়ে দিচ্ছেন। আর সম্ভবতঃ এর মাধ্যমে ভেঙ্গে পড়লো ধর্মবাদীদের শক্তিশালী ‘ডিজাইন আর্গুমেন্টের’ শেষ সিঁড়িটি, যেটি প্রাণের উৎসের জন্য দোহাই পাড়ত কোন এক অদৃশ্য সর্বময় ক্ষমতাশালী এক সত্তার। অক্কামের ক্ষুরের আরেকটি গভীর পোঁচ যেন পড়ে গেলো তাদের গালে অবধারিতভাবেই!

-অভিজিৎ রায়

কিন্তু আসলেই ভেন্টর সাহেব কি প্রাণ সৃষ্টি করতে পেরেছেন? বিশেষজ্ঞরা কি বলেছেন?

ক্যালিফোর্নিয়া ইউনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (ক্যালটেক) এর জিনবিদ ডেভিড বাল্টিমোর বলেছেন:

ক্রেইগ ভেন্টর ব্যাপারটা নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করেছেন। তিনি কোনো প্রাণ ‘সৃষ্টি’ করতে পারেন নি, অনুকরণ করেছেন কেবল।[১]

বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োইঞ্জিনিয়ার জিম কলিনস আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন:

আমার আশঙ্কা হচ্ছে, কিছু মানুষ এই গবেষণার খবর শুনে মনে করবে—তারা বুঝি নতুন প্রাণ সৃষ্টি করেছেন। ঘটনা কিন্তু তা নয়। এই বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক জিনোম থেকে কপি করে বানানো জিনোম দিয়ে একপ্রকার অণুজীব বানিয়েছেন। এর দ্বারা মোটেই গোড়া থেকে প্রাণ সৃষ্টি বা নতুন কোন প্রাণ সৃষ্টি হয় নি।[২]

নোবেলজয়ী ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী পল নার্স বিবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন:

ভেন্টরের প্রচেষ্টা বড় অর্জন বটে। তবে এর দ্বারা কোনো কৃত্রিম প্রাণ তৈরি হয় নি বুঝলেন। স্রেফ জড় কেমিক্যাল দিয়ে যদি গোড়া থেকে একটা ব্যাকটেরিয়ার পুরো কোষটা তৈরি করা হত, তাহলে সেটাকে কৃত্রিম প্রাণ বলা যেত।[৩]

মজার ব্যাপার হলো, ভেন্টর নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন, তিনি গোড়া থেকে প্রাণ তৈরি করতে পারেন নি, বরং বলা যায় আল্লাহর দেওয়া উপকরণ ব্যবহার করে কিছু কপি তৈরি করেছেন মাত্র। তাছাড়া মুক্তমনারা যে দাবি করে তাকে নিয়ে লেখছে সেটাও তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। তারা বলতে চাচ্ছে, মানুষের ঈশ্বর হয়ে ওঠছে! অথচ ভেন্টর বলছেন এগুলো ভুল কথা।

মজার ব্যাপার হলো, এই কপি-পেস্ট মার্কা কোষ বানাতে তাদের টিমে ১৫ বছর সময় লেগেছে, একদল মানুষের বুদ্ধিমত্তা, প্ল্যান-প্রোগ্রাম প্রয়োজন হয়েছে আর ব্যয় হয়েছে চার কোটি ডলার (প্রায় তিনশত আটত্রিশ কোটি টাকা)। একটু ভেবে দেখুন, একটা কপি-পেস্ট টাইপের সরলকোষ জোড়াতালি দিতে যদি এই পরিমাণ শ্রম, বুদ্ধিমত্তা আর রিসোর্স দরকার হয়; তাহলে যে প্রাণ থেকে তারা কপি করলো সেটা শূন্য থেকে বানাতে কিরকম বুদ্ধিমত্তা দরকার হতে পারে! অথচ মুক্তমনারা বিশ্বাস করে প্রাণ হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয়ে গেছে, স্রষ্টার দরকার নেই!! কি অদ্ভুত প্রলাপ। যে ঘটনাকে তারা স্রষ্টার অস্তিত্বের বিপক্ষে প্রমাণ হিসেবে নিয়ে আসলো, সেই ঘটনাই তো তাদের বুকে ছোরা-স্বরূপ! এদের উপমা হলো সেই অন্ধের মত, যার চোখের সামনে উজ্জ্বল আলো ফেলার পর যখন জিজ্ঞেস করা হয়—কি দেখতে পাও? সে বলে অন্ধকার! হায় আফসোস!

আচ্ছা, গল্পটা শেষ করে যাই। ভটকিল বড়ালের ভক্তকুলকে তন্তসঙ্গ নামটা দিয়েছেন সিদ্ধার্থদা। তিনি টুকটাক স্প্যানিশ জানতেন। সাধারণ মানুষ তো স্প্যানিশ বুঝে না। এলাকায় তিনি পরিচিত হওয়ায়, তার মুখ থেকে শুনে ভটকিলের ভক্তদের সেই নামেই ডাকা শুরু হল। স্প্যানিশ ভাষায় Tonto মানে হলো গবেট!

 

তথ্যসূত্র

[১]DAVID BALTIMORE QUOTED IN: NICHOLAS WADE (2010), RESEARCHERS SAY THEY CREATED A ‘SYNTHETIC CELL’. THE NEW YORK TIMES

[২]JIM COLLINS QUOTED IN: NICHOLAS WADE (2010), RESEARCHERS SAY THEY CREATED A ‘SYNTHETIC CELL’. THE NEW YORK TIMES

[৩]AMIT BHATTACHARYA (2010), DID VENTER CREATE LIFE? NOT REALLY, SAY EXPERTS. TIMES OF INDIA

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

About The Author

জন্ম এই ইট-কাঠের যান্ত্রিক শহরে। অষ্টম শ্রেণী থেকে টানা দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বৃত্তি পেয়ে দেশের ২য় সরকারি মেডিকেল কলেজে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে কৃতিত্বের সাথে MBBS সম্পন্ন করেছেন। জন্ম মুসলিম পরিবারে হলেও, জীবনের বাঁকে একসময় সংশয় ও নাস্তিক্যবাদের চোরাগলিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সত্যকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন, চেষ্টা চলছে, চলবে ইন শা আল্লাহ। ‘বিশ্বাসের যৌক্তিকতা’ তার প্রথম একক গ্রন্থ, প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে। ২০১৯ এর বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় একক গ্রন্থ “অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়”। দুটি বই অল্প সময়ে বেস্ট সেলারে পরিণত হয়। ছড়িয়ে যায় দেশের বাইরেও। তিনি বর্তমানে কিশোর বয়সীদের মাঝে বিজ্ঞানের সঠিক অনুধাবন পৌছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ২০২০ সালের বইমেলায় তার প্রকাশিত “হোমো স্যাপিয়েন্‌স: রিটেলিং আওয়ার স্টোরি”। তার আগ্রহের বিষয় তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, হাদিসশাস্ত্র, ফিলোসফি অফ সাইন্স, ইভোলিউশনারি বায়োলজি।

Related Posts

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Loading Disqus Comments ...
IIRT Arabic Intensive