একতখন থার্ড ইয়ারে পড়ি। দ্বীনের জন্য সামান্য কিছু করতে পারলেই নিজের কাছে খুব ভালো লাগতো। আর এই ভালো লাগা থেকেই রমাদান মাসে একটি উদ্যোগ নিলাম কিছু রোজাদারকে ইফতার করাবো বলে। তবে আমি যেহেতু স্টুডেন্ট লাইফ পার করছিলাম সেহেতু আমার একার পক্ষে এটা সহজও ছিলো না। আবার অনেক ফ্রেন্ড আগে থেকেই এমন উদ্যোগের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তাই কয়েকজন ফ্রেন্ড নিয়েই আমাদের উদ্দেশ্য ঠিক করে ফেললাম। আমরা কিছু মাদ্রাসায় আমাদের ইফতার প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করবো। কারণ আমরা চেয়েছিলাম আমাদের ইফতার আয়োজনে যেন সর্বোচ্চ সংখ্যক তাকওয়াবান রোজাদার ব্যক্তিই উপস্থিত থাকে।

এদিকে আমরা আমাদের ফান্ড সংগ্রহ করতে গিয়ে মানুষের আগ্রহ দেখে আরো উৎসাহিত হয়ে উঠলাম। আমরা যেহেতু পার্সোনালি খুব কম মানুষকেই আমাদেরকে আর্থিকভাবে সহযোগীতা করতে বলেছিলাম, তবুও আমরা আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সহযোগীতা পেয়ে যাই। হয়তো আল্লাহ্ তার ঐ বান্দাদের দিয়ে দ্বীনের খেদমত একটু বাড়িয়ে নিতে চেয়েছেন। আর তারাও হয়তো উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে দ্বীনী কাজে খরচের পুরোটাই আখিরাতের জন্য ডিপোজিট হয়ে থাকে। আর এভাবেই আমাদের প্রথম আয়োজনের জন্য পর্যাপ্ত ফান্ড সংগ্রহ হয়ে গেল।

IIRT Arabic Intensive

এই ফান্ড সংগ্রহ করতে গিয়ে যে বিষয়গুলো আমাকে বেশি বিমোহিত করেছিল তার মধ্যে একটি হলো- কিছু ভাই ও বোন (যাদের বেশিরভাগই স্টুডেন্ট) আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করতে চাইতো আবার নিজের অল্প সামর্থের কথা চিন্তা করে লজ্জাও পেত। তবে শেষ পর্যন্ত আমাদের থেকে উৎসাহ পেয়ে তারা তাদের লজ্জাকে হারিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করতো। বিষয়টা এজন্যই আমার কাছে একটু বেশি ইন্টারেস্টিং ছিলো কারণ আমি তখনও স্টুডেন্টই ছিলাম। আর স্টুডেন্ট লাইফে ছেলে-মেয়েদের প্রতিটা টাকাই যে হিসেব করে খরচ করতে হয় তা আমি ভালো করেই জানতাম। সেখান থেকে দ্বীনের জন্য খরচ করতে পারাটা সত্যিই সৌভাগ্য ও সাহসের বিষয়।

দুইফান্ড সংগ্রহ শেষে আমরা কিছু মাদ্রাসা খুঁজতে থাকলাম। যেখানে আমাদের ফান্ডটা সুষ্ঠভাবে খরচ করতে পারবো এবং তাদের জন্য কিছুটা হলেও উপকার হবে। আর তখন খুঁজে পেলাম দু-একটি কওমী মাদ্রাসা। যাদের বড় আর্থিক উৎসটাই হলো এদেশের সাধারণ মুসলিমগণ। তাই তাদের সাথেই  ইফতার করার সিদ্ধান্ত জানালাম। তারাও আমাদের সিদ্ধান্তে অনেক খুশি। কারণ তাদের অনেকেই মনে করতেন ভার্সিটির ছেলেরা মাদ্রাসার ছেলেদের গুরুত্ব দেয় না, ভার্সিটিতে পড়ুয়া ছেলেগুলো মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলেগুলোর চেয়ে সমাজের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায় ইত্যাদি। আর বাস্তবে এমনটাই হয়। মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলেগুলোকে মসজিদের ইমাম, আর মৃত্যুর পর দুআ ব্যতীত অন্য কিছু করতে পারে বলে আমরা ভাবতেও চাইনা। অথচ আজকের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজের পেছনে তাদের সুস্থ মানসিকতা ও উত্তম চরিত্রের প্রতি অবহেলা অনেকটাই দায়ী। কারণ তাদেরকে অবহেলা করতে গিয়ে আমরা সভ্য ও প্রগতিশীল সংস্কৃতির নামে নিজেদেরকে নিয়ে এসেছি চতুষ্পদ জন্তুর কাতারে। যেখানে নিজের ভাইয়ের কাছে বোন নিরাপদ না, শিক্ষকের কাছে ছাত্রী না, এমনকি সমাজের সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তিটার কাছে খেটে খাওয়া গরীব মানুষটাও নিরাপদ না।

তিনযাক এবার আসি সেই চক্ষু শীতলকারী মুহূর্তে। আমরা তিন বন্ধু ইফতারের বেশ আগেই হল থেকে রওয়ানা হলাম। গন্তব্য সেই মাদ্রাসা, যেখানে আমরা আজকের ইফতার করবো। মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে ঢুকতেই উস্তাদদের হাতের স্পর্শে মনটা শীতল হয়ে গেল। ছাত্র-শিক্ষক সবাই মেঝেতে বসা। আমরাও মেঝেতেই বসলাম। যদিও আমাদের ভার্সিটিতে কোন ইফতার আয়োজন হলে বিভিন্ন পদ অনুযায়ী বসতে হতো। এখানে এসে ঠিক বিপরীতটাই দেখতে পাচ্ছি। কে মাদ্রাসা প্রধান, আর কে দারোয়ান তা বুঝাও কঠিন। কারণ সবাই একই কাতারে বসা। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো যখন ইফতার সামনে নিয়ে বসেছিল তখন মনে হচ্ছিলো এর চেয়ে বেশি কমান্ড মানার ক্ষমতা আমি আগে কখনো দেখিনি। সব মিলিয়ে একটি চক্ষু শীতলকারী দৃশ্য। অতঃপর ইফতার ও মাগরিব সালাত শেষে বিদায় নিলাম। তবে এখানকার ১৫০+ ছাত্রদের শৃঙ্খলতা আর উস্তাদদের আতিথেয়তা দেখে আমরা সবাই মুগ্ধ হয়েছি। কারণ এর চেয়ে ভালো ইফতার মুহূর্ত আগে কখনো দেখিনি। (আলহামদুলিল্লাহ)

পরবর্তীতে আরো দুটি মাদ্রাসাসহ মোট ৫০০+ সায়িমের সাথে ইফতার করে ঐবারের মতো আমাদের ইফতার প্রজেক্ট ক্লোজ করেছিলাম। আর প্রতিটা স্থানেই দেখেছিলাম ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করতে আসা ছেলেগুলোর শৃঙ্খলতা ও সরলতা। যারা কখনো অভিযোগ করেনি তাদের এই নিয়মতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তারা তাদের সবটুকু ত্যাগ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করে থাকে। তারা ভালো করেই জানে এই পরিশুদ্ধ জীবনব্যবস্থার রয়েছে এক শক্ত ভিত্তি। যার স্থপতি স্বয়ং মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। আমরা জানিনা কতটুকু আন্তরিকতার সাথে কাজগুলো করতে পেরেছিলাম। তবে প্রথমবার হিসেবে আমরা আমাদের সবটুকু আন্তরিকতার সাথেই চেষ্টা করেছিলাম। আর তা করতে গিয়ে আল্লাহর দ্বীন চর্চাকারী মানুষগুলোকেও খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করার সৌভাগ্য হলো। যা আজও আমার স্মৃতির পাতায় ভাসছে।

এছাড়া ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে হলের প্রতিটা রুমের ইফতার আয়োজন, কারো রুমের সামনে দিয়ে যেতেই ইফতারের জন্য ডাক,  রুমের সবচেয়ে উশৃঙ্খল ছেলেটার ইফতার সামনে নিয়ে বসে থাকার শৃঙ্খলতা, ইফতারের জন্য সবচেয়ে কিপটে ছেলেটার সবচেয়ে বেশি কন্ট্রিবিউট করার প্রতিযোগীতা সবই ছিল চোখে পড়ার মতো। আর ইফতার বিক্রেতা মামাদের তাড়া খেয়ে দূরে থাকা পথ শিশুগুলোকেই আবার ইফতারের সময় ডেকে এনে ইফতার করানোর দৃশ্যটাও ভুলার নয়। সবাই যেন একই প্রতিযোগীতায় লিপ্ত, সবাই যেন চাচ্ছে তার সওয়াবটা একটু হলেও বাড়িয়ে নেয়া যায়। কারণ এ সুযোগ যে সীমিত সময়ের জন্য। আর এই প্রতিযোগীতার পেছনে যে কথাটির সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে তা আমাদের সবারই জানা, তবুও আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে সে রোজাদারের সম পরিমাণ সওয়াব পাবে; রোজাদারের সওয়াব থেকে একটুও কমানো হবে না। [সুনানে তিরমিযি (৮০৭), সুনানে ইবনে মাজাহ (১৭৪৬), সহীহ ইবনে হিব্বান (৮/২১৬)]

চারশেষ মুহূর্তে ছোট্ট একটি মেসেজ দিয়েই শেষ করছি। রমাদান মাস সত্যিকারেই ইবাদাতের শ্রেষ্ঠ মাস। কারণ শয়তান তখন শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে, আল্লাহ তাঁর রহমাতের সবগুলো দরজা খুলে দেন, আর বান্দার আমলগুলোও বাড়িয়ে দেন বহুগুণে। তাই এই সুযোগটি আমাদের নিতে হবে। সকল অহংকার ও স্বার্থপরতা বর্জন করে নিজেদেরকে আল্লাহর সমীপে দাঁড় করাতে হবে, মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে এবং নিজেকে সকল প্রকার জুলুম থেকে বিরত রাখতে হবে। নিজের মুসলমানিত্বকে আপগ্রেড করতে হবে। নিজের চিন্তা-চেতনা ও আমলগুলোকে পরিশুদ্ধ করে নিতে হবে। সর্বোপরি আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও দুয়া চাইতেই হবে। আল্লাহ্ তা’আলা যেন আমাকে, আপনাকে একজন তাকওয়াবান মুসলিম হিসেবে কবুল করেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর মনোনীত দ্বীন ইসলামের উপরই স্থির রাখেন। (আমীন)

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive