শাইখ ড. বিলাল একটা সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন। ধরুন, আপনি একটা প্রতিষ্ঠান দিলেন, শ্রমিকদের হায়ার করলেন, ম্যাটেরিয়ালস পারচেজ করলেন। এখন শ্রমিকদেরকে অফিস ডেকে কি তাদেরকে ইনস্ট্রাকশন দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ, নাকি চুপচাপ বসে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ? ইন্সট্রাকশন না দিলে তো তারা কফি শপে গিয়ে কফি খাবে, মূল কাজই করবে না। অথচ কিছু ডেইস্ট এবং এগনোস্টিক বিশ্বাস করে- আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছেন ভালো কথা, কিন্তু সৃষ্টির সাথে তাঁর আর কোনো কমিউনিকেশন নেই! এটা মহামহিম আল্লাহ’র জন্য শোভনীয় নয়।

মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে? [সূরাহ আল-কিয়ামাহ (৭৫): ৩৬]

আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টির সাথে বিভিন্নভাবে কমিউনিকেইট করেন। কারো সাথে তিনি সরাসরি কথা বলেন, যেমন, মূসার (‘আলাইহিসসালাম) সাথে বলেছেন। কারো সাথে জিবরাঈলের (‘আলাইহিসসালাম) মাধ্যমে মেসেজ পাঠিয়ে ইত্যাদি। তাঁর সৃষ্টি জগতের সাথে কমিউনিকেশনের আরেকটা মাধ্যম হলো, নেচার বা প্রকৃতি। এই যে ঢাকা শহরে ভূমিকম্প হচ্ছে, এটা আল্লাহ’র কমিউনিকেশন। উনি আমাদেরকে সতর্ক করছেন। অবশ্য কারো কাছে এটা ‘মাদার নেচার’ এর কার্যক্রম। যাক বাবা! ভাগ্যিস উৎপত্তিস্থল নেপালে কিংবা মায়ানমার ছিলো! আর যারা জানে, তাঁদের কাছে এটা আল্লাহ’র কমিউনিকেশন, সিগনাল, ওয়ার্নিং।

IIRT Arabic Intensive

স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে। [সূরাহ আর-রূম (৩০):৪১]

আচ্ছা আমরা কীভাবে বুঝবো একজন আল্লাহ্ আছেন? কীভাবে তাঁর ইন্সট্রাকশন পাবো? নাস্তিকদের এখানে উত্তরটা সুন্দর। তারা চায় সৃষ্টিকর্তা আকাশ চিরে ধপাস করে হিমালয়ে কিংবা ইউরোপের কোথায় পড়ে বলবে, “এই দেখো আমি আল্লাহ্।” আমার এক এগনস্টিক বন্ধু আমাকে বললো, “কুরআন একবার শব্দ করে কথা বললেই তো হয়! ব্যস, কোনো নাস্তিক থাকবে না!” মজার বিষয়। কিন্তু, তখন যে তুমি বলবে না এটা স্রেফ জাদু তার কি নিশ্চয়তা আছে? আল্লাহ্ এদের সম্পর্কে বলেছেন,

যদি আমি ওদের সামনে আকাশের কোনো দরজাও খুলে দেই আর তাতে ওরা দিনভর আরোহণও করতে থাকে, তবুও ওরা এ কথাই বলবে, ‘আমাদের দৃষ্টির বিভ্রাট ঘটানো হয়েছে; না বরং আমরা জাদুগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।’ [সূরাহ আল-হিজর (১৫): ১৪-১৫]

অনেক আগে এক ভাই একটা সুন্দর স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। নাস্তিকরা কি ভণ্ড, না অন্ধ? তারা নাকি ঈশ্বরকে দেখে না, তাই বিশ্বাস করে না! তো গির্জায় গির্জায় যীশুর ছবি, গৌতম বুদ্ধের মূর্তি, হিন্দুদের লক্ষ কোটি দেব দেবীকেও কি তারা দেখে না? পৃথিবীর মধ্যে এত ঈশ্বর থাকতে তারা ঈশ্বর দেখতেছে না?

আবার আসি আল্লাহ’র নিদর্শন নিয়ে। কেন আমরা অদেখা আল্লাহ’কে বিশ্বাস করবো? আল্লাহ’র সৃষ্টি জগতকে দেখে। চট্টগ্রামে থাকতে প্রতিদিন বিকালে বের হতাম পাহাড় থেকে সূর্যাস্ত দেখার জন্য। লাল আভা বের করে বিদায় নিচ্ছে সূর্য, গ্রীক মুশরিকদের কাছে এটাই ঈশ্বর, কিন্তু ইবরাহীমের (‘আলাইহিসসালাম) কাছে নয়। যে ডুবে যায়, সে ঈশ্বরকে যে তাঁর পছন্দ না! কক্সবাজারের সেই সমুদ্র সৈকতের ঢেউ কিংবা কর্ণফুলীতে স্টিমারের গর্জন। কত গোছালো সব! এই যে চাঁদ মামাটা যদি না থাকতো কিংবা আমাদের সৌরজগত যদি আমাদের ছায়াপথের এই অংশে না থেকে গ্যালাক্টিক কোরের পাশে থাকতো, বৃহস্পতি গ্রহ যদি বুধের জায়গায় থাকতো আর বুধ শনি গ্রহের জায়গায়! আল্লাহ্‌’র এই সুন্দর সৃষ্টি, সবকিছুকে এত সুন্দর করে অর্গানাইজ করা ডিজাইন করা কীসের নির্দেশক? ‘বাই চান্স’ এর নির্দেশক নাকি একজন ‘সর্বশক্তিমান ডিজাইনার’ এর নির্দেশক? সিম্পল লজিক ডিজাইন ইন্ডিকেটস ডিজাইনার।

নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের বিবর্তনে এবং নদীতে নৌকাসমূহের চলাচলে মানুষের জন্য কল্যাণ রয়েছে। আর আল্লাহ তা’আলা আকাশ থেকে যে পানি নাযিল করেছেন, তদ্দ্বারা মৃত যমীনকে সজীব করে তুলেছেন এবং তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সবরকম জীব-জন্তু। আর আবহাওয়া পরিবর্তনে এবং মেঘমালার, যা তাঁরই হুকুমের অধীনে আসমান ও জমিনের মাঝে বিচরণ করে; নিশ্চয়ই সে সমস্ত বিষয়ের মাঝে নিদর্শন রয়েছে বুদ্ধিমান সম্প্রদায়ের জন্যে। [সূরাহ আল-বাকারাহ (২):১৬৪]

ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সময় আপনার প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রতি যে আপনার ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়, এটাকে কীভাবে ‘বাই চান্স’ এ চালিয়ে দেওয়া যায়? এই যে ‘ভালোবাসা’ ‘ভালো লাগা’ এসব দেখতে না পাওয়া, অস্পর্শনীয় জিনিস কীভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি হলো?

আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাকো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে। [সূরাহ আর-রূম (৩০):২১]

এই যে মানুষের মধ্যে রাগ, হাসি, বিদ্বেষ, এসব ইমোশনের কীভাবে বিবর্তন হলো কিংবা কেনই বা হঠাৎ করে মানব শরীরের মধ্যে এসবের আগমনের প্রয়োজন পড়লো?

আল্লাহ্‌ আরেকভাবে মানুষকে ইন্সট্রাকশন দেন। তা হচ্ছে রাসূল পাঠিয়ে। মানুষের পক্ষে যুক্তি, ফিলোসফি দিয়ে স্রষ্টা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা সম্ভব। তবে পুরো বিষয়ের জন্য দরকার মেসেঞ্জার, যারা আল্লাহ্‌ থেকে মানুষকে ইনফরমেশন দেবেন। মেসেঞ্জাররা তাঁদের জাতির কাছে এসে ঘোষণা দেন যে, তাঁরা আল্লাহ’র রাসূল। সূরা শু’আরা-তে আমরা তা দেখতে পাই। রাসূলগণ আসছেন আর তাঁদের জাতির কাছে বলছেন তাঁরা আল্লাহ্‌র রাসূল।

নিশ্চয়ই আমি তোমাদের নিকট একজন বিশ্বস্ত রাসূল। [সূরাহ আশ-শু’আরা (২৬):১৬২]

কেউ রাসূল বললেই আমরা তাঁকে রাসূল বলে বিশ্বাস করি না। মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে আমি রাসূল মানি না, সে প্রমাণ দিতে ব্যর্থ। আইনস্টাইন কিংবা শেক্সপিয়র রাসূল ছিলো না। রাসূল হতে হলে ঘোষণা দিতে হবে। পৃথিবীর সব মানুষকে যাচাই করার দরকার নেই। যে বলবে সে রাসূল, তাকেই যাচাই করতে হবে।

কিন্তু এই যে রাসূল পাঠিয়ে আল্লাহ্ কমিউনিকেইট করেন, তা নাস্তিকদের পছন্দ হলো না। তারা চায় আল্লাহ কীভাবে চলবেন, তাঁর সৃষ্টিকে নির্দেশনা দিবেন তা এই মাথামোঠা মানুষ ঠিক করে দিবে! আল্লাহ তাঁর উইজডম অনুযায়ী কীভাবে সৃষ্টির সাথে কমিউনিকেইট করবেন, তা এই নাস্তিকরা ঠিক করে দিতে চায়। তাই তাদের কথা, ‘‘ওকে আল্লাহতে বিশ্বাস করবো, তবে একবার তাঁকে দেখতে হবে, ফেরেশতাদেরকে দেখতে হবে!’’ তাই তারা বলে-

ফেরেশতারা হাজির হচ্ছে না কেন? [সূরাহ আল-হিজর (১৫):৭]

আমাদের উপর আসমানকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে দেবেন অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে নিয়ে আসবেন। [সূরাহ বানী ইসরাঈল (১৭):৯২]

আমরা আমাদের পালনকর্তাকে দেখি না কেন? [সূরাহ আল-ফুরক্বান (২৫):২১]

যা-ই হোক, আল্লাহ্‌ তাঁর ওয়ে-তেই কাজ করেন, যা তাঁর উইজডম অনুযায়ী হয়। আল্লাহ্‌ রাসূল প্রেরণ করেছেন, যাতে অবিশ্বাসীদের কোনো সুযোগ না থাকে।

আমি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে লোকদের জন্য আল্লাহ’র ওপর অজুহাত দাঁড় করানোর কোনো সুযোগ না থাকে…। [সূরাহ আন-নিসা (৪):১৬৫]

সো। সব ক্লিয়ার। যারা অপেক্ষা করতেছে আল্লাহ্‌ তাদের সামনে হাজির হবে, তারপর না হয় বিশ্বাস, তারা অপেক্ষা করুক।

তারা শুধু এ বিষয়ের দিকে চেয়ে আছে যে, তাদের কাছে ফেরেশতা আগমন করবে কিংবা আপনার পালনকর্তা আগমন করবেন অথবা আপনার পালনকর্তার কোনো নির্দেশ আসবে। যেদিন আপনার পালনকর্তার কোনো নিদর্শন আসবে, সেদিন এমন কোনো ব্যক্তির বিশ্বাস স্থাপন তার জন্যে ফলপ্রসূ হবে না, যে পূর্ব থেকে বিশ্বাস স্থাপন করেনি কিংবা স্বীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কোনোরূপ সৎকর্ম করেনি। আপনি বলে দিন, “তোমরা পথের দিকে চেয়ে থাকো, আমরাও পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম।’’ [সূরাহ আল-আন’আম (৬):১৫৮]

অতএব আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন এবং অপেক্ষা করুন, তারাও অপেক্ষা করছে। [সূরাহ আস-সাজদাহ (৩২):৩০]

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive