যদি স্রষ্টা মানুষকে কিছু বলেন – তবে তাতে কি ভুল থাকা সম্ভব?

উত্তর হচ্ছে-না। সকল ধর্মের লোকেরাই এই ক্ষেত্রে একমত হবে। বিশেষ করে যারা দাবী করে তাদের কাছে কিতাব আছে (মুসলিম, ইহুদি ও খ্রীষ্টান সম্প্রদায়)। তারা তো সবার আগে মাথা ঝাঁকাবে।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

এখন যদি বলা হয়- স্রষ্টা কি এমন বিধান দিতে পারেন, যা পরবর্তীতে রহিত করতে হয়? এক্ষেত্রেও আহলে কিতাবরা বলবে, “অসম্ভব! এটাও হতে পারে না।” অনেক মুসলিমও হয়তো অজ্ঞতার কারণে কিংবা মডারেট হয়ে বলবে, “এটা সম্ভব না।” যুক্তি হচ্ছে-

“কুরআন অনুসারে আল্লাহ ভবিষ্যত জানেন। যদি কুরআনের রচয়িতা আল্লাহই হন, তবে কেন তিনি এমন বিধান দিবেন যা পরবর্তীতে রহিত করতে হয়? তিনি কি জানতেন না যে তাঁর বিধান ভবিষ্যতে অকার্যকর হয়ে পড়বে?”

ইসলামী পরিভাষায় ‘রহিতকরণ’ বলতে এমন কিছুই বোঝানো হয় না।

রহিতকরণ কী?

আরবী نسخ শব্দের অর্থ রহিত করা। পারিভাষিকভাবে, নাসখ মানে সকল শর্ত পূরণ করেছে এমন কোনো কর্মবিষয়ক বিধান পালনের সময়সীমার সমাপ্তি ঘোষণা করা।

অর্থাৎ, নাসখ বলতে স্রষ্টার একটি বিধান নতুন আরেকটি বিধান দ্বারা বাতিল হয়ে যাওয়াকে বোঝায়।

রহিতকরণ কি সত্যিই আছে?

কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফদের থেকে রহিতকরণ বা ‘নাসখ’ এর বিষয়টি পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত। আর এটা আমাদের অনেকের কমনসেন্সের সাথে না মিললেও একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই রহিতকরণের পিছনে প্রজ্ঞাটা ধরতে পারা যায়।

আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলেন,

“আমি কোন আয়াত রহিত করলে অথবা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জানো না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান?” [সূরা আল বাকারাহ (২): ১০৬]

এছাড়া সহীহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি, সূরা আহযাব এক সময় আকারে সূরা বাকারার মতো ছিলো। পরবর্তীতে এর অধিকাংশ আয়াত রহিত করে দেওয়া হয়।[১]

সাহাবাদের নিকট ‘রহিতকরণ’ এর জ্ঞান থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কারণ, অনেক সময়ে কেউ কেউ হালাল ভেবে নিজে হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে পড়তে পারে, আর অন্যকেও সে দিকে আমন্ত্রণ জানাতে পারে। একবার চতুর্থ খলিফা আলী (রাঃ) একজন বিচারককে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি মানসুখ (রহিত) আইন-কানুন সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন কি না। বিচারক জবাব দিলেন, “না।” আলী (রাঃ) তাঁকে বললেন, “তুমি নিজে ধ্বংস হয়েছো আর অন্যদেরও ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছো।”[২]

আমাদের সালাফরাও নাসখ নিয়ে প্রচুর বই লিখে গেছেন। সম্ভবত এর মধ্যে সর্বাধিক প্রাচীন গ্রন্থটি হলো বিখ্যাত তাবিয়ী, হাদীস বিশেষজ্ঞ কাতাদাহ ইবনু দিয়ামা’র লেখা আন নাসিখ ওয়াল মানসুখ ফী কিতাবিল্লাহ। এছাড়া নাসখ নিয়ে বই লিখেছেন ইবনু হাযাম যাহিরী, মাকী ইবনু আবী তালিব, ইবনুল জাওযী প্রমুখ।

উল্লেখ্য যে, বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নাসখ সংক্রান্ত ঘটনার সংখ্যা মাত্র অল্প কয়েকটি। আর সেগুলো সনাক্ত করার সুনির্দিষ্ট তিনটি পদ্ধতি রয়েছে। সেগুলো হলো-

■ নবী ﷺ কিংবা তাঁর কোনো সাহাবীর সুষ্পষ্ট বক্তব্য।

■ রহিতকারী ও রহিত- উভয়ের আইনের ব্যাপারে প্রথম দিকের মুসলিম বিশেষজ্ঞদের পূর্ণ মতৈক্য।

■ এ বিষয়ের নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক জ্ঞান যে, যে আইনটিকে রহিত করা হয়েছে সেটি রহিতকারী আইনটির পূর্বে নাযিল হয়েছে এবং তা রহিতকারী আইনটির কোন সম্পূরক বিধি নয়, বরং তার সাথে সুষ্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।

নাসখ কত প্রকারের হতে পারে?

মূলতঃ তিন ধরনের নাসখ সংঘটিত হতে পারে।

■ কুরআন দ্বারা কুরআনের নাসখ:

এ ক্ষেত্রে কুরআনের পূর্ববর্তী একটি আইন পরবর্তী আইন দ্বারা রহিত হয়। যেমন, যেসব নারীরা ব্যভিচার করে, তাদের শাস্তি সম্পর্কে কুরআনে নাযিল করা হয়ঃ

“আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচারিণী, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চার জন পুরুষকে সাক্ষী হিসেবে নিয়ে এসো। আর যদি তারা সাক্ষ্য প্রদান করে তবে সংশ্লিষ্টদেরকে গৃহে আবদ্ধ রাখো, যে পর্যন্ত মৃত্যু তাদেরকে তুলে না নেয় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোনো পথ নির্দেশ না করেন।” [সূরা আন নিসা (৪): ১৫]

এ আইনটি পরবর্তীতে বাতিল করা হয়। যারা এ ধরনের মন্দ কাজ করবে তাদের শাস্তি সম্পর্কে নাযিল করা হয়,

ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুসলিমদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” [সূরা আন নূর (২৪): ২]

■ কুরআনের মাধ্যমে সুন্নাহর নাসখ:

এক্ষেত্রে, রাসূল (সাঃ) এর একটি নির্দেশ কিংবা তিনি পালন করতেন এমন কোনো সুন্নাহ পবিত্র কুরআনের কোনো আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে যায়। রাসূল (সাঃ) মদিনায় হিজরত করে দেখতে পেলেন সেখানকার ইহুদীরা আশুরা’র দিন সিয়াম পালন করছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, “নবী ﷺ যখন মদিনায় এলেন, তখন দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখে। তখন তিনি বললেন, “কেন তোমরা রোজা রাখো?” তারা বললো, “এটি উত্তম দিন। এ দিনে আল্লাহ বনি ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করেছেন; তাই মূসা (আঃ) এ দিনে রোজা রাখতেন।” তখন নবী ﷺবললেন, “তোমাদের চেয়ে আমি মূসার অধিক নিকটবর্তী। ফলে তিনি এ দিন রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।”[৩]

রাসূলﷺ এর এই নির্দেশের পর সবাই বাধ্যতামূলকভাবে আশুরা’র দিন সিয়াম পালন করতো। তখনো রামাদ্বানে সিয়াম রাখার বিধান নাযিল হয়নি। পরবর্তীতে আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেন,

“রামাদ্বান মাসই হল সে মাস, যে মাসে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা গণনা পূরণ করো এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ তা’আলার মহত্ত্ব বর্ণনা করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।” [সূরা বাকারা (২): ১৮৫]

আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী, এ আয়াতটি নাযিল হবার পর মুসলিমরা আশুরা’র সিয়ামকে বাধ্যতামূলক হিসেবে পালন করেনি। বরং তা ঐচ্ছিক হয়ে যায়।[৪]

■ সুন্নাহর মাধ্যমে সুন্নাহর নাসখ:

যখন রাসূলﷺএর কোনো নির্দেশ পরবর্তীতে তাঁর আরেকটি নির্দেশ দ্বারা বাতিল হয়ে যায়। যেমন, ইসলামের প্রথম দিকে কেউ রান্না করা খাবার খেলে রাসূলﷺ তাকে সালাত আদায়ের পূর্বে ওযু করার নির্দেশ দিতেন। কিন্তু পরবর্তীতে জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন, “আল্লাহর রাসূলﷺএর দুটি নির্দেশের শেষেরটিতে আগুনে পাকানো বস্তু খাবার পর ওযু না ভাঙ্গার কথা বলা হয়েছে।”[৫] অর্থাৎ রান্না করা খাবার খেলে পুনরায় ওযু করার প্রয়োজন নেই।

এছাড়াও নাসখ আরো বিভিন্ন প্রকারে হতে পারে। শুধু কুরআনের মধ্যেই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে নাসখ হতে পারে:

■ নতুন আইন দ্বারা পূর্বের আইনটি বাতিল হবার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট আয়াতের পাঠও কুরআন থেকে সরিয়ে ফেলা হয়. এ ধরনের নাসখের ঘটনা বিরল। আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন,

“ওহীসমূহের মধ্যে এ আইনটিও ছিলো যে, কোনো ধাত্রী কোনো শিশুকে দশবার দুধ পান করালে ঐ শিশুর সাথে ধাত্রী ও তার নিকটাত্মীয়দের বিয়ে হারাম হয়ে যায়, যেমনটি ঘটে থাকে আপন মায়ের নিকটাত্মীয়দের ক্ষেত্রে। তারপর এই আইনটির স্থান দখল করে পাঁচবার দুধ পান করানো সংক্রান্ত আইন- যা আল্লাহর রাসূলﷺ এর ইন্তেকালের অল্প কিছুদিন আগেও কুরআনের অন্যান্য আয়াতের সাথে পঠিত হতো।[৬]

■ আইনটি বলবৎ থাকে, শুধু আয়াতের তিলাওয়াত রহিত হয়ে যায়। পুর্বে কুরআনে বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যভিচারীদের পাথর মেরে হত্যা করা সংক্রান্ত আয়াত পঠিত হতো। উমার (রাঃ) সে আয়াতটি বর্ণনা করেছেন, “বৃদ্ধ নারী ও পুরুষ ব্যভিচার করলে তাদেরকে নিশ্চিতরূপে পাথর মারবে।”[৭]

এ আয়াতটি এখন আর কুরআনে নেই। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশেই তা কুরআন থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে আইনটি কিন্তু রহিত হয়নি। খোলাফায়ে রাশেদীনের সকলেই এই আইনটি প্রয়োগ করেছেন।[৮]

■ আয়াতের তিলাওয়াত বহাল থাকবে, শুধু আইন রহিত হয়ে যাবে। এই ধরনের নাসখের উদাহরণ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে নিম্নোক্ত আয়াতটি,

“আর যখন তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে, তখন স্ত্রীদের ঘর থেকে বের না করে এক বছর পর্যন্ত তাদের খরচের ব্যাপারে ওসিয়ত করে যাবে। অতঃপর যদি সে স্ত্রীরা নিজে থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে সে নারী যদি নিজের ব্যাপারে কোন উত্তম ব্যবস্থা করে, তবে তাতে তোমাদের উপর কোনো পাপ নেই। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী বিজ্ঞতাসম্পন্ন।” [সূরা বাকারা (২): ২৪০]

এ আয়াতটি পরবর্তীতে নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা বাতিল হয়,

“আর তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে এবং নিজেদের স্ত্রীদেরকে ছেড়ে যাবে, তখন সে স্ত্রীদের কর্তব্য হলো নিজেকে চার মাস দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়ে রাখা। তারপর যখন ইদ্দত পূর্ণ করে নেবে, তখন নিজের ব্যাপারে নীতিসঙ্গত ব্যবস্থা নিলে কোনো পাপ নেই। আর তোমাদের যাবতীয় কাজের ব্যাপারেই আল্লাহর অবগতি রয়েছে।” [সূরাবাকারা (২): ২৩৪] [৯]

এখানে উল্লেখ্য যে, প্রত্যেক প্রকারের নাসখই স্বয়ং আল্লাহ তা’আলার অনুমোদনেই হয়ে থাকে।

নাসখ কেন করা হয়? এর পিছনে কি কোনো প্রজ্ঞা রয়েছে?

শায়খ রাহমাতুল্লাহ কীরানবী (রহঃ) তাঁর অনবদ্য বই ইযহারুল হক-এ নাসখের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেন,

“আল্লাহ জানতেন যে, এই বিধানটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাঁর বান্দাদের মধ্যে প্রচলিত থাকবে এবং এরপর তা স্থগিত হয়ে যাবে। যখন তাঁর জানা সময়টি এসে গেলো, তখন তিনি নতুন বিধান প্রেরণ করলেন। এই নতুন বিধানের মাধ্যমে তিনি পূর্বতন বিধানের আংশিক বা সামগ্রিক পরিবর্তন সাধন করতেন। প্রকৃতপক্ষে, এ হলো পূর্বতন বিধানের কার্যকারিতার সময়সীমা জানিয়ে দেওয়া। তবে যেহেতু আগের বিধানটি দেওয়ার সময় এর সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি, সেহেতু নতুন বিধানটির আগমনকে আমরা আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে বাহ্যত ‘পরিবর্তন’ বলে মনে করি।

আল্লাহর সাথে কোনো সৃষ্টির তুলনা হয় না। তাই তুলনার জন্য নয়, শুধু বোঝার জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। আপনি আপনার একজন কর্মচারীকে একটি কর্মের দায়িত্ব প্রদান করলেন। আপনি তার অবস্থা জানেন এবং আপনার মনের মধ্যে সিদ্ধান্ত রয়েছে যে, এক বছর পর্যন্ত সে উক্ত কর্মে নিয়োজিত থাকবে। এরপর আপনি তাকে অন্য কর্মে নিয়োগ করবেন। কিন্তু আপনার এই সিদ্ধান্ত আপনি কারো কাছে প্রকাশ করেননি। যখন নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলো, তখন আপনি আপনার পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুসারে তাকে অন্য কর্মে নিয়োজিত করলেন। এই বিষয়টি উক্ত কর্মচারীর নিকট ‘রহিতকরণ’ বলে গণ্য। অনুরূপভাবে, অন্য সকল মানুষ যাদের নিকট আপনি আপনার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেননি, তারাও বিষয়টিকে ‘পরিবর্তন’ বলে গণ্য করবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এবং আপনার কাছে বিষয়টি ‘পরিবর্তন’ নয়।

এরূপ রহিতকরণ যুক্তি বা বিবেকের দৃষ্টিতে অসম্ভব না। ঈশ্বরের ক্ষেত্রেও তা তাঁর মহত্ত্ব বা মর্যাদার পরিপন্থী নয়।

পাঠক কি দেখেন না যে, ভালো ডাক্তার রোগীর অবস্থার প্রেক্ষিতে তার ঔষধ পরিবর্তন করেন? তিনি সর্বদা রোগীর জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা প্রদানের চেষ্টা করেন। কেউই তাঁর এই বিধানকে অজ্ঞতা বা মূর্খতা বলে গণ্য করেন না। কাজেই অনাদি-অনন্ত জ্ঞানের অধিকারী সর্বজ্ঞানী মহান স্রষ্টার এইরূপ প্রজ্ঞাময় পরিবর্তনকে আমরা কীভাবে অজ্ঞতা বলে অপব্যাখ্যা দিতে পারি?”[১০]

ড. বিলাল ফিলিপ্স তাঁর বইয়ে নাসখের তিনটি মৌলিক কারণ উল্লেখ করেছেন:

■ আসমানী আইনসমূহকে ধীরে ধীরে পূর্ণতার স্তরে নিয়ে যাওয়া।

■ ঈমানদারদের পরীক্ষা করা। কখনো তাদের একটি আইন মানতে বলা হয় আর কিছু কিছু জায়গায় তাদের সে আইন মানতে বারণ করা হয়। এভাবে পরীক্ষা করা হয়, ঈমানদাররা সবসময় আল্লাহর আইন মানতে কতটুকু প্রস্তুত।

■ কখনো কঠিন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ঈমানদারদের পুরষ্কার অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হয়। কারণ- কাঠিন্য যত বেশি, পুরস্কারও বেশি। আবার সহজ আইন প্রণয়ন করে ঈমানদারদের একটু বিশ্রাম প্রদান করে এ বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, আল্লাহ মূলতঃ তাদের কল্যাণই কামনা করেন। যেমন, প্রথম দিকে রাতের নামাজ আদায় করার পর পরের দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার ও সহবাস নিষিদ্ধ ছিলো। এই আইনটি কিছুটা কঠিন। পরবর্তীতে এই আইন রহিত করে রাতের বেলা পানাহার ও স্ত্রীর নিকট গমন করাকে বৈধ করা হয়।

যেসব বিষয় রহিত হয় না

রহিত হবার বিষয়টা নিয়ে তখনই আপত্তি তোলা যেতে পারে, যখন একই কিতাবের কোনো কাহিনী বা ঘটনা, ভবিষ্যৎবাণী কিংবা বিভিন্ন উপমা সেই কিতাবেই রহিত করা হয়। আমরা মানুষেরা এটা প্রায়ই করি। নিজেদের লেখা বইয়ে কোনো তথ্যের ভুল থাকলে তা সংশোধন করি। কিন্তু স্রষ্টার পক্ষে ভুল তথ্য দেওয়া অশোভন। কুরআন তথ্যের ও ভবিষ্যৎবাণীর রহিতকরণ না করে হুকুমের রহিতকরণ করে আমাদের আরো পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে এটা মানুষের তৈরি কোনো বই নয়। এ কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে যিনি তাঁর বান্দাদের সুবিধা-অসুবিধার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখেন।

অনেকে দাবী করেন, বাইবেলের নতুন ও পুরাতন নিয়মের কাহিনী কুরআন দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। ব্যাপারটা মোটেও সেরকম নয়। তাছাড়া বাইবেলের মধ্যে অনেক মিথ্যা কাহিনী রয়েছে। যেমন,

■ লূত (আঃ) মদ খেয়ে মাতাল হন এবং তাঁর দুই মেয়ের সাথে পরপর দুই রাতে ব্যভিচারে লিপ্ত হন। ফলে তাঁর দুই মেয়ে পিতার দ্বারা গর্ভবতী হয়।[১২]

■ দাউদ (আঃ) দূর থেকে উরিয়র স্ত্রী বাতসেবাকে নগ্ন অবস্থায় গোসল করতে দেখে তাকে প্রাসাদে ডেকে পাঠান এবং বাতসেবার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন। ফলে বাতসেবা গর্ভবতী হয়। বিপদ বুঝতে পেরে, তিনি সেনাপতিকে পরামর্শ দেন কৌশলে যুদ্ধের মাঠে উরিয়কে হত্যা করার জন্য। এভাবে উরিয় নিহত হন আর দাউদ (আঃ) বাতসেবাকে ভোগ করেন।[১৩]

■ সুলাইমান (আঃ) শেষ বয়সে মেয়েলোকের পাল্লায় পরে ধর্মত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যান। তিনি মূর্তিপূজা শুরু করেন।[১৪]

■ হারূন (আঃ) একটি বাছুরের মূর্তি তৈরি করেন এবং এর উপাসনা করা শুরু করেন। শুধু তাই না, তিনি বনী ইসরাইলকে এই বাছুরকে উপাসনা করার নির্দেশও দেন।[১৫]

আমরা বিশ্বাস করি, সকল নবীই নিষ্পাপ। তাই এই কাহিনীগুলো মিথ্যা ও বাতিল। আমরা বলি না যে, এগুলো রহিত। রহিত হতে হলে তো অবশ্যই এগুলোতে একটু হলেও সত্যতা থাকতে হবে।

রহিতকরণ কি কেবল কুরআনেই আছে?

আগেই উল্লেখ করেছি, ইহুদি ও খ্রীষ্টানরা এটা বিশ্বাস করতে পারে না যে, স্রষ্টার অভিধানে ‘রহিত’ শব্দটি থাকতে পারে। যদিও তাদের বাইবেলে প্রচুর ‘রহিতকরণ’ এর ঘটনা দেখতে পাওয়া যায়। কয়েকটি উল্লেখ করছিঃ

■ বিকৃত বাইবেল অনুসারে, ইব্রাহীম (আঃ) এর স্ত্রী সারা তাঁর সৎ-বোন ছিলেন। যার অর্থ, ইব্রাহীম (আঃ) এর জন্য নিজের সৎ-বোনকে বিয়ে করা বৈধ ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাই, পুরাতন নিয়মে সৎ-বোনকে বিয়ে করার বিধান নিষিদ্ধ করা হয়। [১৬]

■ বিকৃত বাইবেল অনুসারে, মূসা (আঃ) এর শরীয়াতে, যে কোনো কারণে একজন স্বামী তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন। স্ত্রী ঘর থেকে বের হয়ে গেলে অন্য পুরুষ তাকে বিয়ে করতে পারেন। যিশুখ্রিষ্ট ব্যভিচারের কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া রহিত করেন। আর যে এমন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করবে, তাকেও ব্যভিচারী হিসেবে সাব্যস্ত করেন। [১৭]

■ বিকৃত বাইবেল অনুসারে, শনিবার(সাবাত)-কে সম্মান করে সকল প্রকার কাজ থেকে বিরত থাকা মূসা (আঃ) এর ব্যবস্থায় একটি অলঙ্ঘনীয় চিরস্থায়ী বিধান। কিন্তু বাইবেলেই আমরা দেখতে পাই, যিশুখ্রীষ্ট বারবার এই আইন ভঙ্গ করছেন।[১৮] বর্তমানেও খৃষ্টানরা বাইবেলের এই বিধান পালন করে না। অথচ তাদের অনেক স্কলারই দাবী করে, পুরো বাইবেলই ঈশ্বরপ্রদত্ত আর সেখানে কোনো রহিত হবার বিধান নেই।

তারা কি জানে, এই বাইবেল অনুসারেই চিরস্থায়ী ‘সাবাত’ ভঙ্গ করার কারণে তাদের সবার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিৎ? কারণ, বাইবেল পড়লে জানা যায়, শনিবারের দিনে শুধু কাঠ কুড়ানোর অপরাধে এক লোককে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা হয়েছিলো।[১৯]

■ বিকৃত ইঞ্জিলেই এক বিধান কর্তৃক আরেক বিধান রহিত হবার প্রমাণ মেলে। মথি লিখিত সুসমাচারে যিশু তাঁর শিষ্যদেরকে জেন্টাইল (যারা ইহুদী নয়)-দের কাছে যেতে নিষেধ করেন। তিনি আরো বলেন, বনী-ইসরাইল ছাড়া তিনি আর কারো কাছে প্রেরিত হননি। জেন্টাইলদের তিনি ‘কুকুর’ বলে সম্বোধন করেছেন। আবার অন্য সুসমাচার পড়লে জানা যায়, সেই তিনিই সকল সৃষ্টির নিকট তাঁর সুসমাচারগুলো প্রচার করতে বলছেন। [২০]

■ “নিশ্চয়ই জান্নাত রয়েছে তরবারির ছায়াতলে” – রাসূলﷺ এর এই হাদিসকে অনেক খ্রীষ্টান স্কলার ব্যঙ্গ করে থাকেন। অথচ বাইবেল অনুসারে, যিশু খ্রীষ্ট বলেছেন, “এ কথা ভেবো না যে আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে এসেছি৷ আমি শান্তি দিতে আসিনি, বরং তরবারি দিতে এসেছি৷”

আবার সেই তিনিই ইহুদিদের হাতে বন্দী হবার প্রাক্কালে তাঁর সাথী পিতরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “যারা তরবারি চালায়, তারা তরবারিতেই মারা পড়ে।” [২১]

সুতরাং, শুধু কুরআনেই নয় বরং পূর্ববর্তী কিতাবগুলো বিকৃত হওয়ার পরেও তাতে অনেকগুলো রহিত বিধান রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, যে চোখ দিয়ে ইহুদি ও খ্রীষ্টানরা কুরআনকে দেখে, সেই একই চোখে তারা বাইবেলকে দেখে না।

আমাদের বর্তমান প্রজন্মের একটি মূল সমস্যা হচ্ছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলﷺ এর প্রতি ঈমান আনার দাবী করার পরেও ইসলাম বিদ্বেষীদের কিছু সাধারণ ছোঁড়া প্রশ্নে আমরা সংশয়বাদী হয়ে যাই। আমরা দাবী করি, আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে আমাদের আকল ব্যবহার করতে বলেছেন। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে, আল্লাহ আমাদেরকে আকল ব্যবহার করতে বলেছেন, চিন্তা করতে বলেছেন। কিন্তু তিনি আমাদেরকে আমাদের আকলের পূজা করতে বলেননি। আমরা অবশ্যই সত্যকে জানার চেষ্টা করব। কিন্তু যিনি মহাবিশ্বের সবকিছু জানেন, তাঁর জ্ঞানের সাথে আমাদের আকলের সবকিছু সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে- এমনটা ভাবাই বা কতটুকু বুদ্ধিমানের কাজ?

শান্তি তাদের উপর বর্ষিত হোক যারা হেদায়েতের অনুসরণ করে।

“আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন, তিনিই সে সম্পর্কে ভালো জানেন। যখন আমি এক আয়াতের স্থলে অন্য আয়াত উপস্থিত করি, তখন এরা বলে, ‘তুমি নিজেই এ কুরআনের রচয়িতা;’ আসলে এদের অধিকাংশই প্রকৃত সত্য জানে না।” [সূরা নাহল (১৬): ১০১]

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থাবলী

[১] আবু দাউদ, হাদীস নং: ৫৪০

[২] আল ইতকান, জালালুদ্দিন সূয়ুতী- খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা: ৫৯

[৩] সহীহবুখারী, হাদীসনং: ১৮৬৫

[৪] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৪৯৯-২৫০৩

[৫] আবু দাউদ, হাদীস নং: ১৯২

[৬] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৩৪২১

[৭] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৪১৯৪

[৮] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৪১৯১-৪২২৫

[৯] সূরা বাকারার ২৪০ নং আয়াতটি ২৩০ নং আয়াত দ্বারা রহিত হতে দেখে অনেকে ভুল বুঝতে পারেন। ক্রমধারায় ২৪০ নং আয়াত পিছিয়ে তবে আয়াতটি ২৩০ নং আয়াতের পূর্বে নাযিল হয়েছিলো।

[১০] ইযহারুল হক– আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী, পৃষ্ঠা: ৪৬৭-৪৬৮

[১১] কুরআন বোঝার মূলনীতি– ড.বিলাল ফিলিপ্স, পৃষ্ঠা: ২২৮-২২৯

[১২] Holy Bible, Genesis- chapter:19, verse:30-38

[১৩] Holy Bible, 2 Samuel- chapter:1, verse: 1-27

[১৪] Holy Bible, 1 kings- chapter 11, verse: 1-13

[১৫] Holy Bible, Exodus- chapter 32, verse: 1-35

[১৬] Holy Bible, Genesis- chapter 20, verse-12 কে রহিত করেছে Leviticus- chapter 18, verse 9

[১৭] Holy Bible, Deuteronomy- chapter 24, verse:1-2 কে রহিত করেছে Gospel of Matthew, Chapter 5, verse: 31-32

[১৮] Holy Bible, Exodus- chapter 35, verse: 2-3 কে রহিত করেছে Gospel of John-chapter 5, verse 16

[১৯] Holy Bible, Numbers-chapter 15, verse: 32-36

[২০] Holy Bible, Gospel of Matthew- chapter 15, verse: 24-26 কে রহিত করেছে Gospel of Mark- chapter 16

[২১]Holy Bible, Gospel of Matthew- chapter 10, verse: 34 কে রহিত করেছে Gospel of Matthew- chapter 26, verse: 52

১। ইযহারুল হক- আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী

২। কুরআন বোঝার মূলনীতি- ড.বিলাল ফিলিপ্স

শুরু হোক আপনার অ্যারাবিক শেখার যাত্রা।  ০১ ডিসেম্বর ২০১৭ এ শুরু হতে যাচ্ছে দুই বছর মেয়াদি অনলাইন ভিত্তিক আরবি ভাষা শিক্ষা কোর্স IIRT Arabic Intensive প্রোগ্রামের Spring-2018 সেমিস্টারের রেজিস্ট্রেশন। বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন: www.arabic.iirt.info

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.