ইব্রাহীম (আলাইহিসসালাম) ও হাজ্জ

হাজ্জের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ইব্রাহীম (আঃ) এর জীবনী। হাজ্জের যাবতীয় কর্মকাণ্ড তাঁর সুন্নাত ঘিরে আবর্তিত। তাই তাঁর সম্পর্কে কিছুটা না জানলে হাজ্জের মাহাত্ম্য পরিপূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়। ইব্রাহীম (আঃ)-কে আল্লাহ্‌র খলিল অর্থাৎ আল্লাহ্‌র বন্ধু খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে। যিনি জীবদ্দশায় বহু কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং প্রতিটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন অবিশ্বাস্য সফলতার সাথে। তাঁর নাম কুরআন মাজিদের পঁচিশটি সূরাহতে মোট তিয়াত্তর বার এসেছে, ‘ইব্রাহীম’ নামের একটি সম্পূর্ণ সূরাহ নাযিল হয়েছে।

রহমানুর রহিম তাঁকে এতটাই সম্মানিত করেছেন যে, তাঁর পরবর্তীতে যত নবী ও রাসুল এ ধরায় আগমন করেছেন, তাঁদের সবাইকেই ইব্রাহীম (আঃ) এর বংশের করেছেন, অর্থাৎ তাঁরা সকলেই উনার উত্তরসূরি। এমনকি আমাদের মুহাম্মাদ ﷺও উনার জ্যেষ্ঠ সন্তান ইসমাঈল (আলাইহিসসালাম) এর বংশধর।

IIRT Arabic Intensive Registration

আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগের কথা। বর্তমান ইরাকের এক স্থানে আজর নামের এক ব্যক্তি বাস করতো, যার পেশা ছিল মূর্তি তৈরি করা। সে সময়ে আজরের জাতি মূর্তিপূজা এবং প্রচণ্ড শির্কের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলো। তাদের নানা রকমের মূর্তি ছিলো। ধনীরা সামর্থ্য অনুযায়ী বড় মূর্তি খরিদ করতো, আর গরীবরা সামর্থ্য কম থাকার হেতু অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির খরিদ করতো। আবার বিত্তহীন জনগণ যখন বিশাল বিপদে আপতিত হতো, তখন বিত্তবানদের নিকট হতে বিশালাকারের মূর্তি কিছু দিনের জন্য কর্জ করে নিয়ে আসতো। কী অদ্ভুত ছিলো তাদের চিন্তাধারা!!

তাওহীদ বা একত্ববাদের ধারণা তাদের অন্তরে চাপা পড়ে গিয়েছিলো শির্কের নিকষ অন্ধকারে। কিন্তু আজরের সাত বছরের পুত্রের নিকট এ ধরণের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মবিশ্বাস বড়ই অবান্তর বোধ হতো। তার বালক মস্তিষ্কে কিছুতেই প্রবেশ করতো না, নিজের হাতে তৈরি পুতুল কী করে ভাগ্যবিধাতা হতে পারে!!! যে মাটির পুতুল অন্যের হাতে সৃষ্ট এবং নিজের ভালো মন্দ করার ক্ষমতা রাখে না, সে কীভাবে এই সৃষ্টিকুলের সাহায্যে আসতে পারে?? বালকের এ ধরণের ধ্যানধারণা তার জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর কাছে অতিশয়-অদ্ভুত পরিগণিত হতো।

একদিন বালক ইব্রাহীম তার পিতাকে জিজ্ঞেস করলো, “তোমরা কেন এমন জিনিসের ইবাদাত কর, যেসব জিনিস নিজেরাই অন্যের হাতে সৃষ্ট, এদের তো ভালো বা মন্দ কোনোকিছুই করার ক্ষমতা নেই!!” বর্তমান যুগে যারা হারাম অর্থ উপার্জন করে, যেমন মদ বা তামাক বিক্রয় করে, হারাম ব্যবসা করে বা সুদের সাথে জড়িত থাকে, তাদের অর্থ উপার্জনের বৈধতা নিয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়, তাহলে কি তারা আনন্দের সাথে সেই প্রশ্নের জবাব দেবে, নাকি অসন্তুষ্ট হবে এমনতর জিজ্ঞাসার জন্য!! অবশ্যই খুশি হবে না, এ ব্যাপারে নিশ্চিত। আজরও মোটেও আনন্দিত হলো না পুত্রের এই প্রশ্ন শুনে। কারণ, একে তো সে এসব মূর্তির ইবাদাত করতো, তার ওপর মূর্তি নির্মাণের মাধ্যমেই জীবিকা অর্জন করতো।

রাগান্বিত পিতা কঠোরভাবে ছেলেকে সাবধান করে দিলো যেন এধরণের প্রশ্ন সে আর ভুলেও না করে। তাদের জাতির লোকজনকে যখন একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হলো তখন তারা জবাব দিলো যে, তাদের পূর্বপুরুষদের এসব বস্তুর ইবাদাত করতে দেখেছে, তাই তারাও এগুলোর ইবাদাত করে!! ইব্রাহীম তখন তার বাবাকে বললো, “হে পিতা, শয়তানের ইবাদাত করবেন না। শয়তান তো অবশ্যই মহান প্রতিপালকের চরম অবাধ্য। আমি অত্যন্ত ভয় করছি যে, পরম করুণাময় আপনাদের কঠিন শাস্তি দেবেন।” আপন বাবা মা-কে কে না ভালবাসে? তাই ইব্রাহীমের কচি-মন পিতার আসন্ন আযাবের কথা চিন্তা করে শঙ্কায় বিভোর হয়ে গেলো।

আল্লাহ্‌ বলেছেন, যখন কেউ আল্লাহ্‌র সাথে শরীক করে, তখন তিনি তাকে শাস্তি দেন। একমাত্র শির্কের কোনো মাফ নেই, যদি না সে মৃত্যুর পূর্বে খাঁটি অন্তঃকরণে তওবা করে। এছাড়া অন্য যেকোনো গুনাহ আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন (পার্থিব কষ্ট বা সাময়িক জাহান্নাম বাস করানোর মাধ্যমে – সম্পাদক)।

আজর পুত্র আরো বলতে থাকে, “আমি তাঁর ইবাদাত করি যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন ও আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন, আমাকে খাদ্য দান করেন, তৃষ্ণা নিবারণ করেন, অসুস্থতার আরোগ্য দান করেন, আমার মৃত্যু দেবেন ও আবার পুনরুত্থিত করবেন। এবং আমি তাঁর ইবাদাত করি, যার উপর আশা রাখি, বিচার-দিবসে ক্ষমা পাবার। অর্থাৎ পুনরুত্থানের পর, যে সুমহান স্বত্ত্বা আমাকে ক্ষমা করার শক্তি রাখেন, শুধুমাত্র তাঁর উদ্দেশ্যে আমি জমিনে মাথা ঠেকাই। আর কারো সামনে মাথা নিচু করি না।” এবং তখন সে আল্লাহ্‌র নিকট প্রার্থনা করে, আল্লাহ্‌ যেন তাকে ন্যায়-অন্যায় প্রভেদ করার শক্তি দেন ও সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করেন।

ইব্রাহীম অল্প বয়স থেকেই তার জাতিকে বার বার আহ্বান করতে লাগলো, কোনো মৃত ব্যক্তি বা মাটির পুতুলের মাধ্যমে নয়, বরং তারা যেন সরাসরি শুধু মাত্র এক আল্লাহ্‌র ইবাদাত করে। কারণ তিনি সর্বশক্তিমান, তিনি আমাদের রিযিক দেন, তিনি ছাড়া আর কোন স্বত্বার বিন্দুমাত্র শক্তি নেই এক ফোঁটা রিযিক দেবার।

কিন্তু সেই জাতির কেউ তখন সৎকর্মপরায়ণ  ছিলো না। একজন ব্যক্তিও তার আহ্বানে সাড়া দিলো না। তারা কাঠের টুকরা, মাটির টুকরার পূজা করতেই থাকলো, এমনকি মৃত ব্যক্তিদের কাছেও তারা সাহায্য প্রার্থনা করতো। আমাদের দেশের মাজার পূজারীদের মতো। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের মৃত্যুই ঠেকাতে পারেনি, নিজের লাশ দাফন ও সৎকারের জন্যও যাকে জীবিতদের উপর নির্ভর করতে হয়, সে কী করে অন্যের উপকার করবে, তা ছোট্ট ছেলেটি অনুধাবন করতে পারলেও, শির্ক ও আত্মাভিমানে নিমগ্ন এ জাতি অনুভব করতে পারলো না।

এভাবে কয়েক বছর অতিক্রান্ত হলো। কিশোর ইব্রাহীম ততদিনে পূর্ণ যুবকে পরিণত হয়েছে এবং একা একা তাওহীদের পক্ষে পুরো জাতির বিরুদ্ধে লড়তে লাগলো। সে এক পরিকল্পনা করলো, সবার অলক্ষে গিয়ে মূর্তিগুলো একে একে চূর্ণ বিচূর্ণ করে আসবে। যেই ভাবনা সেই কাজ। আজরের বিশাল এক গুদাম ঘর ছিলো, যেখানে সে ছোট-বড় সকল আকৃতির মূর্তি বিক্রয়ের আগে জমা করে রাখতো। বালক সেখানে গিয়ে সব মূর্তি ভেঙে ফেলে। তারপর সবচেয়ে বিশাল কানওয়ালা মূর্তির কানে একটি কুড়াল রেখে সন্তর্পণে ঘরে ফিরে আসলো। অপেক্ষা করতে লাগলো কী হয় দেখার জন্য।

অল্প সময়েই এই বিধ্বংসী কাণ্ড উন্মোচিত হয়ে পড়লো, ক্রোশে ফেটে পড়লো লোকজন। তারা আক্রোশে চিৎকার করতে লাগলো, কার এত বড় সাহস হয়েছে তাদের সব ইলাহদের চুরমার করে ফেলতে!! তারা বললো, “আমরা শুনেছি, ইব্রাহীম নামের একজন মূর্তিদের নিয়ে বাজে কথা বলতো।” সুতরাং অতিসত্ত্বর ইব্রাহীমকে তলব করে সবাই তাকে জেরা করতে লাগলো এই মূর্তি কে ভেঙেছে তা বলার জন্য। ইব্রাহীম তখন বললো, যে মূর্তির উপর কুঠার ঝোলানো আছে, তাকেই কেন জিজ্ঞেস করা হয় না এ ব্যাপারে। তখন বিরক্ত হয়ে লোকেরা বললো, মূর্তি কি কথা বলতে পারে!! তাকে জিজ্ঞেস করে লাভ কি!! সুবহানআল্লাহ্‌!

তারা সকলেই বুঝতে পারলো এ কর্ম ইব্রাহীম ছাড়া আর কারো নয়। তাঁকে গ্রেফতার করা হলো এবং আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যুর দণ্ড দেওয়া হলো। যেন পরবর্তীতে আর কেউ এমন দুঃসাহসিক কাণ্ড না করতে পারে। সমগ্র জাতি তাঁর বিপক্ষে ছিলো। তাঁর পাশে কেউ ছিলো না, তাঁর জন্মদাতা বাবাও নয়। ইব্রাহীম (আঃ) এর সর্ব শক্তিমান আল্লাহ্‌র উপর অগাধ বিশ্বাস ছিলো। তিনি বললেন, “আমার রক্ষাকারী হিসেবে আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে রক্ষা করবেন।” তিনি আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কারো কাছে সাহায্য চাইলেন না।

কথিত আছে, বহুদিন ব্যয় করে ইব্রাহীমকে পোড়াবার জন্য বিরাটাকার এক গর্ত তৈরি করে তাতে অগ্নিকুণ্ড প্রজ্বলিত করা হয়েছিলো। সেই অগ্নিকুণ্ড এত ভয়ঙ্কর উত্তপ্ত ছিলো যে, তার উপর দিয়ে পাখি উড়ে গেলে সেই পাখিও দগ্ধ হয়ে আগুনে পতিত হতো। জনমানব কেউ সেই আগুনের নিকটে যেতে পারতো না দগ্ধ হবার আশঙ্কায়। তাই তারা দড়ি দিয়ে বেঁধে অনেক দূর থেকে ইব্রাহীমকে বিভীষিকাময় আগুনের গহ্বরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। এসময় তিনি একটি দু’আ করলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দু’আর কথা উল্লেখ করেছেন, যা সহীহ বুখারিতে সংকলিত হয়েছে। তিনি বললেন, “হাসবুনুল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল”, “Allah is enough for me, and He is the best disposer of affairs” (“আল্লাহ্‌ই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্ম বিধায়ক”)।

সুমহান আল্লাহ্‌র হুকুমের বিরুদ্ধে যাবার সাধ্য কারো নেই। তিনি আগুনের মাঝে সিঁড়ি তৈরি করে দিলেন, এবং ইব্রাহীম জনগণের বিস্ফোরিত দৃষ্টির সম্মুখে সিঁড়ি বেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে অগ্নিকুণ্ডের মাঝে নেমে গেলেন। এই আগুনের মালিকও তো আল্লাহ্‌ই। তিনি নির্ধারণ করে দিয়েছেন আগুনের ধর্ম উত্তপ্ত হওয়া, অতএব আগুনের ধর্ম তিনি বদলেও ফেলতে পারেন। আল্লাহ্‌ আগুনকে হুকুম করলেন যেন তা ইব্রাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ আগুন তার মালিকের ভালোবাসার বান্দার জন্য প্রশান্তিদায়ক হয়ে গেলো ও তাঁর শরীরের বন্ধন খুলে গেলো।

পরবর্তী জীবনে ইব্রাহীম (আঃ) বলেছিলেন যে, তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহূর্ত ছিলো এই অগ্নিকুণ্ডের মধ্যখানে থাকার সময়টুকু। তাঁর শাস্তি দেখতে যারা জড় হয়েছিলো, তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ করে দিয়ে ধীরে সুস্থে ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ আগুনের ভেতর থেকে বের হয়ে এলেন। এই দৃশ্য দেখার পরও দুর্ভাগা জাতি ঈমান আনলো না, একজন বালক ব্যতীত। তিনি হলেন ইব্রাহীমের ভাইয়ের ছেলে লূত (আলাইহিসসালাম)। তখনো লূত নবুয়ত পাননি।

এই ঘটনার পর ইব্রাহীম ও লূত (আঃ) হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লেন। কারণ যারা আল্লাহ্‌র এত বড় নিদর্শন দেখার পরও ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করতে পারলো না, তাদের সঙ্গে বসবাস করার কোনো অর্থ উনারা খুঁজে পেলেন না।

ইব্রাহীম (আঃ) এর বহু কাহিনী কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত আছে। তেমনি কিছু কাহিনীর উল্লেখ না করে পারছি না। বাদশাহ নমরুদ যখন অগ্নিকুণ্ডের ঘটনা সম্পর্কে জ্ঞাত হলো, তখন ইব্রাহীমকে ডেকে পাঠালো। জিজ্ঞেস করলো, “ওহে ইব্রাহীম! তুমি কাকে রব হিসাবে বিশ্বাস কর?” ইব্রাহীম জবাব দিলেন, “যিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন, তাঁকেই রব হিসেবে মানি।” রাজা হাস্যোচ্ছলে পাল্টা জবাব দিলো, “আমিই তো জীবন দিতে পারি ও মৃত্যু দিতে পারি।” এরপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন আসামীকে নিয়ে এসে একজনকে মুক্ত করে দেওয়া হলো ও অন্যজনের দণ্ড অব্যাহত রেখে বললো, “দেখো, আমি এদের একজনকে মৃত্যু দিলাম, অন্যজনকে জীবন দিলাম।” তখন ইব্রাহীম বললেন, “আমি এক আল্লাহ্‌র ইবাদাত করি, যিনি সূর্য পূর্বদিকে উদিত করেন। আপনি যদি একে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করতে পারেন, তাহলে আমি আপনার ইবাদাত করবো।” নমরুদ এবার বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো, আর কোনো উত্তর সরলো না তার মুখে।

ইব্রাহীম (আঃ) হিজরত চালু রাখলেন। ইতোমধ্যে বিবি সারাহর সাথে তাঁর বিবাহ হয়েছে এবং বিবিও ইসলামের পথে তাঁর সাথে শরীক হয়েছেন। এক পর্যায়ে তাঁরা আল্লাহ্‌র হুকুমে শাম দেশে রওনা হলেন ও স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে জেরুজালেমে বাস করা শুরু করলেন। বর্তমান সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন ও জর্ডান ইত্যাদি দেশ নিয়ে তৎকালীন শাম দেশ গঠিত ছিলো।

শাম দেশে একবার ভয়াবহ খরা হয়। তখন ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে মিশর গমন করেন। মিশরে সে সময় একজন অত্যাচারী শাসক শাসন করতো। রাজার চরেরা রাজার কাছে সংবাদ নিয়ে যায় একজন বিদেশি অপূর্ব সুন্দরী একজন রমণীকে নিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেছেন। এদের খুব জঘন্য অভ্যাস ছিলো। কোন মহিলাকে যদি তাদের পছন্দ হতো, তাহলে তার স্বামীকে মেরে ফেলে মহিলাটিকে ভোগ দখল করতো। তাই বিবি সারাকে যখন তারা ছিনিয়ে নিতে আসলো, তখন ইব্রাহীম (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলো, “এই মহিলা তোমার কী হয়?” উনি কৌশলের সাথে জবাব দিলেন, “আমার দ্বীনি বোন হয়।” ইসলামে বিশ্বাসী সকলেই দ্বীনি ভাই-বোন, তাই উনার কথাটা মিথ্যা ছিলো না। তখন তারা ইব্রাহীমকে ছেড়ে দিয়ে শুধু সারাকে নিয়ে রাজার কাছে চলে গেলো।

রাজপ্রাসাদের মহিলাগণ বিবি সারাকে সুন্দর রূপে সাজিয়ে রাজার কক্ষে প্রেরণ করলো। ইব্রাহীম-পত্নীর মনের অবস্থা তখন কেমন ছিলো, তা আমাদের জন্য কল্পনা করাও দুষ্কর। উনি কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতে লাগলেন এ নোংরা পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাবার জন্য। আল্লাহ্‌র কাছে বলতে লাগলেন, “ও আল্লাহ্‌! আমি শুধু আপনার ইবাদাত করি, আমি নিজেকে সবসময় সম্পূর্ণ পবিত্র রেখেছি আমার স্বামীর জন্য। আপনি আমাকে রক্ষা করুন।”

যখন রাজা সারাহকে স্পর্শ করতে উদ্যত হলো, সারাহ দু’আ করলেন। রাজার হাত বরফের মতো জমে গেলো। তখন রাজা তাঁকে আকুতি জানালো, “তোমার রবের কাছে দু’আ কর আমাকে যেন ঠিক করে দেন, তাহলে তোমাকে মুক্ত করে দেবো।” তিনি দু’আ করার সাথে সাথে রাজার হাত সাধারণ অবস্থায় ফেরত আসলো। তখন দুরাচারী শাসক আবার সারাহর দিকে হাত বাড়ালো, সারাহ আল্লাহ্‌র কাছে দু’আ করলেন। রাজার হাত আবার জমে গেলো। এভাবে একই ঘটনার পরপর তিনবার পুনরাবৃত্তি হলো।

কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, সারাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে তার পা কাঁপতে থাকে। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাতে বলা আছে, রাজা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না, তার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে। আর স্বপ্নে দেখে এই মহিলাকে মুক্তি না দিলে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। যা-ই হোক, কিছুতেই সারাহকে স্পর্শ করতে না পেরে মিশরের এই স্বৈরাচারী শাসক বাধ্য হয় তাঁকে মুক্ত করে দিতে। মুক্ত করার সাথে তাঁকে হাজেরা নামের এক দাসী উপঢৌকন রূপে প্রদান করা হয়। বেশ কিছু বর্ণনায় আছে, হাজেরা কোনো দাসী ছিলেন না। একজন সচ্চরিত্রবানের কন্যা ছিলেন। আবার অনেকে বলেন হাজেরা এই রাজারই কন্যা ছিলেন। এক মাত্র আল্লাহ্‌ই জানেন আসল সত্য।

অনেক বছর মিশরে বসবাস করার পর তাঁরা আবার শামে প্রত্যাগমন করেন। ইব্রাহীম (আঃ) ও বিবি সারার বিয়ের অনেক বছর হবার পরও তাদের কোনো সন্তান ছিলো না। তাই সারা তাঁর স্বামীর সাথে বিবি হাজেরাকে বিবাহ দেন ও তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় এক নেককার পুত্র, যার নাম হলো ইসমাঈল (আঃ)। বহুদিন সন্তানের আকাঙ্ক্ষার পর ইসমাঈলকে পেয়ে ইব্রাহীমের জীবনে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। তখন আল্লাহ্‌ তাঁর প্রিয় পাত্র ইব্রাহীমকে এক কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেন। তাঁকে আদেশ করেন, শিশু পুত্র সহ স্ত্রী হাজেরাকে মক্কায় রেখে আসতে।

আল্লাহ্‌র উপর তাঁর তাওয়াককুলের পরিমাণ সাধারণ মানুষের জন্য কল্পনা করাও দূরূহ। নিজের সন্তানকে কে না ভালবাসে! সন্তানের গায়ে কোনো প্রকার আঁচড় লাগলেও বাবা-মার তীব্র যন্ত্রণা হয়। স্বেচ্ছায় কেউ নিজের প্রাণের ধনকে ক্ষুদাতিক্ষুদ্র কষ্টে ফেলার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবে না। আর অনেক অনেক দু’আর পর যখন কেউ সন্তান লাভ করে, তার হৃদয়ের আবেগ-উচ্ছ্বাসের কথা সহজেই অনুমেয়। যখন সেই সন্তানকে শত শত মাইল দূরে জনমানবহীন, রুক্ষ পরিবেশে রেখে আসার হুকুম দেওয়া হয়েছিলো, তখন ইব্রাহীমের মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল, সেই তীব্র বেদনার কথা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? স্ত্রীকে আর কলিজার টুকরা পুত্রকে রেখে আসার সময় তাঁকে কী পরিমাণ ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়েছিলো, তা বর্ণনার অতীত। কিন্তু উনি আল্লাহ্‌কে সব চাইতে বেশি ভালবাসতেন ও তাঁর উপর দৃঢ়ভাবে তাওয়াক্কুল করেছিলেন। সুতরাং ইব্রাহীম তাঁর রবের হুকুম পালনে দেরী করলেন না। হাজেরা ও সন্তান ইসমাঈলকে মক্কায় রেখে আসলেন।

বাক্কা উপত্যকায় ইব্রাহীম (আঃ) ও কাবা নির্মাণের ইতিহাস

এক সময় আরব পেনিনসুলার মক্কা নগরী ছিলো জনমানবহীন বিরানভূমি। এর নাম ছিলো বাক্কাহ (কুরআন ৩:৯৬)। আজকের মতো জৌলুস তখন ছিলো না, কদাচিত কারো পদচিহ্ন পড়তো এই মরুর বুকে। হয়তোবা কখনো বণিকদের কাফেলা যেতো এই পথ বেয়ে, কখনো তারা থামতো এখানে, আবার কখনো থামার কোনো প্রয়োজন বোধ করতো না … বিপদসঙ্কুল, খাদ্য-পানীয়ের অভাবে পরিবেষ্টিত ধু ধু মরুভূমিতে কেউ কেনই বা আসবে!!! যারা কালেভদ্রে এ মরুভূমির ওপর দিয়ে ভ্রমণ করতো, তারা কি কখনো কল্পনা করতে পেরেছিলো, বাক্কাহ উপত্যকা এক সময় মুসলিম উম্মাহর প্রাণকেন্দ্রে এবং সর্ববৃহৎ মিলনক্ষেত্রে পরিণত হবে!!!!

ইব্রাহীম (আঃ) যখন তাঁর পরিবারকে রেখে ফেরত চলে যাচ্ছিলেন, স্ত্রী হাজেরা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি আমাদের এমন স্থানে কেন ফেলে যাচ্ছেন? আপনি কি আল্লাহ্‌র হুকুমে আমাদের এখানে রেখে যাচ্ছেন?” যখন হাজেরা বুঝতে পারলেন আল্লাহ্‌র হুকুমে তাঁদের এখানে বাস করতে হবে, তখন তিনি আর উচ্চবাচ্য করলেন না। বুকে পাথর বেঁধে স্বামীকে বিদায় দিলেন। উনাদের ঈমানের জোর কত সাঙ্ঘাতিক ছিলো, কত মজবুত ছিলো!!! বিবি হাজেরা জানতেন, তাঁদের এখানে বসবাস করা যদি আল্লাহ্‌র ইচ্ছা হয়, তবে অবশ্যই তিনি তাঁদের সাহায্য করবেন।

দু-একদিনের ভেতর তাঁদের খাদ্য ও পানীয় ফুরিয়ে গেলো। ক্ষুৎপিপাসায় শিশু ইসমাঈল কাঁদতে লাগলেন। বিবি হাজেরা পাগলের মতো সাফা আর মারওয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটতে লাগলেন এক ফোঁটা পানির আশায়। এভাবে সাতবার তিনি এ মাথা থেকে ও-মাথায় গেলেন, কিন্তু কোনো মানব বা পানির চিহ্ন মাত্র দেখলেন না। এমন সময় তিনি একটি শব্দ শুনতে পান। তাকিয়ে দেখেন, যেখানে ইসমাঈলকে রেখে এসেছেন, সেখানে একজন ফেরেশতার পাখার বা পায়ের আঘাতে একটি গর্ত তৈরি হয়েছে, এবং সেই গর্ত ফুঁড়ে পানি বের  হচ্ছে। হাজেরা দৌড়ে এসে সেই পানি পান করেন এবং নিজের ও শিশু সন্তানের তৃষ্ণা নিবারণ করেন। জম জম এর অর্থ “থাম, থাম”। বিবি হাজেরা “জম জম” শব্দগুলো উচ্চারণ করতে করতে অফুরন্ত পানির স্রোত থামানোর চেষ্টা করছিলেন।

এভাবেই বরকতময় জম জম কূপ তৈরি হয় ও আল্লাহ্‌ মানব জাতিকে বিশুদ্ধতম পানির উৎস উপহার দেন। এ জমজম কূপকে কেন্দ্র করে এখানে বসতি স্থাপিত হয়, জুরহুম গোত্র এখানে পানির উৎসের সন্ধান পেয়ে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে।

বেশ ক বছর পরের কথা। আল্লাহ্‌ ইবরাহীম (আঃ)-কে স্বপ্নের মাধ্যমে আদেশ করেছেন শিশু পুত্রকে আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে কুরবানি করতে। তিনি ইসমাঈলকে এই স্বপ্নের কথা জানালেন। ইসমাঈল বললেন, “হে পিতা,  আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা-ই করুন। আল্লাহ্‌ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।” আল্লাহ্‌র আদেশের কাছে পিতা ও পুত্র দুজনেই যখন আত্মসমর্পণ করলেন। তখন আল্লাহ্‌ বললেন,

“তখন আমি তাকে ডাক দিলাম, ‘হে ইব্রাহীম! স্বপ্নে দেওয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করেই ছাড়লে।’ এভাবেই আমি সৎ কর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। অবশ্যই এটা ছিলো এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এক মহান কুরবানির বিনিময়ে পুত্রটিকে ছাড়িয়ে নিলাম। আর আমি তাঁকে পরবর্তীদের মাঝে স্মরণীয় করে রাখলাম। ইব্রাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক! সৎকর্মশীলদের আমি এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি।”  [সূরাহ আস-সফফাত ৩৭: ১০৪-১১০]

শিশু ইসমাঈলের বিনিময়ে সেখানে একটি ভেড়া রাখা হলো, আল্লাহ্‌ উনার কুরবানি কবুল করে নিলেন।

উক্ত ঘটনার আরো কিছু বছর অতিক্রান্ত হলো, এখন ইসমাঈল (আঃ) বালেগ হয়েছেন, এবং জুরহুম গোত্রের একজন রমণীকে বিয়ে করেছেন। ইব্রাহীম (আঃ) কে আল্লাহ্‌ নতুন এক আদেশ দেন। এবার আল্লাহ্‌ তাঁকে তাঁর পুত্রকে সাথে নিয়ে কাবা ঘর নির্মাণের জন্য আদেশ করেন। যদিও সর্বপ্রথম কাবাঘর নির্মিত হয়েছিলো আদি পিতা আদাম (আলাইহিসসালাম) এর দ্বারা। কিন্তু কাল পরিক্রমায় সে নির্মাণ ততদিনে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো।

পরম করুণাময়ের কী মহান পরিকল্পনা! এ পৃথিবীর বুকে তিনি মক্কাকেই বেছে নিলেন তাঁর ইবাদাতের প্রথম গৃহ নির্মাণের জন্য। মক্কা শহরটি পৃথিবীর ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত। মজার ব্যাপার হলো, হিন্দু ধর্ম শাস্ত্রে বিধান আছে লোকে যেন পৃথিবীর কেন্দ্রে তীর্থ করতে যায়!!! অবশ্য থাকতেই পারে এমন কথা, কারণ হিন্দু ধর্ম হয়তো বা তাওহীদে বিশ্বাসী কোনো ধর্মের অপভ্রংশ, যা কাল পরিক্রমায় একেশ্বরবাদের মূল মন্ত্র থেকে সরে গিয়ে বহু ঈশ্বরবাদের ভ্রান্ত ধারণায় পর্যবসিত হয়েছে। কারণ যুগে যুগে আল্লাহ্‌ তা’আলা সব জাতির কাছে তাঁর বানী পৌঁছানোর জন্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন শেষ নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর নাযিলকৃত কুরআন ছাড়া আর সকল আসমানী গ্রন্থে বহু সংযোজন ও বিয়োজন ঘটায় ধর্মের আসল বক্তব্য হারিয়ে গেছে এবং সত্যের কিছু ছিটেফোঁটা রয়ে গেছে।

বিশ্ব জগতের প্রতিপালক রাহমানুর রাহিমের ইবাদাতের উদ্দেশ্যে নির্মিত প্রথম মসজিদ হচ্ছে কাবা। দ্বিতীয় মসজিদ হলো জেরুজালেমের মসজিদ আল আকসা। কাবা ঘর তৈরি করার পর আল্লাহ্‌ ইব্রাহীম (আঃ)-কে আদেশ করেন, চারদিকে হাজ্জের ঘোষণা  করে দিতে।

“এবং মানুষের মধ্যে হাজ্জের জন্য ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর- দূরান্ত থেকে।” [সূরাহ হাজ্জ ২২:২৭]

তাফসির ইবন কাসির থেকে জানা যায়, যখন আল্লাহ্‌ পাক এমন আদেশ দিলেন, তখন ইব্রাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেন, উনি কী করে হাজ্জের ঘোষণা দেবেন, যেখানে তাঁর গলা সবার কাছে পৌঁছবে না!! তারপরও সর্বশক্তিমান প্রভু এই আদেশ অব্যাহত রাখেন ও প্রচার করার দায়িত্ব খোদ নিজে নেন। তখন ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ তাঁর মাকামে (কোনো কোনো বর্ণনা মতে সাফা পাহাড় অথবা আবু কুবায়েস পাহাড়ে) দাঁড়িয়ে সমগ্র মানব জাতির উদ্দেশ্য আহ্বান জানান, যেন তারা সকলে আল্লাহ্‌র ঘরে হাজ্জব্রত পালন করতে আসেন।

বর্ণীত আছে, তাবৎ পাহাড়–পর্বত নিজেদের উচ্চতা নামিয়ে ফেলে, যেন তাঁর এই আহ্বান পৃথিবীর কোনায় কোনায় পৌঁছে যায়, যারা মাতৃগর্ভে আছে, ও এ ধরার বুকে যত মানবের আগমন ঘটবে, তাদের সকলের কানে এই আহ্বান পৌঁছেছিলো। এই পবিত্র ঘোষণার উত্তর দিতে আল্লাহ্‌র হুকুমে যারা হাজ্জে আসেন, তাঁরা সমগ্র অস্তিত্বের সকল আবেগ নিয়ে উচ্চারণ করেন লাব্বাইক ধ্বনি। তাঁরা সকলে বলতে থাকেন, “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক”, যার অর্থ আমি হাজির হয়েছি আল্লাহ্‌, আমি হাজির হয়েছি। এই লাব্বাইক ধ্বনি হাজার হাজার বছর আগের, সেই আহ্বানেরই প্রতিফলন … সেই আহ্বানেরই জওয়াব।

ইব্রাহীম (আঃ) সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন

সূরাহ বাকারা ২:১৯৪-২০৩

সূরাহ হুদ ১১:৬৯-৭৬

সূরাহ ইব্রাহীম ১৪:৪১-৫১

সূরাহ আম্বিয়া ২১:৫১-৭৩

সূরাহ হজ্জ ২২:২৬-৩৮

সূরাহ শুআরা ২৬:৬৯-৮৬

সূরাহ আনকাবুত ২৯:১৬-২৭

সূরাহ সাফফাত ৩৭:৮৩-১১৩

***************************************

কাবা ঘর এ যাবৎ কালতক বহুবার পুনর্নির্মাণ ও মেরামত করা হয়েছে। আদি নকশা অনুযায়ী এ গৃহ আয়তাকার ছিলো। রাসূল ﷺ এর নবুয়তের কয়েক বছর আগে এক প্রলয়ঙ্করী বন্যার পানিতে কাবা ঘরের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। তাছাড়া, এর আগে কাবা একবার আগুনেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো, যার ফলে মূল ভিত্তি অতি দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো। এই দুটো দুর্ঘটনার কারণে কাবার মেরামত করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

কুরাইশদের আয় রোজগারের বড় অংশ আসতো সুদি ব্যবসা ও বিভিন্ন অনৈতিক ব্যবসা থেকে। কিন্তু তারা ইবাদাতের গৃহ নির্মাণের জন্য হারাম পয়সা ব্যবহার করার সাহস করেনি। ফলে তাদের যাবতীয় হালাল অর্থ একত্র করে শুধু মাত্র কাবার বর্গাকার আকৃতি দিতে সক্ষম হয়। কাবার বাকি অংশ স্বল্প উচ্চতার দেয়াল দ্বারা অর্ধ বৃত্তাকার আকৃতিতে ঘেরাও করে দেয়, যাকে হাতিম বলা হয়। এখন পর্যন্ত বাইতুল্লাহ এভাবেই আছে।

মেরামতের পর কাবার কালো পাথর “হাজরে আসওয়াদ” পুনঃপ্রতিস্থাপনের ব্যাপারে কুরাইশ দলপতিদের ভেতর তর্ক লেগে যায়। তারা কিছুতেই স্থির করতে পারে না, কে এই পাথর আবার স্বস্থানে স্থাপন করবে। এই সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তারা ঠিক করে, তাদের সামনে যে ব্যক্তি সবার আগে কাবার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করবে, তাকেই জিজ্ঞেস করা হবে এই সমস্যার সমাধান কীভাবে করা যায়। সবার প্রথমে নবিজী ﷺ সেখানে প্রবেশ করেন। মক্কাতে তিনি নবী হবার আগে থেকেই অত্যন্ত সম্মানিত একজন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর অমায়িক ব্যবহার, সততা ও মাধুর্যময় ব্যক্তিত্বের জন্য সকলেই তাঁকে ভালবাসতো।

তিনি এই সমস্যার অতি সহজ সমাধান দিলেন। বললেন একটি চাদরের মাঝে কালো পাথরটি রেখে সকল দলপতি চাদরের চার কোণা ধরে কাবা ঘর পর্যন্ত যেন নিয়ে আসে। এরপর নিজ পবিত্র হস্ত দ্বারা চাদর থেকে হাজরে আসওয়াদ নিয়ে কাবার গায়ে স্থাপন করে দেন। তিরমিযি শরীফের হাদিসে আছে, এই পাথরটি জান্নাত থেকে আনা হয় এবং এর রঙ ছিলো দুধের চেয়েও সাদা। যারা এ পাথর স্পর্শ করেছে, তাদের পাপের কারণে ধীরে ধীরে পাথরের রঙ কালো হয়ে যায়। [হাদিস নং, ৮৭৭]

হাশরের দিন এ পাথরকে দৃষ্টিশক্তি ও বাকশক্তি দেওয়া হবে, যেন যারা যারা একে খাঁটি অন্তঃকরণে স্পর্শ করেছে, তাদের হয়ে এটি সাক্ষ্য দিতে পারে [তিরমিযি ৯৬১]। কাবা ঘর তওয়াফ শুরু করা হয় হাজরে আসওয়াদকে চুমু খেয়ে। পাথর ছোঁয়ার জন্য হুড়াহুড়ি করা, অন্যান্য মুসুল্লিদের কষ্ট দেওয়া কঠোরভাবে পরিত্যাজ্য। ভীড়ের কারণে চুমু খেতে না পারলে স্পর্শ করা, তাও সম্ভব না হলে দূর থেকে হাতের ইশারাই যথেষ্ট।

এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, হাজরে আসওায়া একটি পাথর ব্যতীত কিছু নয়। এর কোন ঐশী শক্তি নেই। একারণেই উমার (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) একদিন পাথরে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, “আমি জানি, তুমি কেবল মাত্র একটি পাথর, যা কিনা ভালো কিংবা মন্দ, কিছুই করতে পারে না। আমি যদি নবী ﷺ কে তোমাকে চুমু খেতে না দেখতাম, আমি তোমাকে চুমু খেতাম না।”

কাবা গৃহের বরাবর ঊর্ধ্বাকাশে আল্লাহ্‌র ইবাদাতের আরো একটি ঘর রয়েছে, যাকে বলা হয় বাইতুল মামুর। প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা এখানে ইবাদাতে রত হয়, কোন ফেরেশতাই জীবনে দ্বিতীয়বার সুযোগ পায় না এ স্থানে ইবাদাত করার। বাইতুল মামুর অত্যন্ত পবিত্র ও সম্মানিত স্থান। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে সূরাহ তুরের চতুর্থ আয়াতে এই পবিত্র গৃহের নামে শপথ করেছেন। বলেছেন, “ওয়াল বাইতিল মা’মুর।” অর্থাৎ, কসম বাইতুল-মা’মুরের তথা আবাদ গৃহের।”

কাবা ঘরে আক্রমণের প্রচেষ্টার একটি গল্প দিয়ে এই অধ্যায় শেষ করছি। রাসুল ﷺ এর জন্মের বছরে ইথিওপিয়ার শাসক আবরাহা কাবা আক্রমণের নীল নকশা বুনন করে। আবরাহা তার দেশে একটি গির্জা নির্মাণ করে। আরবরা যেন কাবার পরিবর্তে তার তৈরি গির্জায় তীর্থ করতে আসে, এই মনোবাসনা নিয়ে সে তার বিশাল হস্তীবাহিনী সহকারে মক্কার পথে রওনা হয়। কি ভীষণ দাম্ভিক হলে কেউ নিজের তুচ্ছতা ভুলে গিয়ে আল্লাহ্‌র ঘরে আঘাত করার পরিকল্পনা করতে পারে!!

পথিমধ্যে আল্লাহ্‌ আবরাহাকে সদলবলে তার হস্তী বাহিনীসহ সমূলে ধ্বংস করে দেন। ঝাঁকেঝাঁকে পক্ষীর বাহিনীকে আল্লাহ্‌ এদের উপর চড়াও করে দেন। প্রতিটি পাখি ঠোঁটে একটি ও দুই পায়ে করে দুটি, মোট তিনটি মটর দানার আকৃতির পাথর নিয়ে বিশাল এ বাহিনীকে আক্রমণ করে। প্রতিটি পাথরের আঘাতে একজন করে মারা যায়। এভাবে তাদের পুরো বাহিনী পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। খড়কুটোর মতো সেখানে পড়ে থাকে তাদের ধ্বংসাবশেষ। আল্লাহ্‌ উদ্ধতদের এভাবেই অপমানজনক সাজা দিয়ে থাকেন। কত অসম্মানজনক হয় অহংকারীদের পরিণতি!! যারা ক্ষণকালের দুনিয়ায়, হস্তিবাহিনীর মালিক হয়ে নিজেদের অপরাজেয় ভেবেছিলো, আল্লাহ্‌ তাদের সামান্য পক্ষীবাহিনী দ্বারা পরাজিত করে দিলেন।

আবরাহার এই ঘটনার বর্ণনা নিয়ে সূরাহ ফীল নাযিল হয়েছে। ফীল অর্থ হাতি। আমরা সালাতে পড়ে থাকি, “আলাম তারা কাইফা ফা আ’লা রাব্বুকা বি আস হা’বিল ফীল … ।” কিন্তু ক’জন জানি এই সূরাহ নাযিলের পেছনের শানে নুযুল কথা? সূরাহ ফীল মানবজাতির জন্য একটি উদাহরণ। যারা আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, এতে তাদের শোচনীয় পরিণতির চিত্র পাওয়া যায়।

কাবাঘরের প্রতি আল্লাহ্‌ মুসলমানদের অন্তরে এক অদ্ভুত ভালবাসা ও আকর্ষণ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এই ভালোবাসার চৌম্বকীয় টানে লাখ লাখ মানুষ প্রতিনিয়ত আল্লাহ্‌র ঘরে ছুটে যায়।

হাদিসে আছে, কাবা ঘর পৃথিবী ধ্বংসের কাছাকাছি সময়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। এটি কিয়ামতের একটি পূর্ব লক্ষণ। আবু হুরাইরা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ﷺ বলেছেন, “ইথিওপিয়ার যুল সুয়াইকাতাইনের দ্বারা কাবা ধ্বংস হয়ে যাবে।” [বুখারি, হাদিস নং, ১৫১৯,সহিহ]।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

চলছে দুই বছর মেয়াদী আরবি ভাষা শিক্ষা প্রোগ্রাম IIRT Arabic Intensive এর Spring 2018 সেমিস্টারের রেজিস্ট্রেশন। কোর্সে রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.