একতারিক সাহেব বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। বাবা-মায়ের চোখের মণিটার জন্ম হলো, কী যে আদর, কী যে ভালোবাসা! প্রতিদিন বাবা মায়ের আদরে একটু একটু করে বড় হচ্ছে বাচ্চাটা, বাচ্চার প্রতিটি হাসি যেন বাবা -মায়ের হৃদয়ে আনন্দের ঝড় বইয়ে দেয়, দেখতে দেখতে বসা শিখে গেলো, এরপর হামাগুড়ি, এরপর দাঁড়ানো, এরপর হাঁটতেও শিখে গেলো। দিন যায়, মাস যায়, বাবা -মায়ের স্বপ্নের বাচ্চাটা চোখের সামনে বড় হয়ে যেতে থাকে…. স্কুলের ফার্স্ট বয়, বাবা -মায়ের সারাদিন চিন্তা ছেলেটা অনেক বড় হবে। স্কুল পেরিয়ে কলেজে উঠে যায়, কলেজ পেরিয়ে ভার্সিটি। ভালো একটা ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ানোর জন্য বাবা-মায়ের কষ্টের শেষ নেই, কত রাত যে মা ছেলের পাশেই কাটিয়েছেন, ছেলে যদি রাতে উঠতে না পারে! এরপর সত্যি সত্যিই ছেলেটা খুব ভালো একটা ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে গেলো। কিন্তু ভার্সিটিটা অন্য শহরে!!

বাবা-মায়ের চোখে অনেক স্বপ্ন,ছেলে আমার বড় হবে। কিন্তু তার জন্য তাকে যে কোল থেকে ছেড়ে বহুদূর পাঠিয়ে দিতে হবে। তিল তিল করে যে বাচ্চাটাকে এতদিন কাছে রেখে বড় করে তোলা, তাকে দূরে রেখে ওরা থাকবে কি করে? বিগত ২০ টা বছর যে একটা দিনও তারিককে ছাড়া থাকেননি তারা, এখন কি করে থাকবেন তারা? ওদের জীবনের কানায় কানায় যে ছেলেটা জায়গা করে নিয়েছে! ভাবতে ভাবতেই কেঁদে ফেলেন, রান্না করতে গিয়ে কাঁদেন, খেতে বসে কাঁদেন আর চোখ মোছেন, ছেলে আবার দেখে না ফেলে!

IIRT Arabic Intensive

বিদায়ের দিন ঘনিয়ে আসে। ছেলেটা ট্রলি টেনে নিয়ে ক্যাম্পাসে চলে যায়। স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বাবা মা ফিরে আসেন। পুরো ঘরটা এখন নিরব, হাহাকার করছে চারদিক। তারিকের জন্মের ২০ বছর পর বোধহয় বাবা-মা আবার আগের মত দুইজনের সংসারে প্রবেশ করলেন| তখন আর কেউ ছিলো না, কিন্তু এখন তাদের চোখের মণি সন্তানটা দূরে, বহুদূর। ডাইনিং টেবিলে খেতে বসলে তারিকের চেয়ারটা ফাঁকা থাকে, ফাঁকা চেয়ার দেখে বাবা-মায়ের মনটা হু হু করে ওঠে। ছেলেটা আমার কি না কি খাচ্ছে! খাবার গলা দিয়ে নামতে চায় না। ছেলের রুমে গেলেই তার কাপড়চোপড়, বই খাতা, ব্যাট-বল। দু’জোড়া চোখ আবার ভিজে যায়!

মাস যায়, বছর পেরোয়।  ছেলে পাস করে, বাবা মা হৈ হুল্লোড় করে ছেলের বিয়ে দেন। ছেলে পিএইচডি করতে স্ত্রীসহ বিদেশে চলে যায়। বাবা-মায়ের বাসার সেই ফাঁকা জায়গাটুকু আর পূরণ হয় না। বাবা তবু বাইরে ব্যস্ত থাকেন, মা বাসায় বসে প্রচণ্ড ডিপ্রেশানে পড়ে যান, কোন কাজে মন দিতে পারেন না। মাঝে মাঝে জীবনের ডায়েরি খুলে হিসাব মেলাতে চেষ্টা করেন, জীবনটাকে ব্যর্থ মনে হয়। আসলেই কি তার জীবনের কোন অর্থ আছে? মাঝে মাঝে কেমন যেন পাগল পাগল লাগে তার। রাতে ঘুম আসতে চায় না।

ছেলেটা কেমন আছে জানা হয়নি! ভাবতে ভাবতেই মোবাইলের কল বাটনে চাপ দেন মা।
– আব্বু, কেমন আছো তোমরা? আমার দাদুমনিটা কী করছে আজ? ওকে এত দেখতে ইচ্ছে করছে, ওর একটা ভিডিও পাঠাও না বাবা!

দুইতারিকের স্ত্রী তানিয়া আজ খুব বিরক্ত, ফাইজার দাদা দাদীকে রেগুলার তার আপডেইট জানাতে হবে। কেমন আছে, কী করছে, আজকে কী কী নতুন কথা শিখলো…. সব সব। এত সময় কি আছে দুদিন পর পর ফোন দেয়ার? অদ্ভূত মানুষজন!! দাদা-দাদী তো আরও আছে, নাতি-নাতনি নিয়ে এত অবসেশনের কী আছে? উনারা উনাদের মত ভালো থাকুক না, ছেলেমেয়েদের জীবনে এত ইন্টারফেয়ার করার কি দরকার? তারা বড় হয়ে গেছে, এটাতো বুঝতে হবে। তাদেরও নিজস্ব জগৎ আছে। ওদের বাচ্চারা বড় হলে তাদের সাথে কখনোই ওরা এমন করবেনা, ইনশাআল্লাহ।

উপরের এই বিপরীতধর্মী দৃশ্য দুটি আমাদের বর্তমান সমাজে খুবই কমন ঘটনা। আমরা যখনই বিষয়গুলো নিজেদের দিক থেকে চিন্তা করি, নিজেকেই একদম ঠিক মনে হয়। হয়তো আমরা সমাধানটাও চিন্তা করে ফেলি ফাইজার মা-বাবার মতো। আমরা যখন দাদা-দাদী/নানা-নানীর অবস্থানে যাবো তখন  নিজেরা এমন আচরণ করবো না। কিন্তু এই চিন্তাটা কি আসলেই ১০০% ঠিক? আমাদের আজকের পচিশ-ত্রিশের চকচকে লেন্স আর ৫০-৬০ এর ঘোলাটে লেন্সের ভিউ কি পুরো একরকম থাকবে? আসলেই থাকবে?

বৃদ্ধবয়সে সন্তানরা  নিজ নিজ কাজে দূরে চলে যাওয়ার পর বাবা-মা আবার একা হয়ে যান, এই বিচ্ছেদের কারণে বাবা-মায়েরা, বিশেষ করে মায়েরা একরকম কঠিন ডিপ্রেশানের স্টেইজ পার করে থাকেন। এটাকে বলা হয় ‘এম্পটি নেস্ট সিন্ড্রোম (Empty Nest Syndrome)’। যে পাখি দুটো এতদিন খাবার জোগাড় করে এনে বাচ্চাদের মুখে তুলে দিতো, এখনও তাদের খাবার জোগাড় করতে হয় আগের মতই কিন্তু বাচ্চাগুলোর ক্ষুধার্ত মুখ আর নেই, ওদের আনা খাবারের জন্য অপেক্ষা করে কেউ আর বসে থাকে না। অধিকার হারানো কিংবা অধিকার ভাগাভাগির এই ধাক্কাটা সামলে ওঠা কঠিন, খুব কঠিন।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য উভয় পক্ষের পজিটিভ চিন্তা খুব জরুরী।

তিনআমরা ছেলেমেয়েরা আসলেই যদি ব্যস্ত থাকি, বাবা-মায়েদের সাথে যদি একদম প্রতিদিন কথা বলার সময় করে উঠতে না-ও পারি, বাবা-মায়েদের এই ফীলিংসগুলোর যেন মূল্যায়নের চেষ্টা করি অন্তত। তাদের এই আবেগ-অনুভূতিগুলোকে অবসেশন বা অনধিকার চর্চা ট্যাগ না দিয়ে দিই। একদিন তো আমরাও এমন এম্পটি নেস্টার (Empty Nester) হবো, সেদিন হয়তো এই কষ্টগুলো আমাদেরকেই ব্যাকফায়ার করবে।

অন্যদিকে বাবা-মায়ের জন্য এম্পটি নেস্টিং  যদিও খুবই কঠিন, তবু এটা তো বাস্তবতা। ডিমের খোলসের ভেতর যতদিন পাখির বাচ্চা থাকে ততদিন খোলসটা তাকে বাইরের বিরূপ পরিবেশ থেকে প্রোটেকশন দেয়। কিন্তু যখন বাচ্চার বেরিয়ে আসার সময় হয়, তখন খোলসের নিজকে ভেঙেই বাচ্চাকে বাইরে যেতে দিতে হয়, জোর করে খোলসের ভেতর আটকে রাখলে বরং তখন বাচ্চাটাই আহত হবে। মানবজীবনের সম্পর্কগুলোও এমন, অধিকারগুলোও। যে যাবার যখন যাবার, তাকে ছেড়ে দিতে হয়, এই ত্যাগের মধ্যেই মা-বাবার মহানুভবতা, স্বার্থকতা, প্রাপ্তি নিহিত। সন্তানের খোঁ0জ-খবর আমরা অবশ্যই নেবো, তাদের কাছে ন্যায্য অধিকারগুলোও চাইবো, কিন্তু তাদের উপর যেন অনাকাঙ্ক্ষিত ‘হেলিকপ্টার প্যারেন্ট’ হয়ে না বসি!! স্পেইস তো তাদেরও দরকার, তাদের জীবনেও ব্যস্ততা আছে, অসুস্থতা আছে, সুখ আছে, দুঃখ আছে ৷ ঐ যে বললাম, কিছু মানুষের জন্য ত্যাগেই সুখ। আজকে আপনারা, কাল আমরাও …


লেখক: নিশাত তামমিম

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive