পর্ব ০১ | পর্ব ০২পর্ব ০৩ | পর্ব ০৪

সাজিদের ব্যাগে ইয়া মোটা একটি ডায়েরি থাকে সবসময়।

IIRT Arabic Intensive

ডায়েরিটা প্রাগৈতিহাসিক আমলের কোন নিদর্শনের মতো। জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। ছেঁড়া জায়গার কোনোটাতে সূতো দিয়ে সেলাই করা, কোনো জায়গায় আঠা দিয়ে প্রলেপ লাগানো, কোনো জায়গায় ট্যাপ করা।

এই ডায়েরিতে সে তার জীবনের নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনা লিখে রাখে। এই ডায়েরির মাঝামাঝি কোনো এক জায়গায় সাজিদ আমার সাথে প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাটিও লিখে রেখেছে। তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয় টি.এস.সি তে।

সে আমার সম্পর্কে লিখে রেখেছে-

‘ভ্যাবলা টাইপের এক ছেলের সাথে সাক্ষাৎ হলো আজ। দেখলেই মনে হবে, জগতের কঠিন বিষয়ের কোনোকিছুই সে বুঝে না।কথা বলার পরে বুঝলাম, এই ছেলে অত্যন্ত বুদ্ধিমান, কিন্তু বোকা। ছেলেটার নাম- আরিফ।’

নিচে তারিখ দেওয়া- ০৫/০৩/০৯

এই ডায়েরিতে নানান বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথাও লিখা আছে। একবার কানাডার টরেন্টোতে সাজিদ তার বাবার সাথে একটি অফিসিয়াল ট্যুরে গিয়েছিলো। সেখানে অনেক সেলেব্রিটির সাথে বিলগেটসও আমন্ত্রিত ছিলেন। বিলগেটস সেখানে দশ মিনিটের জন্য বক্তৃতা রেখেছিলেন। সে ঘটনাটি লিখা আছে।

জাফর ইকবালের সাথে সাজিদের একবার বই মেলায় দেখা হয়ে যায়। সেবারের বইমেলায় জাফর স্যারের বই ‘একটুখানি বিজ্ঞান’ এর দ্বিতীয় কিস্তি ‘আরো একটুখানি বিজ্ঞান’ প্রকাশিত হয়। সাজিদ জাফর স্যারের বই কিনে বের হওয়ার পথে জাফর স্যারের সাথে তার দেখা হয়ে যায়। সাজিদ স্যারের একটি অটোগ্রাফ নিয়ে স্যারের কাছে হেসে জানতে চাইলো,- “স্যার, ‘একটুখানি বিজ্ঞান’ পাইলাম। এরপর পাইলাম ‘আরো একটুখানি বিজ্ঞান’। এটার পরে, ‘আরো আরো একটুখানি বিজ্ঞান’  কবে পাচ্ছি?”

সেদিন নাকি জাফর স্যার মিষ্টি হেসে বলেছিলেন,- ‘পাবে।’

নিজের সাথে ঘটে যাওয়া এরকম অনেক ঘটনাই ঠাঁই পেয়েছে সাজিদের ডায়েরিটাতে।

সাজিদের ডায়েরির আদ্যোপান্ত আমার পড়া ছিলো। কিন্তু সেমিস্টার ফাইনাল সামনে চলে আসায় গত বেশ কিছুদিন তার ডায়েরিটা আমার আর পড়া হয়নি। অবশ্য ডায়েরিটা আমি লুকিয়ে লুকিয়েই পড়ি।

সেদিন থার্ড সেমিস্টারের শেষ পরীক্ষাটি দিয়ে রুমে আসলাম। এসে দেখি সাজিদ ঘরে নেই। তার টেবিলের উপরে তার ডায়েরিটা পড়ে আছে খোলা অবস্থায়।

ঘর্মাক্ত শরীর। কাঠফাটা রোদের মধ্যে ক্যাম্পাস থেকে হেঁটে বাসায় ফিরেছি। এই মুহূর্তে বসে ডায়েরিটা উল্টাবো, সে শক্তি বা ইচ্ছে কোনোটাই নেই। কিন্তু ডায়েরিটা বন্ধ করতে গিয়ে একটি শিরোনামে আমার চোখ আটকে যায়। আমি সাজিদের টেবিলেই বসে পড়ি। লেখাটির শিরোনাম ছিলো-

‘ভাগ্য বনাম স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি- স্রষ্টা কি এখানে বিতর্কিত?’

বেশ লোভনীয় শিরোনাম। শারীরিক ক্লান্তি ভুলেই আমি ঘটনাটির প্রথম থেকে পড়া শুরু করলাম। ঘটনাটি সাজিদের ডায়েরিতে যেভাবে লেখা, ঠিক সেভাবেই আমি পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি-

‘কয়েকদিন আগে ক্লাসের থার্ড পিরিয়ডে মফিজুর রহমান স্যার এসে আমাকে দাঁড় করালেন। বললেন, ‘তুমি ভাগ্যে, আই মিন তাকদিরে বিশ্বাস করো?’

আমি আচমকা অবাক হলাম। আসলে এই আলাপগুলো হলো ধর্মীয় আলাপ। মাইক্রোবায়োলজির একজন শিক্ষক যখন ক্লাসে এসে এসব জিজ্ঞেস করেন, তখন খানিকটা বিব্রত বোধ করাই স্বাভাবিক। স্যার আমার উত্তরের আশায় আমার মুখের দিকে চেয়ে আছেন।

আমি বললাম, ‘জ্বি, স্যার। এ্যাজ এ্যা মুসলিম, আমি তাকদিরে বিশ্বাস করি। এটি আমার ঈমানের মূল সাতটি বিষয়ের মধ্যে একটি।’

স্যার বললেন, ‘তুমি কি বিশ্বাস করো যে, মানুষ জীবনে যা যা করবে  তার সবকিছুই তার জন্মের অনেক অনেক বছর আগে তার তাকদিরে লিখে দেওয়া হয়েছে?’

– ‘জ্বি স্যার।’ আমি উত্তর দিলাম।

– ‘বলা হয়, স্রষ্টার অনুমতি ছাড়া গাছের একটি ক্ষুদ্র পাতাও নড়েনা, তাই না?’

– ‘জ্বি স্যার।’

– ‘ধরো, আজ সকালে আমি একজন লোককে খুন করলাম। এটা কি আমার তাকদিরে পূর্বনির্ধারিত ছিলো না?’

– ‘জ্বি, ছিলো।’

– ‘আমার তাকদির যখন লেখা হচ্ছিলো, তখন কি আমি জীবিত ছিলাম?’

– ‘না, ছিলেন না।’

– ‘আমার তাকদির কে লিখেছে? বা কার নির্দেশে লিখিত হয়েছে?’

– ‘স্রষ্টার।’

– ‘তাহলে সোজা এবং সরল লজিক এটাই বলে- ‘আজ সকালে যে খুনটি আমি করেছি, সেটি মূলত আমি করিনি। আমি এখানে একটি রোবট মাত্র। আমার ভেতরে একটি প্রোগ্রাম সেট করে দিয়েছেন স্রষ্টা। সেই প্রোগ্রামে লেখা ছিলো যে, আজ সকালে আমি একজন লোককে খুন করবো। সুতরাং, আমি ঠিক তা-ই করেছি, যা আমার জন্য স্রষ্টা পূর্বে ঠিক করে রেখেছেন। এতে আমার কোন হাত নেই। ডু ইউ এগ্রি,সাজিদ?’

– ‘কিছুটা।’ আমি উত্তর দিলাম।

স্যার এবার হাসলেন। হেসে বললেন, ‘আমি জানতাম তুমি কিছুটাই একমত হবে, পুরোটা নয়। এখন তুমি আমাকে নিশ্চই যুক্তি দেখিয়ে বলবে, স্যার, স্রষ্টা আমাদের একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। আমরা এটা দিয়ে ভালো-মন্দ বিচার করে চলি,রাইট?’

– ‘জ্বি স্যার।’

– ‘কিন্তু সাজিদ, এটা খুবই লেইম লজিক, ইউ নো? ধরো, আমি তোমার হাতে বাজারের একটি লিস্ট দিলাম। লিস্টে যা যা কিনতে হবে, তার সবকিছু লেখা আছে। এখন তুমি বাজার করে ফিরলে। তুমি ঠিক তা-ই তা-ই কিনলে যা আমি লিস্টে লিখে দিয়েছি। এবং তুমি এটা করতে বাধ্য।’

এতটুকু বলে স্যার আমার কাছে জানতে চাইলেন, ‘বুঝতে পারছো?’

আমি বললাম, ‘জ্বি স্যার।’

– ‘ভেরি গুড! ধরো, তুমি বাজার করে আসার পর একজন জিজ্ঞেস করলো, সাজিদ কী কী বাজার করেছো? তখন আমি উত্তর দিলাম, ‘ওর যা যা খেতে মন চেয়েছে, তা-ই তা-ই কিনেছে। বলো তো, আমি সত্য বলেছি কিনা?’

আমি বললাম,- ‘নাহ, আপনি মিথ্যা বলেছেন।’

স্যার চিৎকার করে বলে উঠলেন, “এক্সাক্টলি। ইউ হ্যাভ গট দ্য পয়েন্ট, মাই ডিয়ার। আমি মিথ্যা বলেছি। আমি লিস্টে বলেই দিয়েছি তোমাকে কী কী কিনতে হবে। তুমি ঠিক তা-ই তা-ই কিনেছো যা আমি কিনতে বলেছি। যা কিনেছো সব আমার পছন্দের জিনিস। এখন আমি যদি বলি, ‘ওর যা যা খেতে মন চেয়েছে,সে তা-ই তা-ই কিনেছে’,  তাহলে এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা,না?”

– ‘জ্বি, স্যার।’

– ‘ঠিক স্রষ্টাও এভাবে মিথ্যা বলেছেন। দুই নাম্বারি করেছেন। তিনি অনেক আগে আমাদের তাকদির লিখে তা আমাদের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন। এখন আমরা সেটাই করি, যা স্রষ্টা সেখানে লিখে রেখেছেন। আবার, এ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য ডে, এই কাজের জন্য কেউ জান্নাতে যাচ্ছে, কেউ জাহান্নামে। কিন্তু কেন? এখানে মানুষের তো কোন হাত নেই। ম্যানুয়ালটা স্রষ্টার তৈরি। আমরা তো জাস্ট পারফর্মার। স্ক্রিপ্ট রাইটার তো স্রষ্টা। স্রষ্টা এর জন্য আমাদের কাউকে জান্নাত, কাউকে জাহান্নাম দিতে পারেন না। যুক্তি তাই বলে, ঠিক?’

আমি চুপ করে রইলাম। পুরো ক্লাসে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছে তখন।

স্যার বললেন, ‘হ্যাভ ইউ এনি প্রপার লজিক অন দ্যাট টিপিক্যাল কোয়েশ্চান, ডিয়ার?’

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।

স্যার মুচকি হাসলেন। মনে হলো উনি ধরেই নিয়েছেন যে, উনি আমাকে এবার সত্যি সত্যিই কুপোকাত করে দিয়েছেন। বিজয়ীর হাসি। আমাকে যারা চিনে তারা জানে, আমি কখনো কারো প্রশ্নের উত্তর দিতে সময় নিই না। আজকে যেহেতু তার ব্যতিক্রম ঘটলো, আমার বন্ধুরা আমার দিকে ড্যাব ড্যাব চোখ করে তাকালো। তাদের চাহনি দেখে মনে হচ্ছিলো, এই সাজিদকে তারা চিনেই না।কোনোদিন দেখেনি।

আর ক্লাসে আমার বিরুদ্ধ মতের যারা আছে, তাদের চেহারা তখন মুহূর্তেই উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করলো। তারা হয়তো মনে মনে বলতে লাগলো, ‘মোল্লার দৌড় ওই মসজিদ পর্যন্তই। হা হা হা।’

আমি মুখ তুলে স্যারের দিকে তাকালাম।মুচকি হাসিটা স্যারের মুখে তখনও বিরাজমান।

আমি বললাম, ‘স্যার, এই ক্লাসে কার সম্পর্কে আপনার কী অভিমত?’

স্যার ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। স্যার জিজ্ঞেস করেছেন কী আর আমি বলছি কী।

স্যার বললেন,- ‘বুঝলাম না।’

– ‘মানে, আমাদের ক্লাসের কার মেধা কী রকম, সে বিষয়ে আপনার কী ধারণা?’

– ‘ভালো ধারণা। ছাত্রদের সম্পর্কে একজন শিক্ষকেরই তো সবচেয়ে ভালো জ্ঞান থাকে।’

আমি বললাম, ‘স্যার, আপনি বলুন তো এই ক্লাসে কারা কারা ফার্স্ট ক্লাস আর কারা কারা সেকেন্ড ক্লাস পাবে?’

স্যার কিছুটা বিস্মিত হলেন। বললেন, ‘আমি তোমাকে অন্য বিষয়ে প্রশ্ন করেছি। তুমি ‘আউট অফ কনটেক্সট’ এ গিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করছো, সাজিদ।’

– ‘না স্যার, আমি কনটেক্সটেই আছি। আপনি উত্তর দিন।’

স্যার বললেন,- ‘এই ক্লাশ থেকে রায়হান, মমতাজ, ফারহানা, সজীব, ওয়ারেশ, ইফতি, সুমন,জাবেদ এবং তুমি ফার্স্ট ক্লাস পাবে। আর বাকিরা সেকেন্ড ক্লাস।’

স্যার যাদের নাম বলেছেন, তারা সবাই ক্লাসের ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। সুতরাং, স্যারের অনুমান খুব একটা ভুল না।

আমি বললাম, ‘স্যার, আপনি এটা লিখে দিতে পারেন?’

– ‘Why not?’ স্যার বললেন।

এই বলে তিনি খচখচ করে একটা কাগজের একপাশে যারা ফার্স্ট ক্লাস পাবে তাদের নাম, অন্যপাশে যারা সেকেন্ড ক্লাস পাবে, তাদের নাম লিখে আমার হাতে দিলেন।

আমি বললাম, ‘স্যার, ধরে নিলাম যে আপনার ভবিষ্যৎবাণী সম্পূর্ণ সত্য হয়েছে। মানে আপনি ফার্স্ট ক্লাস পাবে বলে যাদের নাম লিখেছেন,তারা সবাই ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে, আর যারা সেকেন্ড ক্লাস পাবে লিখেছেন, তাদের সবাই সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে।’

– ‘হুম, তো?’

– ‘এখন, স্যার বলুন তো, যারা ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে, আপনি এই কাগজে তাদের নাম লিখেছেন বলেই কি তারা ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে?’

– ‘নাহ তো।’

– ‘যারা সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে, তারা সেকেন্ড ক্লাস পাবে বলে আপনি এই কাগজে লিখেছেন বলেই কি তারা সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে?’

স্যার বললেন, ‘একদম না।’

– ‘তাহলে মূল ব্যাপারটি কী স্যার?’

স্যার বললেন, ‘মূল ব্যাপার হলো, আমি তোমাদের শিক্ষক। আমি খুব ভালো জানি পড়াশুনায় তোমাদের কে কেমন। আমি খুব ভালো করেই জানি, কার কেমন মেধা। সুতরাং  আমি চোখ বন্ধ করেই বলে দিতে পারি কে কেমন রেজাল্ট করবে।’

আমি হাসলাম। বললাম, ‘স্যার, যারা সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে, তারা যদি আপনাকে দোষ দেয়? যদি  বলে, আপনি ‘সেকেন্ড ক্লাস’ ক্যাটাগরিতে তাদের নাম লিখেছেন বলেই তারা সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে?’

স্যার কপালের ভাঁজ লম্বা করে বললেন, ‘ইট উড বি টোট্যালি বুলশিট! আমি কেন এর জন্য দায়ী হবো? এটা তো সম্পূর্ণ তাদের দায়। আমি শুধু তাদের মেধা, যোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা রাখি বলেই অগ্রিম বলে দিতে পেরেছি যে কে কেমন রেজাল্ট করবে।’

আমি আবার জোরে জোরে হাসতে লাগলাম। পুরো ক্লাস আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।

আমি থামলাম।বললাম, ‘স্যার, তাকদির তথা ভাগ্যটাও ঠিক এরকম। আপনি যেমন আমাদের মেধা, যোগ্যতা, ক্ষমতা সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন, স্রষ্টাও তেমনি তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে ধারণা রাখেন। আপনার ধারণা মাঝে মাঝে ভুল হতে পারে, কিন্তু স্রষ্টার ধারণায় কোনো ভুল নেই। স্রষ্টা হলেন আলিমুল গায়েব। তিনি ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সব জানেন। আপনি যেরকম আমাদের সম্পর্কে পূর্বানুমান করে লিখে দিয়েছেন যে আমাদের মধ্যে কারা কারা ফার্স্ট ক্লাস পাবে, আর কারা সেকেন্ড ক্লাস। এর মানে কিন্তু এই না যে আপনি বলেছেন বলে আমাদের কেউ ফার্স্ট ক্লাস পাচ্ছি, কেউ সেকেন্ড ক্লাস। স্রষ্টাও সেরকম তাঁর জ্ঞানের কারণে আমাদের তাকদির লিখে রেখেছেন। তাতে লেখা আছে দুনিয়ায় আমরা কে কী করবো। এর মানেও কিন্তু এই না যে তিনি লিখে দিয়েছেন বলেই আমরা কাজগুলো করছি। বরং এর মানে হলো এই, তিনি জানেন যে আমরা দুনিয়ায় এই এই কাজগুলো করবো। তাই তিনি তা অগ্রিম লিখে রেখেছেন তাকদির হিসেবে। আমাদের মধ্যে কেউ ফার্স্ট ক্লাস আর কেউ সেকেন্ড ক্লাস পাবার জন্য যেমন কোনোভাবেই আপনি দায়ী নন, ঠিক সেভাবে মানুষের মধ্যে কেউ ভালো কাজ করে জান্নাতে, আর কেউ খারাপ কাজ করে জাহান্নামে যাবার জন্যও স্রষ্টা দায়ী নন। স্রষ্টা জানেন যে, আপনি আজ সকালে একজনকে খুন করবেন। তাই তিনি সেটা আগেই আপনার তাকদিরে লিখে রেখেছেন। এটার মানে এই না যে স্রষ্টা লিখে রেখেছেন বলেই আপনি খুনটি করেছেন। এর মানে হলো স্রষ্টা জানেন যে,আপনি আজ খুনটি করবেন। তাই সেটা অগ্রিম লিখে রেখেছেন আপনার তাকদির হিসেবে। স্যার, ব্যাপারটা কি এখন পরিষ্কার?’

স্যারের চেহারাটা কিছুটা ফ্যাকাশে মনে হলো। তিনি বললেন, ‘হুম।’

এরপর স্যার কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর বললেন, ‘আমি শুনেছিলাম তুমি ক’দিন আগেও নাস্তিক ছিলে। তুমি আবার আস্তিক হলে কবে?’

আমি হা হা হা করে হাসলাম। বললাম, ‘এই প্রশ্নটা কিন্তু স্যার আউট অফ কনটেক্সট।’

এটা শুনে পুরো ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়লো।

পিরিওডের একদম শেষদিকে স্যার আবার আমাকে দাঁড় করালেন। বললেন, ‘বুঝলাম স্রষ্টা আগে থেকে জানেন বলেই লিখে রেখেছেন। তিনি যেহেতু আগে থেকেই জানেন কে ভালো কাজ করবে আর কে খারাপ কাজ করবে, তাহলে পরীক্ষা নেওয়ার কী দরকার? যারা জান্নাতে যাওয়ার তাদের জান্নাতে, যারা জাহান্নামে যাওয়ার তাদের জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেই তো হতো, তাই না?’

আমি আবার হাসলাম। আমার হাতে স্যারের লিখে দেওয়া কাগজটি তখনও ধরা ছিলো। আমি সেটা স্যারকে দেখিয়ে বললাম, ‘স্যার, এই কাগজে কারা কারা ফার্স্ট ক্লাস পাবে, আর কারা কারা সেকেন্ড ক্লাস পাবে, তাদের নাম লেখা আছে। তাহলে এই কাগজটির ভিত্তিতেই রেজাল্ট দিয়ে দিন। বাড়তি করে পরীক্ষা নিচ্ছেন কেনো?’

স্যার বললেন, “পরীক্ষা না নিলে কেউ হয়তো এই বলে অভিযোগ করতে পারে যে, ‘স্যার আমাকে ইচ্ছা করেই সেকেন্ড ক্লাস দিয়েছে। পরীক্ষা দিলে আমি হয়তো ঠিকই ফার্স্ট ক্লাস পেতাম।’

আমি বললাম, ‘একদম তাই, স্যার। স্রষ্টাও এইজন্য পরীক্ষা নিচ্ছেন যাতে কেউ বলতে না পারে দুনিয়ায় পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলে আমি অবশ্যই আজকে জান্নাতে থাকতাম। স্রষ্টা ইচ্ছা করেই আমাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছে।’

ক্লাসের সবাই হাত তালি দিতে শুরু করলো। স্যার বললেন, ‘সাজিদ, আই হ্যাভ এ্যা লাস্ট কোয়েশ্চান।’

– ‘ডেফিনেইটলি, স্যার।’ আমি বললাম।

– ‘আচ্ছা, যে মানুষ পুরো জীবনে খারাপ কাজ বেশি করে, সে অন্তত কিছু না কিছু ভালো কাজ তো করে,তাই না?’

– ‘জ্বি স্যার।’

– ‘তাহলে, এই ভালো কাজগুলোর জন্য হলেও তো তার জান্নাতে যাওয়া দরকার,তাই না?’

আমি বললাম, ‘স্যার, পানি কীভাবে তৈরি হয়?’

স্যার আবার অবাক হলেন। হয়তো বলতে যাচ্ছিলেন যে এই প্রশ্নটাও আউট অফ কনটেক্সট, কিন্তু কী ভেবে যেন চুপসে গেলেন।বললেন, ‘দুই ভাগ হাইড্রোজেন আর এক ভাগ অক্সিজেনের সংমিশ্রণে।’

আমি বললাম,- ‘আপনি এক ভাগ হাইড্রোজেন আর এক ভাগ অক্সিজেন দিয়ে পানি তৈরি করতে পারবেন?’

– ‘কখনোই না।’

– ‘ঠিক সেভাবে, এক ভাগ ভালো কাজ আর এক ভাগ মন্দ কাজে জান্নাত পাওয়া যায়না। জান্নাত পেতে হলে হয় তিন ভাগই ভালো কাজ হতে হবে, নতুবা দুই ভাগ ভালো কাজ, এক ভাগ মন্দ কাজ হতে হবে। অর্থাৎ, ভালো কাজের পাল্লা ভারি হওয়া আবশ্যক।’

সেদিন আর কোন প্রশ্ন স্যার আমাকে করেননি।’

এক নিশ্বাঃসে পুরোটা পড়ে ফেললাম। কোথাও একটুও থামিনি। পড়া শেষে যেই মাত্র সাজিদের ডায়েরিটা বন্ধ করতে যাবো, অমনি দেখলাম পেছন থেকে সাজিদ এসে আমার কান মলে ধরেছে। সে বললো,- ‘তুই তো সাংঘাতিক লেভেলের চোর।’

আমি হেসে বললাম,- ‘হা হা হা। স্যারকে তো ভালো জব্দ করেছিস ব্যাটা।’

কথাটা সে কানে নিলো বলে মনে হলো না। নিজের সম্পর্কে কোন কমপ্লিমেন্টই সে আমলে নেয় না। গামছায় মুখ মুছতে মুছতে সে খাটের উপর শুয়ে পড়লো।

আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম। বললাম,- ‘সাজিদ……’

– ‘হু’

– ‘একটা কথা বলবো?’

– ‘বল।’

– ‘জানিস, একসময় যুবকেরা হিমু হতে চাইতো। হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে, মরুভূমিতে গর্ত খুঁড়ে জ্যোৎস্না দেখার স্বপ্ন দেখতো।দেখিস, এমন একদিন আসবে, যেদিন যুবকেরা সাজিদ হতে চাইবে। ঠিক তোর মতো……’

এই বলে আমি সাজিদের দিকে তাকালাম। দেখলাম, ততক্ষণে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। অঘোর ঘুম……..

(এটি ‘সাজিদ’ সিরিজের চতুর্থ পর্ব। সাজিদ একটি কাল্পনিক চরিত্র। এই চরিত্রটি কাল্পনিক নানান ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে নাস্তিক তথা ইসলাম ধর্ম বিদ্বেষীদের যুক্তিগুলোকে দর্শন, যুক্তি, বিজ্ঞান আর বাস্তবতার আলোকে খন্ডন করে)

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive