ইসলাম এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি কথা প্রায়ই বলা হয় যে, ইসলামী আইন কেবল মাত্র ইসলামের প্রাথমিক যুগের জন্যই এসেছিল। আধুনিক বিশ্বে ঐসব আইনের প্রয়োগ ঠিক মানায় না। প্রযুক্তি আর যোগাযোগ ব্যবস্থার উৎকর্ষ, বিজ্ঞানের নিত্য নতুন সব আবিষ্কার সেসব আইনকে এখন অকার্যকর করে দিয়েছে। এসব যুক্তি প্রদর্শনের সময় কেউ দৈববাণীর তাৎপর্য বা একজন মুসলিমের আত্মসমর্পণের অন্তর্নিহিত গুরুত্ব, কোনোটার কথাই মাথায় রাখে না। ‘মুসলিম’ শব্দের অর্থ ‘অনুগত’। সত্যি বলতে, আপনি যখন আল্লাহর প্রতি একান্ত অনুগত হয়ে আত্মসমর্পণ করবেন তখন আপনার চিন্তাধারাই পাল্টে যাবে। আপনি দেখবেন আপনার বিরুদ্ধে যাওয়া কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা হয়তো আপনি বুঝতে পারছেন না, কোনো কোনো ব্যাপারে হয়তো মন সায় দিতে চাইছে না। কিন্তু যেহেতু আপনি মহান আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছেন, আপনি এখন যে কোনো পরিস্থিতিই গ্রহণ করে নিতে প্রস্তুত। কারণ আপনার বিশ্বাস, মহাজ্ঞানী আল্লাহতা’আলা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা-ই সঠিক। কোনো কিছুই তো তাঁর অজানা নেই।

যাই হোক, আল্লাহ প্রদত্ত এসব আইন যে বিতর্কের উর্ধ্বে, এই কথাটাও শুধুমাত্র যুক্তি তর্কের মাধ্যমে কাউকে বিশ্বাস করানো সম্ভব নয়। বরং অন্তরের নিয়ন্ত্রণ আল্লাহরই হাতে।

IIRT Arabic Intensive

যারা কুফরী করেছে আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন, তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ্‌ তাদের হৃদয়সমূহ ও তাদের শ্রবণশক্তির উপর মোহর করে দিয়েছেন, এবং তাদের দৃষ্টির উপর রয়েছে আবরণ। আর তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।[১]

যদি আল্লাহ কারো অন্তরে মোহর মেরে দেন, সে অন্তর তো আল্লাহ তাকে আবার খুলে দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত হিদায়াতের আলো পাবে না। আমাদের আলোচনা কিন্তু স্রষ্টা প্রদত্ত আইনের যথাযথতা নিয়ে না। বরং এই ধৃষ্টতাপূর্ণ কথা নিয়ে যে, আমাদের পূর্ববর্তীদের যুগ, স্পষ্ট করে বললে রাসূলﷺও সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমদের যুগ কি সেকেলে কিনা।

বর্তমানে যেসব আইন ও বিচার ব্যবস্থা প্রচলিত সেগুলোকেই স্বচ্ছ এবং আধুনিক ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করা হয়। বাস্তবিকই মুসলিম অধ্যুষিত কোনো দেশের একজন ব্যক্তি এর যথার্থতার প্রমাণ পেতে পারেন। এছাড়া যারা কোনো অভিজ্ঞ উকিল বা আইনজীবীর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পান তাদের ক্ষেত্রে বিচারিক আদালত থেকে আসা রায় নিজেদের পক্ষে আনার সুযোগ আরও বেশি। এই কি স্বাধীনতা আর ন্যায়বিচারের নমুনা? কিংবা এটাই কি আদিমতা না যেখানে সমাজের ক্ষমতাশালীরা আইনের ঊর্ধ্বে? যে সমাজে ক্ষমতাধর আইন ভঙ্গকারীকে কূটনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়, সে সমাজ ন্যায়বিচারের পক্ষাবলম্বীদের দিকে চেয়ে উপহাস করে।

এবার খিলাফাহর যুগের সাহাবীদের (রা) অসংখ্য ঘটনার সাথে তুলনা করা যাক। যেখানে খলিফা তথা মুসলিম উম্মাহর শাসক পর্যন্ত তুচ্ছ বিষয়েও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে ছিলেন না। একটা উদাহরণ দেই,  খলিফা ঊমার ইবনুল খাত্তাব (রা) একবার মুসলিমদের উদ্দেশ্যে “শোনো এবং মানো” বলে খুতবা দেওয়া শুরু করলেন। এমন সময় এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, “আমরা আপনার কথা শুনবো না, মানবো না। আপনি আমাদের সবাইকে এক টুকরো কাপড় দিয়ে নিজের জন্য দু’ টুকরো রেখেছেন।” একেবারে জনসম্মুখে খলিফাকে উদ্দেশ্য করে যে লোক এই কথা বলেছিল সে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা কোনো বিতার্কিক ছিল না। তবু উপস্থিত জনতা কি তাকে নিয়ে তখন ঠাট্টা করে উঠেছিল? কেউ কি তাকে বলেছিল, “বাদ দাও তো। এসব মামুলি বিষয়।” নাকি কেউ বলেছিল যে, খলিফা হিসেবে তিনি বাড়তি কিছু সুবিধা পেতেই পারেন।” না, এসব না বলে লোকেরা বরং অপেক্ষা করছিল খলিফা ঊমার (রা) কী জবাব দেন তা শোনার জন্য। এই হলো একটি সুন্দর সমাজের লক্ষণ যেখানে শাসক তার জনগণের কাছেও জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন। তো, ঊমার (রা) তখন বললেন, আর সবার মতো তিনিও নিজের জন্য এক টুকরো কাপড়ই নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর দীর্ঘকায় দেহের জন্য যেহেতু সেই কাপড় যথেষ্ট ছিল না, তাই তাঁর ছেলে নিজের ভাগের কাপড়টাও খলিফাকে দিয়ে দিয়েছিল।[২]

একইভাবে বলা যায় আলী ইবনে আবু ত্বলিব (রা) এর কথা, যিনি শুধু মুসলিম উম্মাহর খলিফাই ছিলেন না, ছিলেন আল্লাহর রাসূলﷺএর চাচাত ভাই। তাঁকেও একবার কাজীর সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল এক অমুসলিম ব্যবসায়ীর কারণে। আলী (রা) একবার তাঁর প্রিয়ঢাল হারিয়ে ফেলেন। পরে একদিন এক অমুসলিম লোককে দেখেন কুফা’র বাজারে সেই ঢালটি বিক্রি করছে। দেখে আলী (রা) বললেন, “এই ঢালটি আমার। এটা আমার উটের ওপর থেকে অমুক রাতে অমুক সময় পড়ে গিয়েছিল।” লোকটি একথা অস্বীকার করে বলল যে ঢালটির মালিক সে নিজে। আলী (রা) প্রতিবাদ করলেন এই বলে, “হতেই পারে না। এটা আমারই, যেহেতু আমি ঢালটি কখনো বিক্রি করিনি বা কাউকে দিয়েও দিইনি।”

এরপর দু’জনই সম্মত হলেন একজন বিচারকের মাধ্যমে এর ফয়সালা করতে। তাঁরা শুরাইহ এর কাছে গেলেন। শুরাইহ আলীকে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করতে বললেন। আলী (রা) বললেন যে, লোকটার হাতে দেখা সেই ঢাল তাঁর ছিল এবং সেটা এক রাতে তাঁর উট থেকে পড়ে যায়। আরও বললেন তিনি এটি কখনো বিক্রয় করেননি বা কাউকে দানও করেননি। কাজী এবার ঐ লোকটির দিকে ফিরে তার বক্তব্য জানাতে বললেন। লোকটি বলল সে আলী (রা)কে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করছে না, কিন্তু ঢালটির মালিকানা তার যেহেতু সেটি তখন তার হাতে ছিল।শুরাইহ আলী (রা) এর দিকে ফিরে বললেন, “আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি, কিন্তু আপনার বক্তব্যের সমর্থনে দু’জন সাক্ষী লাগবে।” আলী (রা) যখন বললেন ক্বানবার (রা) এবং তাঁর ছেলে হাসান (রা) তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দেবে,।তখন সেই লোকটি বলল একজন ছেলে তার বাবার পক্ষে সাক্ষ্য দিলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। আলী (রা) বললেন, “ইয়া আল্লাহ, জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়া একজনকেই কিনা সাক্ষী হিসেবে মেনে নিতে পারছ না! তুমি কি জান না যে, রাসূলﷺ বলেছেন জান্নাতে যুবকদের সর্দার হবে হাসান এবং হোসাইন? শুরাইহ বললেন, “হ্যাঁ, আমি শুনেছি সে কথা। কিন্তু একজন ছেলে তার বাবার পক্ষে সাক্ষী হতে পারে না।” আলী (রা) এবার লোকটির দিকে ফিরে বললেন, “নিয়ে যাও তুমি এ ঢাল, যেহেতু আমার আর কোনো সাক্ষী নেই।”

অমুসলিম সেই লোকটি তখন বলল, “আহ! কি অসাধারণ এক ধর্ম। আমি চাইলেই আলীকেও অভিযুক্ত করতে পারি। আমার পক্ষে রায় দেবে এমন বিচারকও পেতে পারি। আলী, এই ঢাল তোমার। আর আমি নিজেকে আজ থেকে মুসলিম হিসেবে ঘোষণা করছি।” লোকটি বিচারককে বলল যে, সে মুসলিম বাহিনীকে পেছন থেকে অনুসরণ করছিল। এমন সময়  ঢালটি পড়ে যেতে দেখে আর সে তা তুলে নেয়। আলী (রা) লোকটিকে ঢালটির পাশাপাশি একটি ঘোড়াও উপহার হিসেবে দান করেন।

‘আমর ইবনুল আস (রা)ও একবার এক বিধর্মীর করা অভিযোগে আদালতের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। যদিও তাঁর কোনো অন্যায় ছিল না। ঘটনা হলো, তাঁর ছেলে এক লোকের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। এরপর সে নিজের বাবার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে লোকটিকে মারধর করে। সেই লোক অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও ন্যায়বিচার পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। তাই শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে সে মদিনায় হযরত ঊমার (রা) এর কাছে অভিযোগ জানাতে আসে।

আমাদের আধুনিক সমাজে কেউ কি পারে এমন উচ্চপদস্থ কারো সাথে চাইলেই দেখা করতে? পারে না। এটাই তাহলে গণতন্ত্র? (যেখানে গুণ বা সক্ষমতা অনুসারে ক্ষমতা দেওয়া হয়) ইংল্যান্ডের সংসদে হাউজ অভ কমন্সের দিকে খেয়াল করুন। বিশ শতকের মাঝামাঝি খুব অল্প সময়ের জন্য সেখানে শ্রমজীবী লোকেরা মিলে সরকারের একটা অংশ গঠন করেছিল এবং তখন থেকেই এটা একটা রীতিতে দাঁড়িয়ে গেছে। ২০১১সালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে গার্ডিয়ান পত্রিকার একজন সাংবাদিক জানান, “১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রায় ৪০% সদস্য শারীরিক শ্রম কিংবা কেরানিগিরি করত। ২০১০সালে তার হার নেমে আসে মাত্র ৯%-এ। একই সময়ে লেবার পার্টি থেকে আসা সদস্যদের মধ্যে সাংবাদিক বা সম্প্রচারক হিসেবে কাজ করা লোকের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এগার শতাংশ সদস্য PR এবং মার্কেটিং ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, ১৯৭৯সালে এর হার ছিল প্রায়শূন্য। সরকারী দলের ষাট শতাংশ মন্ত্রী, কনজারভেটিভ পার্টির ৫৪% সদস্য এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে আসা ৪০% সদস্য বৈতনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করেছেন, যেখানে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৭শতাংশ মানুষ এ সুযোগ পায়।”[৩]

একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর `অনুদান’এর প্রভাব এবং আভিজাত্যের অভিযোগও আছে প্রচুর।[৪]

এবার সাহাবীদের (রা) স্বর্ণযুগের সাথে একে মেপে দেখি। শাসনব্যবস্থার পদ নির্ধারণে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থাকে গোনায় ধরা হতো না তখন। যেমন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) ছিলেন যুদ্ধ পরিচালনায় অত্যন্ত দক্ষ এবং পারদর্শী। কিন্তু তিনি ইসলাম কবুল করার পর রাসূল (সা) কিছুদিন অপেক্ষা করে তাঁর বিশ্বস্ততা যাচাই করে নিয়ে তার পর সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব দিলেন। অর্থাৎ তাঁকে আস্থা অর্জন করে নিতে হয়েছিল। আবার ঊমার (রা) খলিফা হওয়ার পর খালিদ (রা)কে কৌশলগত কারণে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন, যদিও খালিদ (রা) এর অর্জন এবং জনপ্রিয়তা তখন ছিল উত্তুঙ্গে। মুসলিমদের জন্য যোগ্যতাই ছিল সে সময়কার নিয়ন্তা, সামাজিক অবস্থান নয়। অথচ এসব ঘটেছে এমন এক সমাজে, এমন এক যুগে যেখানে কোনো ব্যক্তিকে তার বংশপরম্পরা বা সামাজিক প্রতিপত্তি অনুযায়ী নেতৃত্ব দেওয়াই ছিল ঐতিহ্য।

ইসলামী জনকল্যাণ ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। এখানে ধর্মীয় বিধানেই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে কারা এবং কখন দান খয়রাত পাওয়ার যোগ্য। অথচ বর্তমান শাসনব্যবস্থায় সরকার তার খেয়াল খুশি মতো ঠিক করে দিচ্ছে কোন কোন ব্যক্তি বা পরিবার রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা পেতে পারে। এই ব্যবস্থার ব্যর্থতার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক অর্থ কেলেঙ্কারিতে- যেখানে দেখা যায় ধনী এমপিরা এমন একটি ব্যবস্থা থেকে লভ্যাংশ আদায় করছে যেটি কেবল তাদের জন্যই বিদ্যমান।

খলিফা উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এর শাসনামলে তাঁর কন্যা উম্মুল মু’মিনীন হাফসা (রা) বাবার বাড়ি এসে দেখলেন কি দুরবস্থায়ই না কাটছে খলিফার দিনকাল! হাফসা (রা) বললেন, “নিশ্চই আল্লাহ আমাদেরকে প্রচুর পরিমাণে দান করেছেন। এবং তিনি আপনার জন্য যে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন তা পর্যাপ্ত থেকেও বেশি। আপনি তো চাইলেই এখন যা খাচ্ছেন তার চেয়েও নরম কিছু খেতে পারতেন! গায়ে জড়াতে পারতেন আরও কোমল কোনো পোশাক!” উমার (রা) জবাবে বললেন, “তোমার এই কথার বিচার এখন তুমিই করবে।” এই বলে তিনি তাঁর মেয়েকে স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলেন হাফসা (রা) যখন রাসূলﷺ এর সাথে ছিলেন, তখন আল্লাহর রাসূলﷺ কীভাবে জীবনযাপন করেছেন। কত কষ্টের সাথে দিন অতিবাহিত করতেন তিনি। অতীতের কথা স্মরণে এসে হাফসা (রা) কান্নায় ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত উমার (রা) সেসব দিনের কথা বলে চললেন। তিনি আরও বললেন, “আমার দুইজন সাথী (মুহাম্মাদ ﷺ এবং আবুবকর (রা) ছিলেন। তাঁরাও এভাবে কষ্ট করে গেছেন। আমার আশা, যদি আমিও তাঁদের মতো করে চলি, তাহলে আমিও তাঁদের সাথে উপভোগ্য ,সহজ এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় এক জীবনে যোগ দিতে পারব।” এটা ছিল তখনকার ঘটনা, যখন মুসলিম উম্মাহ র হাতে এসেছে অপ্রতুল সম্পদ। পুরো বিশ্বের বড় বড় সাম্রাজ্য আর তাদের সম্পদ আসছিল মুসলিমদের অধীনে।[৫] আর এমনই ছিল সেই সাম্রাজ্যের নেতার চালচলন!

মুসলিমদের ট্যাক্স বা রাজস্ব ব্যবস্থা হিসেবে আছে যাকাত। এটি এমন এক রাজস্ব আদায় পদ্ধতি, যা স্রষ্টা কর্তৃক নির্ধারিত। এ পদ্ধতি অনুসারে যাকাতের শর্ত পূরণ করা প্রত্যেকেই যাকাত দিতে বাধ্য। এখানে আইনের এমন কোনো ফাঁকফোকর নেই যা গলে একজন সম্পদশালী বের হয়ে যেতে পারবে। অথচ বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা এমন যে, সম্প্রতি প্রকাশ হওয়া ‘পানামা পেপারস’ এর মতো ট্যাক্স ফাঁকির খবরগুলোতেও আমরা আর তেমন অবাক হই না। সমাজের এলিট বা অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা যে ভিন্ন এক জগতে বাস করে, এতদিন এমনই ছিল আমাদের ধারণা। প্রকাশিত নথিপত্রগুলো সেই সন্দেহকেই সত্যায়িত করেছে কেবল।[৬] তাই যখন দেখা গেল যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বহু রাজনৈতিক নেতা এই কোম্পানির সাথে জড়িত, কারো মনেই তেমন বিস্ময় জাগেনি। অথচ যখন কোনো সম্প্রদায় যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, আবুবকর (রা) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। সে তুলনায় যুক্তরাজ্য সরকারের গুগলের কাছ থেকে ১৩০ মিলিয়ন ইউরো রাজস্ব আদায় নিতান্তই তুচ্ছ।

এই জায়গায় এসেই আমাদেরকে শরীয়াহ আইনের বর্বরতার প্রমাণাদি নিয়ে বয়ান শুনতে হয়। তখন মুসলিমদের পক্ষ থেকে গতানুগতিক পাল্টা যুক্তি হিসেবে সাধারণত তুলে ধরা হয় কোন কোন ক্ষেত্রে শরীয়াহ আইন  কার্যকর করা হয় না। কিন্তু এসব অন্যায়ের গভীরতা নিয়ে কিংবা এদের স্বাভাবিকীকরণ (যেমন ভার্চুয়াল জগতের ব্যভিচার) নিয়ে কোনো কথা হয় না।

শুধু তাই না ইসলামী বিচারিক আইনকে ঘিরে আরও অনেকগুলো ব্যাপারে লক্ষ্য করার আছে, তর্ক করার সময় দণ্ডের বিধানগুলোকে আমরা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করি না। দেখি আমাদের বুঝ মতো কোনটা কঠোর, তা। যা নিতান্তই যার যার মানসিক ব্যাপার। এর কারণ হচ্ছে এই, ইতিহাসে ব্যভিচারীদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর করা হয়েছিল, শাস্তির ব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্তের জোর দাবি ওঠার পরে। (এখানে আমরা প্রতিষ্ঠিত মুসলিম দেশগুলোর কথা বলছি, স্বঘোষিত কোনো পালের গোদার কথা নয়)। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিঃ) এটাই বলেছেন, যা পরবর্তীতে শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহিঃ) নিশ্চিত করেছেন।

ইসলামী দণ্ডবিধি অপরাধীদের বেনেফিট অব ডাউটের সুবিধা এতোটাই দেয় যে এটাকে অনেক সময় বাড়াবাড়ি মনে হয়।উদাহরণ হিসেবে রাজদ্রোহের কথা বলা যেতে পারে। এটাকে ইসলামী আইনে ধর্মত্যাগের কাতারে ফেলা হলেও সুনিশ্চিত না হয়ে এ আইনের প্রয়োগ করা হয় না। আবার ধর্মত্যাগী হওয়ার সহায়ক পরিবেশ কিংবা এমন পরিবেশ যা ধর্মত্যাগকে উৎসাহিত করে তা কোনোভাবেই ইসলামী বিধান দ্বারা সমর্থিত হতে পারে না।[৭]

পশ্চিমা দেশগুলোতে বসবাসকারী মুসলিমদেরকে যে ইসলামী দণ্ডবিধি মেনে চলার কারণে লাঞ্ছিত করা হয়, তা না। তাদের তো সে সুযোগও নেই যেহেতু তারা থাকেই অন্য আইনব্যবস্থার অধীনে। বরং তারা রাত-দিন তিরস্কৃত হয় কেবল মাত্র আল্লাহর ওপর তাদের বিশ্বাসের কারণে। তাই যারা শরিয়াহ আইনকে ঘৃণা করে তারা মুসলিমদের বোঝাতে চায় যে তারাই সঠিক। এটাকে মুসলমানদের একটি আদর্শিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া উচিত। যেমন ইসলাম কী আসলেই আল্লাহপ্রদত্ত বিধান? তর্কের মাঠে ইসলামী আইনের ঐশ্বরিক হওয়ার দৃঢ় ধারণার সামনে ‘মানবাধিকারের’ সতত পরিবর্তনশীল মানদণ্ড বেশীক্ষণ টিকে থাকতে পারে না। এখন পর্যন্ত কেউ এর জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াতে পারেনি, পারবেও না। অনেকটা এভাবে বলা যায়, আপনি কাউকে এ কথা মানাতে পারবেন না যে, আপনার ভিজে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল বলেই বৃষ্টি হয়নি।

সবশেষে বলা যায়, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যারাই ইসলামকে আধুনিকায়ন করতে চায় অথবা সামাজিক অবস্থার সাথে মিলিয়ে ইসলামকে বদলে নিতে চায়, তাদের নিজেদেরকেই আগে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে স্রষ্টার নির্ধারিত আইন বলতে তারা কী বোঝে। পাশাপাশি যদি কেউ (শুধু ইতিহাসের ঘটনাগুলো ছাড়া বাস্তব উদাহরণ দিয়ে) ইসলামী শরীয়াহর সুবিধাদি না বুঝতে পারে তবে তার এই ভেবে স্বস্তি পাওয়া উচিৎ যে, মানুষের উপলব্ধি করার ক্ষমতারও একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে। ঠিক চোখের দৃষ্টিসীমার মতো, একটা ছোট বলয় পর্যন্ত। সুতরাং যুক্তি দিয়ে আমরা ততটুকুই বিচার করতে পারি যতটুকু আমরা আসলে বুঝতে পারি। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর পরিমাণ খুবই সামান্য।

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থাবলি

[1] আল কুরআন, [সূরা বাকারাহ (২): ৬-৭]

[2] Uyoon Al-Akhbaar (1/55) and Mahd As-Sawaab (2/579)

[3] https://www.theguardian.com/commentisfree/2011/dec/29/working-class-leaders-politicians

[4] https://www.theguardian.com/politics/2015/mar/21/revealed-link-life-peerages-party-donations

[5] কিতাবুয যুহুদ – ইমাম আহমাদ

[6] https://www.bbc.com/news/business-35979313

[7] https://www.islam21c.com/islamic-law/doubt-in-islamic-law-a-history-of-avoiding-punishment/


উৎস: Islam21C (মূল আর্টিকেল লিংক)

অনুবাদক: মাহমুদ বিন আমান

অনুবাদ কপিরাইট © মুসলিম মিডিয়া

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive