আমরা অনেক সময়ই অভিযোগ করে থাকি, দু’আ করছি কিন্তু দু’আ ক্ববুল হচ্ছে না। এই অবস্থা আমাদের মাঝে তীব্র হতাশারও সৃষ্টি করে। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি যে, আমাদের কোনো কাজই হয়তো বা আমার দু’আ ক্ববুলের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করছে? আমরা নিজের হাতেই আমাদের দু’আ ক্ববুলের রাস্তা বন্ধ করে দিচ্ছি কি না?

আসুন নিচের হাদীসটি একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করি:

IIRT Arabic Intensive

রাসূল ﷺ এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে বের হয় এবং তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে ও কাপড় ধূলোবালিতে ময়লা হয়ে আছে। অতঃপর সে নিজের দুই হাত আকাশের দিকে তুলে ধরে ও বলে, “হে রব, হে রব!” অথচ তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, সে হারামভাবে লালিত-পালিত হয়েছে; এ অবস্থায় কেমন করে তার দু‘আ কবূল হতে পারে? [মুসলিম, ১০১৫]

এই হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, হালাল উপার্জন দু’আ ক্ববুলের অন্যতম প্রধান শর্ত। এখন আমাদের উপার্জনে কি হারাম কিছু মিশ্রিত আছে? আমরা কি নিজের অজান্তেই ভয়ংকর কোনো গুনাহতে লিপ্ত আছি?

আজকে আমরা এমনই একটা বিষয় নিয়ে কথা বলব, যেটার মাঝে আমরা হয়তো এতটাই আকণ্ঠ নিমজ্জিত আছি যে, আল্লাহ্‌র দৃষ্টিতে এটার ভয়াবহতার ব্যাপারে সচেতনই নই। সেটা হলো রিবা (সুদ)।

এ ব্যাপারে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলছেন,

হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো। অতঃপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না করো, তবে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। [সূরাহ আল-বাকারাহ ২:২৭৮-২৭৯]

অধিকাংশ স্কলারদের মতে, এমন কঠিনতম অভিব্যক্তি কুরআনে আর কোথাও আর কোনো গুনাহের ব্যাপারে বলা হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা মুসলিমরা শূকরের মাংস না খাওয়ার ব্যাপারে, মদ্যপান না করার ব্যাপারে যতটা সচেতন, এই ব্যাপারে ঠিক ততটাই বেখেয়াল কেন?

এটার অনেকগুলো কারণ আছে। তার মাঝে একটা কারণ হচ্ছে রিবার সংজ্ঞার ব্যাপারে আমাদের জ্ঞান খুবই অপ্রতুল। এখন কিসে রিবা হয় সেটা যদি আমরা বুঝতেই না পারি, তাহলে সেটা থেকে বিরত থাকব কীভাবে? বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমাদের চেষ্টা থাকবে সুদের সংজ্ঞাটা সহজ ভাষায় বোঝা, এবং মুনাফার সাথে এর পার্থক্যটা তুলে ধরা। তবে তার আগে একটা বিষয় আমাদের খুব ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে—আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা রিবা নিষিদ্ধ করেছেন মূলত আমাদের অর্থনৈতিক জীবনটাকে সহজ করার জন্য। তাই আজকে আমরা রিবার সংজ্ঞা বোঝার চেষ্টা করব একদমই অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আমরা বোঝার চেষ্টা করব, কখন একটা সমাজে রিবা প্রসারতা লাভ করে।

দৃশ্যপট: ১  

মনে করুন আপনি খুব বিপদে পড়েছেন, আপনার বেশ কিছু টাকার খুব দরকার। এখন আপনার লোকালয়ে চেনাজানা একজন ব্যক্তিই আছে, যে টাকা ধার দেবে, শর্ত হচ্ছে সুদের হার হচ্ছে ১০%। তখন আপনি কী করবেন? আপনার আর কোনো উপায় নেই। যে ব্যক্তি ১০% সুদে ঋণ দিচ্ছে, আপনি তার কাছেই যাবেন।

দৃশ্যপট: ২

এখন আরেকটি দৃশ্য কল্পনা করুন। এখন আপনার লোকালয়ে ২ জন ব্যক্তি আছে ধার দেওয়ার মতো। একজন ৮% হারে দিচ্ছে, আরেকজন ১০%। আপনি নিঃসন্দেহে যে ৮% হারে দিচ্ছে, তার কাছে যাবেন। টাকা এখন আগেরবারের চেয়ে একটু কম দুষ্প্রাপ্য।

দৃশ্যপট: ৩

এবার ভাবুন এমন একটা পরিস্থিতি, যেখানে প্রচুর মানুষ আপনাকে বিনা সুদে ধার দিতে রাজি আছে। আর কিছু মানুষ আছে, যারা ২-৩% সুদ ছাড়া আপনাকে ধার দেবে না। তখন কি আপনি রাজি হবেন সুদ দিতে, যেখানে সুদ ছাড়াই আপনি টাকা ধার পাচ্ছেন? নিশ্চয়ই না।

তাহলে আমরা কী বুঝলাম?

একটা এলাকায় বা সমাজে টাকা যত দুষ্প্রাপ্য হয়, সুদের হার তত বাড়তে থাকে।

দৃশ্যপট: ৪

আসুন এবার একটু অন্যরকম একটা পরিস্থিতি চিন্তা করি। এই সমাজে টাকার কোনো অভাব নেই, কিন্তু টাকা ইস্যু করার ক্ষমতা বা সমস্ত টাকার নিয়ন্ত্রণ শুধু একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাঝেই সীমাবদ্ধ। সেক্ষেত্রে তারা যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে সুদ ছাড়া কাউকে টাকা ধার দেওয়া হবে না, তাহলে টাকার পরিমাণ অঢেল থাকা সত্ত্বেও টাকা দুষ্প্রাপ্যই রয়ে যাচ্ছে।

এখান থেকে আমরা শিখলাম:

টাকার পরিমাণ অঢেল, এমনকি প্রয়োজনের অতিরিক্ত থাকা সত্ত্বেও যদি সব টাকার নিয়ন্ত্রণ কোনো গ্রুপ বা সিন্ডিকেটের মাঝে কুক্ষিগত থাকে, তাহলেও সেই সমাজে সুদ ছাড়া টাকা পাওয়া অসম্ভব হয়ে যেতে পারে।

তাহলে আমরা বুঝলাম, মূলত টাকার দুষ্প্রাপ্যতাই সুদভিত্তিক লেনদেনকে সম্ভব করে তোলে। এককথায় যখন টাকার ডিমান্ডের তুলনায় সাপ্লাই কম হয়, তখনই সুদের হার বেড়ে যায়।

যদি সিস্টেমটা এমন হয় যে, সেখানে টাকা ছাড়া কোনো লেনদেন করা সম্ভব না, তবে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয় পড়ে। কারণ, তাতে টাকার ডিমান্ড আরও বেড়ে যায়। যাদের কাছে অতিরিক্ত টাকা আছে কিংবা টাকা সাপ্লাইয়ের ক্ষমতা যাদের হাতে, তারা এটার সুযোগ নিয়ে সুদের হার বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু যদি এমন হয় যে কিছুটা হলেও বিনিময়-অর্থনীতি বিদ্যমান (অর্থাৎ মানুষ তার কাছে থাকা টাকা ছাড়া অন্যান্য সম্পদ যেমন: গবাদি পশু বা কৃষিপণ্য এগুলোর বিনিময়ে তার কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পেতে পারে), তাহলে টাকার ডিমান্ড কমে যায়। যাদের কাছে টাকা নেই, টাকার নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী তাদের অবস্থার সুযোগ অতটা নিতে পারে না।

এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়—যারা সুদ নেয়, তারা কিন্তু কোনো ভ্যালু অ্যাড করে না। মানে কোনো উপযোগ বৃদ্ধি করে না। তারা স্রেফ দুটি অবস্থার সুযোগ নেয়। হয় টাকার সাপ্লাইয়ের চেয়ে ডিমান্ড বেশি, নয়তো টাকার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। এই বিষয়টা আমরা মাথায় রাখব, সুদের সাথে প্রফিটের পার্থক্য বুঝতে আমাদের কাজে লাগবে ইনশা আল্লাহ্‌।

এতক্ষণ ধরে আমরা বোঝার চেষ্টা করলাম যে কখন একটা সমাজে সুদ বিরাজ করে। কিন্তু এটা থেকে কি প্রকারান্তরে আমরা বুঝলাম যে, সুদ কী?

বিনিময়ের মাধ্যমের (তথা টাকার) ডিমান্ড যদি সাপ্লাইয়ের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে অতিরিক্ত টাকার মালিক/টাকার নিয়ন্ত্রকরা একটি অতিরিক্ত চার্জ আদায় করে থাকেএটিই সুদ

সহজ ভাষায় একে আমরা একটা সেতুর টোলের সাথে তুলনা করতে পারি। টোল না দেওয়া পর্যন্ত যেমন ব্রিজ পার হওয়া যায় না, সুদ না আদায় করা পর্যন্ত টাকার মালিক/নিয়ন্ত্রকরা বাজারে টাকা ছাড়ে না।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, সুদ জিনিসটাতে ঝামেলা কোথায়। কেন এটা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।

আমরা যদি এতক্ষণ ধরে বর্ণিত সুদের সংজ্ঞা বুঝে থাকি, তাহলে বুঝব যে এতে বিনিময়ের মাধ্যম আরও দুর্লভ হয়ে যায়। ঠিক যেন ব্রিজটার মতো। যারা টোল দিতে পারে না, তারা ব্রিজ পার হতে পারে না। যখন বিনিময়ের মাধ্যম থাকে না, কিংবা সুদ দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না, তখন মানুষের লেনদেন করার ক্ষমতা কমে যায়। আর যখন মানুষ লেনদেন করতে পারে না, তখন সমাজে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্তিমিত হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেহেতু একটা সমাজের চালিকাশক্তি, তাই তখন সমাজটাই স্থবির হয়ে পড়ে। ঠিক যেন আমাদের শরীরের মতো। যখন রক্ত চলাচল করতে পারে না, তখন প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অন্যান্য উপাদান শরীরের জরুরি অংশগুলোতে পৌঁছাতে পারে না এবং আমরা নানারকম রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হই। রিবা বা সুদ তাহলে শরীরের রক্ত তথা বিনিময়ের মাধ্যমকে জমাট বাঁধিয়ে দেয়, এটার অবাধ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।

এখানে লক্ষণীয়, অন্য যেকোনো পণ্যের (যেমন: ভাত, ডাল, পোশাক-আশাক সবকিছুর) দামই এভাবে নির্ধারিত হয় এর আপেক্ষিক ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয়ের ওপর নির্ভর করে। যদি ডিমান্ড সাপ্লাই এর চেয়ে বেশি হয়, তাহলে দাম বেশি। আর সাপ্লাই ডিমার চেয়ে বেশি হলে দাম কম … এভাবে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে যে ‘টাকার দাম’ও এভাবে নির্ধারিত হলে সমস্যা কোথায়? সুদকে আমরা ‘টাকার দাম’ হিসেবে চিন্তা করতেই পারি।

এখানেই আল্লাহ্‌র বিধানের প্রাসঙ্গিকতা এবং প্রজ্ঞা।

ইসলামে মুদ্রাকে আর দশটা পণ্যের মতো বিবেচনা করা যাবে না, কারণটা আমরা আগেই বলেছি। বিনিময়ের মাধ্যম জোগাড় করতেই যদি মানুষকে দাম দিতে হয়, তাহলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনেক স্থবিরতা আসবে। মানুষের দক্ষতা, যোগ্যতা ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও সে কোনো লেনদেন করতে পারবে না। কারণ, তার কাছে পর্যাপ্ত মুদ্রা নেই এবং সুদ দিয়ে মুদ্রা জোগাড় করার মতো সামর্থ্যও নেই। একটা ছবির সাহায্যে আমরা ব্যাপারটা আরও ভালো বুঝতে পারব ইনশা আল্লাহ্‌।

এখন আমরা কীভাবে জানি যে, ইসলামে মুদ্রাকে আর দশটা পণ্যের মতো ব্যবহার করা যাবে না? উত্তর হচ্ছে সহীহ হাদীস থেকে।

উবাদাহ বিন সামিত (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “সোনার দ্বারা সোনা, রুপার দ্বারা রুপা, গমের বদলে গম, যবের বদলে যব, খেজুরের বদলে খেজুর ও লবণের বদলে লবণ লেনদেন (কম-বেশি না করে) একই রকমে সমপরিমাণে ও হাত বাঁ হাত অর্থাৎ নগদে বিক্রয় চলবে। যখন ওই বস্তুগুলোর মধ্যে প্রকারভেদ থাকবে, তখন নগদে তোমরা ইচ্ছানুযায়ী বিক্রয় করো। (মুসলিম, ১৫৮৭)

আপাতদৃষ্টিতে এই হাদীসটি খুবই বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। যদি আমি নগদে এবং সমান পরিমাণে লেনদেন করি, তাহলে সেই লেনদেনের অর্থটা কী! আর এমন অর্থহীন লেনদেন নিষিদ্ধ করারই-বা কী দরকার! কিন্তু আমরা যদি হাদীসটি গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করি এবং মুদ্রার অবিশেষায়িত রূপের (Non standardized Nature of money) কথা বিবেচনায় রাখি, তাহলে বুঝব যে হাদীসে উল্লেখিত পণ্যগুলো আসলে তখন মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। হাদীসটি আসলে ইসলামে মুদ্রার ব্যাপারে মূলনীতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে!

বিনিময়ের মাধ্যম থেকে সুবিধা আসলে দুইভাবে নেয়া যায়। দেরিতে শোধ করার সুযোগ থাকলে অথবা লেনদেনের সময় খারাপ কোয়ালিটি আর ভালো কোয়ালিটির পরিমাণের মাঝে কমবেশি করার মাধ্যমে। বিনিময়ের মাধ্যম থেকে সুবিধা নেয়ার সকল সম্ভাব্য রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে এই হাদীস।

এই হাদীসে উল্লেখিত নিষেধাজ্ঞার সীমারেখা শুধু এই ছয়টি পণ্যের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ কি না, এ নিয়ে ফকীহদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতটি হলো, স্কলারগণ ওপরের ছয়টি পণ্যকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন এদের  বিচার্য বিষয়ের (Cause of Judgment) ওপর ভিত্তি করে।

সোনা ও রুপা বাদে বাকি চারটি পণ্যের ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় (Cause of Judgment) হবে এদের ওজন বা পরিমাণ; তা ছাড়াও এটা ভক্ষণযোগ্য হতে হবে। আর সোনা ও রুপার ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় হচ্ছে মূল্য। কেন? কারণ, আমাদের কমন সেন্স থেকেই আমরা বুঝি যে, সোনা ও রুপার বৈশিষ্ট্য অন্য চারটি পণ্য থেকে একটু আলাদা। আমাদের সমকালীন উদাহরণ থেকে বুঝতে পারি যে, দুই টাকার কয়েন ও  দুই টাকার নোটের ওজন আলাদা হলেও এদের বাজারমূল্য একই।

সামগ্রিকভাবে লেনদেন-সংক্রান্ত যে হাদীসগুলো আমরা পাই, সেখান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে

লেনদেনের ধরন শর্ত
টাইপ ও আইটেম দুইটাই একই

যেমন: সোনার সাথে সোনা।

·       নগদ লেনদেন হতে হবে এবং পরিমাণ একই হতে হবে, যেন সেটার জন্য কোনো ‘দাম’ রাখার কোনো সুযোগই থাকে না। অর্থাৎ বাকিতে লেনদেন করার বা পণ্যের গুণগত মান, পরিমাণ এগুলো কোনোকিছু কমবেশি করার সুবিধা দেওয়ার/পাওয়ার মাধ্যমে কেউ যেন কোনো লাভ না করতে পারে।
টাইপ একই কিন্তু আইটেম ভিন্ন

যেমন: সোনার সাথে রুপা

·       শুধু নগদ লেনদেন হতে হবে, পরিমাণ ভিন্ন হলে সমস্যা নেই কারণ, মূল্যমান ভিন্ন হওয়াতে পরিমাণে কম-বেশি নিয়ে কোনো সুবিধা নেয়া হচ্ছে না।
টাইপ ও আইটেম ২টাই ভিন্ন

যেমন, সোনার সাথে লবণ

·       এ ক্ষেত্রে একটি মুদ্রা এবং আরেকটি পণ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তখন মুনাফা করতে অসুবিধা নেই, তাই বাকিতেও লেনদেন করা যাবে, পরিমাণও কমবেশি করা যাবে তবে এটা মাথায় রাখতে হবে যে, যেকোনো একটি প্রদানে বিলম্ব করা যাবে; দুটোই নয়। অর্থাৎ, কোনো লেনদেন করার সময় হয় দাম দেওয়া দেরি করা যাবে, নয়তো পণ্য পৌঁছে দেওয়া। দুটোই দেরি করা যাবে না।

 

তাহলে কোন কোন লেনদেনে সুদ হয় না?

তবে এখানে আমাদের অবশ্যই একটা বিষয় বুঝতে হবে যে, লেনদেনের প্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে যে অর্থনীতিতে আমরা বাস করছি সেটার স্বরূপের ওপর। যদি ওই এলাকায় লবণ এবং রুপা এই দুটাই মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে লবণ এবং রুপার লেনদেনও নগদ হতে হবে। যদি তা না হয়, তাহলে রুপাকে মুদ্রা এবং লবণকে সাধারণ পণ্য ভাবতে হবে। কারণটা আমরা আগেই বলেছি, আবারো বলছি যে, সোনা ও রুপার ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় (Cause of judgment) এবং অন্য ৪টা দ্রব্যের ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় একই না। ঐতিহাসিকভাবে সোনা এবং রুপা মূলত মুদ্রা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

এই হাদীসটা আমাদের সাধারণ মূলনীতি জানিয়ে দিচ্ছে। তাই যদিও আমরা এখন সোনা বা রুপা কোনোটাই মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করি না, তবুও আমাদের সময়ে প্রচলিত মুদ্রা তথা ডলার, রিঙ্গিত, টাকা এগুলোর ক্ষেত্রে এই হাদীসে উল্লেখিত মূলনীতি প্রয়োগ করতে হবে। আবার যেহেতু এই হাদীসে নাম ধরে ৬টা দ্রব্যের নাম এসেছে, তাই সোনা, রুপা ইত্যাদির ক্ষেত্রে হাদীসে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ আক্ষরিক এবং পারিভাষিক দুইভাবেই এই হাদীস আমাদের মেনে চলতে হবে; আমাদের পরিবর্তিত সময়েও।

এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কি এই হাদীসের কোনো প্রয়োগ আছে? অবশ্যই!

আমরা যদি দুটো দেশের মুদ্রার মাঝে লেনদেন করতে চাই, যেমন ডলার আর টাকা, তাহলে এক্সচেঞ্জ রেট অনুসারে আমরা লেনদেন করতে পারি, কিন্তু সেটা হতে হবে নগদ।

আমরা অনেক সময় ভাংতি টাকা খুঁজে থাকি। ভাংতি টাকা দেওয়া নিয়ে কোনো ব্যবসা করা যাবে না; কারণ, সেটা একই ধরনের মুদ্রা।

ঈদের সময়ে আমরা পুরোনো নোটের বদলে নতুন নোট নিয়ে থাকি, তখন পরিমাণে কমবেশি করি, যেটা করা যাবে না।

পুরোনো সোনার গয়নার সাথে নতুন গয়না আদান-প্রদান করে পার্থক্যটা টাকায় শোধ করা যাবে না।[1]

মুনাফা:

রিবা নিয়ে তো অনেক কথাই হলো। এখন নিশ্চয়ই আমাদের জানতে ইচ্ছা করছে যে, মুনাফা কী। সুদ আর মুনাফার মাঝে পার্থক্যটাই-বা কী।

মুনাফার কন্সেপ্ট বুঝতে হলে আমাদের আগে বুঝতে হবে প্রান্তীয় উপযোগের কন্সেপ্ট। প্রান্তীয় উপযোগ (Marginal Utility) হচ্ছে কোনো বস্তুর একটা ইউনিট ভোগ করা হলে অতিরিক্ত যে উপযোগ পাওয়া যায়, সেটা। অর্থাৎ কমলা খাচ্ছি এই অবস্থায় একটা কমলা খেলে যে অতিরিক্ত উপযোগ পাব, তাকে বলে প্রান্তীয় উপযোগ।

একটু খেয়াল করলেই আমরা বুঝব যে, কোনো জিনিস ভোগ করতে থাকলে সেটার প্রান্তীয় উপযোগ কমতে থাকে।  অর্থাৎ কমলা যদি আপনার খুব পছন্দের হয়, তাহলে প্রথম ১-২টা কমলা খেতে আপনার যত ভালো লাগবে, পরেরগুলো খেতে আরে তত ভালো লাগবে না। কমলার সংখ্যা যত বাড়তে থাকবে, সেখান থেকে প্রাপ্ত প্রান্তীয় উপযোগের পরিমাণ তত কমতে থাকবে এবং একসময় তার পরিমাণ হয়ে যাবে ঋণাত্মক। মানে খেতে ভালো তো আর লাগবেই না; বরং খারাপ লাগবে/বমি আসবে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলে Law of diminishing marginal utility. নিচে একটা ছবির সাহায্যে ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করা হলো:

ছবি থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, প্রথম প্লেট ভাত থেকে কৃষকের প্রান্তীয় উপযোগ ছিল ১০০ ইউনিট। কমতে কমতে পরে তা হয়েছে মাইনাস ১০ ইউনিট। একই কথা মাছওয়ালার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এখন চিন্তা করলে দেখব যে, যেকোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এই প্রান্তীয় উপযোগ/প্রান্তীয় খরচ/প্রান্তীয় আয় এগুলোর ভিত্তিতে। যেমন: ধরুন, একটা কোম্পানি। তারা নতুন একজন শ্রমিক নিয়োগ করবে কি না, সেটা ঠিক করবে তাকে নিয়োগের ফলে বৃদ্ধি পাওয়া প্রান্তীয় খরচ (Marginal cost) এবং অর্জিত প্রান্তীয় আয়ের (Marginal benefit) মাঝে তুলনা করে। তেমনিভাবে আমরা যখন কোনো একটা কিছু কিনব কি না বা নিজের কাছে রাখব কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিই; সেটাও নিই প্রান্তীয় উপযোগের পরিমাণের ভিত্তিতে, মোট উপযোগের ভিত্তিতে নয়। ওপরের ছবিতে দেখানো কৃষক বা মাছওয়ালার মতো কোনো কিছুর প্রান্তীয় উপযোগ যখন আমাদের কাছে কমে যায়, তখন তা আমাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় লাগতে থাকে। তাই যেই জিনিসটা আমার কাছে অনেক আছে, সেই অতিরিক্ত জিনিসগুলো আমি নিজের কাছে রাখতে চাই না। এখন একটা অপশন হচ্ছে আমি এটা দিয়ে লেনদেন করতে পারি এবং বিনিময়ে এমন জিনিস পেতে পারি, যেটার প্রান্তীয় উপযোগ আমার কাছে অনেক বেশি, কিন্তু যে বিক্রি করছে তার কাছে অনেক কম। এভাবে যখন আমরা বিনিময় করছি, তখন উভয়েই লাভবান হচ্ছি।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন কৃষক এক প্লেট ভাতের বিনিময়ে একটা মাছ নিচ্ছে। যে ভাত দিলো, তার প্রান্তীয় উপযোগ তার কাছে ছিল ১০ ইউনিট। আর যে মাছটা পেল, তারটা ১০০ ইউনিট। তাহলে কাটাকাটি করার পরও তার নেট উপযোগ বৃদ্ধি পেল ৯০ ইউনিট। একই কথা মাছওয়ালার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তার কাছে মাছের প্রান্তীয় উপযোগ খুবই কম, তাই সে দিয়ে দিচ্ছে। পক্ষান্তরে ভাতের প্লেটেরটা অনেক বেশি।

লেনদেনের ফলে এই যে উপযোগের বৃদ্ধি ঘটে, এটাই হচ্ছে মুনাফা বা লাভ।

খেয়াল করলে দেখব যে, আমরা কিন্তু এখানে বিনিময় অর্থনীতির কথা বলছি, যেখানে পণ্যের সাথে পণ্যের বিনিময় হচ্ছে। এটা এখন প্রায় অনুপস্থিত বললে অত্যুক্তি হবে না। আমরা এখন বাস করি মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতিতে, যেখানে সব লেনদেনের এক দিকে থাকে মুদ্রা। আমাদের হয়তো মনে আছে যে, আমরা বলেছিলাম মুদ্রার একটি কাজ হচ্ছে মূল্যের মানদণ্ড হিসেবে কাজ করা। এখন হয়তো বিষয়টা ক্লিয়ার হয়েছে। আমরা যদি সব লেনদেনে পণ্যের বিনিময়ে মুদ্রা পেতে চাই, তাহলে একটা কমন রেফারেন্স পয়েন্ট লাগবে, যার মাধ্যমে আমার উপযোগের যে হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটেছে সেটা প্রকাশ করা যাবে। আগেও বলেছি, আবারো বলছি, মুদ্রা এখানে স্রেফ একটা তথ্য হিসেবে কাজ করছে। ধরুন আমার উপযোগ যদি ৫০ ইউনিট বেড়ে থাকে, টাকার হিসেবে সেটার মূল্য হয়তো-বা ২৫ টাকা।

কীভাবে এই মূল্য তথা দামটা নির্ধারিত হয়?

আগে আমরা দেখেছি একজন মাত্র কৃষক ও মাছওয়ালার উদাহরণ। এমন তো হতে পারে যে, বাজারে আরও মাছওয়ালা আছে, যে এক প্লেট ভাতের বিনিময়ে কেউ দুটি-তিনটি মাছ দিতে ইচ্ছুক। আবার অনেকে পোলাওর চালও বিক্রি করে।

এভাবে বাজারে কোনো জিনিসে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে কোনো জিনিসের ‘দাম’ সৃষ্টি হয়। আমরা সবাই বহুলপ্রচলিত চাহিদা ও জোগান রেখার মিথস্ক্রিয়া-সংক্রান্ত নিচের ছবিটা হয়তো দেখেছি:

বাজারে চাহিদা ও জোগানের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় যে ‘দাম’ নির্ধারিত হয়, তা কিন্তু ক্রেতা বা বিক্রেতা যে দামে কেনা-বেচা করতে রাজি থাকে, তার সমান না। ক্রেতা যত দাম দেয়, জিনিসটার মূল্য তার কাছে এর চেয়ে বেশি। একই কথা বিক্রেতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেও আসলে এর চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে রাজি ছিল। বাজারের উপস্থিতির জন্য তাদের যে লাভ হলো, সেটা নিচের ছবিতে বোঝানোর চেষ্টা করা হলো:

ছবি থেকে আমরা বুঝতে পারছি, ক্রেতা ১০ ইউনিট দামেই দ্রব্যটি কিনতে রাজি ছিল। কিন্তু বাজারে ৫ ইউনিটেই পেয়ে গেছে। এই ৫ ইউনিট তার লাভ। একই কথা বিক্রেতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ জন্য আমরা খুব সহজ ভাষায় বলি, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্যকে মুনাফা বলে। এটার নেপথ্যের মিথস্ক্রিয়া আসলে এটা। তাহলে আমরা কী বুঝলাম?

মুনাফা = বিক্রেতা বিক্রি করে যত টাকা পেয়েছে (আয়) – যত টাকায় বেচতে রাজি ছি (খরচ)

তাহলে সুদ আর মুনাফার মাঝে পার্থক্য কি আমাদের কাছে স্পষ্ট হলো কিছুটা? মূল পার্থক্য যেটা আমাদের ব্রেইনে গেঁথে নেওয়া দরকার, সেটা হচ্ছে যে মুনাফাতে দুই পক্ষই লাভবান হচ্ছে এবং দুই পক্ষের জন্যই উপযোগ সৃষ্টি হচ্ছে (creation of Value)। এটা শুধু প্রকৃত সম্পদের (Real asset) লেনদেনেই হওয়া সম্ভব। প্রকৃত সম্পদ কী? প্রকৃত সম্পদ হচ্ছে সেই সম্পদ, যা থেকে আমরা সরাসরি কোনো উপযোগ (utility) পাই। যেমন: বাড়ি, খাবার, পোশাক-আশাক, ল্যাপটপ ইত্যাদি। আরও একধরনের সম্পদ আছে, যাকে আমরা বলতে পারি আর্থিক সম্পদ (financial asset)। আর্থিক সম্পদকে সংজ্ঞায়িত করা যায় এভাবে যে, এটা হলো প্রকৃত সম্পদের (Real asset) ওপর কারও দাবি বা claim। যেমন: শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি। অর্থাৎ এগুলো থেকে প্রত্যক্ষভাবে উপযোগ পাওয়া যায় না। পরোক্ষভাবে পাওয়া যায়। মানে আমরা এগুলোর মাধ্যমে যেসব প্রকৃত সম্পদ ভোগ করতে পারি, সেগুলো থেকে উপযোগ পাই।

এখন উপযোগ কীভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে? আগে আমরা দেখেছি, আমার কাছে কোনো সম্পদ অতিরিক্ত থাকলে সেটার অতিরিক্ত অংশটা লেনদেন করলে উপযোগ বৃদ্ধি হয়। মানে আমার কাছে কম উপযোগের কিছু বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে আমি এমন কিছু কিনতে পারি, যার উপযোগ আমার কাছে অনেক বেশি। কিন্তু এটাই কি একমাত্র উপায়?

না।

আরও আছে

আমার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আমি কোনো বস্তুর রূপান্তর ঘটাতে পারি এবং সেটা বেশি দামে বিক্রি করতে পারি। যেমন: কাপড় থেকে জামা বানাতে পারি; আটা থেকে রুটি, পিঠা। এগুলো বানিয়ে বিক্রি করতে পারি এমন মানুষদের কাছে, যাদের এগুলো করার সময়/দক্ষতা/এনার্জি নেই।

আমি কোনো জিনিসকে সহজ প্রাপ্য করতে পারি। ধরুন সুপার স্টোরগুলোতে জিনিসপত্রের দাম বেশি হয়। কারণ, সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে, সাজানোভাবে জিনিসগুলো পাওয়া যায়, অনেক কিছু একসাথে পাওয়া যায়, যেটা হয়তো এলাকার কাঁচা বাজারগুলো থেকে কেনা কষ্টকর।

এ রকম আরও উদাহরণ দেওয়া যায়।

সুদ সম্পর্কে আলোচনার প্রাক্কালে আমরা বলেছি যে, একই বিনিময়ের মাধ্যম লেনদেনের সময় কোয়ালিটি কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। ২২ ক্যারেটের সোনা আর ১৮ ক্যারেটের সোনা একই ভাবে ওজন করতে হবে। এখন কারও কাছে যদি এই কোয়ালিটির পার্থক্য থেকে উপযোগ সৃষ্টি হয়? তাহলে কী করতে হবে, সেটাও হাদীসে আমাদের বলে দেওয়া হচ্ছে:

আবু সা’ঈদ খুদরি (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) ও আবু হুরায়রা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত,

আল্লাহ্‌র রাসূল ﷺ এক ব্যক্তিকে খায়বারে তহসীলদার নিযুক্ত করেন। সে জানীব নামক (উত্তম) খেজুর নিয়ে উপস্থিত হলে আল্লাহ্‌র রাসূল ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “খায়বারের সব খেজুর কি এ রকমের?” সে বললো, “না, আল্লাহ্‌র কসম, হে আল্লাহ্‌র রসূল! এরূপ নয়, বরং আমরা দু’ সা’ এর পরিবর্তে এ ধরনের এক সা’ খেজুর নিয়ে থাকি এবং তিন সা’ এর পরিবর্তে এক দু’ সা’।” তখন আল্লাহ্‌র রাসূল ﷺ বললেন, “এরূপ করবে না। বরং মিশ্রিত খেজুর দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিরহাম দিয়ে জানীব খেজুর ক্রয় করবে।” (সহীহ বুখারি,  ক্রয়-বিক্রয়, ২২০২)

অর্থাৎ, ওই বস্তুটাকে (হোক সেটা খেজুর বা সোনা বা রুপা ইত্যাদি) একটা পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে অন্য বিনিময়ের মাধ্যমের সাথে বাজারে লেনদেন করতে হবে। তারপর যা পাওয়া যাবে, সেটা দিয়ে যতটুকু ভিন্ন কোয়ালিটির বস্তু পাওয়া যায় সেটা কিনতে হবে। সরাসরি খারাপ কোয়ালিটির বস্তুর সাথে ভালো কোয়ালিটির পরিমাণে কমবেশি করে লেনদেন করা যাবে না।

আশা করি সুদ এবং মুনাফার মাঝে মূল পার্থক্যটা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। এখন আমরা সেগুলো একটা ছক আকারে উপস্থাপন করব।

                   সুদ                    মুনাফা
কোনো উপযোগের সৃষ্টি হয় না, এক পক্ষ থেকে আরেক পক্ষের মাঝে অন্যায়ভাবে হস্তান্তর হয়। উপযোগ সৃষ্টি হয়, দুই পক্ষই লাভবান হয়।
উৎস হচ্ছে বিনিময়ের মাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ, কোনো যোগ্যতা থাকা লাগে না। উৎস হচ্ছে দক্ষতা ও যোগ্যতা।
বিনিময়ের মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, কুক্ষিগত বা জিম্মি করেই আদায় করা হয়। বিনিময়ের মাধ্যমের দুষ্প্রাপ্যতার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রকৃত সম্পদের লেনদেন ছাড়াই শুধু বিনিময়ের মাধ্যম লেনদেন করে আদায় করা সম্ভব। প্রকৃত সম্পদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে উপযোগের সৃষ্টি ছাড়া মুনাফা অর্জন সম্ভব নয়। উপযোগের সৃষ্টিটাই মূল পয়েন্ট; কারণ, উপযোগের সৃষ্টি ছাড়া শুধু প্রকৃত সম্পদের সম্পৃক্ততা মুনাফা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়।
এক পক্ষ লাভবান হয় আরেক পক্ষের দুরবস্থার সুযোগ নেয়ার মাধ্যমে। দুই পক্ষই লাভবান হয় (Win win situation)।

অনেক সময় কোনোকিছু নগদে বিক্রি করলে আর কিস্তিতে বিক্রি করলে দামের একটা হেরফের হয়, কিস্তিতে বিক্রি করলে দাম বেশি পড়ে। এটাকে অনেকে সুদের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু আসলে এটা সুদ নয়। কারণ, কিস্তিতে পাওয়ার কারণে ক্রেতা পণ্যটা পূর্ণ মূল্য শোধ করার আগে থেকেই ব্যবহার করতে পারেন, এই সুবিধার বিনিময়ে কিছু অতিরিক্ত মূল্য চার্জ করাতে কোনো সমস্যা নেই। মূল কথা হচ্ছে, বিনিময়ের মাধ্যম থেকে সুবিধা নেওয়া যাবে না, পণ্য ব্যবহার করে নিলে সমস্যা নেই। যারা বিনিময়ের মাধ্যমকে আর ১০টা পণ্যের মতোই ভাবেন, তাঁরা সুদ আর মুনাফার মাঝে পার্থক্যটা গুলিয়ে ফেলেন, যেটার কথা আল্লাহ্‌ কুরআনে বলেছেন,

তারা বলেছে,“বিক্রয়ও তো সুদ নেওয়ার মতোই।” অথচ আল্লাহ তা’আলা ক্রয়-বিক্রয়কে বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। [সূরাহ আল-বাকারাহ (২):২৭৫]

আমরা যদি বর্তমান অর্থব্যবস্থার আদ্যোপান্ত জানতে পারি, তাহলে আরও কিছু পার্থক্য আমরা বুঝতে পারব। কিন্তু আজকের আলোচনা এতটুকুই। আল্লাহ্‌ আমাদের সুদ এবং মুনাফার মাঝে পার্থক্য বোঝার এবং সেই জ্ঞানের ওপর আমল করার তাওফীক্ব দান করুন।

তথ্যসূত্র

[1] https://islamqa.info/en/49045

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive