সাহিত্যজগতে একটি বহুল প্রচলিত কথা হলো death of the author. সাহিত্যকর্ম রচনা শেষ হওয়ার সাথে সাথে রচয়িতা মৃত। মানে কবিতা লেখা শেষ করেই কবি ঠুস করে মরে গেলেন, এমন নয়। বরং তাঁর সাহিত্যকর্ম পড়ে/দেখে/শুনে/শুঁকে/স্পর্শ করে(/চেটে!) মানুষ সেটার কী অর্থ বের করবে, সেখানে সাহিত্যিকের আর কোনো হাত নেই। তাই সাহিত্যিক mean করতে চাননি, এমন অনেক অর্থও শ্রোতা/পাঠক/দর্শক…বের করে ফেলতে পারে। আবার সাহিত্যিক mean করেছেন, এমন অনেক অর্থও শ্রোতা/পাঠক/দর্শক…miss করে যেতে পারে। আবার অনেক সময় শিল্পী/সাহিত্যিকের উদ্দেশ্যই থাকে গভীর কোনো অর্থ এমনভাবে শিল্প বা সাহিত্যকর্মে encode করে রাখা, যা খুব মনোযোগের সাথে লক্ষ না করলে বা নির্দিষ্ট কোনো শাস্ত্রে একটা লেভেল পর্যন্ত পাণ্ডিত্য না থাকলে কেউ decode করতে পারবে না। Social engineering-এ এই জিনিস ভালোমতোই কাজে লাগে। শুধু শিল্পী-সাহিত্যিক না; যে কেউই এভাবে encoding-decoding এর খেলা খেলে social engineering চালাতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “আমরা সবাই রাজা” কবিতা/গানটির মাধ্যমে কী কী অর্থ mean করেছেন, তা আমাদের পক্ষে নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব না। একদম surface level-এ পাঠ করলে এটি একটি শিশুতোষ গান। শিশুতোষ গান মানে শিশুসুলভ দক্ষতা নিয়ে তৈরি করা গান নয়, গানটির মূল ভোক্তা হিসেবে শিশুদের কথা মাথায় রেখে রচিত গান। তবে এটাকে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার বন্দনা হিসেবেও পাঠ করা যায়। রাজা-প্রজার মাঝে সাম্যের/একত্বের বাণী শোনানো হয়েছে এখানে। আমি এই লেখায় গানটির একটি ধর্মতাত্ত্বিক পাঠ দেওয়ার চেষ্টা করছি। গানের লিরিক্স নিচে উল্লেখ করে দিচ্ছি পাঠকদের সুবিধার জন্য। এটি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা। লিরিক্সে কোনোরকম ভুল আছে কি না, তা যাচাই করার মতো সুযোগ আমার হয়নি।

IIRT Arabic Intensive

“আমরা       সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে–

              নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?।

আমরা       যা খুশি তাই করি,   তবু   তাঁর খুশিতেই চরি,

আমরা       নই বাঁধা নই দাসের রাজার ত্রাসের দাসত্বে–

              নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?।

রাজা         সবারে দেন মান,    সে মান    আপনি ফিরে পান,

মোদের      খাটো ক’রে রাখে নি কেউ কোনো অসত্যে–

              নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?

আমরা       চলব আপন মতে,    শেষে     মিলব তাঁরি পথে,

মোরা        মরব না কেউ বিফলতার বিষম আবর্তে–

              নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?।”

‘রাজার রাজত্ব’ বলে এখানে ঈশ্বরের সর্বময় ক্ষমতাকে স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু ‘আমরা সবাই রাজা’ বলতে বোঝানো হয়েছে যে, স্রষ্টা এবং সৃষ্টি আসলে একই অস্তিত্ব/সত্তা। এমনটা না হলে মৃত্যুর পর স্রষ্টার পরমাত্মার সাথে সৃষ্টির আত্মার একীভূত হয়ে যাওয়ার দর্শনটা মেলানো যায় না (নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?)। এই বিশ্বাসটাকে বলে সর্বেশ্বরবাদ (pantheism).

সৃষ্টিজগত (আরেকটু কমিয়ে এনে বললে ‘মানবজাতি’) কী করলো, সাওয়াবের কাজ করলো না গুনাহের কাজ করলো, এ নিয়ে স্রষ্টার কোনো concern নেই (আমরা যা খুশি তাই করি, তবু তাঁর খুশিতেই চরি,)। অনেকটা গ্রীক দার্শনিকরা যেমনটা বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর কেবলই prime mover. প্রথম ধাক্কাটা দিয়ে তিনি cause and effect এর একটি chain চালু করে দিয়েছেন, যা এখনও চলছে। একেশ্বরবাদীরা (বিশেষত মুসলিমরা) সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার যেই দাস-মনিব সম্পর্কে বিশ্বাস করে, এরকম ভয়-ভিত্তিক সম্পর্কের সাথে কবি একমত নন (আমরা নই বাঁধা নই দাসের রাজার ত্রাসের দাসত্বে)।

সব ধর্মের মূল কথাই এক, এই দর্শনটাকে বলা হয় perennial philosophy. হিন্দুদের একাংশ এবং ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বীদের মূল প্রবক্তাগণ এই দর্শনে বিশ্বাস রাখেন। যেমন- রাজা রামমোহন রায় কুরআন সহ অন্যান্য কিছু ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করে এই সিদ্ধান্তে আসেন। তাই যেকোনো ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীকে সম্মান করা মানেই ঈশ্বরকে সম্মান করা (রাজা সবারে দেন মান/সে মান আপনি ফিরে পান)। সর্ব ধর্মই সত্য বলে ‘অসত্যের অনুসারী’ (বা কাফির) বলতে কেউ নেই (মোদের খাটো ক’রে রাখে নি কেউ কোনো অসত্যে)।

এভাবে নিজ নিজ ধর্ম অনুসরণ করে জীবনযাপন করে মারা যাওয়ার পর সবাইই যেহেতু ঈশ্বরের পরমাত্মার সাথে মিশে যায় (মোরা চলব আপন মতে, শেষে মিলব তাঁরি পথে), তাই অনন্তকাল জাহান্নামে দগ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ভয়ের কিছু নেই (মোরা মরব না কেউ বিফলতার বিষম আবর্তে)।

ইওরোপিয়ান রোমান্টিক কবিদের মধ্যে এবং আমেরিকান ট্রান্সেন্ডেন্টালিস্ট সাহিত্যিকদের মধ্যেও অনুরূপ বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। অবশ্য সেখানে সর্বেশ্বরবাদ (pantheism) আর শ্বরবাদের (deism) কিছু মিশ্রণ ছিল। রোমান্টিসিজম আর ট্রান্সেন্ডেন্টালিজম তাই কেবলই নতুন একটি সাহিত্যিক চিন্তার গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে আলাদা ধর্মবিশ্বাসে পরিণত হয়। (এখানে বলে রাখা ভালো যে, ‘রোমান্টিক কবিতা’ মানে প্রেমের কবিতা না। রোমান্টিসিজম আরো বিস্তৃত একটা দর্শন। আগ্রহী পাঠকরা গুগল, উইকিপিডিয়া ইত্যাদির সাহায্য নিতে পারেন।)

যা-ই হোক, কথা হচ্ছিলো রবিঠাকুরের গান নিয়ে। তো দেখা যাচ্ছে যে, শিশুতোষ একটা গানের মধ্যে অনেকগুলো কুফরি আকীদাহ embed করে রাখা হয়েছে। হয়তো যেই মা (অথবা বুয়া অথবা ডে-কেয়ার সেন্টারের আয়া) তাঁর কোলের শিশুকে এই গান গেয়ে ঘুম পাড়াচ্ছেন, তিনি এসব mean করছেন না, বাচ্চাটারও এসব বোঝার বয়স হয়নি। কিন্তু এই গানের জায়গায় গীতা/বাইবেল/ত্রিপিটক/ইয়াসিকের কোনো অংশ ধরিয়ে দিলে কোনো মুসলিম মা/বুয়া/আয়া নিশ্চই তাঁর কোলের শিশুকে তা শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন না!

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive