“…চোখ ও হৃদয় একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত, একটি অপরটি দ্বারা প্রভাবিত হয়। যদি একটি ভালো থাকে অপরটিও ভালো থাকে, আর যদি একটি রোগাক্রান্ত হয়, অপরটিও রোগাক্রান্ত হয়।”[১]

চোখকে বলা হয় হৃদয় বা ক্বলবের সদর দরজা। হৃদয় নানাভাবে পাপের সম্মুখীন হয়। আর অধিকাংশ পাপের সূত্রপাত হয় চোখের দ্বারা। আত্মিক পরিশুদ্ধি লাভে ক্বলব বা হৃদয়ের পরিশুদ্ধি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

“…মনে রেখো, শরীরের ভেতরে এক টুকরো মাংসপিণ্ড আছে, যখন এটা ভালো থাকে, সমস্ত শরীর ভালো থাকে; যখন এটা আক্রান্ত হয়, সমস্ত শরীর আক্রান্ত হয়। আর সেটা হলো ক্বলব।” (মুসলিম, হাদিস নং ১৩৩)

আল্লাহ বলেন, “চোখের অপব্যবহার ও হৃদয়ে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত।” [সূরা গাফির (৪০): ১৯]

হৃদয়ের এই দরজা যত সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা যাবে, পাপের প্রতি নাফসের প্রলুব্ধি তত সহজে কমানো যাবে।

কোন কোন ক্ষেত্রে দৃষ্টি সংযত রাখবো?

১) পুরুষ বা নারীর আওরাহর প্রতি দৃষ্টিপাত না করা, নন মাহরাম নারীর সৌন্দর্যও এর অন্তর্গত। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল নির্দেশ দিয়েছেন,

“মুমিন পুরুষদের বলো যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। আর মুমিন নারীদেরকে বলো, যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না।…” [সূরাহ আন-নূর (২৪): ৩০-৩১]

“আল্লাহ তাঁর কিতাবে দৃষ্টি অবনত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যা দুই ধরনের: প্রথমটি হলো কারো আওরাহর দিকে না তাকানো। দ্বিতীয়টি হলো নন-মাহরাম নারীর দিকে না তাকানো। দ্বিতীয়টি প্রথমটির থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমনটি তুলনা করা যায় মৃত গাধা বা রক্ত খাওয়ার সাথে মদ খাওয়াকে; মদ্যপানকারী হাদ্দ শাস্তি পাবে, কেননা, অপরগুলো ততটা আকর্ষনীয় নয় যতটা আকর্ষনীয় হলো মদ।”[২]

২) অপরের ঘরের ভেতর বিনা অনুমতিতে দৃষ্টিপাত না করা

“দৃষ্টি সংযত রাখা অপরের আওরাহর দিকে না তাকানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং, অপরের ঘরের ভেতরে তাকানোও এর অন্তর্গত। একজনের গৃহ তাকে সংরক্ষিত রাখে, যেমনটি পোশাক তার দেহকে সংরক্ষিত রাখে। আল্লাহ তা’আলা দৃষ্টি অবনত করার আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে অপরের গৃহে প্রবেশের অনুমতির আয়াত বর্ণনা করেছেন।”[৩]

৩) অপরের সম্পদ, স্ত্রী, সন্তান, দুনিয়াবী অর্জন, ইত্যাদির প্রতি  খেয়াল না করা

আল্লাহ বলেন, “আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে ভোগ বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি তার প্রতি তুমি কখনও তাকিও না; তাদেরকে যা দেওয়া হয়েছে সেই জন্য তুমি ক্ষোভ করো না; মু’মিনদের জন্য তোমার বাহুকে অবনমিত কর।” [সূরা আল-হিজর (১৫): ৮৮]

এসব ক্ষেত্রে অনেকে নিজের অজান্তে অন্যের ওপর হিংসাবশত বা হিংসা ছাড়াই বদ নজর দিয়ে ফেলে যা উভয়ের জন্যই ক্ষতিকারক। কারণ, যার ওপর বদনজর ফেলা হলো সে যদি এ থেকে অরক্ষিত থাকে, তবে সে এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যদি রক্ষিত থাকে তবে তা দৃষ্টিপাতকারীর দিকে ফিরে এসে উল্টো তাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এজন্য হিংসা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং উত্তম যে কোনো কিছু চোখে পড়লে বারাকাহর দু’আ করতে হবে। (আল্লাহুম্মা বারিক লাহু, কিংবা মা শা আল্লাহও বলা যায়।)

কীভাবে দৃষ্টি সংযত রাখতে পারি?

১) নন-মাহরাম নারীদের দিকে না তাকানো, এমনকি অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টির ব্যাপারেও সাবধান থাকা। জারির ইবন ‘আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন, “আমি  রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোনো নারীর ওপর অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টিপাতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে সাথে সাথে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ দিলেন।” (তিরমিযি, হাদিস সহীহ, আল-সুনান,২৭০০)

২) নন-মাহরাম নারীর সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সতর্ক থাকা। আল্লাহ বলেন, “তোমরা তার স্ত্রীদের নিকট হতে কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল হতে চাইবে। এই বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র।” [সূরা আল-আহযাব (৩৩): ৫৩]

৩) এমন স্থানসমূহ পরিত্যাগ করা যেখানে দৃষ্টির খিয়ানত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। যেমন, অহেতুক বাজার বা শপিং মলে না যাওয়া কিংবা রাস্তার পাশে বসে না থাকা।

নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার সাহাবীদের বললেন, “রাস্তার পাশে বসার ব্যাপারে সতর্ক থাকো।” তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, “আমাদের আর কোনো উপায় নেই, এখানেই আমাদের বসা ও আলোচনার জায়গা।” তখন তিনি বললেন, “যদি এখানে বসা ছাড়া আর কোনো উপায়ই না থাকে, তবে অন্তত রাস্তাকে তার হক্ব দাও।” তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, “সেগুলো কী কী?” তিনি বললেন, “দৃষ্টি অবনত রাখা আর (পথচারীর) সমস্যা হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা…” (বুখারী, হাদিস নং ২৩৩৩)

৪) দ্বীনদার ব্যক্তিদের সাথে সময় কাটানো। কেননা, প্রতিটি ব্যক্তিই তার সঙ্গ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। যদি অসৎ সঙ্গে থাকে তবে তারা প্রলুব্ধকারী ব্যাপার নিয়ে কথা বলবে, সেসবের দিকে তাকাতে উৎসাহিত করবে- এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহ বলেন,

“নিজেকে তাদেরই সংসর্গে রাখো যারা তাদের রব্বকে সকাল-সন্ধ্যায় আহবান করে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে; এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিও না। তুমি এমন কারো আনুগত্য করো না যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, ফলে সে তার খেয়াল খুশীর অনুসরণ করে এবং তার কার্যকলাপ সীমালঙ্ঘন করে।” [সূরা কাহফ (১৮): ২৮]

৫) অহেতুক আশেপাশে না তাকানো। কেননা, যত্রতত্র দৃষ্টিপাতের দ্বারা হঠাৎ এমন কিছু চোখে পড়ে যেতে পারে যা ফিতনার প্রতি আকৃষ্ট করবে। সালাফদের অভ্যাস ছিলো, তাঁরা বড় রুমাল দ্বারা মাথা ঢেকে রাখতেন এবং রুমালের ধার চোখের দুপাশে ছড়িয়ে দিতেন। এতে রোদ থেকে বেঁচে থাকাও যেমন সহজ ছিল, তেমনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দৃষ্টি সংরক্ষণ হয়ে যেত।

৬) স্মরণে রাখা যে, সম্মানিত ফেরেশতাদ্বয় আমাদের আমলসমূহ প্রতিনিয়ত লিখে রাখছেন। প্রতিটি আমলের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

৭) ফেসবুক ব্যবহারে সংযত হওয়া। ফেসবুকে এমন ফ্রেন্ডদের আনফলো রাখা যারা নন-মাহরামদের ছবি পোস্ট বা শেয়ার করে থাকে। এছাড়াও ইমেজ ব্লার করার জন্য অ্যাড অন ব্যবহার করতে পারেন, অ্যাড থেকে বাঁচতে FB Purity Add on ব্যবহার করতে পারেন।

৮) বিয়ে করা কিংবা সাওম পালন করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে; কেননা, এটি দৃষ্টি সংযত রাখতে সাহায্য করে এবং গোপন স্থানসমূহকে হেফাযতে রাখে। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে যেন সাওম পালন করে, কেননা, সাওম তাকে সংযত রাখবে।” (বুখারী, হাদিস নং ৫০৬৬)

৯) নিজের পরিবারকে সংযত রাখা। পরিবারের নারীদের পর্দার ব্যাপারে সতর্ক থাকা। এ ব্যাপারে শিথিলতা অবলম্বনকারীকে দাইয়্যুস বলা হয় এবং দাইয়্যুস জান্নাতের সুগন্ধ পর্যন্ত পাবে না।

দৃষ্টি সংযত রাখার সুফলসমূহ

১) হৃদয়ে সংযমতা আসে। এর দ্বারা হৃদয় অনেক পাপ থেকে বেঁচে যায় এবং আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি আরও উৎসাহী হয়ে ওঠে। আল্লাহ এ হৃদয়ের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন, তাতে বারাকাহ দেন।

মূলত পাপের দ্বারা হৃদয় কলুষিত হয়ে ওঠে। আর কলুষিত হৃদয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। শয়তানও সহজে প্ররোচনা দিতে পারে। কিন্তু পাপ থেকে বেঁচে থাকলে হৃদয় পবিত্র থাকে এবং শয়তান ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থানে থাকে। একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, “যে তার প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে চলে, শয়তান তার ছায়া থেকেও পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে।”[৪]

২) আল-কুরআন হিফয ও ইলম অর্জন সহজ হয়ে যায়। ইমাম আশ-শাফি’ঈ (র) বলেন,

“আমি (আমার  শাইখ) ওয়াকীকে আমার স্মৃতিশক্তির ব্যাপারে অভিযোগ করলাম এবং তিনি  বললেন আমি যেন পাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখি। আল্লাহর  জ্ঞান হলো নূর এবং আল্লাহর এই নূর কোনো পাপচারীকে দান করা হয় না।”[৫]

“এক ব্যক্তি মালিক ইবনে আনাসকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘হে আবদ-আল্লাহ, আমার স্মৃতিশক্তিকে  শক্তিশালী করে দিতে পারে এমন কোন কিছু কি আছে?’ তিনি বলেন, ‘যদি কোনো কিছু  স্মৃতিকে শক্তিশালী করতে পারে তা হলো পাপ করা ছেড়ে দেওয়া।’”[৬]

৩) ব্যক্তির মাঝে দূরদৃষ্টি আসে। সে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে অতি সহজে পার্থক্য করতে পারে। হিকমাহর অধিকারী হওয়া যায়। ইবন শুজা’ আল-কিরমানি বলেন,

“যে ব্যক্তি তার বাহ্যিক অবস্থাকে সুন্নাহর পাবন্দ বানায়, অন্তরকে আল্লাহর চিন্তায় ও স্মরণে ব্যস্ত রাখে, প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে দূরে থাকে, নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে নজর হেফাজত করে এবং হালাল খাদ্য গ্রহণ করে, সে ব্যক্তির উপলব্ধি এবং দূরদৃষ্টি কখনো ভুল হয় না।”

৪) দৃষ্টির হেফাজতের দ্বারা ব্যক্তি তার লক্ষ্য থেকে সহজে বিচ্যুত হয় না। কিন্তু এর অন্যথা হলে ব্যক্তি তার লক্ষ্য সম্পর্কে ভুলে যায়, তার কাজের ব্যাপারে অসচেতন হয়ে পড়ে এবং তার প্রবৃত্তির অনুসরণে লিপ্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহর স্মরণবিমুখ হয়ে যায় সে। কিন্তু দৃষ্টি সংযত রাখার দ্বারা ব্যক্তি তার হৃদয়ে অন্য চিন্তা প্রভাব বিস্তারের পথকে বন্ধ করে দেয়।

সবশেষে একটি আশা জাগানিয়া হাদিস দিয়ে লেখাটি সমাপ্ত করছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে পবিত্র থাকার চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখবেন; যে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়, আল্লাহ তার রিযক বাড়িয়ে দিবেন; আর যে ধৈর্যশীল থাকার জন্য চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাকে ধৈর্যশীল বানিয়ে দেবেন…” (বুখারী, হাদিস নং ১৪০০)

গ্রন্থাবলী ও তথ্যসূত্র

[১] ইবন কায়্যিম (র), আল-জাওয়াব আল-কাফি (১২৫)

[২] ইবন তাইমিয়্যাহ (র), মাজমূ’ আল-ফাতাওয়াহ (১৫/৪১৪)

[৩]  ইবন তাইমিয়্যাহ (র), মাজমূ’ আল-ফাতাওয়াহ (১৫/৩৭৯)

[৪] ইবন কায়্যিম (রহি), আল-জাওয়াব আল-কাফি (১২৫)

[৫] ইবন জাওযী, আল-জওয়াব আল-কাফী (১/৫২)

[৬] ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া, আল-খাতীব ​আল-জামী'(২/৩৮৭)

Lowering the gaze

Means of helping oneself to lower one’s gaze

First and second glance at women

The Great Virtue of Lowering the Sight

শুরু হোক আপনার অ্যারাবিক শেখার যাত্রা।  ০১ ডিসেম্বর ২০১৭ এ শুরু হতে যাচ্ছে দুই বছর মেয়াদি অনলাইন ভিত্তিক আরবি ভাষা শিক্ষা কোর্স IIRT Arabic Intensive প্রোগ্রামের Spring-2018 সেমিস্টারের রেজিস্ট্রেশন। বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন: www.arabic.iirt.info

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.