আল্লাহ বলেন– মানুষ কি মনে করে যে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে, আমরা বিশ্বাস করি এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?” (সূরা আনকাবুতঃ ২)

কুরআন আমাদের আল্লাহর করা পরীক্ষার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে। আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করবেনই তা আমরা যেই অবস্থায়ই থাকিনা কেন।

IIRT Arabic Intensive

ঈমান আনার পর ঈমান রক্ষা করা আরো অনেক বেশি কঠিন। তখন শয়তান মু’মিন ব্যক্তিটাকে পেয়ে বসতে অনেক কায়দাই করতে থাকে।

হাদিসে উল্লেখিত আল্লাহর ইবাদতে মশগুল এক বান্দার কাহিনী এক্ষেত্রে অনেক শিক্ষণীয় আমাদের জন্য। কীভাবে কী থেকে কী হয়ে গেলেন তিনি। (আল্লাহ আমাদের মাফ ও হেফাজত করুক) চলুন কাহিনীটি জানা যাক।

বারসিসা বনী-ইসরাইলের একজন সুখ্যাত উপাসক, ধর্মযাজক ও ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিল। সে উপাসনালয়ে একনিষ্ঠভাবে নিজেকে আল্লাহর উপাসনায় নিয়োজিত রাখত। তার সময়ে বনী-ইসরাইল জাতির মধ্যে তিন ভাই সিদ্ধান্ত নিল যে তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। কিন্তু তাদের একটি বোন ছিল এবং তারা ভেবে পাচ্ছিলো না যে বোনটিকে তারা কার নিকট রেখে যাবে। লোকজনদের পরামর্শ অনুযায়ী সেই তিন ভাই বারসিসার নিকট গেল। তারা গিয়ে বারসিসাকে বলল যে তারা আল্লাহর রাস্তায় যেতে চায়, এখন তাদের বোনটিকে কি সে দেখে রাখতে পারবে মন্দলোকের থেকে আর তার যাবতীয় রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে কি না। এর উত্তরে বারসিসা বলল যে, সে তাদের কাছে থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চায় এবং তারা যেন তার কাছে থেকে চলে যায়।

কিছু সময় পর তার মনে হল যে, (মূলত: শয়তান এসে তাকে বলল) তুমি এত সৎ ব্যক্তি, তুমি যেহেতু মেয়েটিকে দেখাশোনার দায়িত্ব নিলে না, তাহলে নিশ্চয়ই কোনো মন্দ ব্যক্তি মেয়েটির দায়িত্ব নেবে আর এরপরের ব্যাপারটি কি হবে তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো, এই অসহায় মেয়েটিকে আশ্রয় দেয়ার মত ভালো কাজ তুমি ছেড়ে দিতে পারো না। এর কিছু সময় পর বারসিসা সেই তিনভাইকে ডেকে বলল যে তাদের কথা সে রাখতে পারে তবে তাদের বোন তার ধারের কাছেও থাকতে পারবে না, উপাসনালয়ের কাছেও না; অদূরেই তার একটি পুরোনো বাড়ি আছে সেখানে রাখতে যদি তাদের কোনো আপত্তি না থাকে তবে। মেয়েটি সেই পুরোনো বাড়িতে আশ্রয় নিলো। বারসিসা প্রতিদিন তার উপাসনালয়ের দরজার সামনে মেয়েটির জন্য খাবার রেখে দিত। সে মেয়েটিকে খাবার পর্যন্ত দিয়ে আসত না। মেয়েটিকে প্রতিদিন কিছুদূর পথ পেরিয়ে উপাসনালয়ের দরজার সামনে থেকে খাবার নিয়ে যেতে হত। বারসিসা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে পর্যন্ত দেখত না।

এরকম কিছুদিন যাওয়ার পর তার মনে হল যে, (মূলত: শয়তান এসে তাকে বলল) এতটুকু হেঁটে আসতে এই অসহায় মেয়েটির অবশ্যই কষ্ট হয়, তাছাড়া দুষ্ট লোকের নজর তার দিকে পড়ে। সুতরাং তার উচিত হবে মেয়েটির খাবার তার আশ্রয়স্থলে গিয়ে দিয়ে আসা। এরপর থেকে বারসিসা মেয়েটির আশ্রয়স্থলে গিয়ে প্রতিদিন দরজার সামনে খাবার রেখে আসত।

কিছুদিন পর শয়তান এসে আবার বারসিসাকে বলল যে, (মূলত: তার মনে হল) দরজা থেকে খাবার নেয়ার সময় মন্দ লোকের নজর মেয়েটির উপর পড়তে পারে, তাই তার উচিত হবে খাবার ঘরের ভিতর দিয়ে আসা। এরপর থেকে বারসিসা মেয়েটির ঘরে খাবার দিয়ে আসত এবং এক মূহুর্তও অপেক্ষা করত না। এমতবস্থায় শয়তান আবার বারসিসার কাছে (মূলত: তার চিন্তায়) এসে বলল যে, সে যে মেয়েটি একা একা রাখছে এতে মেয়েটির হয়ত খারাপ লাগছে, তার তো আপন কেউ কাছে নেই, সে কোথাও বেরও হতে পারে না, কারো সাথে কথাও বলতে পারে না, ঠিক যেন জেলখানায় বন্দি হয়ে আছে। হয়ত পরে দেখা যাবে মেয়েটি বিরক্ত হয়ে ভুল পথে চলে যেতে পারে, পর কোনো পুরুষের সংস্পর্শে চলে আসতে পারে। সেই সময় শয়তান বারসিসার মনে উপস্থিত হল। সে ভাবলো খাবার যখন দিয়েই আসছি, কিছু সৌজন্যমূলক কথা-বার্তা বলা যেতেই পারে, তবে তা ঘরের ভিতরে না হয়ে ঘরের বহিরে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে। এরপর তারা এভাবে চিৎকার করে সামান্য কিছু কুশল বিনিময় করা শুরু করল। এভাবে কিছুদিন চলল। এরপর শয়তান আবার তার মনে উদয় হল এবং বলল যে, এত কঠিন করে কি বা দরকার, শুধু শুধু কষ্ট করে চিৎকার করে করে, ব্যাপারটি সহজ করে নিলেই তো হয়। ঘরে বসেই তো মেয়েটির সাথে কথা বলা যায়, কথা যখন বলা হচ্ছেই। এরপর থেকে সেই সুখ্যাত, ধার্মিক ব্যক্তি বারসিসা সেই মেয়েটির সাথে একটি ঘরে কথা-বার্তা বলে সময় ব্যয় করতে থাকল। একটা সময় বারসিসা মেয়েটির সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাতে লাগল আর ধীরে ধীরে পরস্পরের কাছাকাছি আসতে থাকল। বারসিসা মূলত: সেই মেয়েটির প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। এমন একটা সময় উপস্থিত হল যে সেই সৎ, ধার্মিক বারসিসা মেয়েটির সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত হল, ফলে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ল। মেয়েটি একটি সন্তানের জন্ম দিল।

আবার সেই শয়তান বারসিসার মনে উদয় হল। কি সর্বনাশ! এ কি করেছে বারসিসা! এত সৎ, ধার্মিক, বিশ্বাসী একজন লোক সে। মানুষজন কত ভালোমানুষ হিসেবে জানে তাকে। মেয়েটির ভাইয়েরা ফিরে আসলে তার কি হবে, তারা তার কি অবস্থাই না করবে। শয়তান তখন তাকে ওয়াসওয়াসা দিল যে উপায় একটাই, এই বাচ্চাটিকে মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। তখন বারসিসার মনে হল যে শুধু বাচ্চাটিকে মেরে ফেললেই কি হবে, মেয়েটি অবশ্যই ব্যাপারটি গোপন রাখবে না, সে সবাইকে বলে দেবে। বারসিসা দিশেহারা হয়ে পড়ল, সে এখন কি করবে! সন্তানসহ মা কে হত্যা করে তাদের মাটির নিচে পুঁতে ফেলল।

কিছুদিন পর মেয়েটির ভাইয়েরা বারসিসার কাছে তাদের বোনকে নিতে আসল। বারসিসা তাদের বলল যে- তোমাদের বোন তো অসুখে মৃত্যুবরণ করেছে।

রাতের বেলা তিন ভাইয়ের মধ্যে এক ভাই স্বপ্ন দেখলো, বারসিসা মিথ্যা বলছে। নিশ্চয়ই এখানে একটা কিন্তু আছে, তিন ভাইয়েরা ভাবলো। তারা সেই আশ্রিত বাড়িতে গিয়ে মাটি খুঁড়ল এবং তারা দেখলো যে তাদের বোনের পঁচে যাওয়া মৃত দেহ এবং তার পাশে একটা শিশু! তারা বারসিসাকে গিয়ে ধরে রাজার কাছে নিয়ে গেল। বারসিসাকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেয়া হল। স্বয়ং শয়তান আসল তার কাছে যে কি না তাকে এত ঝামেলার মধ্যে ফেলেছে। সে বলল সমস্যা সৃষ্টি করেছে সে, তাই সমাধানও একমাত্র সেই জানে! এখন বারসিসার সিদ্ধান্ত যে সে কি মৃত্যুদন্ড পেতে চায় না কি শয়তানের সমাধান অনুযায়ী বাঁচতে চায়। বারসিসা শয়তানকে বলল যে তাকে বাঁচাতে! শয়তান বারসিসাকে বলল যে সিজদাহ কর যে তোমাকে হুকুম দিচ্ছে এখন। বারসিসা শয়তানকে সিজদাহ করল! এরপর শয়তান বারসিসাকে বলল,তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ! তোমার সাথে দেখা হয়ে আমার খুব ভালো লাগলো, আমি একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা লাভ করলাম।

এরপর আর কখনোই বারসিসা শয়তানকে দেখতে পেল না আর এটাই ছিল বারসিসার জীবনের শেষ কাজ। কারণ এর কিছুক্ষণ পরই বারসিসার মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়েছিল। অর্থাৎ তার জীবনের শেষ কাজটি ছিল একটি শিরক।

যে ব্যক্তি যেই ধরনের কাজ পছন্দ করে শয়তান ফাঁদ পাতে সেই কাজের মাধ্যমেই ধোঁকা দিতে। মনে করুন একজন ব্যক্তি খুবই পরহেজগার। শয়তান চেষ্টা করবে তাকে এমন যুক্তি দেখাবে যা তার কাছে মনে হবে ইসলামিক, কিন্তু আসল ব্যাপার ভিন্ন। এভাবে সে তাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় যখন আর ফেরার পথ থাকে না। আর যাদের কাছে ইসলাম ভালো লাগেনা, শয়তান তো তাদের খুব সহজেই কাবু করে ফেলে। নিজের লাইফেও কিন্তু আমি দেখেছি শয়তান কীভাবে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে যায়।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ঈমানে মজবুতি দান করুক। প্রকৃত মুত্তাকী বানাক। চলুন আল্লাহর কাছে দু’হাত প্রসারিত করে বলি –

رَبَّنَالاَتُؤَاخِذْنَاإِن نَّسِينَاأَوْأَخْطَأْنَا

(রাব্বানা লা-তুওয়াখিজনা ইন-নাসিনা আও আখতা’ না)
হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করো না।

رَبَّنَاوَلاَتُحَمِّلْنَامَالاَطَاقَةَلَنَابِهِ وَاعْفُ عَنَّاوَاغْفِرْلَنَاوَارْحَمْنَآأَنتَ مَوْلاَنَافَانصُرْنَاعَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

(রাব্বানা ওয়ালা তুহামমিলনা মা-লা ত্ব’কাতালানা বিহি ওয়া’ফু আন্না ওয়াগফির লানা ওয়ারহামনা আনতা মাওলানা ফানসুরনা ‘আলাল কাওমিল কাফিরিন)
হে আমাদের প্রতিপালক! এবং আমাদের দ্বারা ঐ বোঝা বহন করিও না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নাই। আমাদের পাপ মোচন কর। আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমিই আমাদের প্রভু। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য কর।

رَبَّنَالاَتُزِغْ قُلُوبَنَابَعْدَإِذْهَدَيْتَنَاوَهَبْ لَنَامِن لَّدُنكَ رَحْمَةًإِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ

(রাব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল-লাদুনকা রাহমাতান ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ-হাব)
হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্য লংঘনে প্রবৃত্ত করো না এবং তোমার নিকট থেকে আমাদিগকে অনুগ্রহ দান কর। তুমিই সবকিছুর দাতা।

আমীন।


উৎসঃ Stories in the Quran” by Ibn Kathir

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

5 Responses

  1. আসাদুল্লাহ আল মূসা আল নাইম

    এটি কোরআনের এমন একটি ঘটনা যেখানে, আল্লাহ সুবাহান তা’আলা মুসলিমদের জন্য অন্যতম একটি পন্থা বলে দেন যেখানে কিভাবে আমরা সবসময় শয়তানের পথ অনুসরণ থেকে বিরত থাকতে পারব।
    উদাহরণ স্বরুপ জ্যামিতির কথাই ধরূন। একটি বিন্দু থেকে যদি দুটি রেখা পরস্পর মাঝে ১সে.মি. দুরত্ব ফাক রেখে যদি টানা হয় তাহলে কি হবে?
    প্রথমে দুটি রেখার মাঝে ফাক কম থাকবে। কিন্তু যতই এদের দৈর্ঘ যতই বাড়ানো হবে এদের মাঝখানের ফাকও ততই বাড়তে থাকবে। আর বাড়তে বাড়তে এমন একটি পর্যায় এসে পড়বে যখন রেখা দুটি পরস্পরের বিপরীতে অবস্থান করবে।দেখুন, প্রথমে ফাক ছিল মাত্র ১সে.মি. কিন্তু পরে তা বেড়ে দারিয়েছে পুরোপুরি বিপরীত।আর শয়তানো আমাদের এরকম ফাদে ফেলায়, প্রথমে আমরা ভাবি, এতো তেমন কিছু খারাপ কাজ না, কিন্তু এই কাজেরই সুবিধা নিয়ে শয়তান আমাদের এমন কাজ করায় যা কিনা শির্কের সমতুল্য।, যা আমরা আবেদ বারসীসার ঘটনার মাধ্যমে জানতে পারি।

    Reply
    • মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম

      ধন্যবাদ প্রিয় ভাই রাফিজ। মহান আল্লাহ আপনাদের এই ভাল কাজের উত্তম প্রতিদান দিন। জাজাকাল্লাহ খাইরান।

      Reply
    • আবু যুওয়াইনাহ
      রাফিজ ইবনে আব্দুল করিম

      দারুণ বলেছেন, ভাই। কিন্তু এর পাশাপাশি এই নিয়মেরও ব্যতিক্রম আছে আর তা অবশ্যম্ভাবীও নয়। কেবল যদি সময় মতো বুঝতে পেরে আন্তরিকভাবে তাওবাহ করতে পারা যায় এবং আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে ফেরা যায়। আল্লাহ কিন্তু সুযোগও দিবেন। সেটা অবশ্যই। বারসিসার ক্ষেত্রেই দেখি। কিন্তু শায়তান তাকে আবারও ফাঁদে ফেলল। অথচ আল্লাহ তাঁর রহমত থেকে নৈরাশ হতে নিষেধ করেছেন।

      Reply
  2. Nayeem Chowdhury

    Reading this article reminded me of How ISIS is misguiding the youth of this Ummah by making them think that they are doing the the acts that are most beloved to Allah.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Loading Disqus Comments ...
IIRT Arabic Intensive