প্রতিদিন হাজারো আশা আকাঙ্ক্ষা সাথে নিয়ে ঘুম ভাঙে আমাদের। নতুন সূর্য ওঠে, শুরু হয় নতুন একটা দিন… অর্থ উপার্জন, বিয়ে করা, বন্ধুদের সাথে মাস্তি করা, পারিবারিক বিষয়, খাওয়া-দাওয়া, পড়াশোনা, ক্যারিয়ার এসবই ঘুরপাক খায় আমাদের মাথায়। পরের দিনটাও আবর্তিত হয় একই রুটিন এর চক্রে, একই উদ্দেশ্যে। কীভাবে নিজেদের আরো বেশি সুখী করা যায়, জীবনকে আরো সহজ করা যায় কীভাবে আরো বেশি উপভোগ করা যায় এই চিন্তায় আমরা দিনগুলো একই জায়গা থেকে শুরু করি একই গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে। এই তো জীবন, তাই না?

ক্লান্তিহীন ভাবে কাজ করে যাওয়া আর টাকা কামানো, ঝকঝকে একটা ক্যারিয়ার গড়ে তোলা অথবা কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে জীবনসঙ্গী করা- যেন শুধু এজন্যই এখানে আছি আমরা! টাইম পাস করতে ইন্টারনেট ব্রাউজ করি আর ফান করে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আপডেট দেই আর ভেবে ফেলি এই তো অস্তিত্বের দায় মেটাতে বেঁচে থাকা হলো… আমাদের অধিকাংশ ভেবে দেখারই সময় পাইনা আসলে জীবনের উদ্দেশ্যটা কী!

IIRT Arabic Intensive

সভ্য সমাজের বাসিন্দা আমরা, সুশিক্ষায় শিক্ষিত আর অসম্ভব ব্যস্ত আমরা প্রত্যেকেই। সহজাতভাবেই আমরা জাগতিক লক্ষ্যগুলোর পেছনে ছুটে মরছি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই রেসের ঘোড়ার মত এতটা ত্রস্ত-ব্যস্ত হয়ে দৌড়ানোর জন্য এই পার্থিব কারণগুলো যথেষ্ট কিনা। প্রশ্ন হলো ব্যস্ত থেকে আমরা কী করছি? মাঝে মাঝে কি মনে হয় না, আমরা শুধু টিকে থাকছি, এটাকে বাঁচা বলে না?

হলিউডের একজন বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা জিম ক্যারি, ‘এতসব কিছু’ থাকা সত্ত্বেও এজন্য বলেছিলেন, ‘আমি চাই সবাই অনেক ধনী এবং বিখ্যাত হোক, যা কিছুর স্বপ্ন দেখে সব পেয়ে যাক, তাহলে তারা বুঝতে পারতো এটা কোন চূড়ান্ত সমাধান না।’

আসুন দেখে নেই মহান স্রষ্টা আমাদের অস্ত্বিতের নিরিখে কী বলেছেন-

‘এবং আমি জ্বিন এবং মানুষকে আমার ইবাদত ব্যতীত অন্য কিছুর জন্য সৃষ্টি করিনি।’ [সূরাহ আয-যারিয়াত (৫১):৫৬]

এবার নিজের দৈনন্দিন জীবনাচরণে গভীর ভাবে দৃষ্টিপাত করুন। হিসাব করে দেখুন আপনি কতবার আপনার স্রষ্টা আল্লাহকে স্মরণ করেন। কখন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেন। আপনার জীবন কি শুধু আমি, আমি এবং আমিময়? নাকি সেখানে আল্লাহ অনেক বড় একটা ফ্যাক্টর?

আমাদের তো কিছু দায়িত্ব আছে। জীবন তো শুধু ভিডিও গেমসের লাস্ট স্টেপ পর্যন্ত কমপ্লিট করা না, জ়ীবনের মানে লেটেস্ট ফ্যাশনের সাথে তাল মিলিয়ে চলাও না, প্রতি মুহূর্তে ফেসবুক স্ট্যাটাস আপডেট করাই জীবন হতে পারে না। জীবনের আরো ব্যাপক কোনো অর্থ আছে।

আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে একটা মহিমান্বিত উদ্দেশ্যে। আর সেটা হচ্ছে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর কালিমাহকে বুলন্দ করা- ‘আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কোন সত্ত্বা নেই’।

আমরা সবাই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’তে বিশ্বাস করি। কিন্তু বিশ্বাস করা মানে শুধু মূর্তিপূজ়া করতে অস্বীকৃতি জা্নানো না। এর অন্তর্নিহিত অর্থ আমাদের কাছে আরো বেশি কিছু প্রত্যাশা করে- আল্লাহর কালিমাহ’র উপরে বেঁচে থাকা আর আল্লাহর কালিমাহ’কে কাজে পরিণত করা।

কালিমাহর উপরে বেঁচে থাকতে হলে কেবলমাত্র আল্লাহর আনুগত্য করতে হবে, তাঁকে ভালবাসতে হবে সবচাইতে বেশি, অন্য সবার প্রতি ভালবাসা তাঁকেই ভালবাসার শাখা হিসাবে প্রস্ফুটিত করতে হবে আমাদের হৃদয়ে। কখনোই আল্লাহর সৃষ্টি কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে তাঁর চেয়ে বেশি ভালবাসা যাবেনা, তাঁর চেয়ে বেশি ভয় করার তো প্রশ্নই আসেনা। জীবনের সমস্ত স্বপ্ন আশা যেমন তাঁর কাছে সমর্পণ করতে হবে তেমনি নির্ভর করতে হবে শুধু তাঁর উপরই। তাঁর ভালবাসাতেই ভালবাসতে হবে, ঘৃণা করতেও হবে তাঁর ঘৃণায়।

আমরা কি হলফ করে বলতে পারি আমরা কালিমাহ’র উপর বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি? আমরা কি নিশ্চিত যে, পরিবার-পরিজন অথবা আপনজনদের আমরা ঠিক ততটুকুই ভালবাসছি যার আধিক্য আমাদের জন্য কোনো বিপর্যয় বয়ে আনবে না? একটু ভেবে দেখি তাদেরকে খুশি করতে গিয়ে আল্লাহকে অখুশি করছি না তো? তাদের অধিকারের পসরাগুলো যেন আল্লাহর অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।

যখন আপনি শুধু আল্লাহর ইবাদতের পবিত্র গণ্ডিতে প্রবেশ করবেন, তাঁর আনুগত্য করবেন, মানবসৃষ্ট আইনের অনুসরণ করে তাঁর অবাধ্য হবেন না, যখন আল্লাহ এবং আল্লাহর দেওয়া জীবন বিধানের উপর সর্বাত্মক বিশ্বাস স্থাপন করবেন, ভালবাসবেন তাঁকে ভীষণভাবে- অন্য কাউকে ভালবাসার চেয়ে অনেক অনেক বেশি, ভয় করবেন তাঁর প্রতিশ্রুত শাস্তিকে, সবটুকু আশা ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখবেন তাঁকে, তাঁর কাছে নিজের আত্মাকে পুরোপুরি নিবেদন করবেন, ঠিক তখনই আপনার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’কে সার্থক করে বেঁচে থাকা হবে।

তাওহীদ বা একত্ববাদে বিশ্বাসের মূল হচ্ছে- অন্তরে বাহিরে, বাক্যে কর্মে ইবাদতের সবটুকু শুধু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি উৎসর্গ করতে হবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো কিছু বা কারও আনুগত্য করা যাবেনা, সে যে-ই হোক না কেন।

‘এবং তোমাদের প্রভু আদেশ করেছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত কোরো না।’ [সূরাহ আল-ইসরাহ (১৭):২৩]

তাওহীদের পূর্বশর্ত যে কালিমাহ- তা বান্দাকে প্রেরণা দেয় আল্লাহকে ইবাদতের হকদার একক সত্ত্বা হিসেবে গ্রহণ করতে, ইবাদতের একবিন্দুও অন্য কারো দিকে প্রবাহিত না করতে, সে ইবাদতের রকমভেদ ‘খাওফ’[১], ‘খাশিয়া’[২] বা ‘তাওয়াক্কুল’[৩] যেটাই হোক না কেন। এই শব্দাবলির মাহাত্ম্য অন্তঃস্থল থেকে উপলব্ধি করা বান্দার জন্য অবশ্য করণীয়। সাথে সাথে এটার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে জ়ীবনে, অন্তঃসারশূন্য মৌখিক সাক্ষ্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।

শিরক হচ্ছে তাওহীদের বিপরীত। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন- মুশরিকরা চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে, তিনি কখনও তাদের ক্ষমা করবেন না, তাদের জন্য তিনি জান্নাতকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন,

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে। এর নিম্ন পর্যায়ের যে কোন পাপ ক্ষমা করেন যাকে ইচ্ছা তাকে। এবং যে আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করল সে নিঃসন্দেহে জঘন্যতম পাপ করেছে’। [সূরাহ নিসা(8): ৪৮]

আপনি যে ভয়াবহ বিপদের মধ্যে আছেন সেটা বোঝার চেষ্টা করুন। যেখানে ধর্মীয় অজ্ঞতা সবক্ষেত্রে বিদ্যমান সেখানে ইসলামকে ধারণ করা মানে জ্বলন্ত কয়লা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা! মনে করুন আপনি কোনো একটা উপন্যাস পড়া শুরু করলেন, যেখানে বস্তাপচা কাহিনীতে বোঝানো হয়েছে ম্যাজিক কত মহৎ একটা ব্যাপার, কত উপকারী! মানুষ অমরত্ব লাভ করেছে, তাদের কাছে আছে ঐশ্বরিক ক্ষমতা, পড়তে পড়তে মোহাবিষ্ট হয়ে গেলেন লেখকের বানানো সম্পূর্ণ কাল্পনিক কোন চরিত্রের প্রতি। তারপর গেলেন টেলিভিশন দেখতে, দেখলেন প্রোগ্রামে ইসলাম এবং মুসলিমদের নিয়ে তামাশা করা হচ্ছে, ইসলামকে অপমান করা হচ্ছে, প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে মুসলিমদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে ভয়ংকর দানব হিসেবে। হাতে নিলেন আপনার সেলফোন, দেখলেন রাশিফলের মেসেজ়ে আপনার ইনবক্স ভরে গেছে, পাথরের মাধ্যমে ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ, হাতের রেখা দেখে ভাগ্য বলে দেওয়া এরকম হরেক রকম আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন। এরকম একটা বিষাক্ত পৃথিবীতে বাস করে কিভাবে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে এখনও আপনি মুসলিম আছেন?!

আমরা পৃথিবীতে এসেছি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে, এটাই সত্যি; এটা হবে চরম লজ্জাজনক যদি আমরা তা না করে মারা যাই। আল্লাহ আমাদের বানিয়েছেন শুধু তাঁর জন্য, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা সেটা বুঝবো ততক্ষণ জীবন অর্থহীন।

‘জন্মালাম, খাইলাম, বংশবৃ্দ্ধি করলাম, মারা গেলাম’- এত তুচ্ছ গল্প যেন আপনার জীবনের গল্প না হয়। এমন কিছু করুন যেটা শাশ্বত কল্যাণের সহায়ক, আরো বেশি মহীয়ান। আপাদমস্তক প্রবেশ করুন ইসলামে, দৃঢ় থাকুন ইসলামের উপর আমৃত্যু। মুখে উচ্চারিত কালিমাহ যেন হৃদয়েরই ভাষা হয়।

তথ্যসূত্র

[১] খাওফঃ আল খাওফ হচ্ছে পরকালীন শাস্তির ব্যাপারে পূর্ব ধারণা, সেই জ্ঞান যার ফলে হৃদয় আল্লাহর প্রতি ভয়ের পথে চালিত হয়। (মাদারিজ-আস-সালেকিন)

[২] খাশিয়াঃ সেই গভীর জ্ঞান (মা’রিফা) যার মাধ্যমে মানুষ ভয় থেকে উত্তরণের পথ খোঁজে, অমোঘ শাস্তি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। (মাদারিজ-আস-সালেকিন)

[৩] তাওয়াক্কুলঃ আল্লাহর প্রতি দ্ব্যর্থহীন বিশ্বাস এবং নির্ভরতা।


উৎসঃ “ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটি ব্লগ” (মূল আর্টিকেল লিংক)

অনুবাদঃ উম্মে আফরাহ, মুসলিম মিডিয়া প্রতিনিধি

অনুবাদ কপিরাইট © মুসলিম মিডিয়া

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive