সর্বপ্রথম ইসলামে প্রবেশের পর প্রায় সবার মধ্যেই একটা উত্তেজনা কাজ করে। ‘এই করে ফেলবো, সেই করে ফেলবো’ – এরকম মনে হয়। ‘মুসলিমদের যাবতীয় সমস্যা নিজের কাঁধে বহন করে সমাধান করার প্রবণতা তৈরী হয়। চরম উত্তেজনায় এক সাথে অনেক কিছু করতে গিয়ে দেখা যায়, সব গুবলেট হয়ে যায়। এক সাথে অনেক কাজের দায়িত্ব নিতে গিয়ে শেষমেশ কোনটাই হয়ে উঠে না। হতাশা তৈরী হয় আর হতাশা থেকে অধ:পতন হয়। প্রচুর সময় নষ্ট হয়, কাজের কাজ কিছুই হয়না। আমরা অনেকেই এরকম ভুক্তভোগী। তাই এই লেখাটি।

তাহলে ইসলামে এসে আসলে শুরুতেই কি করা উচিত? এখানে আমার কয়েকটি অভিমত শেয়ার করছি –

IIRT Arabic Intensive

 ইসলামে এসেই উম্মতের সব সমস্যা নিজেই সমাধা করার চিন্তা বাদ দেয়া উচিত। এটা আপনি একা করতে পারবেন না, এটা করার সময়ও এখনও হয়নি । বরং সর্বপ্রথম উচিত, নিজেকে বেটার মুসলিম হিসেবে ডেভেলপ করা। নিজেকে বেটার মুসলিম ডেভেলপ করতে পারলে এরপর আপনি উম্মাহকে একটা ভাল সার্ভিস দিতে পারবেন। একজন ডেভেলপড মুসলিম যেভাবে উম্মাহকে সার্ভিস দিতে পারে, ননডেভেলড মুসলিম সেভাবে উম্মাহকে সার্ভিস দিতে পারেনা; সারাজীবন সময় ব্যয় করে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। তো, এটা শুরু করা যায় কিভাবে?

ক. যতটুকু সম্ভব, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মসজিদে জামায়াতের সাথে পড়ার ব্যবস্থা করা। এই ব্যাপারে নিজেকে কোন ছাড় নয়। সাথে সাথে সকল হারাম পরিহার এবং সব ফরজ প্রতিপালন করা – এই ব্যাপারে নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলা।

খ. তাহাজ্জুদ নামাজে নিজেকে অভ্যস্ত করতে চেষ্টা করা। এটা খুব জরুরী। কমপক্ষে, সপ্তাহে একবার-দুইবার।

গ. সহীহ শুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত শিখা। এরপর কয়েক পারা কুরআন মুখস্থ করে ফেলা। এটা করতে কয়েক বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। মানে প্রতিদিন আপনি আধা ঘন্টা-এক ঘন্টা কুরআন মুখস্থ করলেন। এভাবে করলে প্রতি বছর আপনি হয়তো এক-দুই পারা পর্যন্ত মুখস্থ করে ফেলতে পারবেন। এই কুরআন আপনার জন্য রুহানী খাদ্য। আপনার রুহকে কুরআন সজীব করে রাখবে। আর কুরআন মুখস্থ করতে পারাটা সবচেয়ে জরুরী। এর উপর ডিপেন্ড করছে, আপনার নেক্সড ইসলামিক লাইফ। কুরআন মুখস্থ করার সাথে এর অর্থ ও তাফসীর পড়ে নিতে পারেন।

ঘ. এরপর এই মুখস্থ কুরআন দিয়ে তাহাজ্জুদ পড়া। প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করা। এভাবে আপনি আল্লাহর কাছের বান্দায় পরিণত হবেন ইনশা আল্লাহ। কুরআনকে আপনি তখনই পাবেন, যখন আপনি সেই কুরআনকে সালাতে পড়বেন। মনে রাখবেন, আল্লাহর নৈকট্যশীল বান্দায় পরিণত হতে হলে ফরজের পর এই নফল আমলগুলো করতেই হবে। আল্লাহর কাছের বান্দা না হতে পারলে দ্বীনের খেদমত করতে পারবেন না। দ্বীনের খেদমত করতে হলে আগে আল্লাহর নৈকট্যশীলতা অর্জন করে নিতে হবে। রসূল (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীরা যারা দাওয়াত এবং সংগ্রামে অগ্রগামী ছিলেন, তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই এমনটা করতেন।

একটা ব্যাপার উল্লেখ্য, অনেকেই সারা রাত জেগে ফজর পড়ে তারপর ঘুমান। না, কখনও এমন নয়। বরং, রাতে আগে ঘুমান, এরপর ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ, ফরজ পড়ুন। এটাই সুন্নাহ। রাত জাগলে আপনি ইন দ্য লং রান, অসুস্থ হয়ে যাবেন। আর এটা সুন্নাহর ব্যতিক্রম। রাতে আগে ঘুমাতে না পারলে ভাল মুসলমান হতে পারবেন না।

কুরআনের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করাটা আমার দৃষ্টিতে দ্বীনের প্রথম ধাপ।

দ্বিতীয় ধাপসমূহ –

ক. ইসলামি জ্ঞান বা ইলম অর্জন করা। ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য কোন ইসলামি ইন্সটিটিউশনে ভর্তি হতে পারেন। মাদ্রাসায় যেতে পারেন, বা অন্য কোন ইসলামি ইন্সটিটিউশন, যদি সম্ভব হয়। যদি সম্ভব না হয়, নিজে নিজে বই পড়ে যতটুকু সম্ভব ততটুকু করা। অবশ্যই রসূল (সঃ) এর সীরাহ এবং কুরআন এর অর্থ পড়ে নেয়া, সাথে তাফসীর পড়া। প্রচুর ইসলামি বই নিজের কালেকশনে রাখুন এবং এগুলো পড়ুন। এবং অবশ্যই, ইসলামের ইতিহাস পড়া ভুলবেন না। চার খলিফা থেকে আজকের এই অবস্থায় ইসলাম কিভাবে এলো এটা জানা খুব জরুরী। মুসলমানরা অতীতে কি কি ভুল করেছে, তা যদি না জানেন, তাহলে নিজেকে বা নিজেদেরকে শুধরাতে আমরা সক্ষম হবো না।

খ. পৃথিবীর জ্ঞান অর্জন করা। নিশ্চয়ই আপনি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। কোন একটা বিষয়ে অনারস/মাস্টার্স করছেন বা করে ফেলছেন। এটাও জরুরী। এর সাথে সবসময় সংবাদপত্র পড়ুন, ইন্টারন্যাশনাল নিউজে চোখ রাখুন। দুনিয়ার কোথায় উম্মাহর কি অবস্থা, তার খোঁজ রাখুন। বড় বড় শায়খরা কি বক্তব্য রাখছেন, তা জানুন। উম্মতের সাথে থাকুন। এ ব্যাপারে যেন আমরা বেখেয়াল না হই।

পর্যাপ্ত আমল, পৃথিবীর এবং ইসলামি জ্ঞানের কমবিনেশনই আপনাকে একজন ডেভেলপড মুসলিম বানিয়ে দিবে ইনশা আল্লাহ। কাজ করার জন্য আপনি প্রস্তুত হবেন। এবং ময়দানে নামলে কুফফার আপনার কাছে পরাজিত হবে।

 একটা ইসলামি ফ্রেন্ড সার্কেল এর মাঝে থাকুন। অনৈসলামিক ফ্রেন্ডদের সাথে দিনরাত চলবেন না। আপনার সেক্যুলার ফ্রেন্ডরা আপনাকে ইসলাম থেকে দূরে নিয়ে যাবে। সবসময় প্রাক্টিসিং লোকজনের সাথে চলা-ফেরা করলে ইসলামের উপর থাকা আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে।

নিজের জবান এবং লেনদেনকে হেফাজত করুন। মানে (ক) আপনার জিহবা দ্বারা কাউকে কষ্ট দিবেন না। (খ) ওয়াদা করলে তা অবশ্যই পালন করবেন। সবার সাথে স্পেশালী বাবা-মা’র সাথে খুব ভাল ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে হাসিমুখে বকা খান কিন্তু দুর্ব্যবহার করবেন না। আপনার ব্যবহারই প্রমাণ করবে যে ইসলাম সুপিরিয়র ।

 এইবার আপনি স্টেপ নিন, যে উম্মাহকে সার্ভিস দিবেন। আপনি যে কোন ইসলামি অর্গানাইজেশন এর মাধ্যমে বা একক ভাবে উম্মাহকে সার্ভিস দিতে পারেন। তবে দলবদ্ধভাবে সার্ভিস দেয়া একক সার্ভিস থেকে অনেক উত্তম। আসলে এই অবস্থায় আপনি নিজেই বুঝে যাবেন, যে কি করা উচিত।

হ্যা, কারও কারও ক্ষেত্রে ১,২,৩,৪,৫ – প্যারালালি চলতে পারে। তবে একবারে বেশী লোড না নিয়ে আস্তে আস্তে (নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী) আগানোই বুদ্ধিমানের কাজ। তাহলে সব এলোমেলো হবার সম্ভাবনা থাকে না।

জাযাকাল্লাহু খইর। আল্লাহ আমাদের সবার প্রচেষ্টাগুলো কবুল করে নিন, আমীন।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive