এক প্রথম দিন জ্বরের জন্য ফজরের জামাতে মাসজিদে যোগ দিতে পারলাম না, আমি ছাড়া নিশ্চয় সকলে ফজরের জামাত থেকে মাসজিদে নববীতে সালাত পড়া শুরু করে দিয়েছে। আল্লাহ্‌ আমাকে অতি জলদি জ্বর থেকে মুক্ত করে দিলেন, দুপুরের ভেতর জ্বর ছেড়ে দিয়ে শরীর ঝরঝরে হয়ে গেলো। যুহরের সময় আমি মাসজিদে প্রথমবারের মতো গেলাম। মক্কায় হোটেল থেকে মাসজিদ হারামের দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার হলেও মদিনাতে হোটেলের নিকটেই মাসজিদ। চাইলে প্রতি ওয়াক্ত সালাতের পর হোটেলে ফেরত আসা যায় এবং সালাতের সময় আবার যাওয়া যায়।

তারপরও যারা মদিনাতে আসেন, যেহেতু এখানে সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে আসেন, তাই দিনের বেশিরভাগ সময় সেখানে কাটানোর চেষ্টা করেন। পৃথিবীর মাত্র তিনটি মাসজিদের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা ইসলামে অনুমোদিত করা হয়েছে। সেগুলো যথাক্রমে মাসজিদুল হারাম, মাসজিদে নববী এবং মাসজিদ আল-আকসা। হআজ্জ ও উমরাহ্‌ করতে আসলে প্রথম দুটো জায়গায় ভ্রমণ করা হয়ে যায়, বাকি থাকে শুধু জেরুসালেমের আল আকসা মাসজিদ।

মুহাম্মাদ ﷺ এর সময়কালে সমগ্র মদিনা শহরের আয়তন ছিলো বর্তমান মাসজিদে নববীর আয়তনের চেয়েও কম (প্রায়)!! উনার মৃত্যুর পর মুসল্লিদের সমাগমে এবং নববীকে ঘিরে জনবসতি বৃদ্ধি পাওয়াতে ধীরে ধীরে মদিনার আয়তন ও মাসজিদের আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান আকার পেয়েছে।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

রাসুল ﷺ এর মাসজিদ নির্মাণের গল্প কে না জানে? উনি যখন আবু বকরকে (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) নিয়ে মদিনাতে আগমন করেন, তখন বহু সাহাবী তাঁকে যার যার বাড়িতে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু নবীজী বলেন যে, তাঁর উট যেখানে আসন গ্রহণ করবে, উনি সেই স্থানে থাকবেন। অবশেষে চলতে চলতে উট দুই ইয়াতিম ভাইয়ের সম্পত্তির ওপর থামে। পরবর্তীতে সেখানেই উনার বাড়ি ও মাসজিদ নির্মিত হয়।

মাসজিদে নববী সংক্রান্ত কিছু (অনেকের কাছে অজানা) তথ্য লেখার লোভ সামলাতে পারছি না।

■ রাসুল ﷺ এর কবরের উপর আমরা যে সবুজ গম্বুজ দেখতে পাই, সেখানে একটি নয়, বরং দুটো গম্বুজ আছে. দ্বিতীয় গম্বুজটি অপেক্ষাকৃত ছোট এবং বড় গম্বুজের নিচে অবস্থিত।

■ উনার কবরের উপর সবুজ গম্বুজটি বিভিন্ন যুগে ভিন্ন ভিন্ন রঙের ছিলো। কখনো ছিলো বেগুনি, কখনো সাদা। তবে সবচেয়ে দীর্ঘদিন আরবদের পছন্দের রঙ নীলচে বেগুনিতে রাঙ্গানো ছিলো। মাত্র দেড়শ বছর আগে এ গম্বুজের রঙ সবুজ দেওয়া হয়, যা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান।

■ নবীজীর কবরের পাশে যথাক্রমে আবু বকর ও উমারের (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) কবর আছে ও একটি কবরের আয়তনের ফাঁকা জায়গা রয়েছে। বলা হয় ‘ঈসা (‘আলাইহিসসালাম) যখন পৃথিবীতে আসবেন, তখন মৃত্যুর পর তাঁকে এই ফাঁকা স্থানটিতে সমাহিত করা হবে।

■ আলোচ্য মাসজিদে মুসল্লি ধারণ ক্ষমতা ছয় লাখ! হআজ্জের সময় এ ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে দশ লাখে পরিণত হয়!!

■ সমগ্র আরব পেনিনসুলাতে সর্ব প্রথম ইলেক্ট্রিসিটি সংযোগ দেওয়া হয় এ মাসজিদে। এরও বহু বছর পর রাজার প্রাসাদে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়।

আমরা যখন মাসজিদের পথে রওনা হলাম, তখন ভর দুপুর। তীব্র রোদে চোখ মেলা দায়। সানগ্লাস ও ছাতা ব্যতীত দিনের বেলা বের হওয়া মুশকিল। নববীতে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগলো না। কিন্তু এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ছোটখাটো এক সমস্যা দেখা দিলো, যে সমস্যা মক্কায় হয়নি। মাসজিদুল হারামে পুরুষ ও মহিলাদের সালাতের স্থান আলাদা হলেও, পাশাপাশি। মহিলাদের সালাতের স্থানকে উঁচু উঁচু সোনালী রঙের ধাতব বইয়ের শেলফ দ্বারা ঘেরাও করে রাখা হয়। তাই আমাকে মহিলাদের জায়গায় রেখে আমার স্বামী সাফির ঘেরাওয়ের বাহিরের দিকে সালাত পড়তো। আবার অনেক সময় আমরা দুজন পাশাপাশিও সালাত পড়তে পারতাম, যেহেতু উনি আমার স্বামী।

কিন্তু মদিনাতে নিয়ম সম্পূর্ণ বিপরীত। মাসজিদের প্রবেশ পথে পুরুষদের সালাতের স্থান, এরপর প্রায় ৫/১০ মিনিট হাঁটার পর মাসজিদের একদম ভিতরের দিকে মহিলাদের সালাতের স্থান। এখানে পুরুষ-মহিলাদের সালাতের স্থানে যথেষ্ট দূরত্ব রয়েছে। ফিতনার সম্ভাবনা এড়াবার জন্য এ ব্যবস্থা। বুঝতে পারলাম আমাকে আর সাফিরকে এখন আলাদা পথ ধরতে হবে। আমি আগেই উল্লেখ করেছি, বর্তমান মাসজিদে নববী আয়তনে প্রায় প্রাচীন মদিনা শহরের সমান এবং হআজ্জের মৌসুমের দশ লাখ মুসল্লির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন। এই তথ্য দ্বারা আশা করি নববীর বিশালায়তন সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ করা যায়।

মাসজিদের চারদিক ঘিরে প্রচুর প্রবেশ পথ। সম্ভবত তিরিশের অধিক গেট আছে এবং প্রতিটি গেট দেখতে অবিকল এক রকম। গেটের উপর যদিও নাম্বার দেওয়া আছে, কিন্তু সে নাম্বারেরও আবার বিভিন্ন ভাগ আছে। যেমন gate 1a, gate 1b, gate 1c ইত্যাদি। সবকটি গেট দেখতে একরকম হবার চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, গেটগুলোর বাইরে, মাসজিদের আশপাশের এলাকা ও হোটেলগুলোও দেখতে প্রায় একরকম। একই উচ্চতার দালানকোঠা ও বিল্ডিঙয়ের নিচে দোকানপাট, এমনকি আরবি নাম হবার কারণে হোটেলের নামগুলোও আমার একরকম লাগে। এক কথায়, প্রথম দিন যে এ মাসজিদে সালাত পড়তে আসবে তার নির্ঘাত মাথা ঘুরে যাবে। বিশেষত আমার মতো যারা রাস্তা ঘাটে অতি সহজে হারিয়ে যায়, তাদের এখানে আসলে কী অবস্থা হবে, তা যথেষ্ট চিন্তার বিষয়।

এখন চিন্তা করে আর কী ফায়দা? তাছাড়া সাফির তখনো আমার পথ হারাবার বিশেষ ‘সুখ্যাতি’ সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবগত ছিলো না। তাই নিশ্চিন্তে আমাকে ছেড়ে যুহরের সালাতের জন্য ভেতরে চলে গেলো, আমি কিছুক্ষণ হেঁটে মেয়েদের এলাকায় চলে গেলাম। সুবিশাল এই মাসজিদের কারুকার্য যেন রাজপ্রাসাদকেও হার মানায়। মাসজিদের ভেতরে যেমন সালাতের জায়গা আছে, তেমন মাসজিদ পরিসীমায় নববীর দালানের চতুর্দিকে লাল কার্পেট বিছিয়ে সালাতের ব্যবস্থা করা আছে। মেইন রাস্তার ১, ২, ৩ ইত্যাদি নাম্বার চিহ্নিত ফটক দিয়ে প্রথমে মাসজিদের চত্বরে প্রবেশ করতে হয়, মাসজিদ ঘিরে বিস্তৃত এ চত্বর পার হয়ে গেলে জুতা খুলে, কয়েক মানুষ সমান উচ্চতার সোনালী গেট দিয়ে মূল মাসজিদের অন্দরে যেতে হয়। এই সোনালী গেটগুলোর মোট সংখ্যাও চোখ কপালে তোলার মতো। এখানেও একরকম দেখতে প্রচুর গেট রয়েছে কিছুদূর পর পর।

মুসলিমদের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ মাসজিদের আকার আকৃতি, রাজকীয়তা, অসম্ভব পরিচ্ছন্নতা, বিশালত্ব, নিখুঁত কারুকার্য নিয়ে বহু বাক্য রচনা করা যাবে। কিন্তু মাসজিদে নববীর মূল মাহাত্ম্যর পাশে এসব বিশেষণ, আয়তন যেন ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। এসব আভিজাত্য যদি না-ও থাকতো, তবু এ মাসজিদের মাহাত্ম্যে কোনো ভাটা পড়তো না। যে ভালবাসার টানে মুসলিমরা এখন ছুটে আসেন, সেই একই ভালোবাসার টানে এরপরও ছুটে আসতেন।

রাসুল ﷺ এর মাসজিদে প্রবেশের পর সর্বপ্রথম মানুষের যে অনুভূতি হবে, তা হলো “পরম প্রশান্তি” আলহামদুলিল্লাহ্‌। যেন রহমতের ফেরেশতারা তাঁদের ডানা দিয়ে ঢেকে রেখেছে এ মাসজিদের পরিমণ্ডল। এত অদ্ভুত শান্তির অনুভূতি যেন একান্তই অপরিচিত। মাসজিদুল হারামের সাথে অবশ্যই অন্য কোনো স্থানের তুলনা হয় না। কিন্তু নববীতে যারা একবার এসেছে, তারা সকলে স্বীকার করতে বাধ্য হবে এ প্রচণ্ড ভালো লাগার কথা, প্রশান্তির এ তীব্র অনুভূতির কথা।

এ সাকুন বা শান্তির উৎস বা কারণ কী জানি না। হয়ত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ এখানে শুয়ে আছেন বলে আল্লাহ্‌ এত রহমত বর্ষণ করেন এখানে, অথবা সারা বিশ্ব থেকে প্রতিনিয়ত লাখো মানুষ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষণ করছেন বলে, সেই সালাম ও শান্তির ছোঁয়া এ স্থানে অবস্থানরত মুসল্লিরাও পেয়ে থাকেন। কিংবা সবাই এ মাসজিদে এক পরম করুণাময়ের ইবাদাতে মশগুল থাকেন বিধায় এ বিশেষ রহমতে ছেয়ে থাকে চারদিক। আবার এ-ও হতে পারে, উপরোক্ত সকল কারণ ও আরো নানাবিধ জানা-অজানা কারণে এ অনাবিল শান্তির পরশ পাই আমরা। একমাত্র আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামিন জানেন এর সঠিক হেতু কী। কারণ তিনিই তো এই অপার্থিব অনুভূতির উৎস, তিনিই তো একমাত্র প্রশান্তিদাতা, অসীম দয়ার মালিক। আল্লাহ্‌ তো বলেই দিয়েছেন, উনার স্মরণেই প্রশান্তি। আর এ স্থানে প্রতিদিন না জানি কত মুমিন আল্লাহ্‌র স্মরণে মশগুল থাকেন।

মক্কাতে গেলে বিভিন্ন দায়িত্ব ও নির্দিষ্ট ইবাদাত পালন করতে হয়। যেমন উমরাহ্‌ করা, উমরাহ্‌র জন্য সা’ঈ করা, যখন সময় পাওয়া যায় তওয়াফ করা, তওয়াফের সালাত পড়া, হাতিমে সালাত পড়া এবং হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া। তাছাড়া হাজ্জের দিনগুলোতে হজ্জের অবশ্যপালনীয় কার্যাবলী তো আছেই। কিন্তু মদিনাতে এমন কোনো নির্দিষ্ট করে দেওয়া দায়িত্ব নেই। দিনমান অফুরন্ত সময়। নেই কোনো দৌড়ঝাঁপ বা ছোটাছুটি।

তাই এখানে পা রাখলে সকলে নিজস্ব কিছু সময় পান, আত্মোপলব্ধির সময় পান। সারাজীবন পৃথিবীর পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে একদণ্ড সময় যারা পান না, মাসজিদে নববীতে এসে তাঁরাও আখিরাতের কথা চিন্তা করার ফুরসত পেয়ে যান। এখানে কারো কোনো কাজ নেই শুধু সালাত পড়া ছাড়া। অনেকে নফল সালাত রাক’আতের পর রাক’আত পড়তেই থাকেন। কেউবা বসে বসে মোহনীয় কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করেন। অনেকে মুসহাফ অর্থাৎ কুরআন দেখে দেখে পড়েন, আবার কেউ বা মুখস্থ আওড়াতে থাকেন। ধনী- গরীব, সাদা-কালো মানুষে-মানুষে ভেদাভেদের অনুপস্থিতিতে সবাই এক কাতারে সালাত পড়েন, পাশে বসে গল্প করেন। আর আল্লাহ্‌র রহমতে পরিপূর্ণ এক অনাবিল শান্তির স্বাদ আস্বাদন করেন।

এ মাসজিদে সর্বত্র কেমন ধীর স্থির শান্ত পথ চলা, এমনকি সালাতের সময় ইমাম সাহেব কুরআন তিলাওয়াতও করেন কা’বা ঘরের ইমামের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ধীরগতিতে! যখন আযানের পর জামাতের জন্য ইকামাত দেওয়া হয়, সুমিষ্ট কিন্তু দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, “ক্কদ ইকামাতুস সালাহ, ক্কদ ইকামাতুস সালাহ”, তখন যেন সকলের অন্তরে এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সব কাজ ফেলে লোকে এক লাফে দাঁড়িয়ে যায় সালাতের কাতারে। এই ব্যাপারটি মক্কা ও মদিনা উভয় স্থানেই পরিলক্ষিত হয়। আযান দিলেই সবাই সালাতের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। ওযু করতে তাড়াহুড়া লেগে যায়, নিকটস্থ মাসজিদে না যেতে পারলে, যে যেখানে আছে, সেখানেই সালাতের জন্য দাঁড়িয়ে যায়, একাধিক মানুষ সঙ্গে থাকলে তৎক্ষণাৎ একজন ইমাম হয়ে যান। দোকানপাটে বেচাকেনা বন্ধ হয়ে যায়, হাতের কাজ অর্ধসমাপ্ত রয়ে যায়, কেউ ফিরেও তাকায় না অন্য দিকে।

আযানের মাধ্যমে যখন আহ্বান করা হয়, “হাইয়া ‘আলাস সালাহ” (এসো সালাতের জন্য), “হাইয়া ‘আলাল ফালাহ” (এসো কল্যাণের পথে), তখন পৃথিবীর অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যায়। এক সুশিক্ষিত সামরিক ফৌজের মতো সকলে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায়, এক সাথে তাকবির দেয়, রুকুতে যায়, সিজদাতে যায়। অনেকে আবেগতাড়িত হয়ে যান এ সময়। কুরআনের অর্থ যারা বোঝেন, তাঁরা কেউ কেউ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। জান্নাতের পুরস্কারের আয়াত আসলে, সেই অশ্রু হয় আনন্দ ও আশা মিশ্রিত। আবার জাহান্নামের আয়াত উচ্চারিত হলে, ভীতি ও নাজাতের আশায় মুমিনের নয়ন হয় অশ্রুসিক্ত। কেউবা ফোঁপাতে থাকেন বিনম্র শ্রদ্ধায়। আল্লাহ্‌ নিশ্চয় তাঁর প্রতি ভালবাসা ও ভয়ে ঝরে পড়া ক্রন্দনের প্রতিটি ফোঁটার জন্য উত্তম প্রতিদান দেবেন, সকলকে ক্ষমা করে দেবেন।

সর্বশক্তিমানের প্রতি লাখ লাখ মুসলিমের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা না দেখলে অনুধাবন করা যাবে না! সালাতের এই বিশাল কাতার যখন অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, লাখ লাখ মুসল্লি যখন তাদের মালিকের সামনে সিজদায় অবনত হয়, কোথাও এক রত্তি শব্দ হয় না, লাখো মানুষ অনুচ্চস্বরে সালাতের শব্দাবলি পড়তে থাকেন, তখন অপার্থিব এক প্রশান্তির সূচনা হয়। এই নিবিড় ভাবগাম্ভীর্য ও ভালো লাগার কোনো তুলনা হয় না। হয়তো এজন্যই হাজ্জে আসলে মানুষ নেশাগ্রস্ত হয়ে যায়। তখন বারবার আসার জন্য সমগ্র স্বত্বা আকুলি বিকুলি করতে থাকে।

দুই প্রথম দিন সালাত পড়ে ঘরে ফেরার সময়, সাফির যে দিক দিয়ে পুরুষদের অংশে প্রবেশ করেছিলো, আমি সেদিকে রওনা হলাম। অন্তত আমার ধারণা ছিলো যে, আমি সেদিকেই রওনা হচ্ছি। রাসূল ﷺ এর কবর যিয়ারত করতে পারলাম না, কারণ পুরুষ ও মহিলাদের জন্য দিনের কিছু কিছু সময় আলাদা করে ভাগ করা আছে। সম্ভবত ঈশা, ফজর আর আসরের পর মহিলারা যিয়ারতের অনুমতি পায় ও বাকি সময়গুলো পুরুষদের জন্য নির্ধারিত। সারাদিন প্রচণ্ড লোক সমাগম থাকে, রাত বারোটার দিকে আবার মাসজিদে আসবো। তখন মেয়েদের জন্য খুলে দেওয়া হবে উনার কবর যিয়ারতের রাস্তা, আশা করছি তখন ভিড় কম থাকবে।

আপাতত হোটেলে ফিরে যাচ্ছি। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পরও দেখলাম রাস্তা শেষ হচ্ছে না। কিছুক্ষণ পরপর একটি করে গেট, তার সামনে প্রায় হুবহু একরকম দেখতে রাস্তাঘাট, দোকানপাট ও সারি সারি হোটেল। আমি একদম হতবিহ্বল হয়ে গেলাম, সাফির কোথায় গেলো? তার চেয়ে বড় কথা আমি কোথায় এলাম? কিছুই তো চিনতে পারছি না। কোন দিক দিয়ে এসেছি ও কোন দিক দিয়ে ফেরত যাবো, শত চিন্তা করেও বের করতে পারলাম না। ও এদিকে বারবার ফোন দিচ্ছে, আমি কোথায় জানার জন্য।

আমি ছাই কী জবাব দেবো? যদি আমি বুঝতেই পারতাম আমি কোথায়, তাহলে তো সমস্যার সেখানেই সমাধান হয়ে যেতো। শেষে সাফির আমাকে ফোন করে করে কী করতে হবে বলতে থাকলো। আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমি তখন কয় নাম্বার গেটের সামনে। আমি গেটের নাম্বার দেখে ওকে জানালাম, সেদিন বোধ হয় ২৩ নাম্বার গেটের সামনে ছিলাম। অনেকক্ষণ পর সাফির আমার কাছে পৌঁছলো এবং আশ্চর্যের সাথে জানতে চাইলো, আমি এত দূরে কীভাবে আসলাম। কারণ আমাদের হোটেল ১৩ নাম্বার গেটের সামনে!! হোটেলের ফিরতি পথে হাঁটতে গিয়ে আমি নিজেও অবাক হয়ে গেলাম, আসলেই আমি তখন অত দূরে গিয়েছিলাম কী করে?

সেদিন ছিলো হারিয়ে যাবার সবে শুরু। আমি প্রতিদিন নিয়ম করে হারিয়ে যেতে লাগলাম। প্রতি রাতে হোটেলে আসার আগে বেচারা ভদ্রলোকের আধাঘণ্টা ব্যয় হতে লাগলো তার দিকজ্ঞানহীনা অর্ধাঙ্গিনীকে খুঁজে বের করতে। একদিন আমি আমার ব্যাগে হোটেলের নাম লেখা কার্ড নিয়ে বের হলাম, আশা আজ হারিয়ে গেলেও মানুষকে জিজ্ঞেস করে পথ বের করে ফেলবো। কিন্তু আমার আশেপাশের বেশির ভাগ মানুষ আমার মতোই মদিনাতে প্রথমবার এসেছে। তারা নিশ্চয় সব হোটেলের নাম মুখস্থ করে বসে নেই। তখন গার্ডদের কাছ থেকে রাস্তা জানতে চাইতাম। হোটেলের নাম লেখা কার্ডের পেছনে রাস্তার ম্যাপ আঁকা আছে। সেই ম্যাপের দিকে তাকালে আমার কাছে তা নিতান্তই আঁকিবুঁকি মনে হতো। নিরক্ষরদের কাছে ছাপা অক্ষর যেমন ছবি ছাড়া আর কিছু নয়, আমার কাছেও ম্যাপ দেখলে বাঁকাচোরা করে কিছু দাগ টানা ছাড়া আর কিছুই মনে হতো না।

এভাবে পরপর দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ দিন আমি পথ হারিয়ে ফেললাম। এবং একবারও, ভুল করেও সঠিক রাস্তা খুঁজে পেলাম না। প্রতিদিন আমাকে খুঁজে বের করতে গিয়ে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ফোনের ব্যালেন্স শেষ হতে লাগলো। টাকা ভরলেই টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে, “তুমি কোথায়?, আমি এখানে”, ধরণের অনর্থক কথামালার পেছনে। একদিন হারিয়ে গেলে তার প্রতি মানুষের করুণা জন্মে, দ্বিতীয় দিন হারিয়ে গেলে কিছুটা অবাক ভাব জন্মে, কিন্তু অনবরত প্রতিদিন পথ ভুল করতে থাকলে তার ওপর অসম্ভব রাগ আর বিরক্তি ছাড়া আর কিছুই উৎপাদিত হয় না।

অতএব চতুর্থ দিন ওর মতো ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ হতবুদ্ধি হয়ে রাগে ফেটে পড়লো। রাগে অন্ধ হয়ে আমাকে আমার রুমমেটদের সামনে এনে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে ঘোষণা দিলো, “আপনারা সবাই খেয়াল রাখবেন, ও যেন একা বাইরে না যায়। আপনারা ওকে সাথে করে নিয়ে মাসজিদে যাবেন, আপনাদের পাশে রাখবেন ও সেভাবেই ওকে আবার হোটেলে ফেরত আনবেন।” অর্থাৎ আমাকে আনা নেয়ার দায়িত্বে ভদ্রলোক ইস্তফা দিলেন। কারণ মেয়েমহলে যেহেতু ওর প্রবেশ নিষেধ, আমাকে ঠিকমতো দেখেশুনে রাখতে পারে না, তাই কিছু বয়স্কা, দায়িত্বশীলা, রাস্তাঘাট সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্না মহিলার কাছে আমার দায়িত্ব সঁপে দিয়ে সে নিশ্চিন্ত হতে চাইলো কিংবা নিষ্কৃতি পেতে চাইলো। মহিলাত্রয় এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে তা সাদরে গ্রহণ করলো।

এদিকে কেউ খেয়াল করলো না যে, এত বড় অপমানে এক তরুণীর হৃদয় জ্বলে পুড়ে খাঁক হয়ে যেতে লাগলো। আর মনে মনে কঠিন প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফেললো যে, সে এই মহিলাদের সাথে ভুলেও বের হবে না। প্রয়োজনে এরপর থেকে একা একা মাসজিদে যাবে এবং নিজে নিজে পথ চিনে ফেরত আসবে। ভাগ্যিস অন্তরের প্রতিধ্বনি বাইরে শোনা যায় না। তা না হলে এতক্ষণে সকলে আমার এই নির্বোধের মতো হাস্যকর মনোবাসনা শুনে নিশ্চয় একযোগে অট্টহাসি দিয়ে উঠে অপমানের ষোলকলা পূরণ করতো।

পরদিন আমি সবার শেষে গোসলে গেলাম। এদিকে যুহরের সালাতের সময় হয়ে গেছে, আমার রুমের দায়িত্ববান রমণীগণ বাথরুমের দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দিলেন। আমি বলে দিলাম আমার দেরী হবে, আমি একাই যেতে পারবো। বেচারিরা আমার এই অভূতপূর্ব সাহসী বক্তব্যে যারপরনাই দোটানায় পড়ে গেলেন। একদিকে সাফিরের অনুরোধ, অপর দিকে জামাতের সময় এগিয়ে আসছে। আমার জন্য উনারা আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবেন? শেষমেশ জামাতে অংশ নেবার আকাঙ্ক্ষা জয়যুক্ত হলো, আমাকে ফেলে বাধ্য হয়ে তারা মাসজিদে চলে গেলো।

সবাই চলে যাবার পর আমি ধীরেসুস্থে বাথরুম থেকে বের হলাম। ওদিকে সাফির মশাই ফুরফুরে মন নিয়ে মাসজিদে চলে গেছেন। আমার মতো অদ্ভুতূড়ে সঙ্গীকে সঙ্গে নিতে না হয়ে আজ সে নির্ভার পাখির মতো উড়াল দিতে পারবে। সে তো আর আমার দুঃসাহসিক বিচারবুদ্ধির কথা জানে না। জানলে নির্ঘাত চেতনা হারিয়ে অচেতন হয়ে যেতো।

আজ আমি একজন স্বাধীন নাগরিকের মতো হোটেলে থেকে পথে নামলাম। আকাশ, বাতাস, দেয়াল, রাস্তা, দোকান, মানুষজন, সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। যখন স্বামীর সাথে কোনো জায়গায় যাই, তখন মনে হয় আমি অন্ধ হয়ে যাই, আর ও হয় অন্ধের লাঠি। লাঠি যেদিকে নেয়, আমি সেদিকে যাই। কোথায় গেলাম, কোনদিক দিয়ে গেলাম, কিছুই দেখি না। কোন দুনিয়াতে তখন বসবাস করি আল্লাহ্‌ই জানেন!!! সেদিন আশেপাশে সবকিছু নতুন করে দেখতে লাগলাম। রাস্তার প্রতিটি চিহ্ন, গেট নাম্বার মনে মনে গেঁথে নিলাম। আজ আর হারানো চলবে না। কোনোমতেই হারানো চলবে না।

তিন দেশের বাইরে গেলে অচেনা মানুষের সাথে গল্প জুড়ে দেওয়া আমার পছন্দের কাজগুলোর একটি। কখনো ইন্দোনেশিয়ানদের সাথে কথা বলতাম, পাকিস্তানি বা ভারতীয়দের সাথে ভাষা নিয়ে কোন সমস্যা হতো না। আবার আফ্রিকানদের সাথে ইশারাই সম্বল করতে হতো, কারণ তারা হয় ইংরেজি জানে না, আবার জানলেও ভাঙা ভাঙা।

একদিন এক লম্বা, ফর্সা, সুন্দরী, অভিজাত চেহারার পাকিস্তানি মহিলার সাথে আলাপ হলো। তিনি উমরাহ্‌ করতে এসেছেন, সেই ফাঁকে মদিনা ঘুরে যাচ্ছেন। তাঁর চোখে মুখে কোথায় যেন যন্ত্রণার ছায়া, কোনো অব্যক্ত বেদনায় যেন তাঁর ঋজু শরীর নুয়ে পড়ছে। কথা বলে জানলাম, উনার মানসিকভাবে অসুস্থ এক কন্যা আছে, মেয়েটি প্রচণ্ড ডিপ্রেশানের রোগী। মেয়ের চিন্তায় তাঁর জীবনের সকল আনন্দ এখন নিষ্প্রভ। অনেক করে বললেন, তাঁর সন্তানের জন্য দু’আ করতে। আল্লাহ্‌ যেন তাঁর মনোবাসনা পূর্ণ করেন। আমিন।

এখানে ইন্দোনেশিয়ানদের দেখতে সবচেয়ে ভালো লাগে। রুচিবান, পরিচ্ছন্ন, সফেদ বস্ত্রে তাদের দেখে মনে হয় যেন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা বেলি ফুল। নিজেদের দেশীয়দের নিয়ে ছোট ছোট দলে একসাথে থাকতে তারা পছন্দ করে। সবসময় হাসিমুখে কথা বলে, যেন এক একজন বিনয়ের অবতার। ইন্দোনেশিয়ান আর মালয়শিয়ানদের মাঝে অল্প বয়সে হাজ্জ করার প্রবণতা লক্ষণীয়। সেই তুলনায় আবার ভারতীয় উপমহাদেশ হতে আগতগণ সাধারণত মধ্যবয়সী, অথবা বুড়ো থুরথুরে হয়। আবার পাকিস্তানিদের একটি ব্যাপার ভালো। তারা কোলের শিশু, বৃদ্ধ বাবা, মা, ভাই বোন, চাচা, ফুপু ইত্যাদি আত্মীয়স্বজন সবাইকে নিয়ে দলবেঁধে হাজ্জ বা উমরাহ্‌ করতে চলে আসে। সুযোগ পেলে এবং হাতে টাকাকড়ি জমা হলে হাজ্জ/ উমরাহ্‌তে আসা তাদের সংস্কৃতির এক আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ দেশে এসে বিশালদেহী আফ্রিকানদের থেকে কিছুটা সাবধানে থাকি। বিশেষত তওয়াফের সময়, অথবা যখন ভিড়ের মাঝে সালাত পড়তে হয়। কারণ তাদের বলিষ্ঠ শরীরের হালকা ধাক্কা লাগলেও আমার মতো তালপাতার সেপাই উড়ে গিয়ে দূরে ছিটকে পড়বে। আফ্রিকানরা যুগের পর যুগ ধরে অত্যাচারিত হতে হতে জন্মগতভাবে তাদের ভিতর মনে হয় ‘Defensive’ মনোভাবের তৈরি হয়েছে। তারা যেন সদাই প্রস্তুত নিজেদের রক্ষায়। কিন্তু মনের দিক দিয়ে অত্যন্ত সাদাসিধা এই মানুষগুলো একটু ভালোবাসা পেলেই অন্যদের আপন করে নেবে মুহূর্তে। আর কালো মানুষদের মাঝেও যে এত সৌন্দর্য থাকতে পারে, কাছে থেকে না দেখলে জানতাম না কখনোই। এদের অনেক মহিলার মুখে একটি বা দুটো সোনার দাঁত ঝিলিক দিয়ে ওঠে। সেই দেশে বোধ হয় সোনার দাঁত লাগানো ফ্যাশন, যদিও ইসলামে এমনটি করা নিষেধ।

ভিনদেশীদের মাঝে তুর্কিস্তানের মানুষদের দেখতে সবাইকে একরকম লাগে। তাদের বেশিরভাগের বয়স পঞ্চাশোর্ধ্ব, খুব বেশি লম্বা নয়। হাট্টাকাট্টা স্বাস্থ্যের তুর্কিরাও সাধারণত একসাথে থাকে। এদের মাঝে তরুণ বয়সী হাজ্জযাত্রীর সংখ্যা চোখে পড়ে কম।

বিভিন্ন দেশের মুসল্লিদের মাঝে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে আরব দেশীয়দের। মহিলারা ভূমিতে লুটানো লম্বা বোরকা পড়ে। বোরকা ছাড়া কোনো মহিলা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যাদের ভিতর কয়েক হাজারে এক জন হয়তো হবে নিকাব ছাড়া। নিকাবের সাথে অনেকে আবার সানগ্লাস বা অতিরিক্ত এক পরত কাপড় দিয়ে চোখ পর্যন্ত ঢেকে রাখে। আরবি মহিলারা সাধারণত গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে নিকাব ছাড়া বের হয় না।

মাসজিদে নববী মদিনাতে শুধু সালাত ও ইবাদতের স্থান হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মদিনাবাসীদের সামাজিক মেলামেশা ও জীবনযাপনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের দেশে যেমন বিকালের দিকে মানুষ পার্কে হাঁটতে যায় বা শপিং মলে ঘুরতে যায়, এই শহরে তেমন বিকালের দিকে পরিবারের ছেলে-বুড়ো, বাচ্চা-কাচ্চা সকলে মিলে লোকজন নববীতে চলে আসে। ছেলেরা ছেলেদের দিকে থাকে, আর মহিলারা ছোট সন্তানদের নিয়ে মহিলাদের অংশে চলে আসে। আসর থেকে কেউ কেউ ঈশা পর্যন্ত থেকে যায়। ব্যাগে করে নিয়ে আসা খাবার ও ফ্লাস্কে করে নিয়ে আসা চা খেতে খেতে, সালাতের পর সবাই মিলে হাত পা ছড়িয়ে গল্প করতে বসে। মহিলাদের চাপা হাসি, কলকাকলিতে ও শিশুদের ছোটাছোটিতে পিকনিকের মতো আবহ তৈরি হয়। এই ছেলেমেয়েগুলো জন্ম থেকেই মাসজিদে আসতে আসতে মাসজিদ তাদের কাছে নিজ গৃহের মতো আপন হয়ে যায়।

সালাতের সময় বাচ্চারা সালাতের কাতারের ভিতর দিয়ে দৌড়া দৌড়ি করতে থাকে, কিন্তু কেউ এতে বিরক্তি প্রকাশ করে না। এখানে বাচ্চাদের বেঁধে রাখার জন্য এক ধরনের বেল্ট পাওয়া যায়!! সে বেল্টের এক প্রান্ত বাঁধা থাকে মায়ের হাতে বা কোমরে, অন্য প্রান্ত বাঁধা থাকে বাচ্চাটির কোমরে। এর ফলে সবেমাত্র হাঁটতে শেখা দুরন্ত শিশুরা মায়ের সালাতের ফাঁকে হারিয়ে যেতে পারে না। তারা পাশেই খেলতে থাকে, তবে মায়ের চারদিকের বৃত্তের বাইরে যেতে পারে না।

এমনকি তাহাজ্জুদের সময়ও মহিলারা কোলের শিশু নিয়ে জামাতে চলে আসে (উল্লেখ্য, তাহাজ্জুদ সালাত জামাতেও পড়া যায়)। একদিন দেখি এক মহিলার কোলে নরম তুলতুলে নবজাতক, বেশি হলে দেড় থেকে দুমাস হবে তার বয়স। এতটুকু সন্তানকে নিয়ে তো বাঙ্গালী মহিলারা সিঁড়ি বেয়ে নামতেও ভয় করে। আর এই দেশে ঘরের বাইরে তো বটেই, একেবারে তাহাজ্জুদে নিয়ে আসতেও ভয় পায় না আরবি রমণীকুল!

বিভিন্ন দেশের মুসলিমের মাঝে একটি ব্যাপার দেখেছি, তারা শিশু সন্তানদের নিয়ে হাজ্জ বা উমরাহতে চলে আসতে দ্বিধা বোধ করে না।

দু’এক বছর আগে একদিন শারজাহ এয়ারপোর্টে ট্রানজিটের কারণে বেশ কিছুক্ষণ থাকতে হয়েছিলো। সেখানে দেখলাম এক মহিলা তার ছয় সন্তান নিয়ে উমরাহ্‌ করতে যাচ্ছেন। তার বড় শিশুটির বয়স তের/চৌদ্দর বেশি হবে না, সুতরাং কনিষ্ঠদের বয়স আশা করি উল্লেখ করার দরকার নেই। এক পাকিস্তানি পরিবারকেও দেখেছি তিন সন্তান নিয়ে উমরাহ্‌তে যাচ্ছেন। উনাদের জ্যেষ্ঠ সন্তানের বয়স ছয়ের বেশি নয় ও কনিষ্ঠটির বয়স সবে দেড় মাস। হাজ্জে এসে সাফা মারওয়ায় সা’ঈ করার সময় এক ভারতীয় দম্পতির সাথে কথা হলো। তারা তাদের আড়াই বছরের মেয়ে ও কয়েক মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে হাজ্জে চলে এসেছেন। দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের মায়েরা এই একটি ব্যাপারে বিশ্বের সর্বাধিক ‘ভীতু’ মায়ের খেতাব অর্জন করতে পারে। কারণ তারা নয়-দশ বছরের ছেলে মেয়ে নিয়েও কোথাও যাবার আগে দশবার চিন্তা করে!!

চার মদিনাতে আসার আগে মাসজিদে নববীর লাইব্রেরি সম্পর্কে শুনেছিলাম। তাই আমি আর সাফির মদিনাতে এসে লাইব্রেরি খোঁজাখোঁজি করতে লাগলাম। সাফির সহজেই পুরুষদের অংশে বিশাল এক লাইব্রেরি আবিষ্কার করে ফেললো। সেখানে নানা ভাষার সাথে সাথে বাংলাতেও বই রয়েছে। এদিকে আমিও মহিলাদের লাইব্রেরি খুঁজে পেলাম, যতদূর মনে পড়ে ২৬ থেকে ২৮ নং দরজার মাঝামাঝি অংশের কোনো এক প্রবেশদ্বারের পাশে। ভালো করে না খুঁজলে সহজেই চোখ এড়িয়ে যাবে। পুরুষদের লাইব্রেরির মতো বিশাল না হলেও, এখানে যত বই আছে তার সবগুলো পড়ে ফেলতে হলে মদিনায় আরো কয়েকবার আসতে হবে। বইপ্রেমীগণ সালাতের ফাঁকে ফাঁকে লাইব্রেরীতে এসে ইসলামের সহিহ লাইনের উপর প্রচুর বই-পত্র খুঁজে পাবেন এবং সেসব বই পড়ে সত্যিকার অর্থে ইসলামের অনেক অজানা তথ্য জানতে পারবেন।

মাঝে মাঝে সময় পেলে লাইব্রেরিতে এসে বসতাম। এর মানে এই না যে, আমি প্রচুর বই পড়ে উল্টে ফেলেছি। দুই-একটি বইয়ের কিছু কিছু অংশ পড়া হয়েছে মাত্র। বই পড়ার সাথে সাথে অন্যদের কাণ্ড-কারখানা দেখতে ও নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে বেশ ভালো লাগতো! যেমন, এখানকার একজন মহিলা শিক্ষার্থীর সাথে পরিচয় হলো। মেয়েটি আরবির পাশাপাশি চমৎকার ইংরেজি, উর্দু সহ মোট চারটি ভাষা জানে। ফলে সেই ভাষাভাষী বিদেশি মানুষের ধর্ম সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর তাদের ভাষায় দিতে পারে।

একদিন আমি বসে বসে বই ঘাঁটছি, এমন সময় লম্বা একহারা গড়নের এক ভারতীয় মেয়ে পাঠাগারে প্রবেশ করলো। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম আয়েশা নামের এই মেয়েটি মা-বাবাকে নিয়ে হাজ্জে এসেছে। ভারতে ইসলামের ওপর পড়াশোনা করছে, অনেকটা অনার্সের মতো এই পড়াশোনার ব্যবস্থা। ডিগ্রি অর্জন শেষ হলে তাকে আলেমা বলা হবে।

আগেই শুনেছিলাম, মাসজিদে নববীতে একটি কক্ষে বিভিন্ন ভাষায় ইসলামের সঠিক আকিদার ওপর লেখা নানাবিধ বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। আমি আর আয়েশা মিলে সেই কক্ষটি খুঁজে বের করে ফেললাম। যার যার ভাষার একটি করে বই দেওয়া হলো আমাদের। মেয়েটি যখন শুনলো আমি স্বামীর সাথে হাজ্জে এসেছি, একটু যেন অবাক হয়ে গেলো। অন্যের অবাক হওয়া দেখে আজকাল আর আমি চমকাই না। তবে তার অবাক হবার কারণটি ভিন্ন। আমাকে দেখে বেচারি ভেবেছে আমার বয়স অনেক কম। আমার এত কম বয়সে বিয়ে হয়ে গেছে ভেবে সে বোধ হয় করুণার দৃষ্টি হানলো। আমাকে মনে হয় তার চাইতেও কমবয়সী ভেবেছে। যেহেতু এখনো মেয়েটি অনার্স শেষ করেনি, আর চেহারা দেখেও বোঝা যাচ্ছে সে-ই উল্টো আমার চেয়ে বেশ ক বছরের ছোট হবে। কিন্তু আমি আর তার ভুল ভাঙালাম না, উল্টো তার কথাবার্তা উপভোগ করতে লাগলাম। দেখতে হাল্কা পাতলা হলেও, আমার আসল বয়স জানলে মেয়েটি নিশ্চয় চোখ কপালে তুলতো!

পাঁচ এভাবে মাঝে মাঝেই দেশ বিদেশি মানুষের সাথে কথা হতো। কখনো বা আসরের পর মাসজিদের বাইরে দোকানপাটে ঘুরে বেড়াতাম। যেহেতু আসরের থেকে মাগরিবের মাঝে নফল সালাত না পড়ার কথা বলা হয়েছে, তাই সে সময়টুকু ঘুরে বেড়ানোর ও লাইব্রেরিতে বসার কাজে ব্যয় করতাম। তবে বেড়ানোর বদলে যারা কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির আযকার নিয়ে সময় কাটায়, তারা অবশ্যই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ করে। অনেক মহিলারা দল বেঁধে থাকতে পছন্দ করেন। কিন্তু আমার একাকী বোহেমিয়ানের মতো ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগতো। এভাবে লাইব্রেরির সাথে সাথে একটি মার্কেট আবিষ্কার করে ফেললাম।

মাসজিদে নববীর ৬ নাম্বার গেটের বাইরে পথের উপর রোজ বাজার বসতো। ঈশার সালাতের পর সেই মার্কেট বন্ধ হয়ে যেতো। এ জায়গার বিশেষত্ব ছিলো, অত্যন্ত সুলভে এখানে রকমারি দ্রব্যাদি পাওয়া যেতো, যেখানে বড় বড় শপিং মলে সেই একই মানের পণ্যসামগ্রী অতিরিক্ত দাম দিয়ে বিক্রয় করা হতো!! আমি মনের আনন্দে এখান থেকে অনেক কিছু কিনে ফেললাম, আমার রুমের অন্যদেরও আমার এই আবিষ্কারের খোঁজ দিয়ে দিলাম। তারপর অন্য একদিন হাঁটতে হাঁটতে মাসজিদের অন্য একটি গেটের পাশে মুহাম্মাদ ﷺ এর জীবনীর উপর তৈরি এক road show’র আয়োজন দেখতে পেলাম। সেখানে বিশাল এক হল ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বড় বড় ব্যানারে উনার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের ঘটনাবলি ও উনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সহজ ভাষায় লেখা ছিলো।

পাঁচ সবচাইতে মজার ও আপাতদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, সেদিনের সেই পথ হারানো সংক্রান্ত অপমানজনক অভিজ্ঞতার পর থেকে আমি আর একদিনও হারিয়ে যাইনি। সাফিরের আর আমাকে খুঁজে বের করতে হতো না, আল্লাহ্‌র রহমতে পথ চিনে ওর সামনে ঠিক চলে আসতাম। অনেক সময় নিজে নিজে হোটেলেও চলে আসতাম। এক পর্যায়ে দেখা গেলো, একা একা চলাচল করে অন্য অনেকের চেয়ে এমনকি আমার বরের চেয়েও মাসজিদে নববী সংলগ্ন এলাকা আমি ভালো করে চিনে ফেলেছি।

(চলবে ইনশা আল্লাহ্‌)


আগামী পর্ব: মাসজিদে নববীর দারস

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

দুই বছর মেয়াদী অনলাইন ভিত্তিক আরবি ভাষা শিক্ষা প্রোগ্রাম IIRT Arabic Intensive
বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.