Sapiens: A Brief History of Humankind

লেখক: ইয়ুভাল নোয়া হারারি

IIRT Arabic Intensive

‘ইতিহাস’ শব্দটা শুনলে আমাদের মাথায় ভেসে ওঠে কত সালে কোন রাজা সিংহাসনে আরোহণ করেন, কয়টা যুদ্ধ করেন এবং কাকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে কবে মারা যান—এসকল বর্ণনা। Sapiens বইটার কাহিনি ভিন্ন। লেখক এখানে মানব প্রজাতির (‘মানবজাতি’র নয়) একদম শুরু থেকে নিয়ে একবিংশ শতাব্দী হয়ে অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি সার্বিক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ভিত্তি ছিল মূলত এভোলিউশনারি বায়োলজি এবং কালচার। ২০১১ সালে হিব্রু ভাষায় প্রথম প্রকাশিত এই বইটি ২০১৪ সালে ইংরেজিতে অনূদিত হয় এবং বেশ ভালো রকম সাড়া ফেলে। বারাক ওবামাসহ অনেক হাই-প্রোফাইল মানুষের অবসর সময়ের সঙ্গী হওয়ার রেকর্ড আছে বইটির। জুন, ২০১৭ পর্যন্ত ৪৫টি ভাষায় বইটি অনূদিত হয়েছে।

যে ব্যাপারটা শুরু থেকেই চোখে লাগে, তা হলো—অদেখা অতীতের ঝাপসা কিছু বিন্দুকে কাল্পনিক রেখা দিয়ে সংযুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ একটা চিত্র দেখানোর জন্য লেখককে রীতিমতো গল্প বলতে হয়েছে। জীবের আচমকা উৎপত্তি, হঠাৎ একদিন মানব প্রজাতির মাঝে cognitive revolution—এসবের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রদানের কাজটি সযত্নে এড়িয়ে গেছেন হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুসালেমের ইতিহাস বিভাগের এই অধ্যাপক।

ধর্মীয় বিশ্বাসের বিবর্তন-সংক্রান্ত আলোচনায় লেখক খুব একটা স্বকীয়তা দেখাননি। প্রকৃতিপূজা থেকে বহুঈশ্বরবাদ হয়ে কালক্রমে একেশ্বরবাদ ও নাস্তিকতার উদ্ভবের সেই পুরোনো থিওরিরই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এখানে যেই অ্যাপ্রোচটা অনুসরণ করা হয়, তা হলো বহু প্রাচীন কোনো মূর্তি খুঁজে পেয়ে সেটিকে বহুঈশ্বরবাদের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা। কিন্তু একেশ্বরবাদীদের ঈশ্বরের কোনো প্রাচীন মূর্তি না পাওয়ায় একেশ্বরবাদকে তুলনামূলক নতুন বলে দাবি করা। অথচ একেশ্বরবাদের প্রকৃতিই এমন যে, তা প্রতিমা-নির্ভরতাকে ঘৃণা করে। তাই এই পদ্ধতিতে একেশ্বরবাদের বয়স নির্ণয় করতে যাওয়াটা একদম গোড়াতেই ত্রুটিপূর্ণ।

শূন্য থেকে কোনো কিছুকে অস্তিত্বে আনাকে বলা হয় ‘সৃষ্টি’, যা করতে অসমর্থ হওয়ার কথা বিজ্ঞানীরা খোলাখুলিই স্বীকার করেন। এছাড়া বাকি সবকিছুই শক্তি ও পদার্থের এক রূপ থেকে আরেক রূপে ‘রূপান্তর’, যা মানুষ সেই স্মরণাতীত কাল থেকেই করে আসছে। সায়েন্টিফিক রেভোলিউশানের মাধ্যমে মানুষের এই ‘রূপান্তর’ করতে পারার ক্ষমতায় এসেছে ব্যাপক অগ্রগতি। বইয়ের শেষাংশে এটাকেই লেখক তুলে ধরেছেন মানুষ থেকে ঈশ্বর হয়ে ওঠার প্রমাণ হিসেবে। চিকিৎসা ও ওষুধ শিল্পের অগ্রগতিকে তুলে ধরেছেন ‘অমর মানুষ’ তৈরি হওয়ার পূর্বলক্ষণ হিসেবে। অথচ গাড়ি চাপা পড়ে মরা, খুন হওয়া, আত্মহত্যা—এসবের কোনো সমাধান উল্লেখ করেননি।

দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে লেখক ভেতরের অনেক খুঁটিনাটি তথ্য নিয়ে মন্তব্য করার লোভ সামলাতে পারেননি। যেমন, লেখকের মতে একেশ্বরবাদীরা ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বর’ এবং ‘মন্দের অস্তিত্ব’ বিষয় দুটির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে হিমশিম খায়। এছাড়া ঈশ্বরের সম-শক্তিমান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শয়তানের অস্তিত্ব কল্পনা করাটাও একেশ্বরবাদী কনসেপ্টের সাথে সাংঘর্ষিক। অথচ ইসলামের কনসেপ্টই হলো যে, দুনিয়ার জীবন পরীক্ষাস্বরূপ। মন্দের অস্তিত্ব থাকাটা আল্লাহর অক্ষমতার প্রমাণ তো নয়ই, বরং প্রজ্ঞার নিদর্শন। এছাড়া শয়তান হলো আল্লাহর মাখলুক একটি জিন, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আরেকটি ব্যাপার হলো, মুসলিমরা কুরআন-সুন্নাহকে পরকালীন নাজাতের (human salvation) জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের উৎস বলে মানে। ধানের ফলন বাড়াতে কোন সার দেওয়া উচিত (human prosperity), এটি কুরআন-সুন্নাহর আলোচ্য নয়। অথচ লেখক দাবি করেছেন, ধর্মগ্রন্থকেই মুসলিমরা ‘Knowledge necessary for human prosperity and human salvation’ মনে করে! এভাবে অনেক জায়গাতেই অল্প তথ্য সন্নিবেশিত করে অনেক বেশি বিশ্লেষণে লিপ্ত হওয়ায় বইটি বোদ্ধা পাঠকমহলে সমালোচনা কুড়িয়েছে। নৃবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার হলপাইকের মতে, এই বইটি জ্ঞানের জগতে উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন সংযোজন নয়, বড়জোর একটি তথ্য-বিনোদন (infotainment)।

Imagined reality-র আলোচনাটি সুখপাঠ্য। বিপুল-সংখ্যক অপরিচিত ব্যক্তির সাথে মানুষ কীভাবে মিলেমিশে কাজ করতে পারে, যেখানে একটা হাতি বা শিম্পাঞ্জি নিজের দলের বাইরে কারো সাথেই মিশতে পারে না? লেখকের মতে, এর কারণ হলো মানুষ ‘কাল্পনিক বাস্তবতা’ তৈরি করতে শিখেছে। কোম্পানি, সাম্রাজ্য, এমনকি টাকার মূল্যমান—সবই মানুষের দলবদ্ধ কল্পনার ফসল। আপনি-আমি দুজনই কাগুজে নোটের মূল্যমানে ‘বিশ্বাস’ করি। সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়েও তাই আমাদের মাঝে লেনদেন সম্ভব হচ্ছে। অথচ নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতায় সেগুলো কটা কাগজের টুকরো ছাড়া কিছুই নয়। সিইও থেকে ঝাড়ুদার পর্যন্ত সকলে একটি কোম্পানির অস্তিত্বে ‘বিশ্বাস’ করে বলেই মিলেমিশে কাজ করে। টেকনাফ আর তেঁতুলিয়ার দুটি সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ নিজেদের মধ্যকার দেড় লাখ বর্গকিলোমিটার মাটিকে বাংলাদেশ বলে ‘বিশ্বাস’ করে। কোম্পানি, অর্থব্যবস্থা, সাম্রাজ্য কিংবা ধর্ম—কোনো ‘বিশ্বাস’ই আসলে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ আনে না, উলটো ঐক্যবদ্ধ করে।

একইভাবে লেখক দেখিয়েছেন যে, গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও মানবাধিকার—সবই একেকটা ‘বিশ্বাস’, একেকটা ‘ধর্ম’। বিজ্ঞান দিয়ে এই প্রতিটা ধর্মকেই প্রশ্ন করা যায়। বস্তুবাদী বিজ্ঞান কখনও ‘আমেরিকা’, ‘জাতিসংঘ’ বা ‘মানবাধিকার’-এর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। এই নামগুলোর অস্তিত্ব মানুষের মনের ভেতর শুধু। “এই সবই কতগুলো নাম মাত্র, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখেছ। আল্লাহ এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি।” (১২:৪০) এই সকল ধর্ম থেকেই ‘ফ্যানাটিক’ ও ‘ধর্মত্যাগী’ তৈরি হওয়া সম্ভব এবং আছেও। উদারপন্থি মানবতাবাদ (Liberal Humanism) ধর্মের দুটি রুকন ‘সম-অধিকার’ এবং ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’র পরস্পরবিরোধিতা নিয়ে ব্লগে ঝড়-তুফান তুলে ফেলা সম্ভব। কিন্তু তা করা হয় না, কারণ মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এমন কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাস করাই লাগে। হোক সেটা ক্রিশ্চিয়ানিটি বা কম্যুনিজম। প্রতিটি ধর্মের কিছু সাচ্চা অনুসারী তাই সেসব ধর্মকে টিকিয়ে রাখে। এগুলো যে আসলে কাল্পনিক কিছু ধারণা মাত্র, সেই বাস্তবতাকে লুকিয়ে রাখে। এই ধর্মবিশ্বাসগুলো না থাকলে মানবসমাজ টিকে থাকতেই পারতো না, এগুলো যতই বিজ্ঞানবিরোধী হোক না কেন। ইতিহাসে একটি ধর্মই কেবল বিজ্ঞানকে নিজেদের ভিত্তি বানিয়েছিল। Evolutionary Humanism, যার প্রবক্তা হিটলার এবং অনুসারী তৎকালীন নাৎসি ও বর্তমান হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট সম্প্রদায়। এমনকি হাল জামানার ‘সংস্কৃতিবাদ’ও পুরাতন ‘বর্ণবাদে’র নতুন রূপ মাত্র।

কাছ থেকে দেখলে ইতিহাস বড় ছন্নছাড়া একটা জঙ্গল। সেটাতে একটা প্যাটার্ন আবিষ্কার করা লাগলে দূর থেকে দেখা লাগে। তাই ইতিহাসকে দেখার একটা জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো Bird’s eye view. লেখক যেহেতু লম্বা সময়ের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন, তাই তাঁকে satellite view পদ্ধতিতে তাকাতে হয়েছে। স্যাটেলাইট থেকে পর্যবেক্ষণ করে তিনি সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, পৃথিবী ক্রমেই ছোট ছোট অনেকগুলো মানবগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির পর্যায় অতিক্রম করে স্বল্পতর সংখ্যক বড় গোষ্ঠী ও সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছে। গ্লোবালাইজেশান শব্দটির জন্মের অনেক আগে থেকেই এ প্রক্রিয়াটি নীরবে চলে আসছে। ভিন্ন ভিন্ন জাতির কাছে ভিন্ন ভিন্ন শরিয়ত দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন নবি পাঠিয়ে ঠিক নির্দিষ্ট একটা সময়ে গ্লোবাল শরিয়ত দিয়ে একজন গ্লোবাল নবিকে ﷺ প্রেরণ করা কতটা সূক্ষ্ম আসমানি পরিকল্পনার ফসল, তা এখান থেকে অনুমান করা যায়।

বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানের সাথে বিভিন্ন মতাদর্শের মানিক জোড় দেখাতে গিয়ে লেখক পুরো একটা অধ্যায় রেখেছেন। পশ্চিমা বিশ্ব কীভাবে বিজ্ঞান ব্যবহার করে বিশ্বমঞ্চে বামুন থেকে হঠাৎই জায়ান্ট হয়ে গেল, এ নিয়ে লম্বা চওড়া আলাপ আছে। প্রসঙ্গক্রমেই দেখানো লেগেছে যে, বিজ্ঞান কখনও একা একা কাজ করে না। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফান্ডিং-এর জন্য বিজ্ঞান যেমন নির্ভর করে উপনিবেশবাদ, পুঁজিবাদ আর শিল্পায়নের ওপর; তেমনি এই তিনটি জিনিসই নিজ নিজ স্বার্থে বিজ্ঞানকে পয়সা জোগায়। ঔপনিবেশক, পুঁজিবাদী আর শিল্পপতিদের নির্যাতনে যত জাতি নিশ্চিহ্ন হয়েছে, তার কোনোটাই বিজ্ঞানের আচমকা অগ্রগতি ছাড়া সম্ভব ছিল না। বিজ্ঞানকে এগুলো থেকে আলাদা করে একে একটি উপকারী ও নিরপেক্ষ শাস্ত্র ভাবা অসম্ভব।

বিশেষজ্ঞ সমালোচনাগুলো একপাশে রাখলে সাধারণ পাঠকদের জন্য হারারি’র Sapiens চমৎকার একটি অবসরসঙ্গী।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive