এক ড্যান ব্রাউনের লেখা পছন্দ করতাম, দা লস্ট সিম্বল বইয়ের শুরুতে একটা ছোট্ট অনুচ্ছেদ মনে গেঁথে গিয়েছিল-“To live in the world without becoming aware of the meaning of the world is like wandering about in a great library without touching the books.” (The Secret Teachings of All Ages)

[দুনিয়ার মানে কি তা না বুঝে দুনিয়াতে বেঁচে থাকা আর বিশাল কোন লাইব্রেরীতে বইগুলো না ছুঁয়েই ঘুরে বেড়ানো একই কথা।]    (সকল যুগের গুপ্ত শিক্ষা)

IIRT Arabic Intensive

ভাবতাম, “আসলেই তো! দুনিয়ার অর্থটা কি ? জীবনেরটাই বা কি ?”

এই তো সেদিন পড়ছিলাম স্টিফেন হকিং তার ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইমে’র শেষ টানছেন উত্তর সন্ধান করবার আশা ব্যক্ত করে সেই অমোঘ প্রশ্নের- “… why it is that we and the universe exist.”  ( এই মহাবিশ্ব এবং আমাদের অস্তিত্বের কারণ কি )
প্রায়ই আমাকে তাড়া করে বেড়াত সেই প্রশ্ন- “দুনিয়াতে আমি কেন এসেছি? এই জীবনের উদ্দেশ্য কি? দুনিয়ারই বা উদ্দেশ্য কি?” এটাই মানব ইতিহাসের পাতায় যুগ যুগ ধরে আসা মানুষদের জিজ্ঞেস করে যাওয়া সবচাইতে বড় প্রশ্ন। আর এর সঠিক উত্তরের মাঝেই রয়েছে জীবনের সঠিক উদ্দেশ্যের সন্ধান। তবে আমাকে সেই পথ দেখাবে কে? কোথায় পাব আমি সেই Guidance, সেই ফিলোসফারস স্টোন ?

মানব সমাজের শিক্ষাদীক্ষা, চিন্তা চেতনার দিক থেকে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আসলেই দেখবেন কিছু  নির্দিষ্ট সময়কাল বা Phase এর কথা আপনি শুনতে পাবেন। যেমন প্রি-রেনেসাঁ/ মিডলএইজ/ পোস্ট-মডার্নিজম। এই টার্মগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য হল সময়ের বিবেচনায় একটা বর্ডার লাইন বা সীমানা তৈরি করা। একদম স্বতন্ত্র এক সময়কাল চিন্তায় আনা যার এক পাশ এক রকম, আর অন্য পাশটা আরেক রকম। মানুষ সামগ্রিকভাবেও এই টার্মগুলো ব্যবহার করে, ব্যক্তি জীবনেও ব্যবহার করে। এজন্যই শৈশব/ ওল্ডএইজ/ পরিণত বয়স- এসব টার্ম দিয়ে সে জীবনের এক সুনির্দিষ্ট পর্যায়ের সীমানা অঙ্কন করে যার দুপাশে একই মানুষটা দু’রকম। তার শিক্ষা, চিন্তাচেতনা এবং সর্বোপরি জীবনাচরণের মাঝে লক্ষ্য করা যায় দৃশ্যমান পরিবর্তন। তবে কারো ক্ষেত্রে যদি এসব পর্যায়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে তেমন মানসিক উন্মেষ না ঘটে, তবে তার জীবন স্থবির; কোন গতি নেই সে জীবনে। যা বলছিলাম, এরকম পর্যায়গুলোর আসা-যাওয়ার মাঝেই জীবনের গতি পরিবর্তন হতে থাকে। তবে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়টার সূচনা হবে জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে পারার মাধ্যমে। এই বুঝতে পারাটাই প্রকৃত ‘Guidance’/’হিদায়াত’।

দুইসেই নিক্তিতে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পর্যায় দুটি- ‘জাহিলিয়্যাত’ আর ‘পোস্ট-গাইডেন্স’ – এই দুয়ের মাঝে পার্থক্যটা গড়ে দিয়ে গেছে অপার্থিব সুন্দর পথপ্রদর্শক  এক আলো- ‘ইসলাম’। এই পথ প্রদর্শন আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে আর এটাই মানুষের জীবনে সবচেয়ে মুল্যবান দিক নির্দেশনা।

নিঃসন্দেহে হেদায়েত সেটাই, যে হেদায়েত আল্লাহ করেন। [সূরাহ আল-ইমরান: ৭৩]

বলা হয় Knowledge is action. জানাটা জ্ঞান, অর্ধেক জ্ঞান। সে অনুযায়ী কাজ করাটা জ্ঞানের পরিপূর্ণতা। কাজেই জীবনের সঠিক উদ্দেশ্য জানাটা জ্ঞান। আর সে জ্ঞান পরিপূর্ণতা পাবে ব্যক্তির কর্মে। পরিবর্তনটা হবে স্পষ্ট। সকলেই সেটা দেখতে পায়। অতঃপর, জীবন বদলে যাবে। যায়। গেছে। কত লোক পেল সেই পথের সন্ধান, তার পর সেই পথ হয়ে গেল এক অদৃশ্য অথচ অস্তিত্বশীল নদী যার দুপারে তাদের জীবনের চিত্রটা হয়ে গেল দুইরকম।

ইদানীং এক ডাচ ব্যক্তির কথা সামনে আসছে, ভ্যান ক্লাভেরেন, যিনি পুরো জীবন ইসলামের বিরোধীতা করে, ইসলামের বিরুদ্ধে বই লিখতে গিয়ে মুসলিম হয়ে গেছেন। ওনার রাজনৈতিক দলে আরেকজন ছিলেন, ভ্যানদুর্ন যিনি একসময় ইসলামবিরোধী মুভি বানাতেন, কিন্তু পরে মুসলিম হয়ে গেছেন। এই যে একেবারে উল্টে যাওয়া- এটা কোন সে পরশ পাথর, কোন সে সত্য যা একজন মানুষের চিন্তা থেকে কর্ম, কথা থেকে ব্যবহার, অন্তর থেকে বাহিরকে আমূল বদলে দেয়? প্রত্যেকেইতো তার জীবনে Guidance (দিকনির্দেশনা) চায়। এটা এমন কোন পথনির্দেশনা যা জীবনের সামগ্রিক গতিপথকে পাল্টে দেয়? এটাই ইসলাম, এটাই আল্লাহ্‌র প্রদত্ত Guidance. এর একপাশে জীবন একরকম, আরেক পাশে আরেক রকম।

তিনছয় বছর আগে নষ্ট হওয়া একটা সাউন্ডবক্স ঠিক করালাম। বৈদ্যুতিক সংযোগ দেয়া মাত্রই ‘বিপ’ ধ্বনিতে সচল হয়ে উঠল-ঠিক ছয় বছর আগের মতোই। কি চলত ছয় বছর আগে এই যন্ত্রে? তীব্র চিৎকার, উন্মাদ পাশবিক আর্তনাদে ভরা বিদেশী গান। ঘরে কেউ এসব শুনতে চাইত না, অতিষ্ঠ  হয়ে যেত, তবুও তাদের জোর করে শোনাতাম। আর মনে মনে ভাবতাম ব্যান্ড, মেটাল, ইংলিশ গান শুনি, তার মানে “আমি কত মডার্ন”, সাথে শুনি ক্লাসিক, দেশাত্মবোধক, বিপ্লবী, রবীন্দ্র; তার মানে “আমি কত প্রোগ্রেসিভ!” যারা আমাকে এসব গানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, তারা আমাকে এসব গানের পজিটিভ মেসেজের কথা বলত। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে এদের অনেককে দেখতাম মনের মাঝে সুরের অভিব্যক্তি আনার নামে নেশা, মাদকে মজতে। তখন মনে প্রশ্ন জাগতো, ”কেন করছেন তারা এসব?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখলাম এগুলোর অধিকাংশই কিছু শিল্পীদের অন্ধ অনুকরণ ছাড়া আর কিছু না। এইভাবে পজিটিভ মেসেজ নেবার জন্য (আদতে বাস্তবে এর কোনোই প্রতিফলন নেই) গান শোনা হয়ে দাঁড়ায় আরেক নেশা। মানুষটা হয়ে যায় আরেক অভ্যাসের দাস। আরও আছে আবেগের দাসত্ব, টাকার দাসত্ব, চাহিদার দাসত্ব, খ্যাতির দাসত্ব,সমাজের চাপানো দাসত্ব, ‘লোকে কি বলবে’-র দাসত্ব। মাঝে মধ্যেই মনে হতো মুক্তি চাই এই সব দাসত্ব থেকে। একের পর এক আসতে থাকে এইসব পাবার আকাঙ্ক্ষা, বন্দী করে ফেলে একটা মানুষকে চতুর্দিক থেকে দাসত্বের বেড়ি পড়িয়ে। আহা! তাই তো স্বাধীনতা, মুক্তি নিয়ে কত কবিতা, কত ছবি, কত গল্প, কত গান।

চারএরপর সূচনা হলো আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের যখন আমি বুঝতে পারলাম, এই গান আমাকে এতদিন কিছুই দেয়নি, কেবল সময় নষ্ট করেছে। আমি সন্ধান পেলাম আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে মানুষের জীবনের সবচেয়ে মুল্যবান দিক নির্দেশনা ‘কুরআন’। আল্লাহ্‌ প্রদত্ত পথ নির্দেশনা পেয়ে আমার জীবনের সামগ্রিক গতি পথ পাল্টে গেল। আমি উপলব্ধি করতে পারলাম,

আল্লাহ্‌র হিদায়াতই সঠিক হিদায়াত। [সুরাহ আল-আনাম: ৭১]

আর কুরআন তো সেই বই-

এটা সে কিতাব; যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত। [সুরাহ আল-বাক্কারাহ: ১]

এখন আমার সাউন্ড বক্সে  আগের সেসব গান বাজে না।মাঝে মাঝেই কুরআনের ধ্বনি বাজে, রসূলের(সঃ) হাদিস ভেসে আসে, শোনা যায় সাহাবাদের আখ্যান। এক সময়ের গান বাজানো ছেলেটা এখন গানকেই বাজে বলে।। যদিও একই রয়ে গেছে সাউন্ড বক্সটার স্টার্ট হবার শব্দ, এটার ফাংশনগুলো; তবে বদলে গেছে এটা থেকে বের হওয়া আওয়াজের ধরন। গান থেকে কুরআন—শ্রবণের এই বিষয় পরিবর্তনের কারণ হলো শ্রোতার হৃদয়ের অদৃশ্য পরিবর্তন। যন্ত্রটা বদলায়নি, বদলে গেছে যন্ত্রের মালিক আর তাকে বদলে দিয়েছে তার মালিক।যন্ত্রের মালিক বদলে গেছে আর তাকে বদলে দিয়েছে তার মালিক। গান থেকে কুরআন- এই অদৃশ্য পরিবর্তন হৃদয়ের, এটা দেখা যায় না কিন্তু স্পষ্টভাবে বুঝা যায়। অনেক সময় চোখে দেখেও কোন কিছু এত স্পষ্টভাবে বুঝা যায় না।

আর আল্লাহই তো অন্তরের মালিক, ওনার দ্বারাই তো তৈরি এই হৃদয়। তাই এই পরিবর্তিত হৃদয় যেন ভুল পথে আর পরিচালিত না হয় সেজন্য প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে এই  দুআ করি-

হে আমাদের রব, আপনি হিদায়াত দেয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন।

হে অন্তর সমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর সুদৃঢ় করে দাও। (তিরমিযি: ২১৪০)

হে আল্লাহ! (আপনি) হৃদয়সমূহের পরিবর্তনকারী! আমাদের হৃদয়গুলোকে আপনার আনুগত্যের দিকে ঘুরিয়ে দিন। (সহিহ মুসলিম)

মানুষ পাথর ভেঙ্গে দেয়, লোহা গলিয়ে দেয়, মাটি পুড়িয়ে নিদারুণ শক্ত ইট বানায়। শুনেছেন তো নিশ্চয়ই যে হৃদয়ও ভাঙে, গলে, পুড়ে ,নির্দয়-পাষাণ হয়ে যায় ? দুনিয়ার সব মেটালকে মানুষ বদলে ফেলতে পারে; সেই মানুষটাই আবার বদলে যায় যখন বদলায় তার ভিতরের সেই ইলিমেন্ট- অন্তর। এই Guidance, এই হিদায়াত, এই ‘ইসলাম’ পরশপাথর একেবারেই অমূল্য, একেবারেই অপার্থিব। এর আশ্চর্য সুন্দর ছোঁয়ায় বদলে যায় মানুষের হৃদয় যা কিনা হতে পারে পাথরের চেয়েও অনেক অনেক বেশি কঠিন !জানেনই তো…


লেখক:  রিয়াদুস সালেহিন

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive