শারি’আহ আইন হলো ন্যায়বিচার ও দয়ার এক কালোত্তীর্ণ উৎস। অত্যাচারী শাসকেরা তাই একে ভয় পায়, বিরোধিতা করে।

মার্ক কোয়েমার এই লেখাটি একটি সরল স্বীকারোক্তি দেয় যে, ধর্মীয় স্বাধীনতার ধারণা হুট করে পশ্চিমা বিশ্বের ওপর চেপে বসেনি। পশ্চিমারা এর কোনো অনস্বীকার্য গুণে মুগ্ধ হয়ে চিন্তাটিকে আপন করে নিয়েছে, এমন না। লেখক বরং মনে করেন, “ধর্মীয় স্বাধীনতা”র এই লোভনীয় ধারণাটা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের খুব ভালো হাতিয়ার ছিলো।

IIRT Arabic Intensive

যেভাবে শুরু

লেখক মনে করেন যে, বিভিন্ন কারণে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের প্রশ্নে চার্চের ওপর নির্ভরতা কমাতে থাকে। এর আগে এই দেশগুলোকে চার্চের সাথে তোয়াজ করে চলতে হতো, যেন সাধারণ খ্রিষ্টানরা তাদের নানারকম অত্যাচারী আইনের বিরুদ্ধে কিছু বলতে না পারে। অর্থাৎ রাষ্ট্রগুলোর উদ্দেশ্য ছিলো তাদের যেকোনো কাজকেই জনগণের চোখে বৈধ বানিয়ে নেওয়া। আর যে দলের সাথে চার্চের সম্পর্ক যত ভালো, জনগণ স্বাভাবিকভাবেই সে দলকেই সমর্থন দিতো, টিকিয়ে রাখতো তত বেশি। চার্চের সাথে রাষ্ট্রের এরকম আঁতাত ‘সহিষ্ণুতা’র জন্য হুমকিস্বরূপ। কারণ চার্চের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রকে ধর্মদ্রোহীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা লাগতো।

লেখক আরও মনে করেন, জনস্বার্থে কাজ করার জন্যও তখন রাষ্ট্র চার্চের শরণাপন্ন হতো। দরিদ্রের সহায়তা, শিক্ষার সম্প্রসারণ কিংবা অন্যান্য জনকল্যাণকর কাজে রাষ্ট্রীয় দুর্বল সংস্থাগুলোর তুলনায় চার্চ (কিংবা মুসলিম অধ্যুষিত দেশে ওয়াক্বফ)-এর সক্ষমতা আর প্রভাবই ছিলো বেশি। একই সাথে সেসময়ের আইন আর সামাজিক রীতিনীতি খুব বেশি মাত্রায় নির্ভর করতো মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর। সার্বজনীন জাতীয়তা ভিত্তিক পরিচয়ের অতটা কর্তৃত্ব ছিলো না। এইসমস্ত কারণে এক ধর্মের অনুসারীর অন্য ধর্মের লোকের প্রতি সহিষ্ণুতার মাত্রা কমতে থাকে। সে যুগে “ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিলো একেবারেই অচিন্তনীয় একটা ব্যাপার।”

যা যা পরিবর্তিত হয়েছিলো

লেখকের মতে, রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহ শক্তিশালী হতে শুরু করে তখন থেকে, যখন থেকে তারা জনগণের ওপর একের পর এক ট্যাক্স চাপিয়ে দিতে আরম্ভ করেছিলো। এর মাধ্যমে এসব সংস্থা চার্চের সাথে করা তাদের জন্য ক্ষতিকর চুক্তি(কিংবা বলা যায় নির্ভরতা)গুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলো। অর্জিত নতুন ক্ষমতার জোরে তারা তখন আর ধর্মকে পাত্তা না দিয়েই নিত্যনতুন আইন প্রণয়ন করতে পারছিলো। এরপর সরকার কর আদায়ের প্রশ্নে ইহুদী, প্রোটেস্ট্যান্ট, ক্যাথলিক সবাইকে এক কাতারে নিয়ে এলো। সকলেই ট্যাক্সের একেকটি খনি। ফলে স্বভাবতই ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে লোকজনের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থা রাখার প্রথাটা একটি “বাজে খরচ” হিসেবে পরিগণিত হলো। এক কথায়, ধর্মীয় সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরতা কমে যাবার কারণে ধর্মের অনুসরণেও রাষ্ট্রগুলোর ইচ্ছার ঘাটতি দেখা যেতে শুরু করে।

ফলাফল

ধর্মীয় স্বাধীনতার এই ধারণার উৎপত্তি তো আর মূল্যবোধ থেকে না। এর সৃষ্টিমূলে আছে নিজের সুবিধাদি আদায়ের ধান্দা। এখনও অতটা খারাপ মনে হচ্ছে না, তাই তো? নাকি মন একটু একটু খচখচ করছে?

আচ্ছা, আরেকটু গভীরভাবে দেখা যাক। দেখুন, শুরু থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্দেশ্য ছিলো কিন্তু জনগণের সম্পদ চুষে খাওয়ার জন্য তাদেরকে নিয়মের বেড়াজালে বন্দী করে ফেলা। আগে তারা একই কাজের জন্য চার্চকে ব্যবহার করতো। ধীরে ধীরে নিজেদের জন্য যত কার্যকর এবং সুবিধাজনক উপায় তারা বের করতে থাকে, চার্চ ততই তাদের কাছে মূল্যহীন হতে শুরু করে। লেখক উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের সবচাইতে শক্তিশালী সংস্থা ছিলো তার সামরিক বাহিনী। এবং সংস্থাটি সেই পুরো সময় জুড়েই ক্ষমতার ব্যবহার, লোকবল আর প্রযুক্তির দিক দিয়ে তার শক্তিমত্তা বাড়িয়েই গেছে। এবার বলুন তো, জনগণকে বাগে আনা আর সেনাশক্তি বাড়ানো – দুটোর মধ্যে কোনটা উত্তম? রাষ্ট্র তার জন্য যেটা সুবিধার, সেটাই বেছে নিয়েছিলো। মহান সৃষ্টিকর্তা এতে ক্রুদ্ধ হলেন কি খুশি হলেন, এসব দেখার সময় কই আর দরকারটাই বা কী? জনগণ ক্ষেপে গেলে শক্তিশালী মিলিটারি তো আছেই। লাগাও তাদের অবাধ্য জনগণকে সামলাতে।

সত্যিই কি এটা কোনো উন্নতি? ধর্মের এই প্রভাব কমে যাওয়াটা কি আসলেই রাষ্ট্রের সবাইকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দিতে পেরেছে? নাকি এটা কর্তৃত্ব কায়েমকারী এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমের কাছে নিছক ক্ষমতা হস্তান্তর?

একটা বিষয় এখানে লক্ষণীয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই ব্যাপারে ইহুদী বা খ্রিষ্টানদের দিকে নজর রাখবো, ততক্ষণ পর্যন্ত হয়তো তেমন কিছু আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে না। কারণ, হতে পারে, বর্বর সামরিক নিপীড়ন তাদের কাছে চার্চের অত্যাচারের তুলনায় কম হিংস্র মনে হয়েছিলো/এখনো হয়। তাই “ধর্মীয় স্বাধীনতা” নামক এই চটকদার বিজ্ঞাপন তাদের কাছে এখনো তার আবেদন ধরে রাখতে পেরেছে।

কিন্তু ইসলামী আইনে ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউরোপের চার্চগুলোতে যে পরিমাণ অত্যাচার চলতো, অতীত ঘেঁটে কখনোই মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই সেসবের ছিটেফোঁটাও পাওয়া যাবে না। মুসলিম বিশ্বে হওয়া বর্বরতা, নিপীড়ন এবং গণ-জুলুম বরাবরই ঘটেছে ইসলামিক আইন এবং ধর্মীয় পণ্ডিতদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে।

নিষ্ঠাবান ইসলামী সংস্থাগুলোর উপর শাসকশ্রেণীর অত্যাচারের শতাব্দীব্যাপী ইতিহাসটি এবার ঘেঁটে দেখুন। শাসকশ্রেণীর যুলুমের বিরুদ্ধে আলিম সমাজের প্রতিরোধের ইতিহাস স্বতঃপ্রমাণিত। নিষ্ঠাবান ইসলামী সংস্থাগুলো শাসকদের একদম কাট্টা বিরোধী না হলেও এগুলো সবসময়ই শাসকদের কাছে অস্বস্তিকর, উদ্বেগ সৃষ্টিকারী হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। আর এটা প্রায়শই সেইসব সরকারের জন্য একদম ঠিক, যাদের শারি’আহ আইনের প্রতি অল্পই শ্রদ্ধা আছে।

শারি’আহ আইনই একমাত্র আইন, যার মাধ্যমে ক্ষমা আর ন্যায়বিচার দু’টাই প্রতিষ্ঠা সম্ভব। শুধুমাত্র অত্যাচারীরাই একে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। এমনকি বর্তমান যুগ পর্যন্তও এর বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে।


উৎস: দ্য মুসলিম স্কেপ্টিক (মূল আর্টিকেল লিংক)

অনুবাদক: মাঈন উদ্দীন মাহমুদ, মুসলিম মিডিয়া প্রতিনিধি

অনুবাদ কপিরাইট © মুসলিম মিডিয়া

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive