পর্ব ০১ | পর্ব ০২

‘Exorcism’ বা ‘রুক্বিয়া’ নিয়ে লিখতে গেলে প্রথমেই জ্বীন জাতির উপরে মৌলিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যাঁরা জ্বীন এর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে রাজী নন। প্রথম পর্বে তাই জ্বীন জাতির মৌলিক তথ্যগুলো নিয়ে শুরু করছি। আমি মহান আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তান হ’তে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

IIRT Arabic Intensive

পরম করুণাময় এবং অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

জ্বীন: সত্য না দৃষ্টিভ্রম

ইসলাম ধর্মে ‘অদৃশ্যে’ বিশ্বাস স্থাপন করা অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পবিত্র কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে-

“এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য। যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।” (সূরা আল-বাকারা, ২-৩)

বুঝতেই পারছেন- অদেখা বিষয় বা অদৃশ্যে বিশ্বাস করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ বা বাধ্যতামূলক। জ্বীন এই অদৃশ্য বিষয়গুলোর মধ্যে একটি। পবিত্র কুরআনে বেশ কয়েকবার জ্বীনদেরকে মানুষদের সাথে সম্বোধন করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে জ্বীনদের আগমন নিয়ে ‘সূরা জ্বীন’ নামে একটি সম্পূর্ণ সূরা অবতরণ করা হয়েছে।
জ্বীনদের অস্তিত্ব নিয়ে যাঁরা সন্দিহান, তাদের জন্য আমি পবিত্র কুরআন মাজীদে থেকে কয়েকটি আয়াত নিচে উল্লেখ করছি-

▪”যখন আমি একদল জ্বীনকে আপনার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম, তারা কোরআন পাঠ শুনছিল। তারা যখন কোরআন পাঠের জায়গায় উপস্থিত হল, তখন পরস্পর বলল, চুপ থাক। অতঃপর যখন পাঠ সমাপ্ত হল, তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে (জ্বীন সম্প্রদায়) সতর্ককারীরূপে ফিরে গেল।” (সূরা আল-আহক্বাফ, ২৯)
▪”হে জ্বীন ও মানব সম্প্রদায়, তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে পয়গম্বরগণ আগমন করেনি? যাঁরা তোমাদেরকে আমার বিধানাবলী বর্ণনা করতেন এবং তোমাদেরকে আজকের এ দিনের সাক্ষাতের ভীতি প্রদর্শন করতেন? তারা বলবেঃ আমরা স্বীয় গোনাহ স্বীকার করে নিলাম। পার্থিব জীবন তাদেরকে প্রতারিত করেছে। তারা নিজেদের বিরুদ্ধে স্বীকার করে নিয়েছে যে, তারা কাফের ছিল।” (সূরা আল-আনআ’ম, ১৩০)
▪“আমি জ্বীন ও মানুষকে কেবলমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি” (সূরা আয্-যারিয়াত, ৫৬)
▪”হে জ্বীন ও মানবকূল, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের প্রান্ত অতিক্রম করা যদি তোমাদের সাধ্যে কুলায়, তবে অতিক্রম কর। কিন্তু ছাড়পত্র ব্যতীত তোমরা তা অতিক্রম করতে পারবে না।” (সূরা আর-রহমান, ৩৩)
▪”বলুনঃ আমার প্রতি ওহী নাযিল করা হয়েছে যে, জ্বীনদের একটি দল কোরআন শ্রবণ করেছে, অতঃপর তারা বলেছেঃ আমরা বিস্ময়কর কোরআন শ্রবণ করেছি।” (সূরা জ্বীন, ১)
▪”আর এই যে মানুষের মধ্যের কিছু লোক জ্বীন জাতির কিছু লোকের আশ্রয় নিত, ফলে ওরা তাদের পাপাচার বাড়িয়ে দিত।” (সূরা জ্বীন, ৬)

জ্বীনের অস্তিত্ব পবিত্র কুরআন মাজীদ ও হাদীস দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। অসংখ্য সহীহ হাদিস রয়েছে যেগুলোতে জ্বীন জাতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আমি পবিত্র কুরআন মাজীদের রেফারেন্স দিয়েই শেষ করছি, হাদীসগুলোর রেফারেন্স দেয়ার প্রয়োজন মনে করছি না।

জ্বীন: কিসের তৈরী?

পবিত্র কুরআন এবং হাদীসের মাধ্যমে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে, জ্বীন জাতি আগুনের তৈরী।
“আর তিনি জ্বীনকে সৃষ্টি করেছেন আগুনের শিখা দিয়ে।” (সূরা আর-রহমান, ১৫)
“আর আমি এর আগে জ্বীন সৃষ্টি করেছি প্রখর আগুন দিয়ে।” (সূরা আল-হিজর, ২৭)
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সঃ) বলেছেন- “ফেরেশতারা আলোর তৈরী, জ্বীনরা আগুনের স্ফুলিংগ থেকে তৈরী এবং আদমকে যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে তার বর্ণনা (মাটি থেকে) পবিত্র কুরআনে রয়েছে।” (মুসলিম শরীফ ১৮/১২৩ – তাফসীর আন নববী)

জ্বীনের প্রকার

সা’লাবা আল খাসানি থেকে বর্ণিত, রাসুল (সঃ) বলেছেন- “তিন ধরনের জ্বীন আছে- এক প্রকারের জ্বীন পাখার মাধ্যমে বাতাসে ওড়ে, এক প্রকারের জ্বীন সাপ এবং মাকড়শার আকারে থাকে, শেষ প্রকারের জ্বীনরা সাধারনভাবে থাকে এবং চলাচল করে।” (আত তাবারানী, আল হাকিম ৩৭০২, বায়হাক্বী এবং সহীহ আল জামে’ ৩১১৪)

জ্বীনদের বাসস্থান

মানুষের পরিত্যক্ত স্থানগুলোতে জ্বীনরা থাকতে পছন্দ করে। তাদের অধিকাংশই লোকালয় থেকে দুরে নিরব কোন এলাকায় থাকে। তবে কিছু জ্বীন মানুষদের সাথে লোকালয়ে থাকে।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ সহীহ হাদিস থেকে জানা যায়, জ্বীনরা নোংরা ও গন্ধময় জায়গায় থাকতে পছন্দ করে যেখানে মানুষরা ময়লা এবং খাবারের উচ্ছিষ্ট অংশ ফেলে রাখে। মানুষের খাবারের উচ্ছিষ্ট জ্বীনদের খাবার। আমাদের ফেলে দেয়া মাংসের হাড়গুলো আল্লাহর কৃপায় মাংসসহ খাবার হয়ে যায় জ্বীনদের জন্য। রাসুল (সঃ) একারণেই রাস্তার পাশে পড়ে থাকা কোন হাড়ের ওপর প্রস্রাব করা কিংবা মাটি মিশ্রিত হাড়কে ঢিলা হিসেবে ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন।

টয়লেট এবং প্রস্রাব করার জায়গাগুলোতেও জ্বীনদের অবাধ বিচরণ থাকে। জায়েদ বিন আরকাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সঃ) বলেছেন- “এই জায়গাগুলোতে (টয়লেট এবং প্রস্রাব করার জায়গা) জ্বীন এবং শয়তানরা অবাধে বিচরণ করে। তোমাদের মধ্যে যেই এই স্থানগুলোতে যাবে, সে যেন বলে- ‘আমি আল্লাহর কাছে পুরুষ এবং মহিলা শয়তানের থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি’।” (আহমেদ ইবনে হাম্বল, ‘পবিত্রতা’ খন্ড, ৪/৩৬৯)

পুরুষ এবং মহিলা জ্বীন

উপরের হাদিস থেকেই স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় যে জ্বীনদের মধ্যে পুরুষ এবং স্ত্রী জাতি রয়েছে। আয়াতুল কুরসী (সূরা বাক্বারা, ২৫৫) এর ফজিলতের বিষয়ে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ একটি হাদিসের শেষ অংশে উল্লেখ করা হয়েছে- “যে এই আয়াত পড়বে, আল্লাহ তা’আলা তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত করে দিবেন এবং কোন পুরুষ এবং নারী জ্বীন-শয়তান তার কাছে আসতে পারবে না।” (সহিহ বুখারী, ৫০১০)

ইবলিশ শয়তান এবং জ্বীনের সম্পর্ক

পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট উল্লখ করা হয়েছে যে ইবলিশ শয়তান জ্বীনদের একজন।

“যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললামঃ আদমকে সেজদা কর, তখন সবাই সেজদা করল ইবলিশ ব্যতীত। সে ছিল জিনদের একজন। সে তার পালনকর্তার আদেশ অমান্য করল। অতএব তোমরা কি আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করছ? অথচ তারা তোমাদের শত্রু। এটা জালেমদের জন্যে খুবই নিকৃষ্ট বদল।” (সূরা আল-কাহফ, ৫০)

জ্বীনদের ধর্ম

আমাদের মতো জ্বীনদের মধ্যেও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী রয়েছে। তাঁদের কেউ মুসলমান, কেউ খ্রিষ্টান, কেউ হিন্দু, কেউ বৌদ্ধ। নিচের আয়াতটি নিশ্চিত করে যে আমাদের মতো জ্বীনদেরও ঈমানী বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাদেরও কিয়ামতের পরে আল্লাহ পাকের কাছে আমাদের মতো বিচারের জন্য দাঁড়াতে হবে।

“হে জ্বীন ও মানব সম্প্রদায়, তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে পয়গম্বরগণ আগমন করেনি? যাঁরা তোমাদেরকে আমার বিধানাবলী বর্ণনা করতেন এবং তোমাদেরকে আজকের এ দিনের সাক্ষাতের ভীতি প্রদর্শন করতেন? তারা বলবেঃ আমরা স্বীয় গোনাহ স্বীকার করে নিলাম। পার্থিব জীবন তাদেরকে প্রতারিত করেছে। তারা নিজেদের বিরুদ্ধে স্বীকার করে নিয়েছে যে, তারা কাফের ছিল।” (সূরা আল-আনআ’ম, ১৩০)

জ্বীন জাতির খাবার

মানুষের মতো জ্বীন জাতিও খাবার গ্রহণ করে। মানুষের উচ্ছিষ্ট খাবার জ্বীনদের জন্য আল্লাহর রহমতে নতুন খাবার হয়ে যায়।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল (সঃ) বলেছেন- “হাড় এবং গোবর জ্বীনদের খাবার। নসীবাঈন শহরের জ্বীনদের একটি দল আমার সাথে দেখা করতে আসে। কত বিনয়ী ছিল তাঁরা। তাঁরা আমার কাছে মানুষের খাবারের উচ্ছিষ্ট সম্পর্কে জানতে চায়। আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যে তাঁরা এমন কোন হাড় কিংবা গোবর অতিক্রম করবে না যা তাঁদের জন্য খাবার না হয়ে যাবে।” (বুখারী, ৩৫৭১)

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল (সঃ) বলেছেন- “জ্বীনদের একজন আমাকে একদিন ডাকলে আমি তাঁর সাথে যাই। সেখানে আরো জ্বীন ছিল এবং আমি তাদের জন্য পবিত্র কুরআন পাঠ করি। তারা তাদের খাবারের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে আমি বলি- আল্লাহর নাম পড়ে খাওয়া হয়েছে এমন যে কোন হাড় তোমাদের সামনে এলে তা মাংসে পরিনত হয়ে যাবে। একইভাবে গোবর তোমাদের পশুদের খাবার হয়ে যাবে। তাই, ভারমুক্ত (টয়লেট করার পরে) হওয়ার পরে তোমাদের কেউ যাতে এই বস্তুগুলোকে (শুকনো হাড়, গোবর) দিয়ে নিজেকে পরিষ্কার না করে। কারণ তা হলো তোমাদের ভাইদের খাবার। (মুসলিম, ৪৫০)

জ্বীনদের চলাচলের সময়

জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল (সঃ) বলেছেন- “যখন রাত নামে (সন্ধ্যার শুরুতে) তোমাদের সন্তানদের ঘরের বাইরে যেতে বারণ কর। কারণ শয়তান এই সময়ে বের হয়। এক ঘন্টা পার হলে সন্তানদের যেতে দিও এবং আল্লাহর নাম নিয়ে ঘরের দরজাগুলো বন্ধ কর। কারণ শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। তারপর আল্লাহর নাম নিয়ে পানির পাত্রের মুখ বন্ধ কর। এরপরে আল্লাহর নাম নিয়ে খাবারের পাত্রগুলো ঢেকে রাখো। যদি ঢেকে রাখার কিছু না পাওয়া যায়, তবে অন্তত অন্য কিছু উপরে দিয়ে রাখো (কাঠ/বই ইত্যাদি)। এবং রাতে শোবার সময়ে কুপি বাতি নিভিয়ে শুতে যেও।” (বুখারী, ১০/৮৮. মুসলিম ১৩/১৮৫)

কিছু প্রাণী জ্বীনদের দেখতে পায়

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল (সঃ) বলেছেন- “যখন তোমরা গাধার চিত্কার শুনতে পাও, তখন আল্লাহর কাছে শয়তানের থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর. কারণ শয়তানকে দেখতে পাবার কারণেই তারা চিত্কার করে।” (বুখারী, ৬/৩৫০. মুসলিম ১৭/৪৭)

জ্বীনদের চেয়ে আল্লাহর কাছে মানুষ বেশি মর্যাদাপূর্ণ

জ্বীনদের থেকে আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষদের মর্যদা বেশি। পবিত্র কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে-
“নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।” (সূরা বনী ইসরাইল, ৭০)

তারপরেও অজ্ঞতার কারণে অনেক মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে জ্বীনদের সহায়তা চায়। এই রকম অযৌক্তিক কাজ শিরকের অন্তর্ভুক্ত। জ্বীন তখন মানুষকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে চায়। কারণ শ্রেষ্ঠত্ব থাকা স্বত্তেও মানব সন্তান তার কাছে সাহায্য চেয়ে শিরক করেছে! পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- “আর এই যে মানুষের মধ্যের কিছু লোক জ্বীন জাতির কিছু লোকের আশ্রয় নিত, ফলে ওরা তাদের পাপাচার বাড়িয়ে দিত।” (সূরা জ্বীন, ৬)

জ্বীন মানুষ কিংবা প্রাণীর আকার ধারণ করতে পারে

মহান আল্লাহ পাকের দেয়া শক্তি ব্যবহার করে শয়তান জ্বীন মানুষ কিংবা প্রাণীর আকার বা রূপ ধারণ করতে পারে। সহীহ হাদীসের মাধ্যমে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ একটি হাদীসে এক দুষ্ট লোকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রতি রাতে যাকাতের মাল চুরি করতে আসতো। আবু হুরায়রা (রাঃ) প্রতি রাতেই তাকে ধরে ফেলতেন। কিন্তু লোকটি বিভিন্ন অনুরোধ করে মাফ নিয়ে চলে যেত এবং পরের রাতে আবার চুরি করতে আসতো। পরপর তিন রাতে সেই মানুষটিকে ধরার পরে রাসুল (সঃ) কে ঘটনা অবহিত করলে তিনি আবু হুরায়রা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেন, “ওহে আবু হুরায়রা, তুমি কি জানো তুমি এই তিন রাতে কার সাথে কথা বলেছ? ওটা শয়তান ছিল।” (বুখারী, ৩২৭৫)

বদরের যুদ্ধের সময় ইবলিশ শয়তান মক্কার কুরাইশদের কাছে বনু কিনানাহর সর্দার সূরাক্বা ইবনে যুশাম এর আকার ধরে গিয়ে তাদেরকে রাসুল (সঃ) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্ররোচনা দিয়েছিল। (ইবনে কাসীর, আল বিদায়া ওয়াল নিহায়া, ৫/৬২)

আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সঃ) বলেছেন- “মদিনার কিছু সংখ্যক জ্বীন মুসলমান হয়েছে। এদেরকে (প্রাণী হিসেবে) যদি কেউ দেখো, তাহলে তিনবার সাবধান করবে। তারপরেও আবার এলে সেই প্রাণীকে হত্যা করবে।” (মুসলিম, ২২৩৬)

জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড শয়তান জ্বীনকে ধাওয়া করে

শেষ নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর নবুওয়তের আগ পর্যন্ত জ্বীন জাতি আকাশে প্রান্ত সীমা পর্যন্ত গিয়ে ঘাপটি মেরে সংবাদ সংগ্রহের জন্য লুকিয়ে থাকত। আল্লাহ তা’আলা যখন কোন আদেশ করতেন ফেরেশতাদের, তখন ফেরেশতারা সেই আদেশ মুখে মুখে ছড়িয়ে দিত। শয়তান জ্বীন তখন টুকরো টুকরো কিছু খবর চুরি করে পৃথিবীতে এসে সেগুলোর সাথে বিভিন্ন মিথ্যা মিশিয়ে ভাগ্য গণনাকারীদের কাছে বলত, যার কিছু কিছু পরবর্তীতে সত্য হিসেবে প্রকাশ পেত।

রাসুল (সঃ) এর নবুওয়তের পরে আল্লাহ তা’আলা উর্ধ্বাকাশ এবং নিচের আকাশের মাঝে একটি পর্দা দিয়ে দিলেন। ফলে শয়তান জ্বীনরা আর কোন আদেশ শুনতে পেত না। বরং চুরি করে খবর শুনতে নিলেই জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তাদের পিছু নিত।

হঠাত করেই এই রকম পরিবর্তনে অবাক হয়ে শয়তান তার অধীনস্থ সকল জ্বীনদের পৃথিবীর আনাচে-কোনাচে পাঠিয়ে দিল মূল খবর বের করার জন্য- কি এমন ঘটনা ঘটেছে যার কারণে উর্ধ্বাকাশ থেকে কোন খবর আনা যাচ্ছে না? খবরের সন্ধানে জ্বীনদের একদল যখন নাখালা নামের জায়গা দিয়ে যাচ্ছিল, রাসুল (সঃ) তখন সেই পথে ‘উকাজ’ নামের বাজারে ইসলামের দাওয়াতের জন্য যাচ্ছিলেন। জ্বীনদের দল যখন সেখানে পৌঁছল, রাসুল (সঃ) তখন সাহাবীদের নিয়ে ফজরের নামাজ পড়ছিলেন। রাসুল (সঃ) এর মুখে কুরআনের তেলাওয়াত শুনেই জ্বীনদের সেই দল বুঝতে পারল কি কারণে তাদেরকে উর্ধ্বাকাশে যেতে বাধা দেয়া হচ্ছিল। তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং নিজ সম্প্রদায়ের কাছে সংবাদ নিয়ে ফেরত যায়।

“বলুনঃ আমার প্রতি ওহী নাযিল করা হয়েছে যে, জিনদের একটি দল কোরআন শ্রবণ করেছে, অতঃপর তারা বলেছেঃ আমরা বিস্ময়কর কোরআন শ্রবণ করেছি; যা সৎপথ প্রদর্শন করে। ফলে আমরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমরা কখনও আমাদের পালনকর্তার সাথে কাউকে শরীক করব না। এবং আরও বিশ্বাস করি যে, আমাদের পালনকর্তার মহান মর্যাদা সবার উর্ধ্বে। তিনি কোন পত্নী গ্রহণ করেননি এবং তাঁর কোন সন্তান নেই। আমাদের মধ্যে নির্বোধেরা আল্লাহ তা’আলা সম্পর্কে বাড়াবাড়ির কথাবার্তা বলত।” (সূরা জ্বীন ১-৪)

“আমরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করছি, অতঃপর দেখতে পেয়েছি যে, কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিন্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ। আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শ্রবণার্থে বসতাম। এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে জলন্ত উল্কাপিন্ড ওঁৎ পেতে থাকতে দেখে।” (সূরা জ্বীন, ৮-৯)

“নিশ্চয় আমি নিকটবর্তী আকাশকে তারকারাজির দ্বারা সুশোভিত করেছি। এবং তাকে সংরক্ষিত করেছি প্রত্যেক অবাধ্য শয়তান থেকে। ওরা উর্ধ্ব জগতের কোন কিছু শ্রবণ করতে পারে না এবং চার দিক থেকে তাদের প্রতি উল্কা নিক্ষেপ করা হয়। ওদেরকে বিতাড়নের উদ্দেশে। ওদের জন্যে রয়েছে বিরামহীন শাস্তি। তবে কেউ ছোঁ মেরে কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।” (সূরা আস-সাফফাত, ৬-১০)

জ্বীন কি মানুষের ওপর ভর করতে পারে?

জ্বীনের মানুষের ওপর ভর করা কিংবা মানুষের যাদুগ্রস্থ হওয়াকে সাধারনভাবে আরবীতে ‘সাহর’ বলে। এটি এমন একটি অবস্থা যখন মানুষের নিজের ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং সাময়িক স্মৃতি বিভ্রম ঘটে। পবিত্র কুরআন এবং হাদীসের আলোকে ‘সাহর’ একটি নিশ্চিত বিষয়।

“যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়।” (সূরা বাক্বারা, ২৭৫)

শয়তানের আসরে মানুষ মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে- এই বিষয়টি নিশ্চিত। ইমাম কুরতুবী, তাবারী, ইবনে-কাসীর সহ অধিকাংশ তাফসীরবিদ এই আয়াতকে জ্বীনের মানুষের ওপর ভর করার সুনির্দিষ্ট প্রমান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (তাফসীর আল কুরতুবী ৩/৩৫৫, তাফসীর আল তাবারী ৩/১০১, তাফসীর ইবনে কাসীর ১/৩২৬)

সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে- রাসুল (সঃ) বলেছেন, “শয়তান আদম সন্তানের শরীরে প্রবাহিত হয়, যেমন রক্ত শরীরে প্রবাহিত।” (বুখারী, ৩৩/২৫১। মুসলিম, ২১৭৫)

ইমাম আহমদের ছেলে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আমি আমার বাবা (ইমাম আহমাদ) কে বললাম- কিছু মানুষ মানুষের শরীরে জ্বীনের ভর করাকে বিশ্বাস করে না। তিনি বলেন- ও আমার সন্তান, তারা মিথ্যা বলছে। আসর করা অবস্থায় অসুস্থ লোকের মুখ দিয়ে জ্বীন কথাও বলতে পারে।” (মাজমু ফতোয়া- ইবনে তাইমিয়াহ ১৯/১২)

ইমাম আহমদ এবং ইমাম বায়হাকী কর্তৃক লিপিবদ্ধ সহীহ হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, রাসুল (সঃ) একবার একটি অসুস্থ বালকের সাক্ষাত পেয়েছিলেন যার ওপর জ্বীনের ভর ছিল। রাসুল (সঃ) ছেলেটির দিকে ফিরে জোরে বলেন- “ও আল্লাহর শত্রু, বের হয়ে আসো। ও আল্লাহর শত্রু, বের হয়ে আসো। ছেলেটি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।” (ইবনে মাজাহ, ৩৫৪৮। আহমদ ৪/১৭১, ১৭২)

এছাড়াও বিভিন্ন সাহাবীদের থেকে অসংখ্য সহীহ হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে এই প্রসঙ্গে যেখানে রাসুল (সঃ) সাহরগ্রস্থ রোগীর ওপরে দোআ করে সাহর মুক্ত করেছেন। সাহাবীদের মধ্যে ইয়ালা ইবনে মুররাহ (রাঃ), জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ), আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), আবু আল ইয়ুসর (রাঃ), সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রাঃ), উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ), উসমান বিন আল’আস (রাঃ) উল্লেখযোগ্য। সময়ের অভাবে সবগুলো ঘটনা উল্লেখ করা সম্ভব হলো না।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive