কেন এই লেখা

মাদকাসক্তি বর্তমান সমাজে একটি ধ্বংসাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যবহারে সমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। যুবক থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, ধনী, গরীব, ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবী তথা সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষ বর্তমানে কোনো না কোনোভাবে মাদকাসক্তিতে লিপ্ত। এই ব্যাধি শহর থেকে শুরু করে গ্রামের আনাচে কানাচে পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। এর ভয়াবহ পরিণতি দেখে পবিবার থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ পর্যন্ত চিন্তিত। যে যুবকেরা দেশের ভবিষ্যতের মশালবাহী, সেই যুবকেরাই মাদক দ্বারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। তাই বর্তমানে রাষ্ট্র দেশের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত। মাদকের প্রভাব আমাদের শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনীতিকে করে তুলছে বিপর্যস্ত। দ্রুত যদি এর প্রতিরোধ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা একটি কলুষিত সমাজ দেখতে পাবো। যেখানে সততার কোনো মূল্য থাকবে না, মূল্যবোধের কোনো বালাই থাকবে না। তাই এই সমস্যা সমাধানের জন্য সমাজের সকল স্তরের জনগণকে সাথে নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। মানুষের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ বৃদ্ধির মাধ্যমে মাদক প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই মুক্তি পাবে মানবতা, সমাজ পাবে স্বস্তি।

মাদক কী

মাদক হলো মত্ততা সৃষ্টিকারী দ্রব্য। অর্থাৎ, সেটাই মাদক দ্রব্য যেটার ব্যবহারে জ্ঞান-বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি লোপ পায়, নেশা সৃষ্টি করে, সুস্থ মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটায়। মানুষের কল্যাণে আবিষ্কৃত বিভিন্ন দ্রব্যাদির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, উপকারী জিনিসকেও মাদকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে যা সামান্য পরিমাণ নেশা তৈরি করে তা-ই মাদক, এবং সর্বসম্মতিক্রমে সেটা হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

IIRT Arabic Intensive

“সকল নেশার জিনিসই মাদক এবং সকল নেশার জিনিসই হারাম।”

বিভিন্ন প্রকার মাদক

বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এগুলোর মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য, যেমন- বিড়ি বা সিগারেট, জর্দা ইত্যাদি প্রধানত ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ঘুমের ঔষধ, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, আফিম, ভদকা, মদ, পেথিডিন, হেরোইন, কোকেন ইত্যাদির ব্যবহার মাদক হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

তামাকজাত দ্রব্যাদিতে অর্থাৎ, বিড়ি-সিগারেট বা জর্দাতে নিকোটিন নামক একটি ক্ষতিকারক পদার্থ বিদ্যমান। এই নিকোটিন সেবনে মস্তিষ্কে মত্ততা বা নেশা তৈরি হয়। এজন্য এটি একটি মাদক। গাঁজাতে ক্যানাবিনয়েডস নামক কিছু পদার্থ থাকে। এটি সেবনে মস্তিষ্ক হালকা হালকা লাগে। কিন্তু উল্টাপাল্টা জিনিস দেখা, ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং এর প্রতি আসক্তি সৃষ্টি হবার কারণে এটি একটি মাদক। ফেনসিডিল মূলত একটি ঠাণ্ডাজাতীয় রোগের ঔষধ। এর মধ্যে কোডেইন, সিউডো-ইফেড্রিন, ক্লোরফেনিরামিন থাকে। এটিও মস্তিষ্কে নেশা সৃষ্টি করে বিধায় এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মাদক হিসেবে বিবেচ্য। ইয়াবার ব্যবহার বর্তমানে তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে থাকে অ্যামফেটামিন এবং ক্যাফেইন। এটি খেলে অনেকক্ষণ জেগে থাকা যায়, তবে খাবার রুচি কমে যায়। কিন্তু এতে এর প্রতি আসক্তি তৈরি করে এবং এটা ক্রমাগত বেড়েই চলে। এজন্য এটি মাদক হিসেবে স্বীকৃত। এভাবে আফিম, মদ, হেরোইন এবং কোকেন সেবনেও মস্তিষ্কে মত্ততা তৈরির কারণে এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে এগুলোকে মাদক বা নেশাজাতদ্রব্য বলা হয়।

ধূমপান ও মাদকাসক্তির কারণ

সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ বিভিন্ন কারণে ধূমপান ও মাদক গ্রহণের দিকে ঝুঁকতে পারে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ হচ্ছে:-

ক) মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা

সব পেশার মানুষদের মধ্যে ধুমপানের কয়েকটি প্রধান কারণ হলো হতাশা, বিষণ্ণতা, শোক, অন্তরের অস্থিরতা। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক কারণসহ আরো অনেক কারণে এসব মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হতে পারে। তন্মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, আল্লাহ্‌ তা’আলার স্মরণ থেকে নিবৃত থাকা। আল্লাহ্‌ তা’আলা আল-কুরআনের মধ্যে সূরা সাজদাহ এর ২১ নং আয়াতে বলেছেন,

গুরু শাস্তির পূর্বে আমি অবশ্যই তাদেরকে লঘু শাস্তি আস্বাদন করাবো, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।

এই আয়াতের ব্যাখ্যা হলো, আল্লাহ্‌ তা’আলার স্মরণ থেকে যারা দূরে সরে যায়, তাদেরকে আল্লাহ্‌ কাছের শাস্তি বা লঘু শাস্তি ভোগ করান। লঘু শাস্তি অর্থাৎ, বিচারের দিনে শাস্তি প্রদানের আগে, যাতে তারা আল্লাহ্ তা’আলার দিকে ফিরে আসে। আর কাছের শাস্তি বা লঘু শাস্তি হচ্ছে আল্লাহ্‌ তা’আলা দুনিয়ার জীবনে তাদের অন্তরে অশান্তি ও শরীরে রোগব্যাধি সৃষ্টি করে দেবেন। যাতে তারা বুঝতে পেরে প্রত্যাবর্তন করে। আর আল্লাহ্‌ তা’আলা থেকে দূরে চলে যাবার কারণে তাদের অন্তরে সৃষ্ট অশান্তিই তাদের নেশার দিকে ধাবিত করে।

এজন্য দেখা যায়, যারা আল্লাহ্‌ তা’আলার হুকুম পালনের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করে, তারা ধুমপান বা মাদকাসক্তিতে লিপ্ত হয় না। তাদের অন্তরে আল্লাহ্‌ তা’আলা শান্তি ঢেলে দেন। তারা কোনো কঠিন সমস্যায় পড়লে আল্লাহ্‌র উপর ভরসা করে এবং তাকদীরের ফয়সালার উপরে খুশি থাকে। ফলে তাদের মধ্যে হতাশা ও বিষণ্ণতা থাকে না। এজন্য আল্লাহ’র নির্দেশ মান্যকারী মানুষ নেশাগ্রস্ত হয় না। আল্লাহ্‌ তা’আলা আল-কুরআনে অন্যত্র বলেছেন,

যারা আল্লাহ্‌র উপর বিশ্বাস এনেছে, তাদের অন্তরসমূহ আল্লাহ্‌র স্মরণে প্রশান্ত হয়। জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌র স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।

খ) কৌতূহল

কিশোর ও যুবক বয়সে সব কিছুর অভিজ্ঞতা লাভের একটি আকাঙ্ক্ষার প্রভাব লক্ষ করা যায়। তারা মনে করে জীবন তো একটিই, তাই এই জীবনে সবকিছুর অভিজ্ঞতা থাকা চাই। এই ধরনের মানসিকতাই ধীরে ধীরে তাদের মাদকাসক্তির দিকে নিয়ে যায়। অনেকেই হয়তো ফিরে আসে, কিন্তু অধিকাংশেরই ফিরে আসা হয়ে ওঠে না। কারণ, প্রাথমিকভাবে এসব বিষয়ে কৌতূহল থাকলেও পরবর্তীতে সেটা নেশায় পরিণত হয়। ফলে আলোর পরিবর্তে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় তাদের জীবনগুলো। নষ্ট হয়ে যায় তাদের পিতা-মাতার স্বপ্ন।

গ) সঙ্গদোষ

ধূমপান ও মাদকাসক্তিতে লিপ্ত হবার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে অসৎ সঙ্গ। আজকাল যুবকেরা ধূমপান বা মাদক গ্রহণ করাকে উত্তম ব্যক্তিত্বের প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করে। আর বন্ধুমহলে অন্য কিছু দিয়ে কেউ সহযোগিতা না করলেও, বিড়ি-সিগারেট দিয়ে সবাই সহযোগিতা করে। মাদকাসক্ত বন্ধু অর্ধেক সিগারেটের ধোঁয়া গ্রহণ করে বাকি অর্ধেক তার বন্ধুকে দিয়ে উপকার করে! অন্য বন্ধু যদি সেটি গ্রহণে অমত জানায়, তাহলে বলা হয় যে, ‘আরে একদিনই তো, কিছু হবে না। একটু অভিজ্ঞতা অর্জন কর।’ এ কথা শুনে অনেকেই একদিনের জন্য ধূমপান বা মাদক গ্রহণ করে। কিন্তু এই একদিনের ধূমপান বা মাদক গ্রহণ, তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, প্রথমে এগুলোর গ্রহণ মস্তিষ্কে এক ধরনের হালকা অনুভূতির সৃষ্টি করে। কিন্তু পরবর্তীতে এই অনুভূতি মাদকের প্রতি আসক্তি তৈরি করে এবং তখন মানুষ এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কথায় আছে, “সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।”

ঘ) পরিবার

পরিবারে বাবা-মার সাথে ঝগড়া বা তাদের কাছে চেয়ে কোনো কিছু না পাওয়ার সূত্র ধরে যুবকেরা নেশায় লিপ্ত হতে পারে। পিতা-মাতার স্নেহের অভাবও অনেক কিশোরের মধ্যে মাদকের ইচ্ছা জাগ্রত করে। এছাড়াও পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তাকে দেখেও অনেকে নেশার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

ঙ) ব্যক্তিগত জীবন

বিবাহ বিচ্ছেদ, চাকুরী হারানো, সংসারে অশান্তি ইত্যাদি ব্যক্তিগত কারণেও কোনো পুরুষ ধূমপানে আসক্ত হতে পারে। মূলত অতিরিক্ত চিন্তা এবং হতাশাই এর মূল কারণ।

চ) সুশিক্ষার অভাব

আমাদের স্কুল কলেজগুলোতে মাদক নিয়ে সচেতনতা তৈরির প্রবণতা কম। একটি শিশুর চিত্ত ছোটবেলা থেকেই আস্তে আস্তে গড়ে ওঠে। আর পরিবারের পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই শিশুর শিক্ষার জন্য উত্তম স্থান। এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত সচেতনতা ও মূল্যবোধ সৃষ্টির কার্যক্রম না থাকায়, সেখান থেকে মাদকের ব্যাপারে সঠিক ধারণা তারা পাচ্ছে না। এজন্য তারা অন্যকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

ছ) অনিয়ন্ত্রিত ঔষধের ব্যবহার

কিছু কিছু ঔষধ যেমন- ফেনসিডিল, আফিম, পেথিডিন ও বিভিন্ন ঘুমের ঔষধগুলো সাধারণত বিভিন্ন চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই ঔষধগুলো ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী না সেবন করার ফলে এগুলোতে আসক্তি তৈরি হয়। পরে মানুষের উপকারের জন্য তৈরি করা ঔষধই মানবদেহের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

জ) মাদকের সহজলভ্যতা

দেশের মধ্যে মাদকের উৎপাদন, বিভিন্ন দেশের সীমান্ত থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে আমাদের দেশে মাদকের অনুপ্রবেশের কারণে বর্তমানে মাদক অনেকটা সহজলভ্য হয়ে গিয়েছে। কিছু কুচক্রী মহল নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মাদককে মানুষের হাতের কাছে এনে দিচ্ছে। এজন্য মাদকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে।

উপরে বর্ণিত কারণসমূহ ছাড়াও আরও অনেক কারণে ধূমপান ও মাদকের দিকে আসক্ত হচ্ছে প্রচুর পরিমাণ কিশোর, যুবক ও বয়স্ক লোকেরা। তবে আমাদের প্রেক্ষাপটে উক্ত কারণগুলোই প্রধানত দায়ী।

ধূমপান ও মাদক গ্রহণের ধ্বংসাত্মক পরিণতি

সমস্ত ধরনের মাদকের মধ্যে বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে তামাকজাতীয় পণ্যের ব্যবহার বেশি। এছাড়াও অন্যান্য মাদকের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এসমস্ত মাদকের রয়েছে বহুমুখী ক্ষতিকর প্রভাব। সেগুলো হলো:-

ক) স্বাস্থ্যের ক্ষতি

ধুমপান

বিড়ি-সিগারেট বা তামাকজাতীয় দ্রব্যে নিকোটিন নামক বিষাক্ত পদার্থ থাকে। এই উপাদানের ক্ষতিকর প্রভাব অকল্পনীয়। সবচেয়ে ক্ষতিকর পরিণতি হলো, ধুমপানের ফলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু। ধূমপানের ফলে ফুসফুসের অভ্যন্তরে ক্রমাগত ক্ষতি হতে হতে এর সাধারণ গঠন নষ্ট হয়ে যায়। সেখান থেকে পরবর্তীতে ফুসফুসে ক্যান্সার হতে পারে। ধূমপানের ফলে ফুসফুসে ক্যান্সার ছাড়াও অন্ত্র, অগ্নাশয় ও মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সার হতে পারে। ধুমপানের ফলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যটাক ও পরবর্তীতে হার্ট ফেইলিওরের ফলে মৃত্যু হতে পারে। ধূমপানের ফলে আলসার, ও খাদ্যনালীতে সমস্যা হতে পারে। এছাড়াও নিয়মিত ধূমপানে কিডনীতে সমস্যা, চোখে সমস্যা, পরিপাকে সমস্যা হতে পারে। তামাকজাতদ্রব্যে উপস্থিত নিকোটিন মানুষের দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট করে দেয়। ফলে তারা বিভিন্ন ধরনের ঠাণ্ডা-কাশি জনিত রোগে আক্রান্ত হতে থাকে। নিকোটিন নাইট্রিক অক্সাইড তৈরিতে বাধা দেয়। এজন্য সহবাসে অক্ষমতা এবং সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও ধূমপানের রয়েছে বিচিত্র ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব। ফুসফুসে ক্যান্সার ছাড়া বাকি সমস্যাগুলো নিয়মিত তামাক দিয়ে তৈরি বিভিন্ন বস্তু, যেমন- জর্দা খেলেও হতে পারে।

গাঁজা

যদিও গাঁজা থেকে প্রাপ্ত টেট্রাহাইড্রোক্যানবিনোল নামক একটি উপাদান বিভিন্ন চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয়, কিন্তু এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষের পর্যাপ্ত ক্ষতি সাধন করে। চিন্তা বিভ্রম, দৃষ্টি বিভ্রম, বিকারগ্রস্ততা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, অস্বাভাবিক গতিবিধি, সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষমতা, সময় সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা এবং উজ্জ্বল রঙ দেখা প্রাথমিকভাবে অল্প পরিমাণ সেবনের ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ সময় গাঁজা সেবনে মস্তিষ্কের বৃদ্ধি লোপ পায়, স্মৃতি কমে যায়, চিন্তাশক্তির ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

ফেনসিডিল

ফেনসিডিলের ভেতরে থাকা কোডেইন ফসফেটই মূলত ব্যবহারকারীকে ফেনসিডিলের প্রতি আসক্ত করে তোলে। কোডেইন আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে নিস্তেজ করে ফেলে। ফলে অনুভূতিহীনতা তৈরি হয়। ব্যক্তির কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। পুরুষত্বহীনতা দেখা দেয় ও যৌন অনুভূতি কমে যায়। আসক্তদের মধ্যে যৌন বিকৃতি ও যৌনরোগে আক্তান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। পুরুষত্বহীনতার কারণে দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যায়। সাজানো সংসার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। শরীরের স্বাভাবিক রূপ-রস-গন্ধ গ্রহণের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ফেনসিডিল আসক্ত ব্যক্তির চিন্তা-ভাবনা অস্বাভাবিক ও অপরিচ্ছন্ন হয়ে যায়।

হেরোইন

হেরোইনকে নেশার রাজা বলা হয়। ক্রমাগত হেরোইন সেবনে দেহের মারাত্মক ক্ষতি হয়। যদি সিরিঞ্জের মাধ্যমে নেওয়া হয়, তাহলে ক্রমাগত শিরার ক্ষতি হবার কারণে শিরা সংকুচিত হয়ে যায়। এর ফলে রক্তনালী এবং হৃদপিণ্ডের কপাটিকাতে ইনফেকশন হতে পারে। হেরোইনে আক্রান্ত ব্যক্তি যক্ষ্মা, আর্থ্রাইটিস, হেপাটাইটিস, এইডস ইত্যাদি রোগে ভুগতে পারে। এছাড়াও দাঁতের মাড়ির প্রদাহ, শরীর চুলকানো, কোষ্ঠকাঠিন্য, দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কমে যাওয়া, শ্বসনতন্ত্রের ব্যাধি, মাংসপেশির দুর্বলতা, যৌন অক্ষমতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, হতাশা, খাবারে স্বাদ না পাওয়া, ঘুমাতে না পারা ইত্যাদি সমস্যায় ভোগে। হেরোইন সেবনের ক্ষতি সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞানী পেটে বলেছেন,

“মানুষ মনে করে হেরোইন খুব ভালো জিনিস, কিন্তু এটি সেবনে তুমি সব কিছু হারাবে: তোমার চাকরী, পিতা-মাতা, বন্ধুবান্ধব, নিজের উপর আস্থা, নিজের বাড়ি। মিথ্যা বলা এবং চুরি করা তোমার অভ্যাসে পরিণত হবে। তুমি কাউকে বা কোনো জিনিসকে সম্মান করতে ভুলে যাবে।”

ইয়াবা

ইয়াবার ভেতরে থাকা অ্যামফেটামিন এবং ক্যাফেইনই মূলত ব্যবহারকারীকে ইয়াবার প্রতি আসক্ত করে তোলে। ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনে সাময়িকভাবে মস্তিষ্কের উদ্দীপনা বেড়ে যায়। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হেরোইনের চেয়েও ভয়াবহ। নিয়মিত ইয়াবা সেবন করলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, নিদ্রাহীনতা, খিঁচুনি, ক্ষুধামন্দা এবং মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা যেতে পারে। ইয়াবা গ্রহণের ফলে ফুসফুস ও বৃক্কে সমস্যা ছাড়াও অনিয়মিত এবং দ্রুতগতির হৃৎস্পন্দনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত হারে ইয়াবা গ্রহণের ফলে দেহের তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে। নিয়মিত সেবনের ফলে ইয়াবার প্রতি আসক্তি তৈরি হয়। অভ্যস্ততার পরে যদি কোনো ব্যক্তি ইয়াবা সেবন করতে না পারে, তখন তার আত্মহত্যার প্রবণতা এবং হতাশা বেড়ে যায়। ফলে হতাশাজনিত নানা রকম অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, এমনকি অনেকে আত্মহত্যাও করে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা খেলে স্মরণশক্তি কমে যায়, সিদ্ধান্তহীনতা শুরু হয় এবং কারও কারও ক্ষেত্রে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। এছাড়া হৃদপিণ্ডের ভেতরে ইনফেকশন হয়ে বা স্ট্রোক করে অনেকে মারা যান। ইয়াবার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিশিষ্ট মনোচিকিৎসক ডাঃ মোহিত কামাল বলেছেন,

“নিয়মিত ইয়াবা সেবনে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, নিদ্রাহীনতা, খিঁচুনি, মস্তিষ্ক বিকৃতি, রক্তচাপ বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন, হার্ট অ্যাটাক, ঘুমের ব্যাঘাত, শরীরে কিছু চলাফেরার অস্তিত্ব টের পাওয়া, অস্বস্তিকর মানসিক অবস্থা, কিডনি বিকল, চিরস্থায়ী যৌন-অক্ষমতা, ফুসফুসের প্রদাহসহ ফুসফুসে টিউমার ও ক্যান্সার হতে পারে। এ ছাড়া ইয়াবায় অভ্যস্ততার পর হঠাৎ এর অভাবে সৃষ্টি হয় হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা।”

তিনি আরো বলেছেন,

“এ মাদক সাধারণ শান্ত ব্যক্তিটিকেও হিংস্র ও আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে। ইয়াবা গ্রহণে হ্যালুসিনেশন ও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। হ্যালুসিনেশন হলে রোগী উল্টোপাল্টা দেখে, গায়েবি আওয়াজ শোনে। আর প্যারানয়াতে ভুগলে রোগী ভাবে অনেকেই তার সঙ্গে শত্রুতা করছে। তারা মারামারি ও সন্ত্রাস করতেও পছন্দ করে।”

কোকেন

কেউ যদি ১ গ্রাম কোকেন খায়, তাহলে ১ ঘণ্টার মধ্যে মারা যাবে। কোকেন অপব্যবহারকারীদের যে সমস্ত সমস্যা হয়, তার মধ্যে- বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, লালা ঝরা, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস চালানো, দ্রুতগতিতে হৃদস্পন্দন, রাতে ঘুম না হওয়া, দাঁত ও জিহ্বা কালো হয়ে যাওয়া উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, খাবার ও স্ত্রীর প্রতি কোনো আগ্রহ থাকে না। কোকেন সেবনে অভ্যস্ত ব্যক্তির ওজন কমে গিয়ে চিকন হয়ে যায় এবং হতাশায় ভোগে। আরেকটি ভিন্ন ধরনের অনুভূতি হয় কোকেন সেবকদের। সেটা হলো, সবসময় মনে হয় যেন চামড়ার নিচে বালি কিচকিচ করছে বা কোনো পোকা চলাচল করছে। এতে কোকেন সেবক সর্বদা এক ধরনের অস্বস্তিতে ভোগে।

আফিম

বর্তমানে আফিমের ব্যবহার কোথাও নেই। তবে আফিম থেকে তৈরি মরফিন প্যাথেডিন ও হেরোইনের ব্যবহার পাওয়া যায়। মরফিন প্রচণ্ড আসক্তি সৃষ্টিকারী একটি ঔষধ। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে এটিরও কুফল রয়েছে। এটি ব্যবহারে অল্পকিছুদিনেই একজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পরতে পারে। এটা সেবনে মানুষ এর উপরে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। মরফিনে আসক্তরা মারাত্মক রকমের অবসাদগ্রস্ততা, বিষন্নতা, নিদ্রাহীনতা, স্মৃতিবিচ্যুতি, মতিভ্রমে আক্রান্ত হয়ে থাকে। আর প্যাথেডিনের ক্ষেত্রেও উক্ত ক্ষতি লক্ষণীয়।

মদ

মদ বলতে সাধারণত ইথাইল অ্যালকোহলকে বুঝায়। মদে উপস্থিত উপাদান মস্তিস্কের উপর কাজ করে এর প্রতি সেবককে আসক্ত করে তোলে। দীর্ঘদিন মদ সেবনে চিত্তবিভ্রম, উন্মত্ততা, হ্যালুসিনেশন (দৃষ্টি বিভ্রম) ও মনোব্যাধি দেখা যায়। তখন, কাঁপুনি, দুঃস্বপ্ন, অনিদ্রা, খিঁচুনি, স্মৃতিভ্রম, চেনা জিনিস চিনতে না পারা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এছাড়াও নিয়মিত দীর্ঘদিন মদ সেবনে লিভার সিরোসিস নামক একটি জটিল রোগ হতে পারে।

খ) অর্থনৈতিক ক্ষতি

চোরাকারবার

মাদকাসক্তির সাথে চোরাকারবারের ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে, যা দেশের সুষ্ঠু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করে। এ ছাড়া দেশীয় মুদ্রা পাচারের সাথেও মাদকাসক্তির যোগসূত্র রয়েছে। মাদকাসক্তির ফলে মাদকদ্রব্যসহ অন্যান্য চোরাচালানও বৃদ্ধি পায় এবং প্রতি বছর প্রচুর টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। ফলে সরকার শুল্ক থেকে বঞ্চিত হয়।

বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে রয়েছে বড় ধরনের ব্যবধান। বিশেষ করে পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের সাথে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাৎ। ঠিক এ অবস্থায় ভারত থেকে প্রতিদিন চোরাই পথে আসছে কোটি কোটি টাকার ফেনসিডিল এবং পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশীয় সম্পদ। সীমান্তের ফাঁক গলিয়ে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ বোতল ফেনসিডিল আসে আমাদের দেশে। ফলে প্রতি বছর প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা শুল্ক থেকে বঞ্চিত হয় সরকার। এভাবে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের কবলে পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। দেশে চোরাই পথে মালামাল আসলে যেমন সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেননা এতে সরকার শুল্ক থেকে বঞ্চিত হয় এবং সরকারের সুনির্দিষ্ট আমদানী ও রপ্তানী বাধাগ্রস্ত হয়।

চিকিৎসা ব্যয়

মাদকদ্রব্যে আসক্ত ব্যক্তিরা শারীরিকভাবে বিভিন্ন অসুস্থতায় ভোগে। দীর্ঘদিন মাদক ব্যবহারের ফলে আসক্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, স্নায়ুর বিভিন্ন রোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস, ব্রঙ্কাইটিস, অন্ত্রের ঘা, যৌন অপারগতা, সন্তান উৎপাদনের অক্ষমতা, রক্তশূন্যতা ইত্যাদি সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও একই সূঁচের মাধ্যমে মাদক গহণে এইডস, হেপাটাইসিস ‘এ’ ও ‘বি’ সহ বিভিন্ন রোগ হবার সম্ভাবনা থাকে। ক্রমাগত হারে এদের রোগ-ব্যাধি বাড়তেই থাকে। ফলে এদের পেছনে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যয়ও কম হয় না, যা জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।

মানব সম্পদ অপচয়

মানব সম্পদের উন্নয়ন হলো ব্যক্তি ও সমাজের রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি চলমান জটিল প্রক্রিয়া। দেশের জনসংখ্যাকে যদি সম্পদে পরিণত করা যায়, তাহলে সেই দেশের জনসংখ্যা উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আর যদি দেশের জনসংখ্যা সম্পদে পরিণত না হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতি ধ্বসে পরতে বাধ্য। বর্তমানে দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোর উপরও মাদকদ্রব্য তার ভয়াবহ ছোবল প্রসারিত করেছে। মাদকের কবলে পড়ে ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষার প্রতি যেমন বিমুখ হচ্ছে, তেমনি নেশার টাকা যোগাড় করতে অনেক ক্ষেত্রে তারা আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে। এভাবেই নষ্ট হচ্ছে অসংখ্য মেধা এবং দেশ এগিয়ে চলেছে মেধাশূন্যতার দিকে। ফলে আমাদের জনসংখ্যা আমরা সম্পদে পরিণত করতে পারছি না। এ কারণে, দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।

অপরাধপ্রবণতা

মাদকাসক্তির সঙ্গে রয়েছে অপরাধের ঘনিষ্ট সম্পর্ক। মাদকাসক্তির ফলে যুবশ্রেণীর মধ্যে সৎগুণ বিলুপ্ত হয়। সন্ত্রাস, অস্ত্রবাজি ও অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পায়। সীমিত সংখ্যক লোকবল ও অস্ত্রবল নিয়ে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। তার উপর মাদকাসক্তি সৃষ্ট অপরাধ দমন এবং এদের নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে দারুণ ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অস্ত্রের ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব অর্থনীতিতে গিয়ে পড়ছে।

গ) সামাজিক কুফল

পরিবারে অশান্তি

মাদকে আসক্ত ব্যক্তির প্রভাব তার পরিবারের উপর গিয়ে পড়ে। কারণ, পরিবারের কোনো সদস্য মাদকাসক্ত হলে সে পরিবারের অশান্তি আর ভোগান্তির সীমা থাকে না। মাদকাসক্তি কেবল আসক্ত ব্যক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না। তার পরিবারের সকল সদস্যদের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। কত ঘর ভেঙে যায়। বিকশিত হবার আগেই হারিয়ে যায় কত উদীয়মান প্রতিভা। বিধবা হয় কত নারী, কত শিশু এতিম হয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা পরিবার সমাজে অস্বাভাবিক জীবনযাপনের শিকার হয়।

সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়

মাদকাসক্তির কারণে মাদক গ্রহণের প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যবস্থা করতে প্রচুর তরুণ-তরুণী বিপথগামী হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যে, নেশার টাকা যোগানোর জন্যে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই অপকর্ম ছাড়াও ঘরবাড়ি হতে আসবাবপত্র ও তৈজসপত্র বিক্রি করে মাদকাসক্তরা নিজে সর্বস্বান্ত হচ্ছে পরিবারকেও পথে বসাচ্ছে। এমনও ঘটনা আছে যে, নেশার টাকা না দিতে পারায় পরিবারের সদস্যকে মাদকসক্তরা খুন পর্যন্ত করেছে। অনেক যুবতী ও নারীরা পতিতাবৃত্তি পেশায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে। ফলে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে।

ব্যক্তিত্ব বিনাশ

মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের পরিবারের সদস্যদের প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে। এমনকি তারা স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। সকল সৎ গুণ, ক্ষমা, ধৈর্য, বিনয়, সহনশীলতা ইত্যাদি মূল্যবোধ বিলুপ্তির ফলে সে মানসিক ও আত্মিক শূন্যতায় ভুগতে থাকে। ফলে সবদিক থেকে সে দেউলিয়া হয়ে পড়ে।

মুক্তির উপায়

ধূমপান ও মাদক থেকে প্রতিকারের উপায়সমূহ:-

ক) ধর্মীয় অনুভূতি জাগরণ

ধুমপান ও মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রস্তাবনা দিয়ে থাকে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও দেওয়া হয় বিভিন্ন নির্দেশনা। কিন্তু সমস্ত নির্দেশনা ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরেও আমরা মাদকাসক্তি কমাতে পারছি না। এই অবস্থার জন্য একটি মাত্র নিয়ামককে দায়ী করা যেতে পারে। আর সেটি হলো, ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব। কারণ, ধুমপান ও মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি অবগত এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং চিকিৎসকেরা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশের চিকিৎসক সমাজও বর্তমানে ধূমপান ও মাদক থেকে মুক্ত নয়। চিকিৎসকেরা জানেন যে, ধূমপান ক্যান্সারসহ বিভিন্ন মরণব্যাধির জন্য দায়ী। কিন্তু তাঁরাই আবার ধূমপান বা মাদক গ্রহণ করছেন। এর কারণ হলো, প্রবৃত্তির কাছে জ্ঞানের পরাজয়। আমাদের জ্ঞান রয়েছে, কিন্তু প্রবৃত্তির তাড়নায় সেই জ্ঞানের প্রয়োগ করার শক্তি বা সামর্থ্য কোনোটিই আমাদের দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য দরকার প্রবৃত্তির দমন। আর প্রবৃত্তি দমনের একমাত্র পন্থা হচ্ছে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়োগ এবং আল্লাহ্‌’র ভয় অর্থাৎ, তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ্‌ তা’আলা আল-কুরআনে বলেছেন,

তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়।

এই আয়াতের সত্যতা পূর্বের আলোচনা থেকেই প্রমাণিত। উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্ত এটাই যে, যে সমস্ত বস্তু মাদক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর কিছু কিছু উপকার থাকলেও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সেগুলোর দ্বারা ক্ষতি হয় অনেক বেশি। আল্লাহ্‌ তা’আলা আল-কুরআনে আরো বলেছেন,

হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য ব্যতীত কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা কি এখনো নিবৃত্ত হবে না?

সুতরাং, আল্লাহ্‌ তা’আলা মাদককে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আর শয়তান মানুষকে মাদকে অভ্যস্ত করে পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে দেয়-এটাও ঘোষণা করেছেন। মাদকে লিপ্ত ব্যক্তি পরিবার, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিভিন্ন প্রকার কলহে লিপ্ত থাকে। এর থেকে শুরু হয় শত্রুতা এবং পরবর্তীতে এরা একে অপরকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করে না। এজন্য আল্লাহ্‌ তা’আলা মাদককে নিষিদ্ধ করেছেন।

মাদক গ্রহণ সম্পর্কে হাদিসেও এসেছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং পরকালে মাদক সেবীদের জন্য রয়েছে লাঞ্চনা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

তিন ব্যক্তির জন্য জান্নাত হারাম; মদখোর, পিতামাতার অবাধ্য সন্তান এবং দায়ূস।

সুতরাং, হাদিস থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, মাদক গ্রহণকারীদের জন্য প্রাথমিকভাবে জান্নাত হারাম। ইসলাম মানুষকে নৈতিকতা শিক্ষা দিয়েছে। সাথে সাথে সমাজিক মূল্যবোধ যাতে বজায় থাকে, সেজন্য বিভিন্ন নীতিমালা প্রদান করেছে। মুসলিমদের দ্বীন, বিবেক, দৈহিক শক্তি ও সম্পদ যেন নিরাপদ থাকে সেজন্যই এই নির্দেশ। রাসূল ﷺ আরো বলেছেন,

আল্লাহ তা’আলা মদ ও এর পানকারী এবং যে পান করায়, এর বিক্রেতা ও ক্রেতা, এর রস গ্রহণকারী ও রস যোগানদানকারী, সরবরাহকারী ও যার নিকট সরবরাহ করা হয় সবার উপরই অভিশাপ করেছেন।

সুতরাং, ধর্মীয় অনুভূতি জাগরণের মাধ্যমে মাদকের ইহকালীন ক্ষতি ও পরকালীন শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে নৈতিক ও চারিত্রিক শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পিতা-মাতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ, মসজিদের ইমাম সাহেব, সামাজিক নেতৃবৃন্দ ও সমাজ কর্মীরা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারেন।

খ) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বৃদ্ধি

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচীতে মাদকাসক্তির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে প্রবন্ধ, সাময়িকী, গল্প ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্তমানে পাঠ্যসূচীতে যতটুকু বিদ্যমান আছে, তা খুবই সামান্য। মাদক সংক্রান্ত বিষয়সমূহ আরো বিস্তারিত আকারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মাদকাসক্তি সম্পর্কে মাঠ পর্যায়ে উপাত্ত সংগ্রহ করা ও গবেষণা করার সুযোগ দিতে হবে।

গ) মাদক বিরোধী প্রচারণায় সরকারী সহযোগিতা

মাদকাসক্তি প্রতিরোধ সংক্রান্ত সকল কর্মকাণ্ডে সরকারকে উদার হস্তে সহযোগিতা করতে হবে। যেমন, এ সংক্রান্ত বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণা, গণসচেতনতা সৃষ্টি, প্রদর্শনী প্রোগ্রাম, সেমিনার, আলোচনা সভা, ওয়ার্কশপ, মাদক বিরোধী অভিযান ইত্যাদিতে ব্যাপকভাবে সহযোগিতা করতে হবে।

ঘ) মাদকের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি

সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে মাদকদ্রব্যের ভয়াবহ ক্ষতি যেমন- শারীরিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে যুবকেরা মাধ্যমিক পর্যায়ে থাকতেই মাদকাসক্তির শারীরিক ক্ষতির দিকগুলো তাদের বুঝাতে হবে। কেননা প্রথমে মাদক গ্রহণের সময় অনেকেই এ বিষয়ে সচেতন থাকে না। তাহলে সমাজের প্রতিটি মানুষ মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ বেচা-কেনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উদ্যোগী হবে।

ঙ) আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ

মাদকের ব্যাপারে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত আইন প্রণয়ন ও প্রণীত আইনে মাদক সংক্রান্ত অপরাধের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং এ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠিন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে পরবর্তীতে আর কেউ এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ করতে, সহযোগিতা বা মদদ যোগাতে সাহস না করে। এ শাস্তির বিষয়টি জাতীয় প্রচার মাধ্যমে দেশবাসীকে জানাতে হবে এবং মাদকদ্রব্যের প্রচারণা বন্ধ করতে হবে।

চ) চোরাচালান বন্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ

সরকারী উদ্যোগে মাদকদ্রব্যের চোরাচালান ও সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশ মাদক চোরাচালানের আন্তর্জাতিক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং চোরাচালানকারী রাষ্ট্রসমূহ সবগুলোই প্রায় সার্ক সদস্যভূক্ত, সেহেতু এ ক্ষেত্রে সার্কভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের সাথে আলোচনা করে চোরাচালান রোধে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে। মাদকদ্রব্যের চোরাচালান, বিক্রয়, বিপনন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ও সরকারী সংস্থা যেমন পুলিশ, বি.ডি.আর, আইন বিভাগকে আরো বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাদক চোরাচালান ও সরবরাহে পুলিশ বিভাগের সংশ্লিষ্টতার কথা শোনা যায়। সে ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হলে তাৎক্ষনিক চাকুরী থেকে বরখাস্ত করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

ছ) অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি

অভিভাবকদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে, যাতে ছেলেমেয়েরা পাড়ার বা মহল্লার বখাটে ছেলেদের সাথে মিশে আড্ডা না দেয়। কেননা বখাটে বন্ধুদের খপ্পড়ে পড়েই প্রথমে তারা মাদক গ্রহণ করে থাকে। এজন্য অভিভাবকদের ছেলে-মেয়েদের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে।

যাবার আগে

মাদকাসক্তির মতো সর্বনাশা ছোবল দেশের তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আজকের ও আগামী দিনের সুস্থ সুন্দর ও সুখকর সমাজের জন্যে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার রোধ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারী সংস্থাসমূহ মাদকাসক্তি নিবারণে বারবার বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। কিন্তু বরাবরের মতোই তা কোনো কাজে আসেনি। এক নাগাড়ে মাদক তার কালো হিংস্র থাবা বিস্তার করেই যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত মাদকের মায়াজালে আটকে ধ্বংস হচ্ছে জাতি ও সমাজ। অর্থনৈতিকভাবে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি; মাদকাসক্তির এহেন বিধ্বংসী দাবানল থেকে মুক্তি পাওয়ার রাস্তা আপাতত একটিই, সেটি হচ্ছে আল-কুরআনের আইন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকাসক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ। সরকারী ও বেসরকারী সকল উদ্যোগকে সমন্বিত করে একটি পরিকল্পিত ও বাস্তবমুখী আন্তরিক সহযোগিতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা সময়ের শ্রেষ্ঠ দাবী।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive