কা’বা – প্রাচীন এক গৃহ, একত্ববাদের ধারক ও বাহক মুসলিমদের পবিত্র কিবলা। এখানে ইবাদাত করেছেন ইবরাহীম (আ.), ইসমাঈল (আ.) ও মুহাম্মাদ (ﷺ) এর মতো সম্মানিত নবীরা। ইসলামের ইতিহাসের একটি বড় অংশ কা’বাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হলে এর কেন্দ্রভূমিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে। কাজেই খ্রিষ্টান মিশনারি ও নাস্তিক মুক্তমনাচক্র কা’বাকে নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের ডালি খুলেছে। তাদের দাবি: কা’বা গৃহকে কিবলা হিসাবে গ্রহণ করা বিভিন্ন কারণে পৌত্তলিকতা বা paganism। কারণ হিসাবে তারা বলে:

    মুসলিমরা মানুষের তৈরি একটি স্থাপনার (কাবা) দিকে মাথা নত করছে

IIRT Arabic Intensive

    মুসলিমরা কাবার উপাসনা করে

    কাবায় এক সময় ৩৬০টি মূর্তি ছিলো। যেখানে এক সময় মূর্তিপূজা হয়েছে, তা কী করে একত্ববাদী ইবাদাতের কেন্দ্র হয়?

এই অভিযোগগুলো দেখে অনেক সরলপ্রাণ মুসলিম বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তাদের অভিযোগগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাক সেগুলোর আদৌ কোনো যৌক্তিকতা আছে কি না।

 মানুষের তৈরি একটি স্থাপনার (কাবাদিকে মাথা নত করা

ইসলামবিরোধীরা বলতে চায় যে, কা’বার দিকে মুখ করে উপাসনা করা একটি পৌত্তলিক রীতি। মুসলিমরা কেন কা’বার দিকে মুখ করে উপাসনা করে?

উত্তর হচ্ছে: কা’বা মুসলিমদের কিবলা (উপাসনার দিক)। এটি আল কুরআনের নির্দেশ যে কিবলা অর্থাৎ কা’বার দিকে মুখ করে সলাত আদায় করতে হবে।[1] পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, মুসলিমমাত্রই কা’বার দিকে মুখ করে সলাত পড়ে। এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যেরও একটি নিদর্শন।

বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী কিংবা মূর্তিপূজারী একটিও জাতি কি পৃথিবীতে আছে, যারা এরূপ কোনো কিবলার দিকে মুখ করে উপাসনা করে?

উত্তর হচ্ছে: না।

ইসলাম ছাড়া আর একটিমাত্র ধর্মের লোকদের এইরূপ কিবলার ধারণা আছে। আর সেটি হচ্ছে ইহুদি ধর্ম।[2]

বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old testament) অংশটি ইহুদি-খ্রিষ্টান উভয় ধর্মালম্বীদের ধর্মগ্রন্থ। বাইবেলের এ অংশে উপাসনা সংক্রান্ত বিধি-বিধানের বিবরণ এসেছে এবং তার মধ্যে একাধিকবার এই কিবলার কথা এসেছে। বাইবেল অনুযায়ী বনী ইসরাঈলের নবীগণও কিবলার দিকে ফিরে উপাসনা করতেন। বনী ইসরাঈলের জন্য কিবলা ছিলো বাইতুল মুকাদ্দাস (Temple Mount) যেটি মুহাম্মাদ (ﷺ) এর শারি’আতেও প্রথম কিবলা ছিলো। নবী দাঊদ (আ.) এর ইবাদাতের বিবরণ দিয়ে বাইবেলে বলা হয়েছে:

ঈশ্বর, আপনার পবিত্র মন্দিরের দিকে আমি মাথা নত করি। আমি আপনার নাম, প্রেম এবং নিষ্ঠার প্রশংসা করি। কারণ আপনার এবং আপনার বাণীকে আপনি সমস্ত কিছুর উপরে সমুচ্চ করেছেন।

I bow down toward your holy temple and give thanks to your name for your steadfast love and your faithfulness, for you have exalted above all things your name and your word. (ESV) [3]

বাইবেলে এটিই নবী রাসূলদের ইবাদাতের রীতি এবং এ অনুয়ায়ী ইহুদিদের ধর্মীয় আইন হচ্ছে তাদের কিবলা অর্থাৎ মাসজিদুল আকসা {বাইতুল মুকাদ্দাস/Temple Mount} এর দিকে ফিরে ইবাদাত করা। হাজার হাজার বছর ধরে ইহুদিরা এভাবেই ইবাদাত করে আসছে।[4]

বনী ইসরাঈলের শারি’আতে যে কিবলার ধারণা ছিলো, তা আল-কুরআন দ্বারাও প্রমাণিত।[5] বাইবেলের নতুন নিয়ম (New Testament) এ যিশু খ্রিষ্ট বলেছেন যে, পূর্ববর্তী নবীদের সকল আইন মেনে চলতে হবে এবং এগুলো চিরস্থায়ী আইন। বাইবেল অনুযায়ী তিনি নিজেও পূর্ববর্তী নবীদের শারি’আতের অনুসারী ছিলেন।[6] কাজেই আমরা দেখতে পেলাম যে, কিবলার দিকে ফিরে উপাসনা করা মোটেও পৌত্তলিক জাতির রীতি নয়, বরং এটি বনী ইসরাঈল জাতির একটি ধর্মীয় আইন। এবং এটি কুরআনের শারি’আতেও বহাল রাখা হয়েছে। যেসব খ্রিষ্টান মিশনারি মুসলিমদের কিবলার ধারণাকে পৌত্তলিকতার সাথে মিলিয়ে অপপ্রচার চালান, তাঁরা নিজ ধর্মীয় গ্রন্থের বিধানকে গোপন করে এই মিথ্যাচার করেন। কিবলার দিকে ফিরে উপাসনা করা যদি পৌত্তলিকতা হয়, তাহলে বাইবেলে যে নবীগণের কথা উল্লেখ আছে {যেমন দাউদ (আ.)}, তাঁরাও পৌত্তলিক (নাউযুবিল্লাহ)। বরং খ্রিষ্টানরাই  সেইন্ট পলের দর্শন গ্রহণ করে তাওরাতের শারি’আত ও বনী ইসরাঈলের ইবরাহীমী উপাসনার রীতি বাদ দিয়েছে এবং নব উদ্ভাবিত পৌত্তলিক রোমক উপাসনা রীতি গ্রহণ করেছে।[7] যারা নিজেরাই পৌত্তলিক (pagan), তারা আবার অন্যদেরকে পৌত্তলিকতার জন্য অভিযুক্ত করে!

 মুসলিমরা কাবার উপাসনা করে

এটি পশ্চিমা বিশ্বে একটি খুব কমন ধারণা। খ্রিষ্টান মিশনারিদের লাগামহীন প্রচারণার দ্বারা এই ধারনা ব্যাপক ‘জনপ্রিয়তা’ লাভ করেছে।

কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে— ইসলামের মূল কথাই হচ্ছে আল্লাহ ছাড়া আর কারো উপাসনা করা যাবে না। কেউ যদি কা’বার উপাসনা করে, তাহলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। কুরআন ও হাদীসে কোথাও কা’বার উপাসনার কথা বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে কা’বার প্রভু আল্লাহ তা’আলার উপাসনা করতে।

فَلۡيَعۡبُدُواْ رَبَّ هَـٰذَا ٱلۡبَيۡتِ (٣) ٱلَّذِىٓ أَطۡعَمَهُم مِّن جُوعٍ۬ وَءَامَنَهُم مِّنۡ خَوۡفِۭ (٤)

অতএব তারা যেন ইবাদাত করে এই ঘরের (কাবা) প্রভুর, যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং  ভীতি থেকে তাদেরকে নিরাপদ রেখেছেন। [সূরাহ কুরাঈশ (১০৬): ৩-৪]

প্রকৃতপক্ষে যারা এরূপ অভিযোগ করে, তারা আসলে জানেই না যে পৌত্তলিকতা কী। সব থেকে অজ্ঞ মুসলিমটিও কখনোই কা’বাকে আল্লাহর মূর্তি বলে মনে করে না। বরং মুসলিমদের কাছে এটি আল্লাহর ইবাদাতের ঘর। ঠিক যেমন ইহুদিদের কাছে বাইতুল মাকদিস বা বাইতুল মুকাদ্দাস {হিব্রুতে Bethel বা Beit HaMikdash, ইংরেজিতে Temple Mount} হচ্ছে ঈশ্বরের ইবাদাতের গৃহ।[8] অথচ ইহুদিদেরকে তারা বলে একত্ববাদী আর মুসলিমদেরকে বলে পৌত্তলিক!

সৌদি আরব থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দূরবর্তী স্থানে মুসলিমরা সলাত (নামাজ) আদায় করে থাকে। পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিমদের থেকেই কা’বা অনেক দূরে অবস্থিত। এমন কোনো মূর্তিপুজারী কি আছে, যে তার দেবতার মূর্তিকে হাজার হাজার মাইল দূরে রেখে উপাসনা করে? কখনো যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে কিবলার দিক বোঝা যাচ্ছে না, তখন যেকোনো দিকে ফিরে সলাত আদায় করা যায়। এমনকি কা’বাকে যদি কখনো ধ্বংসও করে ফেলা হয়, তাহলে মুসলিমরা কা’বা যে স্থানটিতে আছে, সেই স্থানের দিকে মুখ করে সলাত আদায় করবে।[9] এ থেকে প্রমাণ হয় যে, মুসলিমরা মোটেও কা’বার ইমারতের উপাসনা করে না। বরং কা’বা মুসলিমদের জন্য শুধুমাত্র ইবাদাতের দিক বা কিবলা। যেকোনো পৌত্তলিকের কাছে তার দেবতা সব থেকে পবিত্র ও মহান। অথচ ইসলাম ধর্মে একজন মু’মিন মুসলিমের জান, মাল ও ইজ্জত কা’বার চেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন।[10]

কোনো পৌত্তলিক কখনোই তার দেবতার মূর্তির উপর দাঁড়ায় না। কোনো হিন্দু ধর্মালম্বী কি কখনো তার দেবতার মূর্তির উপর উঠে দাঁড়াতে পারবে? কিংবা কোনো ক্যাথোলিক খ্রিষ্টান কি কখনো যিশু বা মরিয়মের মূর্তির উপর উঠে দাঁড়াতে পারবে? কখনোই না। মুসলিমদের কাছে কা’বা হচ্ছে কিবলা এবং ইবাদাতের ঘর। এর উপর উঠে দাঁড়িয়ে মুসলিমরা আযান দিতে পারে। প্রতি বছর হাজ্জের মৌসুমে কা’বার ছাদে উঠে এর গিলাফ পরিবর্তন করা হয়।[11]

কা’বার ছাদে দাঁড়িয়ে গিলাফ পরিবর্তনের ছবি দেখুন:

এসব থেকে প্রমাণিত হয় যে, কা’বা মুসলিমদের নিকট মোটেও মূর্তি বা প্রতিমা জাতীয় কিছু না এবং মুসলিমরা কখনোই কা’বার উপাসনা করে না।

যেখানে এক সময় মূর্তিপূজা হয়েছে তা কী করে একত্ববাদী ইবাদাতের কেন্দ্র হয়:

মুহাম্মাদ (ﷺ) এর আগমনের পূর্বে কা’বায় মূর্তিপুজা হতো, এই ইতিহাসকে ব্যবহার করে দ্বীন ইসলামের একত্ববাদী চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে খ্রিষ্টান লেখক ও নাস্তিক-মুক্তমনারা। কা’বায় এক সময় মূর্তিপুজা হতো, এমনকি সেখানে এক সময় ৩৬০টি মূর্তিও স্থাপন করা হয়েছিলো – সত্য। কিন্তু এটাই কা’বার প্রাচীনতম ইতিহাস নয়। কা’বা মোটেও মূর্তিপুজার জন্য স্থাপন করা হয়নি, বরং এর স্থাপনের উদ্যেশ্য ছিলো সম্পূর্ণ উল্টো। কা’বা নির্মাণ করেন তাওহীদের (একত্ববাদ) দাওয়াহর মহানায়ক আল্লাহর নবী ইবরাহীম (আ.) এবং তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)। আল-কুরআনে বলা হয়েছে:

وَإِذۡ يَرۡفَعُ إِبۡرَٲهِـۧمُ ٱلۡقَوَاعِدَ مِنَ ٱلۡبَيۡتِ وَإِسۡمَـٰعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّآ‌ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ (١٢٧) رَبَّنَا وَٱجۡعَلۡنَا مُسۡلِمَيۡنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَآ أُمَّةً۬ مُّسۡلِمَةً۬ لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبۡ عَلَيۡنَآ‌ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ (١٢٨) رَبَّنَا وَٱبۡعَثۡ فِيهِمۡ رَسُولاً۬ مِّنۡہُمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡہِمۡ ءَايَـٰتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَـٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَيُزَكِّيہِمۡ‌ۚ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ (١٢٩)

অর্থ: স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা’বাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করেছিলো। তারা দু’আ করেছিলো: আমাদের প্রভু! আমাদের থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ। হে আমাদের প্রভু! আমাদের উভয়কে আপনার আজ্ঞাবহ করুন এবং আমাদের বংশধর থেকেও একটি অনুগত দল সৃষ্টি করুন, আমাদের হাজ্জের রীতিনীতি বলে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি তাওবাহ কবুলকারী, দয়ালু। হে আমাদের প্রভু, তাদের মধ্য থেকেই তাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেবেন। এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান। [সূরাহ আল-বাকারাহ (২): ১২৭-১২৯]

এমনকি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থেও কা’বার কথা উল্লেখ আছে এবং তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকেই প্রমাণ করা যায় যে, ইবরাহীম (আ.) মক্কায় এসেছিলেন।[12] কালক্রমে ইবরাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) এর বংশধর মক্কার আরবরা একত্ববাদী ধর্ম ছেড়ে বিভিন্ন কাল্পনিক দেবতার মূর্তি সহকারে পূজা শুরু করে এবং কা’বাগৃহেও মূর্তি স্থাপন করে। ইবরাহীম (আ.) এর দু’আর ফসল নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) আগমন করে তাদেরকে পুনরায় একত্ববাদী ইসলামের দিকে আহ্বান করেন এবং কা’বা ঘরকে মূর্তিমুক্ত করে এক আল্লাহর উপাসনার গৃহে পরিণত করেন, ঠিক যেমনটি ইবরাহীম (আ.) এর সময়ে ছিলো। এটিই হচ্ছে কা’বাগৃহের ইতিহাস।[13] অর্থাৎ, মূর্তিপুজা ছিলো ইবরাহীম (আ.) এর পরবর্তী লোকদের নব উদ্ভাবন ও পথভ্রষ্টতা। কা’বা নির্মাণের সাথে এর কোনো সম্পর্কে নেই এবং এই ইতিহাস মোটেও কা’বাকে মূর্তিপূজার মন্দির প্রমাণ করে না।

এরপরেও যদি খ্রিষ্টান মিশনারিরা অপতর্ক করতে চায়, তাহলে আমরা বলবো—বাইতুল মুকাদ্দাস তো তাদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী ঈশ্বরের মহামন্দির (Temple Mount), যেখানে যিশু খ্রিষ্টসহ অন্য নবী-রাসূলগণ এক কালে উপাসনা করতেন ও  শিক্ষা দান করতেন।[14] বাইবেল অনুযায়ী এই মহা মন্দিরের গোড়াপত্তনকারী হচ্ছেন ইবরাহীম (আ.) এর নাতি ইয়া’কুব (আ.), [15] এবং এখানেও এক সময় পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা মূর্তিপুজা করেছে—ঠিক যেমনটি কা’বায় হয়েছে! এই তথ্য শুনে হয়তো অনেকেই চমকে উঠতে পারে, কিন্তু ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থে এমনটিই বলা আছে। —-

তাঁর পিতা হিষ্কিয় যে সমস্ত উচ্চস্থান ভেঙে দিয়েছিলেন, মনঃশি আবার নতুন করে সেই সব বেদী নির্মাণ করেছিলেন। বায়াল মূর্তির পূজার জন্য বেদী বানানো ছাড়াও, ইসরায়েলের রাজা আহাবের মতোই মনঃশি আশেরার খুঁটি পুঁতেছিলেন। তিনি আকাশের তারাদেরও পূজা করতেন। মূর্তিসমূহের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে তিনি প্রভুর প্রিয় ও পবিত্র মন্দিরের মধ্যেও বেদী বানিয়েছিলেন। (এই সেই জায়গা যেখানে প্রভু বলেছিলেন, “আমি জেরুশালেমে আমার নাম স্থাপন করবো।”) মন্দিরের দুটো উঠোনে তিনি আকাশের নক্ষত্ররাজির জন্য বেদী বানান। তাঁর নিজের পুত্রকে তিনি যজ্ঞবেদীর আগুনে আহুতি দেন। ভবিষ্যৎ জানার জন্য তিনি প্রেতাত্মা ও পিশাচদের কাছে যাতায়াত করতেন। প্রভুকে অসন্তুষ্ট করার মতো আরো অনেক কাজই মনঃশি করেছিলেন। ফলতঃ প্রভু খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। মনঃশি পাথর কুঁদে আশেরার একটি মূর্তি বানিয়ে সেটাকে মন্দিরে [Temple Mount/বাইতুল মুকাদ্দাস] বসিয়েছিলেন। প্রভু দাঊদ ও তাঁর পুত্র শলোমন [সুলাইমান (আ.)]-কে বলেছিলেন, “সমস্ত শহরের মধ্য থেকে আমি জেরুশালেমকে বেছে নিয়েছি। এখানকার এই মন্দিরে আমার নাম চিরদিনের জন্য থাকবে। ইসরায়েলীয়দের পূর্বপুরুষদের আমি যে ভূখণ্ড দিয়েছিলাম, ইসরায়েলীয়রা যদি আমায় মান্য করে চলে, আমার দাস মোশি[মূসা (আ.)/Moses]-র দেওয়া বিধি ও আদেশগুলো অনুসরণ করে, তাহলে সেই ভূখণ্ড থেকে আমি কখনও তাদের উৎখাত করবো না।” কিন্তু লোকেরা ঈশ্বরের কথা গ্রাহ্য করলো না। মনঃশি লোকদের বিপথে চালনা করলেন, যাতে তারা আরো বেশি পাপকাজ করলো সেই সব জাতিসমূহের চেয়েও, যাদের প্রভু ধ্বংস করেছিলেন এবং ইসরায়েলীয়দের দিয়ে দিয়েছিলেন। প্রভু তাঁর দাস ভাববাদী(নবী/prophet)দের মাধ্যমে বলে পাঠিয়েছিলেন: যিহুদার [ফিলিস্তিনে বনী ইসরাঈলের দক্ষিণ রাজ্য] রাজা মনঃশি, ইমোরীয়দের থেকেও বহুগুণে ঘৃণ্য অপরাধ করেছে এবং মূর্তিপূজা করে যিহুদাকেও পাপের পথে ঠেলে দিয়েছে। [16]

খ্রিষ্টান মিশনারিরা কা’বার বিরুদ্ধে যে (অপ)যুক্তি প্রদান করেন, সেই এক যুক্তি কিন্তু Temple mount এর ক্ষেত্রেও খাটে। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁরা অন্ধের ভান করে কা’বার বিরুদ্ধেই অভিযোগ করেন। নাস্তিক-মুক্তমনাদেরকেও কখনো বাইবেলের নবী-রাসূলদের Temple mountকে pagan temple বলতে দেখা যায় না; কারণ তাহলে যে জার্মানীর ভিসা না-ও জুটতে পারে! এই হচ্ছে তাদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। প্রকৃতপক্ষে বাইতুল মুকাদ্দাস (Temple Mount) কিংবা কা’বা গৃহের মাসজিদ (মাসজিদুল হারাম) এর কোনোটিই pagan temple (পৌত্তলিকদের মন্দির) নয়, বরং উভয়টিই এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনাগৃহ। উভয় গৃহই আল্লাহর নবীগণ নির্মাণ করেছেন, উভয় গৃহেই এক সময় পথভ্রষ্ট লোকেরা মূর্তিপূজা করেছে। এবং বর্তমানে এ উভয় গৃহই মূর্তিপূজামুক্ত হয়েছে, মাসজিদুল হারাম ও বাইতুল মুকাদ্দাস উভয় স্থানেই এখন একত্ববাদী মুসলিমগণ এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা করেন।

নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) কা’বা থেকে মিথ্যা দেবতাদের মূর্তি অপসারণ করতে করতে যা বলছিলেন, ইসলামবিরোধীদের উদ্যেশ্যে আমরাও ঠিক তা-ই বলি—

جَآءَ ٱلۡحَقُّ وَزَهَقَ ٱلۡبَـٰطِلُ‌ۚ إِنَّ ٱلۡبَـٰطِلَ كَانَ زَهُوقً۬ا

অর্থ: সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিলো। [সূরাহ বনী ইসরাঈল (ইসরা) (১৭):৮১]

 

তথ্যসূত্র

[1]. আল কুরআন, বাকারাহ ২ : ১৪২-১৪৬ দ্রষ্টব্য

[2]. সামেরি/শমরীয় (Samaritans)দেরকে ইহুদি ধর্মের অংশ বিবেচনা করে

[3]. বাইবেল, গীতসংহিতা/সামসঙ্গীত/জবুর শরীফ/ Psalms ১৩৮ : ২

[4]. ■ “Why Do We Face East When Praying Or Do We – How to calculate mizrach – Questions & Answers”  (Chabad)

“Mizrah” – Wikipedia, the free encyclopedia

“Jews praying at the Wailing Wall HD” (YouTube)

[5]. আল কুরআন, ইউনুস ১০ : ৮৭ নং আয়াত দ্রষ্টব্য

[6]. বাইবেল, মথি (Matthew) ৫ : ১৭-২০, লুক (Luke) ১৬ : ১৬-১৭ দ্রষ্টব্য

[7]. ‘Pagan Christianity?: Exploring the Roots of Our Church Practices’ by Frank Viola &‎ George Barna

পুরো বইটিই এ বিষয়ক তথ্য-প্রমাণে ভরপুর। বইটি ডাউনলোড করুন এখান থেকে।

[8]. ■ খ্রিষ্টান বাইবেল/ইহুদি তানাখ, আদিপুস্তক(Genesis/Bereishit) ২৫:১০-২২

“The Holy Temple” (chabad)

[9].  Question regarding Muslims worshiping Ka’bah and Hajr Aswad (islamQA Hanafi)

[10]. আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ(ﷺ)কে কা’বা ঘর তাওয়াফ করতে দেখলাম এবং তিনি বলছিলেন: কত উত্তম তুমি হে কা’বা! আর্কষীয় তোমার খোশবু, কত উচ্চ মর্যাদা তোমার! কত মহান সম্মান তোমার। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! আল্লাহর নিকট মু’মিন ব্যক্তির জান-মাল ও ইজ্জতের মর্যাদা তোমার চেয়ে অনেক বেশি। আমরা মু’মিন ব্যক্তি সম্পর্কে সুধারণাই পোষণ করি। [সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৯৩২]

[11]. “Hajj 2013 | Exclusive Kaba Kiswa change 2013-1434 Arafa Day ” (You Tube)

[12]. দেখুন: “কা’বা: মূর্তিপুজকদের মন্দির, নাকি ইব্রাহিম(আ.) এর নির্মাণ করা ইবাদতখানা?”

[13]. ■“A brief history of al-Masjid al-Haraam in Makkah” — islamQA (Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)

আর রাহিকুল মাখতুম, শফিউর রহমান মুবারকপুরী (র) {তাওহিদ পাবলিকেশন্স}, পৃষ্ঠা ৪৬৩-৪৬৬

[14]. বাইবেল, মথি (Matthew) ২১:১২-১৫, ২১:২৩; লুক (Luke) ২:৪৬-৪৯, ২০:১, ২১:৩৭-৩৮ দ্রষ্টব্য

[15]. বাইবেল, আদিপুস্তক (Genesis) ২৮:১০-২২ দ্রষ্টব্য

[16]. বাইবেল, ২ রাজাবলী (2 Kings) ২১:৩-১১

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive