বিসমিল্লাহির রাহমান আর-রাহীম

আমি ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা শুরু হবার পরে অনেক ভালো ভালো বক্তা/লেখকদেরকে ফেসবুকে ফলো করি। অনলাইনে পরিচয় হয় অনেক জুনিয়র-সিনিয়রদের সাথে। প্রায়ই দেখি তাঁরা ভালো উদ্দেশ্যে একটা কাহিনী শেয়ার করেন। বারসিসার কাহিনী। কেউ যদি পুরোটা পড়তে চান, এই লিংকে ঘুরে আসুন। সংক্ষেপে কয়েকটা পয়েন্টে বলছি,

IIRT Arabic Intensive

১। বারসিসা ছিলো একজন আবিদ, মানে সাধক। সারাসময় ইবাদাতে মশগুল থাকতো।

২। তিনজন ভাই যুদ্ধে যাবেন।

৩। তাঁদের কুমারী বোনের দেখাশোনা করার কেউ নাই।

৪। তাঁরা দায়িত্ব দিতে চাইলেন বারসিসাকে। বারসিসা অস্বীকার করলেন প্রথমে।

৫। পরে জোরাজুরি করায় বারসিসা বললো তার উপাসনালয়ের পাশের বাড়িতে রাখতে।

৬। সে প্রতিদিন গিয়ে খাবার দিয়ে আসতে লাগলো।

৭। শয়তানের প্ররোচনায় ভিতরে গিয়ে খাবার দেওয়া শুরু করলো।

৮। এরপর শয়তানের প্ররোচনায় একটু একটু কথা বলা শুরু করলো।

৯। সামান্য কথা থেকে সারাদিন কথা, সেখান থেকে ব্যাভিচার।

১০। শয়তানের প্ররোচনায় ব্যভিচারের ফল বাচ্চাসহ মেয়েটাকে খুন করে সেই বিল্ডিং-এ গর্ত খুঁড়ে পুতে রাখলো।

১১। ভাইরা আসার পরে বললো তাঁদের বোন মারা গেছে।

১২। সেই রাতে শয়তান ভাইদেরকে স্বপ্নে আসল সত্যটা বলে ফেলে।

১৩। ভাইরা পরের দিন সত্যতা যাচাই করেন এবং বারসিসাকে ক্রুশবিদ্ধ করতে চান।

১৪। ক্রুশবিদ্ধ করার আগে শয়তান বারসিসাকে বলে বাঁচার জন্য আল্লাহকে অস্বীকার করে শয়তানকে সিজদা করতে। সে তা-ই করে ফেলে এবং এর পরে শয়তান চলে যায়, বারসিসাকে মেরে ফেলা হয়।

আমার সবসময়ই এই কাহিনীটা শুনলে মনে কেমন খটকা লাগতো। অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছিলো একদিন। প্রশ্নগুলো নিম্নরূপ ,

১) কোনো গাইর মাহরাম মেয়ের দায়-দায়িত্ব নেওয়া কি হারাম, যদি তার কেউ না থাকে ? মারইয়াম (‘আলাইহাসসালাম) যাকারিয়্যা (‘আলাইহিসসালাম) এর গাইর মাহরাম ছিলেন। তারপরও মারইয়ামের দায়-দায়িত্ব নিয়েছিলেন যাকারিয়্যা (‘আলাইহিসসালাম)।

২) ওই গ্রামের বাকি লোকগুলো যুদ্ধে গেলো না কেন? ধরে নেই এটা আক্রমণাত্মক যুদ্ধ, যেখানে সবার যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক না। তাহলে পরের প্রশ্ন ,

৩) যদি বাধ্যতামূলক না হয়েই থাকে, তাহলে তিন ভাই কেন বোনকে একা রেখে গেলেন? তাঁরা একজনকে দেখার জন্য রেখে যেতেই পারতেন! বদরের যুদ্ধে রাসূল ﷺ উসমান (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)-কে বলেছিলেন তাঁর অসুস্থ স্ত্রীর দেখাশোনা করার জন্য। তাবুকের যুদ্ধে যাবার আগে রাসূল ﷺ আলি (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)-কে মাদীনার গভর্নর নিযুক্ত করে যান। এটা তো খারাপ কিছুই না।

৪) আচ্ছা যুদ্ধে যখন যেতেই হবে, বোনকেও তো তাঁরা নিতে পারতেন। যুদ্ধে মেয়েরা তো নার্স হিসেবে কাজ করতেই পারে!

৫) সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমার এলাকায় যদি এ রকম ঘটে, একটা গাইর মাহরাম মেয়ে আছে যার দেখাশোনা করার মতো বিশ্বস্ত কেউ নেই, তাহলে আমার কী করা উচিৎ?

এ ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য ফাতোয়া ওয়েবসাইট ইসলামওয়েবে প্রশ্ন করেছিলাম। তাঁদের উত্তরটা এরকম,

“কুরতুবি, বাগাওয়ি সহ কিছু মুফাসসির নিচের আয়াহ ব্যাখ্যা করতে বারসিসার কাহিনী বর্ণনা করেছেন।

তারা শয়তানের মতো, যখন সে মানুষকে বলে “অবিশ্বাস কর।” কিন্ত অবিশ্বাস করার পর সে বলে, “অবশ্যই আমি তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন। আমি অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনকে ভয় করি।”

কিন্তু আমরা এই ঘটনা সুন্নাহর কোনো নির্ভরযোগ্য বই থেকে পাইনি। তাই এ ধরনের প্রশ্ন করার মানে হয় না–বিশেষত যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে সেটা আমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের শারি’আতের সাথে সম্পর্কিত। যদি কাউকে কোনো গাইর মাহরাম মেয়ের দায়-দায়িত্ব নিতেই হয়, তাহলে সেটা বৈধ। তবে অবশ্যই ইসলামি রীতিনীতি মেনে চলতে হবে, যেমন একাকী একই ঘরে থাকা যাবে না।

যাকারিয়্যা (‘আলাইহিসসালাম) এবং মারইয়াম (‘আলাইহাসসালাম) এর কাহিনী কোনোভাবেই গাইর মাহরামের সাথে একাকী রুমে থাকাকে জায়িয প্রমাণ করে না। যদি ধরেও নেই তা-ই হয়েছিলো, তাহলে বলতে হবে তাঁদের সময় শারি’আহ ভিন্নরকম ছিলো। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।” (ইসলামওয়েব থেকে উদ্ধৃতি শেষ)

এই প্রশ্নগুলোর কারণ হচ্ছে, যারা কাহিনীটি শেয়ার করেন, তাঁরা কখনোই এই কথাগুলো বলেন না। কিন্তু প্রশ্নগুলোও খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যারা ইসলামে নতুনভাবে প্রবেশ করছেন, কম জানেন, তাঁরা এসবের উত্তর না জানলে অনেক বিপদে পড়ে যাবেন। আমি একজন মোটামুটি জ্ঞানী ভাইকে পর্যন্ত দেখেছি তিনি মনে করতেন ঘটনাটা একটা হাদীস, অথচ এটা কোনো হাদীসই না! এটা ইয়াহুদিদের ইতিহাসের ঘটনা, যা সত্য-মিথ্যা যেকোনো কিছুই হতে পারে!

এই লেখার মাধ্যমে সবাইকে অনুরোধ করবো একটু সতর্ক হোন। শয়তানের প্ররোচনা বুঝাতে হলে এর চেয়েও ভালো ভালো শক্ত দলীলের হাদীস পাবেন ইনশা আল্লাহ্‌। যদি শেয়ার করতেই হয়, তাহলে বলবেন মানুষ যেন এক চিমটি না, আধা কেজি লবণ সহ কাহিনীটা পড়ে ।

আল্লাহই ভালো জানেন।


লেখক: আব্দুল মুহাইমিন রাহমান

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

One Response

  1. m3owX

    এই কাহিনীটা *বিয়ে* নিয়েও কিছু পয়েন্ট আউট করে বলে মনে হচ্ছে, ফর এক্সাম্পলঃ
    .
    ১। বারসিসা আবেদ হওয়া স্বত্বেও বিয়ে করে নাই কেন?
    ২। ঐ মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয় নাই কেন?
    ৩। উভয়ে অবিবাহিত থাকার পরিনিতি?
    .
    সবশেষে “এটা ইয়াহুদিদের ইতিহাসের ঘটনা, যা সত্য-মিথ্যা যেকোনো কিছুই হতে পারে!”

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive