মহান আল্লাহ বলেন, যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয় এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ হয়। [সূরা আশ শামস ১০]

সুতরাং সফল হতে হলে নিজেকে শুদ্ধ করতে হবে। আর নিজেকে কিভাবে শুদ্ধ করতে হয় তা জানতে হলে আমাদের প্রথমে নিজেকে জানতে হবে। মানুষের সত্ত্বা মূলত: তিনটি বিষয়ের সমন্বয়- ১) শরীর বা বদন ২) আকল বা বুদ্ধি ৩) রূহ বা নাফস।

IIRT Arabic Intensive

শরীর আর বুদ্ধির ব্যাপারটা সবাই অবগত হলেও রূহ বা নাফস হয়ত অতটা পরিচিত নয়। রূহ কি? মহান আল্লাহ বলেন, লোকেরা আপনাকে রূহ বা আত্মা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে জানতে চায়। আপনি বলে দিন রূহ হচ্ছে আমার প্রতিপালকের নির্দেশ মাত্র। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। [সূরা বনী ইসরাইল ৮৫]

যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও এ বিষয়ে সামান্য কিছু জ্ঞান দেওয়া হয়েছে আমরা আর বেশি কী করে জানব! সহজ কথায় রূহ আল্লাহর একটা নির্দেশ মাত্র যার উপস্থিতি মানব দেহে প্রাণের সঞ্চার করে। রূহ আর নাফস একই বিষয় কী না তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে রূহ আর নাফস একই প্রাণসত্ত্বার দু’টি নাম কিংবা দুটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবস্থা। মানুষের জীবদ্দশায় শরীর ও রূহ সর্বদা উপস্থিত থাকলেও আকল থাকতেও পারে আবার নাও পারে। একজন পরিপূর্ণ মানুষের মধ্যে তিনটি সত্ত্বাই বিরাজমান। সুতরাং নিজেকে শুদ্ধ করতে হলে এই তিন সত্ত্বাকেই শুদ্ধ করতে হবে। কিভাবে আমরা এটা করতে পারি?

সহজ উত্তর। দ্বীন মানতে হবে। দ্বীন মানার মাধ্যমেই আমরা তা করতে পারি। আরেকটু স্পেসিফিক্যালি বললে, দ্বীনের তিনটি অংশ মানব সত্তার এই তিন দিককে শুদ্ধ করে। দ্বীনের প্রথম বিষয় ইসলাম যা আমাদের শরীরকে পবিত্র করে। ইসলাম কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ইসলাম হল, তুমি এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সালাত (নামায/নামাজ) কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রমযানের রোযা পালন করবে এবং বায়তুল্লাহ পৌঁছার সামর্থ থাকলে হাজ্জ (হজ্জ) পালন করবে”। কালিমা গ্রহণ করার মাধ্যমে (পাঠ করা নয় কিন্তু) আপনি শিরক আর কুফর থেকে পবিত্র হবেন। সালাত দিয়ে গুনাহ মুক্ত হবেন, যাকাত দিয়ে সম্পদ পবিত্র হবে, সিয়াম ও হাজ্জ দিয়ে পবিত্র হবে শরীর। এভাবে ইসলাম পালনের মাধ্যমে আমরা আমাদের বাহ্যিক দিকগুলোকে পবিত্র করতে পারি।

দ্বীনের দ্বিতীয় বিষয় হল ঈমান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ঈমান হল আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার কিতাবসমূহের প্রতি, তার রাসুলগণের প্রতি এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান আনবে, আর তাকদিরের ভালমন্দের প্রতি ঈমান রাখবে”। মানুষ কি জানে না যে গায়েবের উপর বিশ্বাস স্থাপন করাই তাদের বুদ্ধি প্রয়োগের আসল জায়গা! আপনি ভেবে দেখেন গায়েবের উপর ঈমান এনে তার প্রমাণ স্থাপন করতে কি পরিমান বুদ্ধির দরকার হয়। যারা এটা করতে পারেনি তারা নি:সন্দেহে অপবিত্র। মহান আল্লাহ বলেন, “বস্তুত: এহেন কাফেরদের উদাহরণ এমন, যেন কেউ এমন কোন জীবকে আহবান করছে যা কোন কিছুই শোনে না, হাঁক-ডাক আর চিৎকার ছাড়া, বধির, মুক ও অন্ধ। সুতরাং তারা কিছুই বোঝে না” [সূরা বাকারাহ ১৭১]

 তৃতীয় বিষয় হল, ইহসান। অনেকের কাছেই এটা অপরিচিত। যার ফলে দেহ এবং বুদ্ধির শুদ্ধতা থাকলেও নাফসের দূষণ শেষ হয় না। ইহসান কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ইহসান হলো, এমনভাবে ইবাদত-বন্দেগি করবে যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ, যদি তুমি তাকে নাও দেখ, তাহলে ভাববে তিনি তোমাকে দেখছেন।” অর্থাৎ যার মধ্যে ইহসান আছে সে জানে তাকে সর্বদা দেখা শুনার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এটা তাকে তার কর্মে এমন সতর্ক করে যে তার অন্তরও কোন পাপ পঙ্কিলতার চিন্তা করে না, দেহ তো দূরের বিষয়।

রূহ বা নাফসের পবিত্রতার দু’টি ধাপ আছে। এর আগে আমরা জেনে নিই তার তিনটি অবস্থার কথা। নাফসের তিনটি অবস্থা হতে পারে- ক. নাফসুল আম্মারাহ্ খ. নাফসুল লাউওয়ামাহ্ গ. নাফসুল মুৎমাইন্নাহ্।

নাফসুল আম্মারাহ্ হলো নাফসের ওই অবস্থা যে অবস্থায় তা মানুষকে শুধু মন্দ কাজের প্রতি ধাবিত করে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ, কিন্তু সে নয়-আমার পালনকর্তা যার প্রতি অনুগ্রহ করেন। [সূরা ইউসুফ ৫৩]। যখন মানুষ ইসলাম ও ঈমান অনুযায়ী চলে না তখন নাফসুল আম্মারাহ্ প্রভাব বিস্তার করে এবং সে পাপাচারে নিমজ্জিত হয়। যারা গান-বাজনা-অশ্লীলতা সহ বিভিন্ন পাপে লিপ্ত এবং তাতে তারা ইতস্তত বোধ করে না তাদের আত্মা নফসুল আম্মারাহ্। আল্লাহ আমাদের এ থেকে হেফাজত করুক।

নাফসুল লাউওয়ামাহ্ হলো নাফসের ওই অবস্থা যে অবস্থায় নাফস মন্দ কাজ সংঘটিত হওয়ার পর অনুতপ্ত হয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নাফসে লাউওয়ামাহ্ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে রয়েছেআরও শপথ করি সেই মনের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয় [সূরা কিয়ামাহ্ ২]। যখন মানুষ তার ভুল বুঝতে পারে এবং তওবা করে। যখন কেউ ইসলাম জানতে ও মানতে শুরু করে তখন নাফসুল লাওয়ামা প্রভাব বিস্তার করে এবং সে অন্যায় করতে বিব্রত বোধ করে। এটা হল মানুষের শুদ্ধতার প্রাথমিক অবস্থা।

নাফসুল মুৎমাইন্নাহ্ হলো নাফসের ওই অবস্থা যে অবস্থায় নাফস মানুষকে ভালো কাজের প্রতি ধাবিত করে অর্থাৎ ভালো কাজে প্রশান্তি লাভ করে। এই অবস্থায় আপনি তখনই আসতে পারবেন যখন আপনি আল্লাহর দ্বীনকে পূর্ণ ভালোবাসা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করবেন, আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ইসলামের জন্য শোকরগুজার হবেন, যখন আল্লাহর সন্তুষ্টিই আপনার সন্তষ্টি আর আল্লাহর অসন্তুষ্টিই আপনার অসন্তুষ্টি হবে, যখন আপনি আল্লাহ ও তার রাসূলকে নিজের পরিবার ও সম্পদ থেকেও বেশি ভালোবাসতে পারবেন, যখন আপনার অন্তরের দুটি প্রকোষ্ঠ তার জন্য ভালোবাসা এবং তার শত্রুর জন্য ঘৃনায় পুর্ন হবে। এই অবস্থায় আল্লাহ স্বয়ং আপনার অন্তরে ঈমান লিখে দেবেন। তার পক্ষ থেকে রূহ দ্বারা আপনাকে শক্তিশালী করা হবে। তিনি বলেন, “যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টতারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে। [সূরা মুজাদিলাহ ২২]

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কেউ আল্লাহর জন্যই ভালবাসে এবং আল্লাহর জন্যই ঘৃণা করে এবং (কাউকে কিছু) দিয়ে থাকে আল্লাহর জন্যই এবং (কাউকে কিছু) দেয়া থেকে বিরত থাকেও আল্লাহরই জন্য; তাহলে তার ঈমান পরিপূর্ণ হলো।” [আবু দাউদ, ৪০৬১] । এভাবে ঈমানের পূর্ণতাই আপনার রূহকে পবিত্র করতে পারে, অন্য কিছু নয়।

কৌতুহল থেকে যায় নাফসুল মুতমাইন্নাহ বা পরিতৃপ্ত আত্মা এসেছে কী না কিভাবে বুঝব! মহান আল্লাহ এর একটা লক্ষণ বর্ননা করেছেন এভাবে, প্রকৃত পক্ষে তারাই ঈমানদার যাদের সামনে যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ারদেগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে[সূরা আনফাল ২]

 অর্থাৎ ঈমানপূর্ণ প্রশান্ত অন্তরের তিনটা মৌলিক দিক হল –

১) আল্লাহর কথা স্মরণ হলে তার ভয়ে অন্যায়, পাপাচার থেকে দূরে থাকে

২) তার আয়াত শুনলে ঈমান বেড়ে যায়

৩) দুঃখে-কষ্টে সর্বদা আল্লাহর উপর ভরসা করে।

আসুন আমরা ভেবে দেখি আমাদের অন্তর কি প্রশান্ত নাকি উদ্ভ্রান্তই রয়ে গেছে। হে আল্লাহ! আপনি আপনার দয়ায় আমাদের ঈমানকে পূর্ণ করে দিন। হে আল্লাহ! আমরা আপনার ঐ ডাকের অপেক্ষায় আছি যা আপনি আমাদের শুনিয়েছেন, হে প্রশান্ত আত্মা, সন্তুষ্ট চিত্তে তোমার রবের কাছে আসো এবং আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আমার জান্নাতে প্রবেশ করো” [সূরা ফাজর ২৮-৩০]

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

5 Responses

  1. Md. Masum Howlader

    MashAllah … Osadaron writing… May Allah(swt) give more barakah in your writing…

    Reply
  2. Safa

    মাশাআল্লাহ………উস্তাদ কথাগুলো হ্রদয়গ্রাহী। 🙂

    Reply
  3. Parvez Ahmed

    আলহামদুল্লিলা অনেক ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ আপনারকে এত সুন্দর লেখা উপকার দেওয়ার জন্য।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive