পূর্বকথাঃ

নিশ্চয়ই সকল সন্তানহারা বাবা-মায়ের জন্য উপকারী জ্ঞান রয়েছে এই লেখাটিতে। আশা করা যায়, এই লেখার মাধ্যমে তাদের সবর করতে কিছুটা সুবিধা হবে। নিদারুণ সেই শোক সামাল দিয়ে মহান আল্লাহর উপরে ভরসা রাখতে সাহায্য করবে তাদের – ইনশা আল্লাহ।

উপকারী মনে হলে পরিচিত ভাইবোন যারা এই শোককে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন, তাদের কল্যাণের জন্য শেয়ার করতে পারেন।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

বিনীত –

মোহাম্মদ জাভেদ কায়সার।

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ তায়ালার নামে শুরু করছি।

নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও স্তুতি একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার জন্য।

পবিত্র কুরআন ও হাদীসে এমন অনেক বর্ণনা আছে যাতে ধৈর্যশীলদের পুরস্কারের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। যে কেউ তার বিপদ ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করবেন, তিনিই এই বিশেষ পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবেন।

নিঃসন্দেহে সন্তানের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা। যেই বাবা-মা এই কঠিন পরীক্ষা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্যের মাধ্যমে মোকাবেলা করবেন, তাদের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশাল প্রতিদান রয়েছে।  আমরা এই সম্পর্কে নীচে ৪টি পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ –

   ▪পবিত্র কুরআনে তাদের কথা

   ▪ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর বর্ণিত হাদীস সমূহে তাঁদের কথা

   ▪ একটি লক্ষণীয় ও জরুরী বিষয় ও

   ▪ একটি প্রশ্নের উত্তর

পবিত্র কুরআনে তাঁদের কথাঃ

“এবং অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয়ই আমরা সবাই মহান আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো। তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি মহান আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হিদায়াত প্রাপ্ত।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৫-১৫৭]

“… আর যারা সবর করে, মহান আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৬]

“… যারা সবরকারী, তারাই তাদের পুরস্কার পায় অগণিত।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত ১০]

পবিত্র কুরআনে আরো বেশ কিছু আয়াত রয়েছে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য তথা সবর করার তাত্পর্যের উপরে।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর বর্ণিত হাদীস সমূহে তাঁদের কথাঃ

স্বাভাবিকভাবেই অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন – কেন মহান আল্লাহ তাঁদের সন্তান হারানোর মত কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন? এর উত্তর উপরে সূরা আল-বাকারার আয়াতের মধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে যে মহান আল্লাহ আমাদের বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করবেন। এই পরীক্ষা যদি আমরা সবরের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে পারি তবে কল্যাণ ছাড়া অন্য কিছু বরাদ্দ নেই আমাদের জন্য; আলহামদুলিল্লাহ।

মুসলিম মাত্রই আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের উপর এমন কোন বিপদ-আপদ আসে না যার বিনিময়ে আমাদের পাপসমূহ মোচন করা হয়। আমরা এই সংক্রান্ত হাদীসসমূহ একটু দেখতে পারি।

একঃ উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কোন মুসলমানের উপর কোন বিপদ আপতিত হলে তার বিনিময়ে তার গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়, এমনকি ক্ষুদ্রতর কোন কাঁটা বিদ্ধ হলেও।

[সহীহ মুসলিমঃ অধ্যায় ৪৫ (সদ্ব্যবহার, আত্নীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার অধ্যায়), হাদীস ৬২৩৯]

দুইঃ আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “মুমিন পুরুষ ও নারীর জান, সন্তান-সন্ততি ও তার ধন-সম্পদ (বিপদ-আপদ দ্বারা) পরীক্ষিত হতে থাকে। পরিশেষে সে আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে নিষ্পাপ হয়ে সাক্ষাৎ করবে।”

[রিয়াদুস সালেহীনঃ অধ্যায় ১ (বিবিধ অধ্যায়) হাদীস ৪৯, জামে’ আত-তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদ]

তিনঃ আবু সা’ঈদ আল-খুদরী ও আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তারা উভয়েই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছেন যে, “কোন ঈমানদার ব্যক্তির এমন কোন ব্যথা-ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, দুঃখ পৌঁছে না, এমনকি দুর্ভাবনা পর্যন্ত, যার বিনিময়ে তার কোন গুনাহ মাফ করা হয় না।

[সহীহ মুসলিমঃ অধ্যায় ৪৫ (সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার অধ্যায়), হাদীস ৬২৪২]

চারঃ সুহাইব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ

“মু’মিন ব্যক্তির কাজ-কর্ম অবলোকন করলে খুব আশ্চর্য লাগে। কেননা তার সমস্ত কাজ তার জন্য কল্যাণকর। আর এটি হয়ে থাকে শুধু মু’মিনদের জন্য, অন্যের জন্য নয়। যখন সে কল্যাণকর কিছু লাভ করে তখন সে (মহান আল্লাহর) শুকরিয়া আদায় করে, আর তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যখন সে কোন বিপদে পতিত হয়, তখন সে ধৈর্য ধারণ করে (সেটিও তার জন্য কল্যাণকর)।”

[সহীহ মুসলিমঃ হাদীস ৫৩১৮]

এবার আমরা সুনির্দিষ্টভাবে সন্তান হারানোর বিষয়ের হাদীসগুলো দেখব।

পাঁচঃ আবু মুসা আল-আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ

যখন কারও সন্তান মারা যায়, তখন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদেরকে ডেকে বলেন যে, ‘তোমরা আমার বান্দার সন্তানের জান কবয করে ফেলেছ?’ তারা বলেন – ‘হ্যাঁ।’ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তার কলিজার টুকরার জান কবয করে ফেলেছ?’ তারা বলেন – ‘হ্যাঁ।’ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার বান্দা কি বলেছে?’ তারা বলেন – ‘আপনার বান্দা এই বিপদেও ধৈর্য ধারণ করে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়েছে।’ তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা আমার এই বান্দার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ কর এবং তার নামকরণ কর “বাইতুল হামদ” অর্থাৎ প্রশংসার গৃহ।’

[রিয়াদুস সালেহীনঃ অধ্যায় ১৪ (মহান আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা অধ্যায়) হাদীস ১৩৯৫। জামে’ আত-তিরমিযী]

ছয়ঃ আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ

‘‘যে কোন মুসলিমের তিনটি নাবালক সন্তান মারা যাবে, মহান আল্লাহ তাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহের বরকতে জান্নাত দেবেন।’’

[রিয়াদুস সালেহীনঃ অধ্যায় ৭ (রোগী দর্শন ও জানাযায় অংশগ্রহণ অধ্যায়) হাদীস ৯৫২। মুত্তাফাক্বুন আলাইহিঃ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]

সাতঃ আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! কেবলমাত্র পুরুষেরাই আপনার হাদীস শোনার সৌভাগ্য লাভ করছে। সুতরাং আপনি আমাদের জন্যও একটি দিন নির্ধারিত করুন। আমরা সে দিন আপনার নিকট আসব, আপনি আমাদেরকে তা শিক্ষা দেবেন, যা আল্লাহ আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন।’ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘‘তোমরা অমুক অমুক দিন একত্রিত হও।’’

অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের নিকট এসে সে শিক্ষা দিলেন, যা মহান আল্লাহ তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে যে কোন মহিলার তিনটি সন্তান মারা যাবে, তারা (মৃত সন্তানেরা) তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে আড় (প্রতিবন্ধক) হয়ে যাবে।’’

এক মহিলা বলল, ‘আর দু’টি সন্তান মারা গেলে?’ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘‘দু’টি মারা গেলেও (তাই হবে)।’’

[রিয়াদুস সালেহীনঃ অধ্যায় ৭ (রোগী দর্শন ও জানাযায় অংশগ্রহণ অধ্যায়) হাদীস ৯৫৪। মুত্তাফাক্বুন আলাইহিঃ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]

আটঃ কুররা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন বসতেন, তখন সাহাবীদের অনেকে তাঁর কাছে এসে বসতেন। তাদের মধ্যে একজনের অল্প বয়স্ক একটি ছেলে ছিল। তিনি তার ছেলেটিকে পেছনে দিক থেকে নিজের সামনে এনে বসাতেন। অতঃপর ছেলেটি মৃত্যুবরণ করল। সেই পিতা বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন। তার ছেলের কথা মনে করে তিনি মজলিসে উপস্থিত হতে পারতেন না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে না দেখে জিজ্ঞাসা করলেন যে, “আমি অমুক ব্যক্তিকে কেন দেখছি না?” সাহাবীগণ বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি তার ছোট ছেলেটিকে দেখেছিলেন সে মৃত্যুবরণ করেছে।’

পরে তার সাথে সাক্ষাৎ করে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার ছোট ছেলেটির কি হয়েছে?”

সে ব্যক্তি বললো, ‘ছেলেটির মৃত্যু হয়েছে।’

তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে ধৈর্য ধারণ করতে বললেন। তারপর তিনি বললেন, “হে অমুক! তোমার কাছে কোনটি পছন্দনীয় – তার দ্বারা তোমার পার্থিব জীবন সুখময় করা? না কাল কেয়ামতে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে তুমি প্রবেশ করতে চাইবে, তাকে সেখানেই পাওয়া – যেখানে সে পৌঁছে তোমার জন্য দরজা খুলে দিবে?”

সে বললো, ‘হে আল্লাহর রাসূল! বরং সে আমার জান্নাতের দরজায় গিয়ে আমার জন্য দরজা খুলে দেবে এটাই আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়।’

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, “তাহলে তা-ই তোমার জন্য হবে।”

[সুনানে আন-নাসাইঃ অধ্যায় ২১ (জানাযা অধ্যায়), হাদীস ২০৯০। তাহকিকঃ সহীহ]

নয়ঃ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের মধ্যে কাকে নিঃসন্তান বলে গণ্য কর?” বর্ণনাকারী বলেন, ‘আমরা যার সন্তান হয় না তাকেই নিঃসন্তান মনে করি।’ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, “সে ব্যক্তি নিঃসন্তান নয়, বরং সেই ব্যক্তি-ই নিঃসন্তান, যে তার কোন সন্তান আগে পাঠায় নি (অর্থাৎ যার জীবদ্দশায় তার সন্তান মৃত্যুবরণ করেনি)।”

[সহীহ মুসলিমঃ অধ্যায় ৪৫ (সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার অধ্যায়), হাদীস ৬৩১১]

অর্থাৎ যে ব্যক্তির কোন সন্তান তার আগে জান্নাতে পিতামাতার জন্য অপেক্ষা করবে না, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকেই নিঃসন্তান বলেছেন।

একটি লক্ষ্যণীয় ও জরুরী বিষয়ঃ

একটি বিষয় লক্ষ্য করুন। যদি সন্তান বেঁচে থাকত, তবে সে বড় হয়ে জীবিকার তাগিদে, প্রয়োজনের তাগিদে কোন এক সময় বাবা-মা’র থেকে দুরে চলে যেতে হতো। সারাজীবন সন্তানকে আঁকড়ে ধরে রাখা সম্ভব নয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে নৈতিকতার অধঃপতনের বেড়াজালে হয়তো অনেক আগেই জড়িয়ে পড়তে পারতো সেই সন্তান। আপন বাবা-মাকে খুন করে ফাঁসির দন্ডাদেশ পাওয়া কিশোরী “ঐশী”-ই তার প্রমাণ।

“মৃত্যু” – এই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম সত্য যা এড়িয়ে যাবার কোন উপায় নেই। মৃত্যুর পূর্বের কষ্ট (সাকরাতুল মওত), কবরের আযাব, বিচার দিবসের সীমাহীন আতংক এবং জাহান্নামের কঠোরতম শাস্তি – এর সবকিছুর উর্ধ্বে রয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা আমাদের সন্তানেরা। তারা উর্ধ্ব আকাশে সাইয়িদুনা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর আশেপাশে অন্যান্য শিশুদের সাথে খেলছে। সুবহানাল্লাহ!

সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের স্বপ্নের বর্ণনায় বলেছেন, “…. …আমরা চললাম এবং একটা সজীব শ্যামল বাগানে উপনীত হলাম, যেখানে বসন্তের হরেক রকম ফুলের কলি রয়েছে। আর বাগানের মাঝে আসমানের থেকে অধিক উঁচু দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছে যার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছি না। এমনিভাবে তার চতুপার্শে এত বিপুল সংখ্যক বালক-বালিকা দেখলাম যে, এত বেশি আর কখনো আমি দেখি নি। আমি তাদেরকে বললাম, উনি কে? আমাকে বলা হলো – ইনি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আর তার আশেপাশের বালক-বালিকারা হলো ঐসব শিশু, যারা ফিৎরাতের (স্বভাবধর্ম) ওপর মৃত্যুবরণ করেছে।”

[সহীহ বুখারীঃ অধ্যায় ৫৯ (সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়), হাদীস ৪২৯]

উপরন্তু এই বালক-বালিকারা তাঁদের বাবা-মায়ের জান্নাতে প্রবেশের কারণ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

আবু হাসসান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হুরায়রা (রাঃ) কে বললাম, ‘আমার দু’টি পুত্র সন্তান মারা গিয়েছে। আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) -এর তরফ থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করবেন, যাতে আমরা মৃতদের সম্পর্কে আমাদের অন্তরে সান্ত্বনা পেতে পারি?’

আবু হুরায়রা (রাঃ) বললেন, “হ্যাঁ, তাদের ছোট সন্তানরা জান্নাতের প্রজাপতিতুল্য। তাদের কেউ যখন পিতা কিংবা পিতামাতা উভয়ের সংগে মিলিত হবে, তখন তার পরিধানের বস্ত্র কিংবা হাত ধরবে, যেভাবে এখন আমি তোমার কাপড়ের আঁচল ধরেছি। এরপর সেই বস্ত্র কিংবা হাত আর পরিত্যাগ করবে না যতক্ষণ না মহান আল্লাহ তাকে তার বাবা-মা সহ জান্নাতে প্রবেশ না করাবেন।”

[সহীহ মুসলিমঃ অধ্যায় ৪৫ (সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার অধ্যায়), হাদীস ৬৩৭০]

একটি প্রশ্নের উত্তরঃ

অনেক দম্পতির সন্তান গর্ভাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।  সুবহানাল্লাহ, পৃথিবীর বুকে না এসেও গর্ভস্থিত সেই ভ্রুণ তার বাবা-মায়ের জন্য মহান আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে এবং জান্নাতের ফয়সালা করিয়ে নিবে।

মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ “সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! গর্ভপাত হওয়া সন্তানের (Miscarried Fetus) মাতা তাতে সওয়াব আশা করলে (ধৈর্যের মাধ্যমে) ঐ সন্তান তার নাভিরজ্জু (Umbilical Cord) দ্বারা তাকে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে।”

[সুনানে ইবনে মাজাহঃ অধ্যায় ৬ (জানাযা অধ্যায়), হাদীস ১৬৭৭, মিশকাত ১৭৫৪]

আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “গর্ভপাত (অসুস্থতাজনিত) হওয়া সন্তান (Miscarried Fetus) এর রব তার পিতা-মাতাকে যখন জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন তখন সে তার প্রভুর সাথে বিতর্ক করবে। তাকে বলা হবে, ওহে প্রভুর সাথে বিতর্ককারী গর্ভপাত হওয়া সন্তান! তোমার পিতা-মাতাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। অতএব সে তাদেরকে নিজের নাভিরজ্জু  (Umbilical Cord)  দ্বারা টানতে টানতে শেষে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।”

[সুনানে ইবনে মাজাহঃ অধ্যায় ৬ (জানাযা অধ্যায়), হাদীস ১৬৭৬, এই বর্ণনাটি দুর্বল]

ইমাম আন-নববী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর মাজমু’ ফাতওয়া (৫/২৮৭) এ বলেছেন – মৃত সন্তানের ক্ষেত্রের হাদীসগুলো গর্ভপাত (অসুস্থতা জনিত) হওয়া সন্তানের বেলাতেও প্রযোজ্য হবে। মহান আল্লাহ সর্বোত্তম জানেন।

[মাজমু’ ফাতওয়া, ইমাম নববী (৫/২৮৭), হাশিয়াত ইবনে আবেদীন (২/২২৮)]

মুহাম্মদ সালিহ আল-উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) সহ অধিকাংশ ফুক্বাহাদের মতে ভ্রুণ-এ রুহ সঞ্চার করা হয় ৪ মাস তথা ১২০ দিন পর।  রুহ সঞ্চারের পর থেকেই অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান মৃত্যু সংশ্লিষ্ট হাদীসগুলো প্রযোজ্য হবে।  মহান আল্লাহ সর্বোত্তম জানেন।

[ফাতওয়া আল-লাজনাহ আল-দা’ইমাহ, ২১/৪৩৪-৪৩৮।

ফাতওয়া আল-মার’আহ আল-মুসলিমাহ, ১/৩০৩, ৩০৫।

আস’ইলাত আল-বাবিল মাফতুহ (মুহাম্মদ সালিহ আল-উসাইমীন); প্রশ্ন নং ৬৫৩]

সুবহানাল্লাহি বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল ‘আযীম।

মহান আল্লাহ কাছে প্রার্থনা করি – তিনি যেন সকল সন্তানহারা বাবা-মা’দের ধৈর্য ধারণ করার মাধ্যমে এই অশেষ পুরষ্কারের গর্বিত মালিক হওয়ার তাওফীক প্রদান করেন।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

শুরু হোক আপনার অ্যারাবিক শেখার যাত্রা।  ফেব্রুয়ারি ২০১৭ এ শুরু হতে যাচ্ছে দুই বছর মেয়াদি অনলাইন ভিত্তিক আরবি ভাষা শিক্ষা কোর্স IIRT Arabic Intensive প্রোগ্রামের নতুন ব্যাচ, যেখানে অ্যাপনি বিশ্বের যেকোন প্রান্ত থেকে ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারবেন, ইনশা আল্লাহ। বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন: www.arabic.iirt.info

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.