পর্ব ০১ | পর্ব ০২

আল্লাহ তা’আলা সূরা নাহলের ৩৫ নং আয়াতে বলেনঃ

IIRT Arabic Intensive

وَقَالَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا عَبَدْنَا مِن دُونِهِ مِن شَيْءٍ نَّحْنُ وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن دُونِهِ مِن شَيْءٍ ۚ كَذَٰلِكَ فَعَلَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۚ فَهَلْ عَلَى الرُّسُلِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ
“এ মুশরিকরা বলে, আল্লাহ চাইলে তাঁর ছাড়া আর কারো এবাদত আমরাও করতাম না, আমাদের বাপ-দাদারাও করতো না এবং তাঁর হুকুম ছাড়া কোনো জিনিষকে হারামও গণ্য করতো না৷ এদের আগের লোকেরাও এমনি ধরনের বাহানাবাজীই চালিয়ে গেছে৷ তাহলে কি রাসূলদের উপর সুস্পষ্ট বাণী পৌঁছিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোনো দায়িত্ব আছে?”

এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা মুশরিকদের একটি ধারণা ও ভুলের অপনোদন করেছেন। তারা বলেছিল, আমরা আল্লাহকে ছাড়া অন্যান্য যেসব বস্তুর এবাদত করছি কিংবা তাঁর হুকুম ছাড়াই যেসব জিনিষকে নিজেদরে জন্য হারাম করে নিচ্ছি, তা যদি ভুল ও বাতিল হতো, তাহলে আল্লাহ তাঅআলা তাঁর কুদরতে কামেলা (পরিপূর্ণ ক্ষমতা) প্রয়োগ করে তা থেকে বিরত রাখলেন না কেন? তিনি না চাইলে তো আমরা সেগুলো করতেই পারতামনা। তিনি যেহেতু আমাদেরকে বল প্রয়োগ করে বিরত রাখছেন না, তাতে বুঝা গেল আমরা এসবকিছু তার ইচ্ছা ও মর্জি মোতাবেকই করছি!

তাদের এই ভ্রান্ত ধারণার জবাবে আল্লাহ তা’আলা বলছেন যে, আল্লাহর দ্বীন পৌঁছিয়ে দেয়াই রাসূলদের দায়িত্ব ছিল। বল ও শক্তি প্রয়োগ করে তাদেরকে ঈমানের উপর বাধ্য করা তাদের কাজ ছিল না। আসল কথা হলো, হে মুশরিক দল! তোমাদের এই ধারণা ঠিক নয় যে, আল্লাহ তোমাদেরকে শির্ক করা থেকে বাধা দেন নি; বরং তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তোমাদের শির্কী কাজ-কর্মের প্রতিবাদ করেছেন। এই জন্যই তিনি প্রত্যেক জাতির কাছেই রাসূল পাঠিয়েছেন, কিতাব নাযিল করেছেন। প্রত্যেক নবীই তাঁর কাওমকে সর্বপ্রথম এককভাবে আল্লাহ তা’আলার এবাদত করার এবং শির্ক বর্জন করার দাওয়া দিয়েছেন।

পরিস্কার কথা এই যে, আল্লাহ তা’আলা শির্ক, কুফরী ও পাপাচার কে কখনো পছন্দ করেন না। তিনি পছন্দ করেন না যে, লোকেরা কুফরী ও পাপাচারে লিপ্ত হোক। তিনি যদি শির্ক করাকে পছন্দই করতেন, তাহলে শির্কের প্রতিবাদ করার জন্য এত নবী-রাসূল পাঠালেন কেন? নবী-রাসূলদের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে শাস্তিই দিলেন কেন?

রাসূল পাঠানো সত্ত্বেও তোমরা যেহেতু তাদেরকে মিথ্যায়ন করে শির্কের পথ বেছে নিয়েছো, তাতে লিপ্ত হয়েছো, ঐ দিকে আল্লাহ তা’আলা তাঁর সৃষ্টিগত ইচ্ছার দ্বারা তোমাদেরকে জোর করে ও বাধ্য করে তোমাদেরকে কুফরী ও পাপাচার থেকে বিরত রাখেন নি, তাতে বুঝা গেল এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা’আলার ঐ হিকমতই বাস্তবায়িত হয়েছে, যার জন্য তিনি তাঁর বান্দাদেরকে ইচ্ছা ও এখতিয়ার করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। কেননা ইচ্ছা ও এখতিয়ারের স্বাধীনতা না দিয়ে কাউকে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। রাসূলগণ মানব জাতির কাছে নিজ নিজ রেসালাত পৌঁছিয়ে দেয়ার সময় শুধু এ কথাই বুঝিয়েছেন যে, তোমরা তোমাদের স্বাধীনতা ও ইচ্ছার অপব্যবহার করো না এবং ভুল পথে তা পরিচালিত করো না। বরং আল্লাহর রেজামন্দি ও সন্তুষ্টি মোতাবেক তা পরিচালিত করো। এটিই ছিল সকল নবী-রাসূলের কথা। তারা বলেছেন, তোমরা স্বাধীনতা ও ইচ্ছার ভুল ব্যাখ্যা এবং অপব্যবহার করে শির্ক ও অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়োনা। যদি তা করো, তাহলে চিরস্থায়ী এবং যন্ত্রদায়ক শাস্তির অপেক্ষা করো।

তাকদীর দিয়ে দলীল পেশ করে আল্লাহ তা’আলার আনুগত্য বর্জন করার প্রচেষ্টা নতুন কোন কথা নয়। আজও কিছু মানুষ আল্লাহর ইচ্ছাকে নিজেদের ভ্রষ্টতা ও অসৎকর্মের কারণ হিসেবে পেশ করছে। এটা অতি পুরাতন যুক্তি। বিভ্রান্ত লোকেরা যুগে যুগে নিজেরেদ বিবেককে ধোঁকা দেবার এবং উপদেশদাতাদের মুখ বন্ধ করার জন্য এ যুক্তি আউড়ে আসছে। এটিই ছিল পূর্বযুগের মুশরিকদের যুক্তি। নূহের প্লাবনের পর থেকে আজ পর্যন্ত হাজার বার এ কথা বলা হয়েছে। এই যুক্তিতে কোন আধুনিকতা নেই এবং অভিনবত্বও নেই। এটি বহুকালের বাসি-বস্তাপচা খোঁড়া যুক্তি। হাজার বছর থেকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্টরা একই গীত গেয়ে আসছে। এখনো সেই পচা গীতটিই গেয়ে আসছে কিছু মানুষ।

আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা এবং তাঁর রেজামন্দিকে এক মনে করার কারণে এই ভুলের উৎপত্তি হয়েছে। অথচ প্রকৃত সত্য হচ্ছে, আল্লাহর ইচ্ছা এক জিনিষ আর তাঁর সন্তুষ্টি ও রেজামন্দি আরেক জিনিষ। আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা যে দুই প্রকার, তা বর্ণনা করার সময় এই কিতাবের অনেক স্থানে এবং আমাদের অন্যতম কিতাব শরহুল আকীদাহ আত্ তাহাবীয়া এবং নাজাতপ্রাপ্ত দলের আকীদাহ নামক কিতাবের একাধিক স্থানে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে অধিক জানার জন্য পাঠকদের প্রতি আমাদের উক্ত বইগুলো পড়ার অনুরোধ রইল।

যারা আল্লাহর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টিকে এক করে বুঝ থাকে, তাদের ভুল ভাঙ্গার জন্য আল্লাহ তা’আলা একটি পশ্ন উত্থাপন করেছেন। তা এই যে, শির্ক ও কুফরীর প্রতি যদি আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি থাকতো এবং তাঁর ইচ্ছা ও রেজামন্দি যদি একই বিষয় হতো, তাহলে শির্ক করার কারণে আযাব আসলো কেন? সুতরাং আযাব যেহেতু এসেছে, তাহলে বুঝতে হবে আল্লাহর ইচ্ছা এক জিনিষ আর রেজামন্দি আরেক জিনিষ। অর্থাৎ আল্লাহ তাঅঅলার রেজামন্দির খেলাফ করার কারণে এবং শির্ক করার কারণে তাদের শাস্তি হয়েছে; তাদের কুফরী করাতে আল্লাহ তা’আলার যে (সৃষ্টিগত) ইচ্ছা রয়েছে, সেই ইচ্ছার কারণে নয়। (আল্লাহ তা’আলা ই অধিক অবগত আছেন)

বান্দার কাজ বান্দা নিজেই করে। অন্য কেউ নয়। যদিও আল্লাহ তা’আলা বান্দা এবং বান্দার কাজেরও স্রষ্টা। কারণ আল্লাহ তা’আলার সাম্রাজ্যের মধ্যে আল্লাহ ছাড়া আর কোন স্রষ্টা নেই। সুতরাং যাকে জোর করে বিষ পান করানো হয়, তার ব্যাপারে এটি বলা হয় না যে, অমুক ব্যক্তি বিষ পান করেছে; বরং বলা হয় বল প্রয়োগ করে বিষ পান করিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। মানুষ তাকে দোষরোপ করেনা। ঐদিকে যে নিজ ইচ্ছায় হাতে বিষ নিয়ে তা পান করে এবং নিজের জান বের করে দেয়, তাকে মানুষ দোষারোপ করে। সহীহ হাদীছে তাকে জাহান্নামী বলা হয়েছে।

এমনি বাতাস যাকে ছাদের উপর থেকে ফেলে দেয়, সে মারা গেলেও কেউ তাকে দোষারোপ করে না; বরং তার জন্য আফসোস করে এবং দুআ করে। অনিচ্ছায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে কেউ মৃত্যু বরণ করলে তাকে শহীদ বলা হয়। পক্ষান্তরে স্ব-ইচ্ছায় কেউ ছাদের উপর থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মৃত্যু বরণ করলে কিংবা গাড়ির নিচে নিজেকে ঢুকিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করলে কোন মানুষ তাকে ভালবাসে না।

এমনি যার কাছ থেকে জোর করে তালাক আদায় করা হয়, তার ব্যাপারে কেউ বলে না যে, অমুক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে; বরং বলা হয় তাকে বল প্রয়োগ করে তার কাছ থেকে তার স্ত্রীকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং তাকে তালাক দিতে বাধ্য করা হয়েছে। আর যে ব্যক্তি সজ্ঞানে নিজের স্ত্রীকে তালাক দেয়, তার ব্যাপারে বল হয় যে, অমুক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে।

এমনি বান্দা নিজ ইচ্ছাতে নামায পড়ে বলে তাকে নামাযী বলা হয়, সে নিজেই ঈমান আনয়ন করে বলেই তাকে মুমিন বলা হয় এবং সে নিজেই রোজা রাখে বলেই তাকে রোযাদার বলা হয়। অনুরূপ যে চুরি করে তাকে চোর বলা হয়, কিন্তু যার পকেটে টাকা ঢুকিয়ে দিয়ে চোর সাব্যস্ত করা হয়, তাকে কেউ চোর বলেনা। যে ব্যভিচার করে তাকেই ব্যভিচারী বলা হয়, কিন্তু কোন মেয়ের সাথে জোর করে ব্যভিচার করা হলে, তাকে যেনাকারী বলা হয় না; বরং ধর্ষিতা বলা হয়।

সুতরাং কোন্ কাজ মানুষের ইচ্ছাতে হয় আর কোন্ কাজ তাদের অনিচ্ছায় হয়, মানুষেরা তাদের বোধশক্তি দ্বারাই বুঝে ফেলে। তাদের ফয়সালাও হয় তার আলোকেই। ইসলামী শরীয়ত মানুষের উপর এমন আকীদাহ, বিশ্বাস ও আমল চাপিয়ে দেয়নি, যা মানুষের স্বাধীন বোধশক্তি উপলব্ধি করতে অক্ষম।

মোট কথা, তাকদীর দিয়ে দলীল পেশ করে পাপচারে লিপ্ত হয়ে শরীয়তের সীমা লংঘন করে এই কথা বলা ঠিক নয় যে, আমার নিজস্ব ইচ্ছায় নামায ত্যাগ করিনা, মদপান করিনা কিংবা পাপাচারে লিপ্ত হইনা; বরং তাকদীরে লিখা আছে, তাই আমার দ্বারা এগুলো হচ্ছে এবং আমি এগুলো করতে বাধ্য। হে আল্লাহ! আমাদেরকে তুমি হেদায়াতের পথ দেখাও। আমীন


লেখকঃ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী

শায়খ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী স্নাতক সম্পন্ন করেছেন মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরাবিয়া থেকে। বর্তমানে তিনি জুবাইল দাওয়া সেন্টার, সৌদি আরাবিয়াতে কর্মরত আছেন।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.

IIRT Arabic Intensive