(এই পর্বে থাকছে- বিদ’আতের পরিচয় এবং বিদ’আতের মৌলিক কিছু কনসেপ্ট)

একআমাদের প্রতি আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার এক বিশেষ রহমত যে আমরা এমন একটি ভূমিতে জন্মেছি যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম। এটি আমাদের প্রতি তাঁর সীমাহীন অনুগ্রহ। তবে পারিবারিকভাবে ইসলাম পেয়ে যাওয়ার কারণেই বোধহয় আমরা ঈমানের গুরুত্ব, তাওহীদের গুরুত্ব, সুন্নাহ এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে অনেকসময়ই সমর্থ হই না। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের দেশের মানুষের ইসলামের প্রতি যথেষ্ট আবেগ আছে। তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺকে অত্যন্ত মহব্বত করেন, তাঁর শানে বেয়াদবি সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, আবেগের সাথে ইলম তথা জ্ঞানের যোগসূত্র না থাকায় এই আবেগ উল্টো তাঁদের রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পথ থেকে দূরে দেয়। দেখা যায় যে, অন্তরে আল্লাহ্‌র রাসূলের প্রতি ভালোবাসা সত্ত্বেও তাঁকে অনুসরণের ক্ষেত্রে মুসলিমরা ততটা ব্রতী নন। যে ইবাদাতটা করছি, সেটা রাসূল ﷺকরেছেন কি না, যে পদ্ধতিতে করেছি তিনি কি সেই পদ্ধতিতেই করতে শিখিয়েছেন কি না- এসব বিষয়ে অমনোযোগী হবার কারণে মানুষ সুন্নাহ মনে করে এমন অনেক কাজ করে ফেলে যা আদৌ রাসূলুল্লাহ ﷺএর আনীত দ্বীন নয়, তাঁর প্রদর্শিত পন্থা নয়।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

আর এভাবেই জন্ম নেয় বিদ’আত। আমাদের সমাজের প্রতিটি মহলে বিভিন্ন বিদ’আত এমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসা অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর বেরিয়ে আসার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন হচ্ছে বিদ’আত সম্পর্কে জানা, বিদ’আতকে চেনা। আসলে বিদ’আত এমন একটি বিষয় যেটা সম্বন্ধে না জানলে ইসলাম সম্বন্ধেই জানা হয় না। তাওহীদ এবং সুন্নাহ হচ্ছে ইসলামের প্রাণকেন্দ্র, আর এই প্রাণকেন্দ্রকে বুঝতে হলেই বিদ’আত সম্বন্ধে জানতে হবে। বিদ’আত না চিনলে সুন্নাহকে চেনা যাবে না, সুন্নাহ না চিনলে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে চেনা যাবে না, আর আল্লাহ্‌র রাসূলকে না চিনলে তো আল্লাহকেই চেনা যাবে না। ফলে মু’মিন হিসেবে প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক হচ্ছে বিদ’আত বিষয়ে বেসিক জ্ঞান অর্জন।

দুইআল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর অসীম করুণা দ্বারা আমাদের এই দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ্‌ বলেন,

“আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম। তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” [সূরা মায়িদা (৫): ৩]

অতএব পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরে তাঁর দ্বীনে নতুন কিছু প্রবেশের সুযোগ নেই।

আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁর এই পবিত্র দ্বীনকে সংরক্ষিত করেছেন কুরআন এবং সুন্নাহকে সংরক্ষণের মাধ্যমে। অন্যান্য ধর্ম বিকৃত হয়েছিল ঐ ধর্মের অনুসারীদের তাদের পয়গম্বরের পথ থেকে আস্তে আস্তে সরে আসার কারণে। সুতরাং দ্বীনকে অবিকৃত রাখতে হলে, বিশুদ্ধ রাখতে হলে সুন্নাহ এর হুবহু অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য দ্বীনের মধ্যে নতুন পদ্ধতি প্রবেশ করিয়ে সুন্নাহ থেকে সরে আসা হচ্ছে এক কঠিন অপরাধ। আর এই নতুন বিষয় প্রবেশ করানোই হলো বিদ’আত।

বিদ’আত কী?

শাব্দিক অর্থে বিদ’আত মানে হলো ‘পূর্ববর্তী কোনো নমুনা ছাড়াই নতুন আবিষ্কৃত বিষয়’।[১]

ইসলামী শরীয়াহর পারিভাষিক অর্থে, ‘আল্লাহ্‌র দ্বীনের মধ্যে নতুন করে যার প্রচলন করা হয়েছে এবং এর পক্ষে শরীয়তের কোনো ব্যাপক ও সাধারণ কিংবা খাস ও সুনির্দিষ্ট দলিল নেই।’[২]

রাসূলুল্লাহ ﷺবলেন, নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী হচ্ছে আল্লাহ্‌র কিতাব এবং সর্বোত্তম আদর্শ হলো মুহাম্মাদের আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো (দ্বীনের মধ্যে) নব উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ। আর নব উদ্ভাবিত প্রত্যেক বিষয় হলো বিদ’আত আর প্রত্যেক বিদ’আত ভ্রষ্টতা, আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম।” [সহীহ মুসলিম-১৫৩৫]

ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ) বিদ’আতের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, “(বিদ’আত হচ্ছে) যে ধরণের ইবাদাত পালন থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ বিরত থেকেছেন অথচ কাজটি যদি শরীয়তসম্মত হতো তবে তা নিশ্চয়ই পালন করতেন, অথবা অনুমতি প্রদান করতেন এবং সাহাবী এবং পরবর্তী খলিফাগণ তা পালন করতেন। অতএব এ কথা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করা ওয়াজিব যে এ কাজটি বিদ’আতও ভ্রষ্টতা।”[৩]

সহজভাবে বলতে গেলে, বিদ’আত হচ্ছে ইসলামের মধ্যে এমন কোনো প্রথা বা ইবাদাতের এমন কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা, যা রাসূল ﷺ, সাহাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম), তাবেয়ীন এবং তাবে তাবেয়ীন থেকে প্রমাণিত নয় ও অনুমোদিত নয়।

বিদ’আতের বেসিক কিছু কনসেপ্ট-

১। রাসূলুল্লাহ এর সুন্নাহ মূলত আল্লাহ্‌রই নির্দেশ:

আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁর রাসূল সম্পর্কে বলেন,

“তিনি কখনও নিজের পক্ষ থেকে কোনো কথা বলেন না৷ তিনি যা কিছু বলেন তার সব কিছুই ওয়াহী, যা তাঁর কাছে পাঠানো হয়।” [সূরা আন নাযম (৫৩): ৩-৪]

এই আয়াত থেকে এটা স্পষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ ﷺযে কাজ যেভাবে করতে শিখিয়েছেন, তা মূলত আল্লাহ্‌রই পছন্দ। সুতরাং তিনি যে কাজ করেছেন সে কাজ, যে পদ্ধতিতে করেছেন সে পদ্ধতি এবং যে কাজ যখন বর্জন করেছেন সে কাজ তখন বর্জন করাই আল্লাহ্‌র পছন্দ। যেমন আল্লাহ্‌র রাসূল ﷺবেশি বেশি রোজা রাখতেন এবং রাখতে উৎসাহিত করেছেন। আবার ঈদের দিন রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং ঈদের দিন রোজা না রাখাই সুন্নাহ এবং এটাই আল্লাহ্‌র নির্দেশ। কেউ যদি রোজার বিশেষ ফজিলাত মনে করে ঈদের দিনও রোজা রাখে তবে সে হারাম কাজ করলো। তার সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হলো।

তাই আল্লাহ্‌র রাসূল ﷺযা বর্জন করেছেন তা করার মাধ্যমে কেউ যদি “বেশি সওয়াব” এর আশা করে তা হবে এক বিধ্বংসী চিন্তা। আর এই বিধ্বংসী চিন্তা থেকেই বিদ’আত শুরু হয়।

২। ইবাদাত বনাম মু’আলামাত: নতুন উদ্ভাবিত সকল কাজই কি বিদ’আত?

যখন বি’দআতের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়, তখন অনেকে একটা প্রশ্ন প্রায়ই করে থাকেন- বিদ’আত যদি খারাপই হয়, তাহলে মোবাইল ফোন, মাইক এসব ব্যবহার করেন কেন? এগুলো তো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সময় ছিলো না, পরে উদ্ভাবিত বস্তু!

এধরণের প্রশ্নের কারণ হচ্ছে, বিদ’আতের কনসেপ্টটা পরিষ্কারভাবে না বোঝা। আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলোকে মূলত দুইভাগে ভাগ করা যায়- ইবাদাত ও মু’আমালাত। ইবাদাত তো আমরা সবাই বুঝি, সাধারণভাবে নামাজ, রোজা, যিকর ইত্যাদিকে বলে। আর মু’আমালাত হচ্ছে আমাদের জাগতিক কাজকর্ম, যেমন খাওয়া, ব্যবসা-চাকরি, জাগতিক পড়াশোনা ইত্যাদি। এগুলোর ব্যাপারেও ইসলামের দিকনির্দেশনা আছে এবং সেগুলো মেনে চললে এ কাজগুলোও ইবাদাতে পরিণত হতে পারে, তবে সাধারণভাবে এ কাজগুলো মানুষ ইবাদাত ভেবে করে না বিধায় এগুলোকে মু’আমালাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বিদ’আত হতে হলে কাজটি অবশ্যই ইবাদাতের অংশ হতে হবে, মু’আমালাতের নয়। মু’আমালাতের ক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবিত বস্তুকে বিদ’আত বলে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে এরকম উদ্ভাবন প্রয়োজন। এরকম নতুন উদ্ভাবিত বস্তু যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যবহারগতভাবে হালালের সীমায় থাকবে, ততক্ষণ তা বৈধ। উদাহরণস্বরূপ, মোবাইল ফোন ব্যবহারকে হালালের সীমায় রাখলে তা ব্যবহারে কোনো সমস্যা নেই। আর এটি দিয়ে কোনো হারাম কাজ করলে সেই হারাম কাজের গুনাহ হবে। তবে হারাম বা হালাল যে কাজেই ব্যবহৃত হোক না কেন এক্ষেত্রে বিদ’আতের গুনাহ হবে না, কারণ এটি মু’আমালাতের অংশ হওয়ায় বিদ’আত নয়।

৩। বিশেষ ক্ষেত্রে মু’আমালাতও বিদ’আত হতে পারে:

সাধারণভাবে মু’আমালাত বা জাগতিক কাজে উদ্ভাবন বিদ’আত না হলেও যদি কোনো জাগতিক কাজের মাধ্যমে শরীয়তের দলিল ছাড়াই সওয়াবের আশা করা হয়, তা বিদ’আতে পরিণত হবে। উদাহরণস্বরূপ, পোশাক একটি জাগতিক বিষয়। কেউ যদি চটের, ছেঁড়া বা ময়লা পোশাক পরে তবে তা অনুত্তম হলেও জায়েয। কিন্তু এধরণের পোশাককে কেউ যদি আল্লাহ্‌র প্রিয় পোশাক ভাবে এবং এগুলো পরলে নেকি অর্জন হবে ভাবে তবে তা বিদ’আত হবে। কারণ এর পক্ষে কুরআন সুন্নাহ এ কোনো দলিল নেই।

৪। ইবাদাত বনাম ইবাদাতের উপকরণ:

বিদ’আতের কনসেপ্ট বোঝার ক্ষেত্রে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো ইবাদাত এবং ইবাদাতের উপকরণের মধ্যে পার্থক্য করতে পারা। যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ হজ্জে গিয়েছেন উটের পিঠে চড়ে। আমরা হজ্জে যাই এরোপ্লেনে চড়ে। এটা কি তাহলে বিদ’আত হলো? না, হলো না। কারণ উটে চড়া বা এরোপ্লেনে এক্ষেত্রে ইবাদাত নয়, বরং ইবাদাতের উপকরণমাত্র। হজ্জটা হচ্ছে ইবাদাত, সেই ইবাদাত করার জন্য যানবাহন একটা জাগতিক মাধ্যম। তাই এক্ষেত্রে পরিবর্তনের সুযোগ আছে। কিন্তু হজ্জের রুকনগুলো রাসূলুল্লাহ ﷺ যেভাবে আদায় করেছেন সেভাবেই আদায় করতে হবে, এক্ষেত্রে নতুন কিছু চালু করলে তা বিদ’আত হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ হজ্জের সময় সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে দৌড়েছেন। এখন কেউ যদি দৌড়ানোর জন্য অন্য দুটো পাহাড় নির্ধারণ করে তবে তা বিদ’আত হবে।

আবার ধরুন মাইকে আজান দেওয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে আজান দেওয়া হতো খালি গলায়। আমাদের সময়ে দেওয়া হয় মাইকে। এক্ষেত্রে মাইকটা ইবাদাত নয়, উপকরণ। ইবাদাত হচ্ছে আজানটা। ফলে কেউ মাইক ব্যবহার করুক বা না করুক কিংবা অন্য কোনো যন্ত্র ব্যবহার করুক সেসব বিদ’আত হবে না। কিন্তু আজানের বাক্যগুলোর মধ্যে যদি কেউ পরিবর্তন করে তাহলে তা বিদ’আতে পরিণত হবে।

আবার মনে করুন, কুরআন যখন লিপিবদ্ধ করা হয় তখন হরকত (যবর, যের, পেশ) ছিলো না, কারণ আরবদের আরবী পড়তে হরকত লাগে না। কিন্তু অনারবদের পড়তে অসুবিধা হয় বিধায় পরবর্তীতে কুরআনে হরকত সংযোজন করা হয়।এখন এই হরকত হচ্ছে সহজে কুরআন পড়ার উপকরণমাত্র, হরকত ইবাদাতের কোন অংশ নয়। সুতরাং এটি বিদ’আত নয়। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন হরকতবিশিষ্ট কুরআন তিলাওয়াত করা হরকত ছাড়া কুরআন তিলাওয়াতের চেয়ে উত্তম, তাহলে তা বিদ’আতে পরিণত হবে।

ইবাদাতের জায়েয পদ্ধতিও বিদ’আতে পরিণত হতে পারে:

কখনো কখনো ইবাদাতের জায়েয পদ্ধতিকেও মানুষ বিদ’আতে পরিণত করে ফেলে। এটি মূলত দুই কারণে হয়ে থাকে-

(i) অন্তরের অবস্থা।

(ii) রীতি বানিয়ে ফেলা।

প্রথমত, অন্তরের অবস্থাভেদে বিদ’আত হতে পারে। যেমন কোনো ইবাদাতের কোনো একটি পদ্ধতি হাদীস কর্তৃক জায়েয প্রমাণিত। সুতরাং কেউ এ পদ্ধতি অবলম্বন করলে তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু সে যদি এই পদ্ধতিকে সুন্নাহ সমর্থিত অন্য পদ্ধতির চেয়ে উত্তম ভাবা শুরু করে, যে উত্তম হবার ব্যাপারে দলিল নেই, তবে তা বিদ’আতে পরিণত হয়। কারণ এর মাধ্যমে সুন্নাহ সমর্থিত আরেকটি পদ্ধতিকে হেয় করা হয়।

যেমন- রাসূলুল্লাহ দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে সব অবস্থাতেই কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। সুতরাং দাঁড়িয়ে কুরআন পড়া নিঃসন্দেহে জায়েয, আমরা নামাজের ভেতর তো দাঁড়িয়েই কুরআন পড়ি। কিন্তু কেউ যদি নামাজের বাইরে দাঁড়িয়ে কুরআন পড়লে বেশি সওয়াব হয় এরূপ বিশ্বাস করেন, তবে সেটা বিদ’আতে পরিণত হবে। কারণ এক, এর পক্ষে কোন দলিল নেই এবং দুই, এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ যে অগণিতবার বসে এবং শুয়ে কুরআন পড়েছেন তাকে অসম্মান করা হলো। রাসূল ﷺ নামাজের বাইরে কোথাও দাঁড়িয়ে কুরআন পড়াকে বেশি ফজিলাতপূর্ণ বলেননি, অতএব একে এরকম মনে করা যাবে না।

তাহলে দেখুন, দাঁড়িয়ে কুরআন পড়ার মতো একটি ইবাদাতকেও কেবল বেশি ফজিলাতপূর্ণ “মনে করা”র কারণে তা বিদ’আতে পরিণত হলো। এভাবেই অন্তরের অবস্থা অনেকসময় ইবাদাতকেও বিদ’আত বানিয়ে ফেলে।

উদাহরণ ২। কেউ রমাদানের শেষ দশকে লাইলাতুল ক্বদর তালাশ করছে এবং রাতের বেলা নফল সালাত পড়ছে। এটি নিঃসন্দেহে অনেক বড় একটি ইবাদাত। সে ব্যক্তি নফল সালাতে প্রত্যেক রাকআতে সূরা ক্বদর পড়ছে। এতেও কোনো সমস্যা নেই, কেননা সূরা ক্বদর কুরআনেরই অংশ। কিন্তু সে মনে করছে লাইলাতুল ক্বদরে সূরা ক্বদর দিয়েই নামাজ পড়তে হবে এবং এর বিশেষ ফজিলাত আছে। এক্ষেত্রে এটি বিদ’আত হয়ে যাবে। কারণ এরকম কোনো নির্দেশ আল্লাহ্‌র রাসূল ﷺ দিয়ে যাননি।

উদাহরণ ৩। কেউ নফল সালাতে প্রত্যেক রাকাতে কোনো একটি সূরা বারবার পড়ছে। এটি জায়েয। কিন্তু যদি কেউ অমুক সংখ্যকবার এই সূরা পড়ার মাধ্যমে নামাজের একটি নিয়ম বানিয়ে ফেলে এবং এর বিশেষ ফজিলাত আছে বলে বিশ্বাস করে, তবে তা বিদ’আত হবে। আমাদের দেশে বাজারে প্রচলিত বইগুলোতে শবে বরাতের নামাজ, শবে মেরাজের নামাজ শিরোনামে প্রত্যকে রাকাতে পঞ্চাশবার সূরা ইখলাস বা অনুরূপ নিয়ম সম্বলিত নামাজের বিবরণ থাকে, যা নিঃসন্দেহে বিদ’আত। কারণ শরীয়তে এরকম নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নামাজ আদায়ের কোনো নিয়ম বর্ণিত হয়নি। অতএব, আমরা সতর্ক থাকি।

দ্বিতীয় ব্যাপারটা হলো, রীতি বানিয়ে ফেলা। কোনো একটি কাজ হয়তো রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো করেছেন, কখনো ছেড়েছেন। এরকমক্ষেত্রে কাজটিকে বারবার করে রীতি বানিয়ে ফেলার মাধ্যমে বিদ’আতের দরজা খুলে যায়। সালাফগণ এধরণের আচরণের বিরোধিতা করেছেন।

উদাহরণস্বরূপ, উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ানের সময় ফজর এবং আসরের সময় নিয়মিত গল্প-কাহিনীর মাধ্যমে ওয়াজ নসীহত হতো। সাহাবী গুদাইফ ইবনুল হারিস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর কাছে এই ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি একে বিদ’আত হিসেবে অভিহিত করেন।[৪] অথচ ফজর এবং আসরের পর গল্প-কাহিনীর মাধ্যমে নসীহত কোনো নাজায়েয কাজ নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সময়ও ওয়াজ নসীহত হতো। তবু সাহাবী কেন একে বিদ’আত বললেন? কারণ আল্লাহ্‌র রাসূলের সময় বা সাহাবীদের যুগে এভাবে ওয়াজ-নসীহত নির্দিষ্ট সময়ে নিয়মিতভাবে করা হতো না, প্রয়োজনমতো মাঝে মাঝে করা হতো। তাই একে নিয়মিত করলে একটা রীতি বানিয়ে ফেলা হয়, যা রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ এর খেলাফ। এজন্য সাহাবী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একে বিদ’আত বলেছেন।

৬। সুন্নাহ বনাম যুক্তি: আমি তো ভালো কাজই করছি, ভালো নিয়্যাতেই করছি!

শয়তান মানুষকে বিদ’আতে লিপ্ত করার ক্ষেত্রে মোক্ষম অস্ত্র এটি বেছে নেয় যে, মানুষ ভাবতে শুরু করে রাসূল ﷺ করেননি তো কী হয়েছে, কাজটি তো আর খারাপ নয়। তাছাড়া ভালো নিয়্যাতে করলে তা বিদ’আত কেন হবে?

এইরকম অজস্র যুক্তি দেখানো যায়। আমি আপনাদের হাদীসের একটা ঘটনা বলি।

প্রখ্যাত ফক্বীহ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা)-কে একবার কয়েকজন ব্যক্তির কথা জানানো হয় যারা নামাজের জন্য অপেক্ষা করছে আর বিভিন্ন হালাকায় বিভক্ত হয়ে আল্লাহ্‌র যিকর করছে। প্রতি হালাকায় একজন নেতাগোছের, সে বলছে, “সবাই ১০০ বার সুবহানাল্লাহ্‌ পড়ুন,” আর বাকিরা পড়ছে। আবার সে বলছে- সবাই ১০০ বার আল্লাহু আকবার পড়ুন। অন্যরা তখন পড়ছে। এদৃশ্য দেখে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “আল্লাহ্‌র কসম করে বলছি, তোমরা কি মুহাম্মাদ ﷺ এর ধর্মের চেয়েও ভালো কোন ধর্ম আবিষ্কার করলে? নাকি তোমরা বিভ্রান্তি ও গোমরাহির দরজা খুলে দিলে?” সমবেতরা বললো, “আমরা তো ভালো নিয়্যাতেই এ কাজ করছি।” তিনি জবাবে বলেন, “অনেক মানুষেরই উদ্দেশ্য ভালো থাকে কিন্তু সে ভালো পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না।” [সুনানে দারেমীর একটি দীর্ঘ হাদীসের অংশবিশেষ]

এখানে দেখুন, আল্লাহ্‌র যিকর নিঃসন্দেহে অনেক বড় একটি ইবাদাত। সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ইত্যাদি মাসনূন যিকর ১০০ বার করে করার কথাও হাদীসে এসেছে। এ পর্যন্ত সবই ঠিক আছে। কিন্তু যে পদ্ধতিতে তারা করছিলো, অর্থাৎ একজন নেতা থাকবে, সে নির্দেশ দেবে এবং বাকিরা সমস্বরে করবে- এমন পদ্ধতি আল্লাহ্‌র রাসূল শেখাননি। সেজন্য “ভালো কাজ”, “ভালো নিয়্যাত” এসব কথার কোনো দাম আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর কাছে রইলো না। রাসূল ﷺ এভাবে করতে শেখাননি, এই একটি ব্যাপারই এর বিরোধিতা করতে তাঁর জন্য যথেষ্ট ছিলো।

আরেকবার আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর পাশে এক ব্যক্তি হাঁচি দিয়ে বলেছিলো, “আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ” (সকল প্রশংসা আল্লাহর এবং সালাম আল্লাহর রাসূলের উপর)। তার উত্তরে ইবনু উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “আমিও বলছি ‘আলহামদুলিল্লাহ ওয়াসসালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ। কিন্তু আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাদের এমনভাবে বলতে শিখাননি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহি আলা-কুল্লি হাল’ (সর্বাবস্থায় আল্লাহর সকল প্রশংসা)।”  [সুনানে তিরমিযী, ২৭৩৮]

আজ এই পর্যন্তই। আগামী পর্বে ইনশা আল্লাহ্‌ আমরা জানবো বিদ’আত কেন বর্জনীয়, আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত কিছু বিদ’আতের কথা এবং বিদ’আত থেকে বাঁচতে আমাদের করণীয় কী- সে ব্যাপারে।

আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে সীরাতুল মুস্তাকীমে অটল রাখুন। আমীন।

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থাবলী

[১] আন নিহায়াহ, পৃ. ৬৯

[২] কাওয়ায়েদ মা’রিফাতিল বিদ’আহ, পৃ. ২৪

[৩] মাজমু আল ফাতওয়া, ২৭/১৭২

[৪] ফাতহুল বারী, ১৩/১৫৩-১৫৪

শুরু হোক আপনার অ্যারাবিক শেখার যাত্রা।  ফেব্রুয়ারি ২০১৭ এ শুরু হতে যাচ্ছে দুই বছর মেয়াদি অনলাইন ভিত্তিক আরবি ভাষা শিক্ষা কোর্স IIRT Arabic Intensive প্রোগ্রামের নতুন ব্যাচ, যেখানে অ্যাপনি বিশ্বের যেকোন প্রান্ত থেকে ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারবেন, ইনশা আল্লাহ। বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন: www.arabic.iirt.info

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.