একনকশাল আন্দোলন একটি কমিউনিস্ট আন্দোলনের নাম। বিংশ শতাব্দীর সপ্তম দশকে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি থেকে শুরু হয়ে এটি ধীরে ধীরে ছত্তীসগঢ় (তদানীন্তন মধ্যপ্রদেশ) এবং অন্ধ্র প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমে এটি একটি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে রূপ নিয়েছিলো। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী বিভিন্ন সালে নকশালদের হাতে নিহতের হার নিম্নরূপ-

১৯৯৬ সালে নিহত হয়েছে ১৫৬ জন।

মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য। বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন।

১৯৯৭ সালে নিহত হয়েছে ৪২৮ জন।

১৯৯৮ সালে নিহত হয়েছে ২৭০ জন।

১৯৯৯ সালে নিহত হয়েছে ৩৬৩ জন।

২০০০ সালে নিহত হয়েছে ৫০ জন।

২০০১ সালে নিহত হয়েছে ১০০+ জন।

২০০২ সালে নিহত হয়েছে ১৪০ জন।

২০০৩ সালে নিহত হয়েছে ৪৫১ জন।

২০০৪ সালে নিহত হয়েছে ৫০০+ জন।

২০০৫ সালে নিহত হয়েছে ৮৯২ জন।

২০০৬ সালে নিহত হয়েছে ৭৪৯ জন।

২০০৭ (৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) সালে নিহত হয়েছে ৩৮৪ জন।

২০০৮ সালে ৩৮ মাওবাদী সহ নিহত হয়েছে ৯৩৮ জন।

২০০৯ সালে ১৬ এপ্রিল জাতীয় নির্বাচনের প্রথম দফা ভোট গ্রহণের সময় বিহার, ছত্তিশগড় এবং ঝাড়খন্ডে হামলা চালিয়ে ১৮ জনকে হত্যা করে।

২৩ এপ্রিল জাতীয় নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা ভোট গ্রহণের সময় জামশেদপুর এবং ঝাড়খন্ডে হামলা চালিয়ে কয়েক জনকে আহত করে।

মে মাসে সম্ভাব্য মাওবাদীদের হামলায় ১৬ জন পুলিশ নিহত হয়।

বিবিসির হিসেব অনুযায়ী নকশালদের কারণে এখন পর্যন্ত ৬০০০ এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

একসময় সরকার নকশালদেরকে শক্ত হাতে দমনের সিদ্ধান্ত নেয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় নকশালদের উপর প্রতি-আক্রমণের নির্দেশ দেন। পুলিশকে কিছু মানবতাবিরোধী ক্ষমতা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিলো নির্বিচারে হত্যা এবং অকারণে যে কাউকে বন্দী করার ক্ষমতা। এক মাসের ভেতরে সরকার নকশাল আন্দোলন দমন করেছিলো। “নকশালদের শক্ত হাতে দমন করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই” ভারত সরকার এবং পুলিশের মনোভাব ছিল এমনই। তারা দেশের জনগণকে এ কথাও ভাল ভাবে বুঝিয়েছিলো যে “দেশ এখন ওই চরমপন্থীদের সাথে গৃহযুদ্ধে নেমেছে, এ যুদ্ধে গণতন্ত্রের নামে পরিহাসের কোনো স্থান নেই। কেননা ওই চরমপন্থীদের কাছে গণতন্ত্র মূল্যহীন।”

দুইঅবাক করা ব্যাপার হলো, নকশালের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করে সাহিত্য রচনা করে মানুষ পুরষ্কারও পেয়েছে। মহাশ্বেতা দেবী রচিত হাজার চুরাশির মা এমনই একটি উদাহরণ। সেখানে ব্রতী নামের একটি ছেলে নকশাল আন্দোলনে জড়িত থাকে। তার মতোই অনেক তরুণ তখন সমাজ রাষ্ট্রে বিদ্যমান বিভিন্ন অবিচারে ক্ষুব্ধ হয়ে নকশালের সাথে জড়িত হয়। একসময় সে তার কয়েকজন কমরেড সহ পুলিশের হাতে নিহত হয়। তার গার্লফ্রেন্ডও পুলিশের টর্চারের ফলে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে।

ব্রতী মোটামুটি অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে। ভাইবোনদের মাঝে সবার ছোট। ছোটকালে খুব ভীতু ছিলো। মা ছাড়া কারো সাথে তেমন ভালো মিলমিশ ছিলো না। তার দাদী, বাবা ও বড় ভাইবোন সবাইই বলতে গেলে “সিস্টেমের প্রতি অনুগত”। পরকিয়ায় লিপ্ত পিতার লোচ্চামিকেও ব্রতীর ভাইবোনেরা পৌরুষ বলে মানতো। নারীত্বের দুর্বলতার কারণে ব্রতীর মা সুজাতা তেমন প্রতিবাদী কেউ ছিলেন না। নকশাল করার পর থেকে ব্রতী কেন যেন খালি বাইরে বাইরে যেত। বাসায় কিছু জানাতো না। জিজ্ঞাসা করলে বলতো আড্ডা দিতে যাচ্ছে। ব্রতী নিজের ভাইবোনদেরকে এবং বিশেষ করে বাবাকে তেমন পছন্দ করতো না। সুজাতা এ নিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন। সে বলতো যে তার বাবার সাথে তার ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। বরং তার বাবার মতো মানুষেরা কিছু নীতি আদর্শে বিশ্বাসী। সেই নীতি আদর্শ ও সেগুলোর ধারক বাহকদের সাথেই তার শত্রুতা।

ব্রতী নিহত হওয়ার পর তার বাবা মিডিয়ার কাছে দৌড়াদৌড়ি করে ব্রতীর নাম গোপন রাখার ব্যবস্থা করে পরিবারের ইজ্জত রক্ষা করেন। ঘরের ভেতরে ব্রতীর সব স্মৃতিচিহ্ন নিশ্চিহ্ন করা না গেলেও একটা রুমে বন্দী করা হয়। ব্রতীর নাম তাই কোথাও প্রকাশিত হয়নি। সে ছিলো নিহত নকশালদের মধ্যে সরকারী হিসাব অনুযায়ী এক হাজার চুরাশি তম। পুরো গল্পে সুজাতা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে তাঁর মৃত সন্তানের আদর্শকে এক্সপ্লোর করেন। সুজাতার পার্সপেক্টিভ থেকে রচিত বলেই গল্পের নাম হয়েছে “হাজার চুরাশির মা”।

ব্রতী যেই কমরেডের ঘরে আড্ডা দিতো তার নাম সমু। নিহত হওয়ার দিনও তারা সমুর ঘর থেকেই ধরা পড়ে। সমুরা ছিল গরীব ঘরের। সুজাতার মতো পলিশড শুদ্ধ ভাষায় সমুর মা কথা বলতে পারেন না। তাঁর ভাষা হলো “দ্যাশে নি কোনো বিচার আছে গো দিদি…” টাইপের। কিন্তু সুজাতা আবিষ্কার করেন যে সমুর মায়ের সাথে তাঁর নিজের সুখ দুঃখের অনেক মিল।

গল্প শেষ হয় ব্রতীর বড় বোনের বিয়ে উপলক্ষে সুজাতাদের বাসায় হওয়া পার্টির মধ্য দিয়ে। দেশ বিদেশের পুঁজিবাদী রুই কাতলারা তাদের সব ভণ্ডামিসহ এক দৃশ্যে জড়ো হয়। মদের গ্লাস হাতে নিয়ে তারা নাচে, গায় আর নকশালদের নিন্দা করে- “দেশের jewelগুলোকেও মেরে ফেললি, নিজেরাও মরলি, মাঝখান দিয়ে অনেস্ট ইনভেস্টররা দেশ ছেড়ে চলে গেলো।” সব দেখে সুজাতার মাথা ঘোরাতে থাকে। একবার ব্রতীর নাম উচ্চারণ করে তিনি মাটিতে পড়ে যান।

তিনখেয়াল করলে দেখা যাবে আইএসের ঘটনার সাথে নকশালের অনেক মিল। ধনী-গরীব নির্বিশেষে তরুণরা আকৃষ্ট হয়, নীতি আদর্শের কথা বলে। দুটি দলেরই উদ্ভবের পেছনের মূল ক্রিমিনাল হলো সমাজ ও রাষ্ট্রে বিদ্যমান হাজারো যুলুম অবিচার আর সেসব অবিচারে নির্লিপ্ত থাকা মানুষের বিনোদন-ব্যস্ততা।

এই কাহিনীগুলো জানলে দেখবেন জঙ্গীবাদ কোনো ধর্মীয় আদর্শের একচেটিয়া সম্পত্তি না। সমাজতান্ত্রিক জঙ্গীবাদের ইতিহাসও অনেক সমৃদ্ধ। লগি-বৈঠা আর পেট্রলবোমার গণতান্ত্রিক জঙ্গীবাদ তো আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। আরেকটা চিন্তার বিষয় হলো ‘ধর্ম’ বলতে আমরা আসলেই কী বুঝি। যা মানুষের ব্রেইনওয়াশ করে? অ্যারন রেমন্ডের লেখা একটি বইয়ের নাম The Opium of the Intellectuals. বইয়ের এপিগ্রাফে লেখা কার্ল মার্ক্সের সেই বিখ্যাত উক্তি “…ধর্ম হলো জনতার আফিম।” এর নিচেই Simone Weil এর একটি উক্তি “মার্ক্সবাদ নিঃসন্দেহে একটি ধর্ম। মার্ক্সের নিজের ভাষায় বলতে গেলে, এটি ধর্মের মতোই জনগণের জন্য আফিমজাত মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।” এছাড়া একজন জর্ডানিয়ান আলেমের লেখা একটি বইয়ের নামকে বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় গণতন্ত্র: একটি ধর্ম

নকশাল প্রসঙ্গে ফেরত যাই। এটা অনস্বীকার্য যে, নকশাল দিয়ে পুরো কম্যুনিজমকে বিচার করা ঠিক না। কম্যুনিস্টদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা এ ধরণের সহিংস কর্মপদ্ধতির সমর্থক না। Ngugi wa Thiongo একজন বিখ্যাত কেনিয়ান লেখক। তাঁর Petals of Blood উপন্যাসটা নিয়ে একটু কথা বলি। উপন্যাসটিতে চারটি মেজর চরিত্র থাকে। আব্দুল্লা, কারেগা, মুনিরা (ইনি কিন্তু পুরুষ) এবং ওয়ানজা (ইনি নারী)। এদের মধ্যে মুনিরা বাদে বাকি সবার মুখ দিয়েই লেখকের কিছু না কিছু বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে। ধারণা করা যায় যে এদের মধ্যে কারেগা হলো লেখকের আসল মাউথপীস। কারেগা ছাত্রজীবনে প্রগতিশীল ছাত্রনেতা ছিলো। পরে ট্রেড ইউনিয়নের নেতা হয়। শিক্ষা ও কর্ম উভয় জীবনেই সে একাধিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়। একটি দৃশ্যে কথোপকথনের সময় সে তার আদর্শ খোলাসা করে। সেখানে সে বলে যে সে ভায়োলেন্সের বিপক্ষে নয়। কিন্তু প্রতিটা ইনডিভিজুয়ালকে ধরে ধরে হত্যা করাকে সে সমাধান মনে করে না। সে চায় সিস্টেমটাকে পাল্টাতে। এর অংশ হিসেবে যদি কখনো প্রয়োজনে অন্যায়কারীদের নেতা গোছের কাউকে হত্যা করা লাগলে সেটা ভিন্ন কথা।

আফ্রো-ক্যারিবিয়ান একজন সাইক্রিয়াটিস্ট Frantz Omar Fanon হলেন পরাধীন ব্যক্তি কর্তৃক ভায়োলেন্সের বৈধ ব্যবহারের সমর্থক। Ngugi, Fanon এর এই মতবাদটিকে তাঁর উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন। আমরা অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার সুবিধার্থে এটার একটা গালভরা নামও দিয়েছিলাম। Constructive violence. গঠনমূলক সন্ত্রাস! নিজেদের বুদ্ধি দেখে নিজেরাও মাঝেমধ্যে ভেবে উঠি।

তো দেখা যাচ্ছে ভায়োলেন্সকে পুরোপুরি কেউ অস্বীকার করতে পারে না। বামপন্থী কারেগা (তথা Ngugi স্বয়ং) নকশালবাদী সন্ত্রাসের সমর্থক না হলেও constructive violence-এর পক্ষে। লগি-বৈঠা আর পেট্রলবোমার রাজনীতিতে যারা বিশ্বাসী না, তাঁরাও দেশ ও দলের কোনো নৈতিক প্রয়োজনে জীবন দিতে প্রস্তুত থাকেন। ইসলামও তেমনি জিহাদকে বাদ দিয়ে কল্পনা করা যায় না। তাই আইএসের সাথে ইসলামের সম্পর্ক বিতর্কিত হতে পারে। কিন্তু জিহাদের সাথে ইসলামের সম্পর্ক আদি ও অকৃত্রিম।

শেষ কথা হলো, এমন কোনো আদর্শ নেই যা তার প্রয়োজনে কখনোই প্রতিপক্ষের এক ফোঁটা রক্তও ঝরায়নি। তাই কে কত কম মানুষ মারলো, কত লিটার রক্ত ঝরালো, এটা দিয়ে আদর্শের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করতে গেলে একটা never ending বিতর্ক শুরু হবে। আর এই বিতর্কে আপনি ইসলামের সাথে কখনোই পেরে উঠবেন না। বিশ্বযুদ্ধগুলো ইসলামের কারণে হয়নি।

শুরু হোক আপনার অ্যারাবিক শেখার যাত্রা।  ফেব্রুয়ারি ২০১৭ এ শুরু হতে যাচ্ছে দুই বছর মেয়াদি অনলাইন ভিত্তিক আরবি ভাষা শিক্ষা কোর্স IIRT Arabic Intensive প্রোগ্রামের নতুন ব্যাচ, যেখানে অ্যাপনি বিশ্বের যেকোন প্রান্ত থেকে ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারবেন, ইনশা আল্লাহ। বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন: www.arabic.iirt.info

নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published.